


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাইটার্স বিল্ডিং-এর বহিরঙ্গ বদলে ফেলে নিজের রূপ। লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার অ্যাস্লে ইডেন ভবনটিকে পুরোপুরি সরকারি সচিবালয় হিসাবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে, ১৮৭৭ সাল নাগাদ বিখ্যাত স্থপতি মার্টিনকে ভবনটিকে নতুন রূপে গড়ে তোলার দায়িত্বভার দেন। মার্টিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী সাদামাটা তিনতলা বাড়িটি পেল তার রাজকীয় রূপ। বাড়ির সামনে ও পিছনে বসল করেন্থিয়ান রীতির কারুকার্য করা থাম। সেই থামের মাথায় স্থান পেল রাজকীয় মুকুটের প্রতীকরূপে ত্রিকোণ চূড়া এবং চূড়ার ওপরে গ্রিক দেবী মিনার্ভার মূর্তি।
কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে লালদিঘীর পাড়ে প্রায় ১৬ বিঘা ১৭ কাঠা ০৮ ছটাক জমির উপর নির্মিত বিখ্যাত সেই রাজকীয় লাল বাড়িটা ১৩ বছর পরে আজ আবার সরগরম, রাজ্য প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে। তবে প্রশাসনিক ভবন নয়, বরং এই বাড়ি তৈরি হয়েছিল ‘কোম্পানি কা কেরানি কা বাড়ি’ হিসাবে, তারপর কিছুদিন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ এবং শেষে সরকারি কাজকর্মের জন্য ভবনটি ব্যবহৃত হয়। আর স্বাধীন ভারতে এই লাল বাড়িটিই হয়ে উঠল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজ্য শাসনের মূল ভরকেন্দ্র ‘মহাকরণ’, আরেক নাম ‘রাইটার্স বিল্ডিং’। ২০১৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর হাওড়া জেলার ‘নবান্ন’ ভবনে স্থানান্তরিত হলেও, ২০২৬ সালের মে মাস থেকে মহাকরণ আবার হয়ে উঠেছে রাজ্যের মুখ্য প্রশাসনিক কার্যালয়।

‘রাইটার্স বিল্ডিং’ নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই ভবনটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পর বাংলায় তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন চলছে, সেই সময় কলকাতাতেই ইংরেজদের প্রধান কুঠি বা বাণিজ্যকেন্দ্র তারা স্থাপন করে। সেই কুঠি ছিল ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লা, আজ সে কেল্লা অবলুপ্ত, সেই জায়গায় এখন স্বমহিমায় বিরাজ করে জিপিও বিল্ডিং। সেই কুঠির কাজকর্মের জন্য ইংল্যান্ড থেকে প্রচুর কর্মচারীদের নিয়ে আসা হত। সেই কোম্পানির ‘জুনিয়র সিভিলিয়ন’ অর্থাৎ কেরানিদের থাকবার জন্য একটি বাড়ি তৈরি করার প্রয়োজন হয়। সেজন্য কুঠির কাছাকাছি জমি পছন্দ করে টমাস লায়নকে একটি আস্তানা নির্মাণের পাট্টা দেওয়া হয়। লায়ন সাহেব ১৭৭৬ থেকে ১৭৮০-র মধ্যে ওখানে কয়েকটি পৃথক অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করেন। এভাবেই পত্তন হয় রাইটার্স বিল্ডিং-এর। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মহাকরণের উত্তর দিকে ‘লায়নস্ রেঞ্জ’ রাস্তাটি এখনও মনে করায় ভবনটির নির্মাতাকে। তবে তখনকার কেরানিদের বাড়ির চেহারা ঠিক এখনকার মহাকরণের মতো ছিল না। সারিবদ্ধ ব্যারাকের মতো তিনতলা বাড়ি আর চওড়া সিঁড়ি এই ছিল মহাকরণের আদিরূপ। এ প্রসঙ্গে ‘হিকিজ গেজেট’ থেকে জানা যায়, তৎকালীন কলকাতার প্রথম তিনতলা বাড়ি ছিল রাইটার্স বিল্ডিং।

কিন্তু সমস্যা হল অন্য জায়গায়, বিদেশ থেকে আসা কর্মচারীদের এদেশে বিনোদনের পরিসর ছিল অত্যন্ত অল্প। ফলে সারাদিন কাজের পর দিনের শেষে একাকিত্ব কাটাতে মদ্যপান এবং নানা উচ্ছৃঙ্খল আচরণে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়তে থাকে। এই অবস্থা ভাবিয়ে তোলে কোম্পানির কর্তাদের। তখন তারা অল্পবয়সিদের পরিবর্তে তুলনামূলক অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের চাকরিতে নিয়োগ করেন, এবং চাকরির মেয়াদও কমিয়ে দেওয়া হয়। দেখা গেল, এই ব্যবস্থার ফলে ভিড় কমতে থাকে রাইটার্স বিল্ডিং-এ। ক্রমে ক্রমে কর্মচারীদের বসবাসের ব্যবস্থা তুলে দিয়ে সরকারি কাজকর্মের কিছু দপ্তর নিয়ে আসা হয় এই বাড়িতে।
অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পাশাপাশি, বিদেশ থেকে এদেশে আসা কর্মচারীদের দেশীয় ভাষা এবং রীতিনীতি শেখানোর উদ্দেশ্যে ১৮০০ সালে এই ভবনেই স্থাপিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। এই কলেজের শিক্ষকতার ইতিহাসে জড়িয়ে আছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, উইলিয়াম কেরি, রামরাম বসু, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখ পণ্ডিতদের নাম। পরবর্তীকালে এই কলেজটি স্থানান্তরিত করা হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাইটার্স বিল্ডিং-এর বহিরঙ্গ বদলে ফেলে নিজের রূপ। লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার অ্যাস্লে ইডেন ভবনটিকে পুরোপুরি সরকারি সচিবালয় হিসাবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে, ১৮৭৭ সাল নাগাদ বিখ্যাত স্থপতি মার্টিনকে ভবনটিকে নতুন রূপে গড়ে তোলার দায়িত্বভার দেন। মার্টিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী সাদামাটা তিনতলা বাড়িটি পেল তার রাজকীয় রূপ। বাড়ির সামনে ও পিছনে বসল করেন্থিয়ান রীতির কারুকার্য করা থাম। সেই থামের মাথায় স্থান পেল রাজকীয় মুকুটের প্রতীকরূপে ত্রিকোণ চূড়া এবং চূড়ার ওপরে গ্রিক দেবী মিনার্ভার মূর্তি। এছাড়াও শাসন, বাণিজ্য, কৃষির প্রতীক হিসাবে আরও কিছু মূর্তি দিয়ে অলংকৃত করা হয় ভবনটি। তাছাড়াও সমৃদ্ধির প্রতীক রূপে অসংখ্য মাটির কলস এবং ব্রিটিশ রাজশক্তির প্রতিনিধি হিসাবে সিংহমূর্তি বসানো হল রাইটার্স বিল্ডিং-এ। নিউ রেঁনেসা ও ইউরোপীয় ধ্রুপদি স্থাপত্যরীতির মিশ্রণ একসঙ্গে মিশে গেছে, এই লাল ইঁটের বাড়িটিতে। কেরানিদের বাসভবন এভাবেই ধীরে ধীরে পরিণত হল গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবনে।

ঐতিহাসিক এই কার্যালয় শুধু অফিস হিসাবে নয়, স্মরণীয় হয়ে আছে তরুণ বিপ্লবী বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্তের সাহসিকতার জন্য। ১৯৩০ সালে এই ভবনের অলিন্দেই ঘটে এক দুঃসাহসিক বিপ্লবী অভিযান। এই তিনজন বিপ্লবী ছদ্মবেশে রাইটার্স বিল্ডিং-এ ঢুকে কারা বিভাগের তৎকালীন অত্যাচারী উচ্চপদস্থ অফিসার কর্নেল এম জি সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। স্বভাবতই এরপর ব্রিটিশ পুলিশ এবং নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে ওই অলিন্দেই অসম যুদ্ধ শুরু হয় বিনয়, বাদল ও দীনেশের। পুলিশের গুলিতে তিনজনই আহত হন। বিনয় ঘটনাস্থলেই পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কয়েকদিন পরেই প্রাণ হারান বাদল গুপ্ত, আর দীনেশ গলায় পরে নেন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের ফাঁসির দড়ি। ডালহৌসি স্কোয়ার নিজের নাম বদলে আজও অমর করে রেখেছে এই তিন তরুণ বিপ্লবীকে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এই লাল ভবনটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রধান সচিবালয়ে পরিণত হয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ এই ভবন থেকেই রাজ্য পরিচালনার কাজ শুরু করেন। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য রাজনীতিতে ঘটে গেছে নানা পালাবদল, আর মহাকরণ সাক্ষী থেকেছে বিভিন্ন সময়ে একের পর এক শাসক পরিবর্তনের।
শুধু বদলায়নি এই ভবনের আদি অকৃত্রিম ঐতিহ্য। তাই বিবাদী বাগ চত্বরের এই লাল-রঙা বাড়িটির গুরুত্ব শুধু প্রশাসনিক ফাইলেই নয়, চির জাগরুক হয়ে আছে ইতিহাসপ্রেমী এবং কলকাতাপ্রেমী সকল মানুষের মননে।
তথ্যসূত্র:
১. ক্যালকাটা টু কলকাতা, গৌতম বসুমল্লিক
২. এক ছাদের আত্মকথা, গৌতম বসুমল্লিক
৩. সচিবালয় মহাকরণের ইতিহাস, উদয়ন মিত্র
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved