


ফতেউল্লা একখানা যন্ত্র বানিয়েছিলেন। সেটা একাই তার দক্ষতার চূড়ান্ত অভিজ্ঞান হতে পারত, যদি আমরা মনে রাখতাম। বাদাউনী লিখছেন ১৫৮৪ সালের নতুন বছরে আকবরের রাজত্বে ‘ফ্যান্সি বাজার’ বসল যথারীতি। সেখানে ফতেউল্লার ‘স্টলে’ ফতেউল্লা নানাবিধ যান্ত্রিক কারসাজি তো দেখালেনই, সেইসঙ্গে প্রদর্শিত হল তার ‘আজব যন্ত্র’। সে আজব যন্ত্রই হল কাব্য-যন্ত্র।
হাতে মিনিট কয়েক সময় আছে? না থাকলে ধার করে নেওয়াই যায়, সুদটা চড়া পড়বে এই যা। আসল কথাটা হল, আজ আমাদের সময় থাকা আর সময়ে থাকা– এই দুটো থাকলে কি না করা যায়! একটা চকলেট প্রস্তুতকারক সংস্থা তাদের একটা ভেন্ডিং মেশিনে ভারতের সময় থাকা ও না থাকাটাকে নিয়ে বেশ একটা লাভজনক বেসাতি পেতেছে। তাদের কাচের স্বচ্ছ মেশিনটা এক শহরের একটা ব্যস্ত জায়গায় রাখা। তার নির্দিষ্ট অংশে টোকেন ফেললে পুতুলখেলার মতো অনেক কাণ্ডকারখানা ক্রমান্বয়ে ঘটিয়ে, মিনিট তিনেক পরে সে বিস্মিত ক্রেতার হাতে তার চকলেটখানা দেয়। ব্যস্ততার মাঝেও বেশ ভিড় জমায়। এটা নতুন কিছু না; বিশ্বব্যাপী ভেন্ডিং মেশিনে ঘটছে এমন ঘটনা। নতুন হল একে সবচেয়ে অলসগতির ভেন্ডিং মেশিন বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, আর মজার কথা হল আজকের দিনে এই অলসগতিটি প্রশ্রয়ও পাচ্ছে। এর ফলে আবার একটু ঘুরপথে হলেও ‘দ্রব্যের উৎপাদন থেকে বিক্রয়’– এই যাত্রাপথে নিহিত শ্রমের ভাগ্যেও একটু সম্মান জুটছে। আহা! এমন যদি হত– চৌরাস্তার মোড়ে বা পার্কে বা দোকানে এক টাকার কয়েন ফেলে দু’ লাইন ‘আনন্দ ভৈরবী’ পাওয়া যেত। পড়ার সময় কারোর হত না বলে তোমরা যন্ত্রখানা বানালেই না। এ তো হল হাতে সময় থাকার আজকের কথা। এবার আসি সময়ে থাকায়।
সময়ের চলাচলের প্রতিটি অনুপুঙ্খে জড়িয়ে থাকার দায় আমাদের সবার। আচার্য নন্দলাল বসুর ভাবাদর্শে কে. জি. সুব্রহ্মণ্যন্ লিখেছিলেন– যে উদ্ভাবন সমস্ত অতীতকে পরিহার করে সে বড় সুস্থতার লক্ষণ নয়। ভেন্ডিং মেশিন-সংক্রান্ত এক বিস্মৃত ইতিহাসের অবতারণা করা এ সময়ে প্রয়োজন।

শাহ ফতেউল্লা সিরাজী ইরান থেকে ভারতে ঠিক কবে এসেছিলেন জানা যায়নি। জানা যায় তিনি বিজাপুরের সুলতান প্রথম আদিল শাহের আমন্ত্রণে ও আয়োজনে ভারতে এসেছিলেন। তারপর লক্ষণীয় হয়ে ওঠেন ১৫৮৩ সাল নাগাদ, সম্রাট আকবরের রাজসভায়। রাজসভায় তার সম্ভ্রান্ত পদ আর তার প্রযুক্তিবিদ্যায় দক্ষতার কথা আবুল ফজল ও বদাউনী ভাগ্যিস লিখেছিলেন! তাতে অন্তত তার কাজ না-থাকুক নামটুকু রয়ে গেছে। তার মতো এমন বহুমুখী প্রতিভাধর ও প্রযুক্তিবিদ সে সময়ের ভারত-ইতিহাসে বিরল। আকবরের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে তার কর্মকাণ্ড বিস্তার পায়, কিন্তু তার মূলত ১৫৮৪ সালের কাজেরই বর্ণনা পাই আমরা। ১৫৮৮-তে উনি কাশ্মীরে মারা যান। তার ১৫৮৪ সালটি আমাদের বিভোর করে রাখে। তিনি বানিয়েছিলেন একসঙ্গে একাধিক বন্দুকের ব্যারেল পরিষ্কার করার যন্ত্র Yarghu, ওয়গন-মিল, চলমান স্নানঘর, একাধিক ব্যারেলের কামান, আয়না, গাড়ি। এছাড়াও ছিল টুকরো করা কামান আর টুকরো করা তাঁবু। এগুলো প্রয়োজন মতো জুড়ে নেওয়া যেত যাত্রাপথে। Yarghu আর কামানগুলোর নক্সা আইন-ই-আকবরিতে মেলে বলে এসব আবিষ্কার বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে। তার গণনা করা ‘ইলাহি’ বা আকবরী পঞ্জিকার অস্তিত্ব এখনও আছে।

ফতেউল্লা আরও একখানা যন্ত্র বানিয়েছিলেন। সেটা একাই তার দক্ষতার চূড়ান্ত অভিজ্ঞান হতে পারত, যদি আমরা মনে রাখতাম। বাদাউনী লিখছেন ১৫৮৪ সালের নতুন বছরে আকবরের রাজত্বে ‘ফ্যান্সি বাজার’ বসল যথারীতি। সেখানে ফতেউল্লার ‘স্টলে’ ফতেউল্লা নানাবিধ যান্ত্রিক কারসাজি তো দেখালেনই, সেইসঙ্গে প্রদর্শিত হল তার ‘আজব যন্ত্র’। ১৮৮৪ সালে বাদাউনীর মুন্তাখাব-উৎ-তারিখ থেকে অনুবাদে শুধু এটুকুই আভাস মেলে। ১৮৭৫ সালের ‘The History Of India As Told By Its Own Historians’ বইটিতে গৃহীত হয় শেখ নুর-উল হকের লেখা জুবদাতু-ৎ-তারিখ। নুর-উল হক ছিলেন দিল্লিতে বসবাসকারী পারস্য দেশীয় ইতিহাসবিদ। তিনি সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধে মূলত তাবাকৎ-ই-নাসিরি আর আকবরনামা থেকে বাছাই করা ঘটনা লিখেছিলেন তার বইতে। সেখানে সম্ভবত বাদাউনীর উল্লেখ করা ফতেউল্লার সেই ‘আজব যন্ত্রের’ বিবরণ মেলে। সে আজব যন্ত্রই হল আমার কাছে কাব্য-যন্ত্র।

সে যন্ত্র এক বাক্স বিশেষ, যার মধ্যে ভর্তি পুতুল। বাক্সের ওপরের গর্তে একটা ধাতব মুদ্রা বা ‘মোহর’ ফেললে সেটা গড়াতে গড়াতে নিচে আসত, আর ঘটে চলত একের পর এক ঘটনা, ক্রমান্বয়ে, ওপর থেকে নিচে। প্রথমেই শিকলে বাঁধা একটা তোতাপাখি কথা বলে উঠত, তারপর মোরগ জাতীয় একজোড়া পাখি এসে ডাকাডাকি করত। একটা জানলা খুলে বেরিয়ে আসত বাঘের মুখ, আর সেখান থেকে একটা গোলা পড়ত তার নিচে বেরিয়ে আসা এক সিংহের মাথায়। সেই গোলা আবার সিংহের মুখ থেকে বেরিয়ে নিচে পড়ত। তখন আরেকটা জানলা খুলে আরেকটা সিংহ এসে গোলাটা নিয়ে বাক্সের ভিতর চলে যেত। বন্ধ হত সে জানলা। ‘নিপুণ শুঁড় বিশিষ্ট’ দুটো হাতি আসত তারপর, দামামা বাজাত ছেলে পুতুলরা। এবার একটা দড়ি যেন আপন খেয়ালে বাক্সের বাইরে এল আর চলে গেল। আবার অন্য দুই মানব-পুতুল এসে সেলাম ঠুকলে, আরেকখানা জানলা যেত খুলে। সেখান থেকে শেষ পুতুলটা আসত হাফিজের কবিতা লেখা চিরকুট নিয়ে। যে ব্যাক্তি টাকা দিয়েছিল বাক্সে, সে কবিতাটা নিয়ে নিলে পুতুলটা বাক্সে ঢুকে যেত, আর জানলাটা বন্ধ হয়ে খেলা শেষ হত। অর্থাৎ টাকার পরিবর্তে সেই ভেন্ডিং মেশিনটা কবিতা দিত। তবে মুদ্রার ওজনটা বোধহয় নির্দিষ্ট হতে হত। মানে ভারি টাকায় এ বিনোদন মিলত। আর কবিতার সমঝদারদের জন্য ছিল এ বিনোদন। আকবর রাতের পর রাত এ খেলা দেখতেন, আর নকিব খান তাকে কবিতাগুলো পড়ে শোনাত।

গবেষকরা বলেন, ‘ত্রয়োদশ শতকে যেখানে যন্ত্রবিদ্যাকে পরিহার করা হয়েছিল, ঠিক সেখান থেকেই ফতেউল্লাহ তাকে বেছে নেয়’। তার যন্ত্রবিদ্যা প্রয়োগের মাধ্যম ছিল একেবারেই অভিজ্ঞতা নির্ভর এবং ব্যবহারিক। তার কাব্য-যন্ত্রে ব্যবহৃত লিভার বা কপিকল বা ব্যালান্স-কাউন্টার ব্যালান্স তার সময়ের বহু যুগ আগেই আবিষ্কৃত। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে আর্কিমিডিস সে সব ধারণার প্রয়োগ জনসমক্ষে হাতে-কলমে দেখিয়েছিলেন, আর বলেছিলেন– তাঁকে একটা লিভার আর দাঁড়াবার জায়গা দিলে তিনি পৃথিবী চাগিয়ে দেখাতেন। এ প্রসঙ্গেই এসে যান আরেক যন্ত্রবিদ; আলেকজান্দ্রিয়ার হেরন। তিনিই প্রথম ভেন্ডিং মেশিন বানিয়েছিলেন খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে, মিশরের মন্দিরের জন্য। সে সব মন্দিরে আসা দর্শনার্থী একখানা মুদ্রার বিনিময়ে সে যন্ত্র থেকে ‘পবিত্র জল’ বা ‘পবিত্র পানীয়’ পেত। যন্ত্রে মুদ্রা ফেললে সেই মুদ্রাটা একটা লিভারে এসে পড়ত, আর তার ফলে একটা কপাটিকা খুলে গিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ জল পড়ত যন্ত্রের বাইরে রাখা পাত্রে।

হেরনের লেখা বই ‘Pneumatic’ থেকে এর বিষয়ে জানা যায়। ভাগ্যিস সে বই আগুনে পোড়েনি। হেরনের এ জল-যন্ত্র বেশ প্রচলিত ছিল। ফতেউল্লাহ এর সবটা শিখেছিলেন নিজের মতো করে। তাই চিরকালীন বৈজ্ঞানিক সত্য-নির্ভর হয়েও তার কাব্য-যন্ত্র অতীতের পুনরাবৃত্তি ছিল না। আবার ভবিষ্যতের কাছেও হয়ে রইল অনুপ্রেরণামূলক। রাজানুগ্রহে থেকেও শুধু প্রজা-শোষণের আর ধর্মের কাজে আসেনি বলেই এর বিস্মরণ ঘটল এমন ভাবা অতিরঞ্জন হবে না। এই পুতুল-ভরা কাব্য-যন্ত্রের ইতিহাস ফিরে দেখলে ভারতের মাটিতে ভেন্ডিং মেশিনের ইতিহাস বদলে যায়। আমরা ভুলে গেলেও ইতিহাস তার পথিকদের ভোলে না। হাফিজ বলেন–
পথিকদের পথক্লান্তি নেই।
প্রেম পথও বটে, গন্তব্যও (মনজিলও) বটে।
[অনুবাদ: আবু সয়ীদ আইয়ুব]
তথ্য ঋণ:
১. Fathullah Shirazi: A Sixteenth-century Indian Scientist, M. A. Alvi and A. Rahman, National Institute of Sciences of India, New Delhi, 1968
২. Muntakhab-ut-Tawarikh, Al-Badaoni, Translated from original Persian by W. H. Lowe, vol-II, Asiatic Society of Bengal, Calcutta, 1884
৩. The History Of India As Told By Its Own Historians, Sir H. M. Elliot, The Muhammadan Period, Vol-VI, Trubner & Co, London, 1875
৪. Why Heron’s Aeolipile Is One Of History’s Greatest Forgotten Machines, Addison Nugent, Popular Mechanics, 29 Nov 2020
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved