Robbar

বহুত্বের স্বপক্ষে লড়াই

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 19, 2026 6:38 pm
  • Updated:May 19, 2026 6:38 pm  

বাংলা ভাষার অধিকার অর্জনের লড়াই শুধুমাত্র বাঙালির লড়াই ছিল না। বাংলা ও বাঙালি ছিল অগ্রভাগে, কিন্তু লড়াই ছিল বহুত্বের স্বপক্ষে বহুভাষী মানুষের লড়াই। বহুভাষিক অসমে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকারের সংগ্রামই ছিল সেদিনের বাংলা ভাষা আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য। তবে একথাও মনে রাখা দরকার, ভাষাশহিদরা বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের সংগ্রাম কেবল ভাষার ছিল না; ছিল মর্যাদার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সংগ্রাম।

সৃজা মণ্ডল

১৯ মে, ১৯৬১। বিশ্বকবির জন্মশতবর্ষ। যে-ভাষায় গান লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ, সেই ভাষায় কথা বলার, গান গাওয়ার, জীবনের অধিকার অর্জনের লড়াইয়ে, সেদিন রক্তে ভিজেছিল বরাকের মাটি। বরাক উপত্যকার তৎকালীন অবিভক্ত কাছাড় জেলার সদর শহর শিলচরের রেল-স্টেশনে পুলিশের গুলিতে জীবন আহুতি দিয়েছিলেন ১১ জন তরুণ-তরুণী। শঙ্খ ঘোষের কথায়, ‘আমরা যেন না ভুলি সেই দিনটার কথা। যেদিন বাঙালিরই একটা অংশ মৃত্যুবরণ করেছিল বাংলা ভাষারই মর্যাদা রক্ষার দায় কাঁধে নিয়ে।’ রক্তদানের পুণ্যে অর্জিত হয়েছিল বরাক উপত্যকার তিনটি জেলায় সরকারি ভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অগণিত অধিবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এ-এক অনন্য সংগ্রাম, গণ-অভ্যুত্থান।

অসমের ভাষা আন্দোলনের সূচনায় আমাদের ফিরে যেতে হয় ১৮৭৪ সালে। বাংলা প্রদেশ থেকে কাছাড়, সিলেট ও গোয়ালপাড়া জেলাকে বিচ্ছিন্ন করে দরং, কামরূপ, লখিমপুর, নওগাঁ ও শিবসাগর– এই ৫ জেলা নিয়ে আদি অসমের পরিসরকে বৃদ্ধি করে অসমকে ব্রিটিশ প্রশাসনের আওতায় চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশ হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়। এই সংযুক্তির আগে ৫ জেলার মোট জনসংখ্যা ছিল ২৩,৬৯,৩২৭ (W.W. Hunter, 1879, A Statistical Account of Account)। ফলে অসমের সেদিনের জনসংখ্যা ছিল ৩৮,৬০,৫৫৪। যার মধ্যে সাড়ে ২৩ লক্ষ জনগণই বাঙালি।

সিলেট-কাছাড় নিয়ে বিস্তৃত সমতল ভূখণ্ড আসলে আবহমান কালের বাংলার সঙ্গে ভৌগোলিক, নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক, লৌকিকভাবে সম্পৃক্ত ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সিলেট পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। অখণ্ড ভারতীয় চেতনাকে মনেপ্রাণে ধারণ করা বাস্তুচ্যুত বাঙালি সিলেট ও সীমান্তের অপর পাড় থেকে দলে দলে ছিন্নমূল উদ্বাস্তু হয়ে চলে আসেন বরাক উপত্যকায়। দেশভাগের পর অসমের শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে গড়ে ওঠে বাঙালি জনপদ। বাঙালির মাতৃভাষা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির বাহন হিসেবে বাংলা ভাষা অসমের সমাজ ও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। অসমে বাঙালি জনগোষ্ঠীর এই আধিক্য অসমিয়া জনগণের মনে শঙ্কার বীজ বপন করতে শুরু করে। ফলে ১৯৪৭ সালের ৫ নভেম্বর অসমের বিধানসভার অধিবেশনে রাজ্যপাল ঘোষণা করেন, অসম সরকার রাজ্যে অন্য কোনও ভাষা ব্যবহারে প্রশ্রয় দেবে না। সরকারি এই ঘোষণায় স্থায়ী ও অভিবাসী বাংলাভাষীদের অস্তিত্ব হয়ে ওঠে সংকটে দীর্ণ। অসমের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ঘৃণা ও উপেক্ষার শিকার হতে থাকে বাংলাভাষীরা। তাদেরকে চিহ্নিত করা হয় ‘অনুপ্রবেশকারী বিদেশি’, ‘বহিরাগত’, ‘সন্দেহভাজন শরণার্থী’ হিসেবে। ১৯৪৮ সালের মে মাসে গৌহাটি শহরে বাঙালিরা প্রথম সম্মুখীন হয় অসমের ভাষাদাঙ্গার। ভেঙে দেওয়া হয় ঘর-দোকান।

এরপর ১৯৫০ সাল। গোয়ালপাড়া জেলায় শুরু হয় ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলন। এই দাঙ্গায় প্রায় দুই লক্ষ বাঙালিকে তাদের বাসস্থান থেকে বিতাড়িত করা হয়। চলে লুঠপাট, অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা। গোয়ালপাড়ার বাঙালিদের এই শর্তে পুনর্বাসন দেওয়া হয় যে, তাঁদের অসমিয়া ভাষাকে ‘মাতৃভাষা’ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং ১৯৫১ সালের জনগণনায় নিজেদের অসমিয়াভাষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। রাজ্যে সরকারিভাবে অসমিয়া ভাষা গৃহীত না-হলেও রাজ্য-জুড়ে অসমিয়াকরণের একটি প্রয়াস চলতে থাকে সরকারি-বেসরকারি উভয়পক্ষ থেকেই। অসমিয়া ভাষায় সর্বত্র প্রচারপত্র, বিজ্ঞপ্তি বিলি চলতে থাকে।

স্বাধীনতা পরবর্তী বিক্ষিপ্ত দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ, হত্যালীলার একটি পর্ব শেষ হওয়ার পর ১৯৫৫ সালে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন আসার পর অসম আবার অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। উগ্র জাতীয়তাবাদের আক্রোশে কৃষকদের মাঠের ফসল পুড়িয়ে, হাতি দিয়ে ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দেশ থেকে তাড়ানোর প্রচেষ্টা করা হয়। বাঙালি ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, নিয়মিত রাজস্ব প্রদানকারী বাঙালি পরিবারকে বাস্তুভিটে থেকে উৎখাতের নোটিশ ধরিয়ে দেওয়া, রাতারাতি বাংলা-মাধ্যম স্কুলগুলোকে অসমিয়া-মাধ্যমে রূপান্তরিত করা– ফলে বাঙালি-সহ অন্যান্য ভাষিক গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ১৯৫০ সালের পর এ-হল দ্বিতীয় ‘বঙ্গাল খেদা’।

২২ এপ্রিল, ১৯৬০। অসম প্রদেশ কংগ্রেস সমিতি অসমিয়াকে রাজ্যভাষারূপে স্বীকৃতির জন্য একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। সরকারি ভাষা-প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য শিলচরে ‘নিখিল আসাম বাংলা ভাষা সম্মেলন’-এর ছায়াতলে বাংলা ভাষাভাষী বাঙালিরা এক নাগরিক সভা আহ্বান করেন, যেখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ওপর সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসা অবিচার ও বৈষম্যের কথা পর্যালোচনা করে কাছাড়, মণিপুর, ত্রিপুরা, লুসাই পাহাড় ও উত্তর কাছাড় পার্বত্য অঞ্চলকে নিয়ে ‘South East Regional Economy Convention’ করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ২ ও ৩ জুলাই ‘নিখিল আসাম বাংলা ভাষা সম্মেলন’-এর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় কাজী নজরুল ইসলামের গানে– ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার’। কিন্তু অসমের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ লক্ষ লক্ষ বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে সরকারি ভাষা করার মৌলিক অধিকারের দাবি অগ্রাহ্য করে, ১৯৬০-এর অক্টোবর মাসে পাশ হয় ‘আসাম ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট ১৯৬০’।

গর্জে ওঠে সারা অসমের অন-অসমিয়াভাষী জনগণ। শুরু হয় রাজ্য ভাষা বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন। বরাক উপত্যকা তো বটেই, অসমের অন্যত্রও শুরু হয় হরতাল, সভা, মিছিল, ধর্মঘট। ২৪ অক্টোবর অসমের রাজধানী শিলং-এর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্তব্ধ হয়ে যায় ৪০ হাজার নরনারীর এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিলে, যা অসমের ইতিহাসে অভিনব ও অদ্বিতীয়। এই আইনের প্রতিবাদে পণ্ডিত রাজমোহন নাথের সভাপতিত্বে ১৮, ১৯, ও ২০ নভেম্বর শিলচরে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল সম্মেলন। সম্মেলনে গৃহীত এক সিদ্ধান্তে বলা হয়, ‘যদি এ আইন করে বাংলা ভাষাকে অসমিয়া ভাষার সমমর্যাদা দেওয়া না হয়, তবে বাঙালি সমাজের মৌলিক অধিকার ও মাতৃভাষা রক্ষার্থে আসামের বাংলা ভাষা-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর বৃহত্তর আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অপরিহার্য হয়ে পড়বে।’

৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬১। শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে ‘কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ’ গড়ে তোলেন বাঙালিরা। ১৪ এপ্রিল তথা পয়লা বৈশাখ সত্যাগ্রহী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ‘সংকল্প দিবস’ পালন করা হয়। অজস্র কণ্ঠে সেদিন উচ্চারিত হয়েছিল, ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ, বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ।’ দিলীপকান্তি লস্কর তাঁর “উনিশে মে’র ইতিহাস” গ্রন্থে লিখছেন– “কাছাড়ের ঘরে ঘরে দুন্দুভি বেজে উঠল… নববর্ষের শুভদিনে সমগ্র কাছাড় শপথ নিল– জান দেব, জবান দেব না।… বুকের রক্তে স্বাক্ষর করে সত্যাগ্রহীরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। দলে দলে বেরিয়ে পড়ল পদযাত্রী। গ্রাম থেকে তারা গ্রামে যায়, আর গান গায়– ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা।’ তারা ডেকে বলে, ‘ভাই সব, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও, লড়াই-এর দিন এসে গেছে, অহিংস উপায়ে লড়াই।” ‘কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ’-এর তরফে ঘোষণা করা হয়েছিল, ১৩ এপ্রিলের মধ্যে বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া না-হলে ১৯ মে ব্যাপক হরতাল করা হবে।

১৯ এপ্রিল থেকে শুরু হল পদযাত্রা। দলে দলে পদযাত্রীগণ ভোর চারটে থেকে করিমগঞ্জ টাউন ব্যাঙ্ক প্রাঙ্গণে জমায়েত হতে থাকে। সকল সত্যাগ্রহীর কপালে এঁকে দেওয়া হয় চন্দন। উলুধ্বনি দিয়ে শুরু হয় পদযাত্রা। এই পদযাত্রায় রাজনৈতিক দলমত, জাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জেলার হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল। প্রায় ১৪ হাজার সত্যাগ্রহী পদযাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন। পদযাত্রীরা দু’সপ্তাহে দীর্ঘ ২২৫ মাইল পরিক্রমা করে ২ মে আবার করিমগঞ্জে ফিরে আসেন। বিপুল উন্মাদনার মধ্যে ঘোষিত হয় ১৯ মে ’৬১ থেকে শুরু হবে জেলাব্যাপী অহিংস সত্যাগ্রহ। ১৮ মে রাত ১২টার পর থেকে প্রায় ১০ হাজার তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ শিলচর রেল স্টেশনে অহিংস অবস্থান ধর্মঘট করার জন্য সমবেত হতে থাকেন।

অবশেষে আসে ১৯ মে। উত্তাল জনসমুদ্র। বাঁধভাঙা মানুষ। সবার কণ্ঠে স্লোগান, ‘আমার ভাষা তোমার ভাষা বাংলা ভাষা’। বাঙালিদের এই হরতাল দমন করতে বরাক উপত্যকা জুড়ে আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করে অসম সরকার। উত্তেজিত জনতার প্রতিরোধে সরকার বাহিনী ট্রেন চালাতে ব্যর্থ হন। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে শিলচর রেল স্টেশনের আকাশ-বাতাস। দফায় দফায় চলে লাঠিপেটা, পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও অবর্ণনীয় অত্যাচার। শুরু হয় একের পর এক গ্রেফতার। কিন্তু পুলিশের লাঠিচার্জ, বুটের লাথি, বন্দুকের বাঁটের আঘাত– কিছুর কাছেই মাথা নত করেনি সত্যাগ্রহীরা। প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে পুলিশি নির্যাতন সহ্য করেও সত্যাগ্রহীরা রেললাইন আঁকড়ে বসে থাকে। চলতে থাকে অবস্থান বিক্ষোভ।

বেলা ২.৩০ মিনিট। কাটিগাড়া থেকে ন’জন সত্যাগ্রহীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছিল পুলিশের একটি ট্রাক। জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। হঠাৎ ট্রাকে আগুন লেগে যায়। সত্যাগ্রহীরা জল দিয়ে আগুন নিভিয়ে দেয়। শোনা যায় ‘ফায়ার, ফায়ার’ চিৎকার। আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা অতর্কিতে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। সাত মিনিটে ১৭ রাউন্ড গুলি চলেছিল সেদিন। গুলিবিদ্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ শহিদ হন ৯ জন– সুনীল সরকার, সুকোমল পুরকায়স্থ, কুমুদ দাস, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, হিতেশ বিশ্বাস, শচীন্দ্রচন্দ্র পাল, কানাইলাল নিয়োগী ও ১৬ বছরের কিশোরী কমলা ভট্টাচার্য।

পরদিন স্টেশনের পাশের পুকুর থেকে সত্যেন্দ্রকুমার দেবের বুলেট বিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। রাতে হাসপাতালে মারা যান বীরেন্দ্র সূত্রধর। ভাষাশহিদের সংখ্যা দাঁড়ায় মোট ১১। তিন শহর মিলিয়ে আহতের সংখ্যা শত শত। গ্রেফতার করা হয় প্রায় ৬,৫০০ মানুষকে। শোকে স্তব্ধ সমগ্র শহর, সারা জেলার জনগণ। কোনও হিংসা নয়, কোনও সন্ত্রাস নয়, ওরা চেয়েছিল নিজের মাতৃভাষার গণতান্ত্রিক অধিকার।

১৯ মে গুলি-চালনার প্রতিবাদে হরতাল পালিত হয় শিলং শহরে। দিকে দিকে বিক্ষোভের ঢেউ ওঠে। ১১ জন ভাষাশহিদের রক্ত আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে অবশেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী-প্রদত্ত সূত্রের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত সংশোধনী আইনে কাছাড় জেলায় বাংলা ভাষা ব্যবহারের অধিকার স্বীকার করে নেওয়া হয়। ভাষা সৈনিকদের রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষার সম্মান ও মর্যাদার বিজয় পতাকা উড্ডীন হয় বরাক উপত্যকায়।

একাদশ ভাষাশহিদ

অধ্যাপক সুবীর কর উল্লেখ করছেন– ‘আমরা সবাই মিলেছিলাম মায়ের ডাকে। সংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছে বাহান্নের ঢাকার ভাষা সংগ্রাম। রফিক, সালাম, বরকতেরা ছিলেন আদর্শ। পদ্মা মেঘনা যমুনার মধ্যে কুশিয়ারা, ধলেশ্বরী, সুরমা খুঁজে নিয়েছিল তার ঠিকানা। বুড়িগঙ্গা আর বরাক হয়ে উঠেছিল চেতনার সংগ্রাম।’ সেদিন বাংলা ভাষার অধিকার অর্জনের লড়াই শুধুমাত্র বাঙালির লড়াই ছিল না। বাংলা ও বাঙালি ছিল অগ্রভাগে, কিন্তু লড়াই ছিল বহুত্বের স্বপক্ষে বহুভাষী মানুষের লড়াই। বহুভাষিক অসমে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকারের সংগ্রামই ছিল সেদিনের বাংলা ভাষা আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য। তবে একথাও মনে রাখা দরকার, ভাষাশহিদরা বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের সংগ্রাম কেবল ভাষার ছিল না; ছিল মর্যাদার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সংগ্রাম।

১৯ মে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে তার প্রকৃত ইতিহাসের নিরিখে, বৈচিত্রে, তার সংগ্রামের ব্যাপকতার নিরিখে। ভাষাকেন্দ্রিক গণ অভ্যুত্থানের এমন আপামর ব্যাপ্তি অন্য কোনও ভাষা সংগ্রামে পাওয়া যায় না। গণসংগ্রামের পন্থাকরণে, সত্যাগ্রহে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসংখ্য অধিবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই সংগ্রাম স্বতন্ত্র।

মাঠের হাল ছেড়ে ছুটে আসে চাষি, মাছ শিকার বন্ধ রেখে এগিয়ে আসে জেলে, তাঁতি তাঁত বোনা বন্ধ রাখে, শিলং শহরে ঐতিহাসিক মৌনমিছিল করে খাসি পুরুষ রমণীরা। ভিখারিরা সারাদিনের উপার্জন জমা দিয়ে যায় ভাষা সংগ্রামের তহবিলে। বন্দুকের ভয় দেখিয়ে শত চেষ্টা করেও একটি শহিদ-শবও গুম করতে পারেনি পুলিশ। রাজনৈতিক নেতৃত্ববিহীন ছাত্র-যুব ও জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহে ও আত্মত্যাগেই ১৯ মে-র ভাষা সংগ্রাম সাফল্য অর্জন করেছিল। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বরাক উপত্যকার প্রতিটি পরিবার এমনই একাত্ম হয়ে উঠেছিল যে, ২০ মে অরন্ধন ঘোষণা হলে সমস্ত ঘরেই উপবাস পালিত হয়। এই প্রতিটি বিষয়ই উনিশে মে’র ভাষা সংগ্রামকে দিয়েছে অনন্যতা। প্রত্যন্ত বরাকের নিভৃতিতে একান্তে জেগে থাকা এক চিরন্তন বিরহগাথা।

শিলচর স্টেশনে ভাষা শহিদদের স্মৃতিতে নির্মিত স্ট্যাচু

উনিশে মে-র ভাষা আন্দোলন ছিল আজকের বহুভাষী রাজ্যের পরিকাঠামো নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর। বহুত্বের চেতনাই উনিশের চেতনা। কিন্তু শুধু একটি দিনের আবেগ দিয়ে ঘিরে না-রেখে, জীবনে-মননে এবং কর্মে ঠাঁই দিতে হবে বাংলা ভাষাকে। তবেই উনিশের ভাষা আন্দোলনের আলো ছড়িয়ে পড়বে আকাশে-বাতাসে-জীবনে-যাপনে। আজও বাংলার এই ভূমিতে দাঁড়িয়ে বারবার মনে হয়, আরও কিছু লড়াই বোধহয় এখনও বাকি রয়ে গিয়েছে।

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন সৃজা মণ্ডল-এর অন্যান্য লেখা

……………………….