


তাঁর রচিত শ্রুতি-নাটক বা রেকর্ড-নাটকগুলো, বিশেষ করে শিশুতোষ নাটকগুলো, বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। ‘পুতুলের বিয়ে’-র মতো শিশুনাটকে তিনি অত্যন্ত সহজ ও কৌতুকপূর্ণ ভাষায় শিশুদের মনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে অমোঘ বার্তা (‘মোরা এক বৃন্তে দুটী কুসুম হিন্দু মুসলমান’) দিয়ে গেছেন, তা আজও আমাদের জন্য এক পরম শিক্ষা। শিশু-কিশোরদের উপযোগী করেও তিনি একাধিক নাটক লেখেন, এবং এই ধারায় তিনিই ছিলেন পথিকৃৎ।
উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সময়কালটি ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজের আত্ম-অনুসন্ধান ও আত্ম-প্রতিষ্ঠার এক ক্রান্তিলগ্ন। ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক অভিঘাতে মুসলমান সমাজ, বিশেষত অভিজাত শ্রেণি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফারসি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজির প্রচলন (১৮৩৭) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) ফলে বহু মুসলমান জমিদার ও রাজকর্মচারী তাঁদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি হারান। এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় তাঁদের আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চা থেকে পিছিয়ে দেয়। এই প্রতিকূল পরিবেশেও কয়েকজন মুসলিম ব্যক্তিত্ব নাটক রচনায় এগিয়ে এসেছিলেন। ড. ঊষাপতি বিশ্বাস– মুন্সী নামদার (‘কাশীতে হয় ভূমিকম্প নারীদের একি দম্ভ’), গোলাম হোসেন (‘হাড় জ্বালানী’), শেখ আজিম উদ্দীন (‘কি মজার কলের গাড়ী’) প্রমুখের নাম উল্লেখ করেছেন, যদিও তাঁদের সৃষ্টি নাট্যরস সৃষ্টিতে ততটা সফল হয়নি। কাজী নজরুল ইসলাম এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেন। তিনিই প্রথম সফলভাবে বাংলা নাটকের মূলধারায় মুসলিম জীবন, সংস্কৃতি, সমস্যা ও আকাঙ্ক্ষাকে শৈল্পিকভাবে তুলে ধরেন। তাঁর নাটক শুধুমাত্র মুসলিম সমাজের কথাই বলেনি, বলেছে মানবতার কথা, বলেছে শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কথা, গেয়েছে সম্প্রীতির গান।

কাজী নজরুল ইসলাম– এই নামটি উচ্চারিত হলেই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে এক মাথা ঝাঁকড়া চুল, চোখে দ্রোহের আগুন আর কণ্ঠে বাঁধভাঙা গান। ‘বিদ্রোহী’ কবি, সাম্যের রূপকার কিংবা অনবদ্য সুরস্রষ্টা হিসেবে তাঁর খ্যাতি এতটাই প্রখর যে, তাঁর সৃজনশীলতার অন্যান্য দিক অনেক সময় সেই প্রবল আলোর নিচে ঢাকা পড়ে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়েছে তাঁর নাট্যকার সত্তা। নজরুলের নাট্যকার হয়ে ওঠার নেপথ্যের ইতিহাসটি বড়ই চমকপ্রদ এবং মাটির কাছাকাছি। নজরুলের নাট্যশিক্ষার কোনও প্রথাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছিল না। তাঁর প্রথম পাঠশালা ছিল রাঢ় বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি– লেটো গানের দল। কৈশোরের চরম দারিদ্র তাঁকে এই পথে ঠেলে দিলেও, এখানেই তাঁর সৃজনশীলতার প্রথম বীজ উপ্ত হয়। লেটোর দলে গান রচনা, সুর দেওয়া এবং অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি একেবারে তৃণমূল স্তরের মানুষের ‘পাল্স’ বুঝতে শিখেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, মানুষের মনে রেখাপাত করতে গেলে তাদেরই ভাষায়, তাদেরই চেনা সুরে কথা বলতে হবে। এই লেটোদলের আসর থেকেই তিনি অর্জন করেছিলেন প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, তাৎক্ষণিক সংলাপ রচনার দক্ষতা এবং সুরের নাটকীয় প্রয়োগের জ্ঞান। ‘চাষার সঙ’ বা ‘রাজপুত্রের সঙ’-এর মতো লেটো পালাগুলোতে আধ্যাত্মিকতা ও স্বদেশপ্রেমের যে বীজ তিনি রোপণ করেছিলেন, তা-ই পরবর্তীকালে তাঁর বিদ্রোহী সত্তায় মহীরুহ হয়ে দেখা দেয়। আব্দুল আজীজ আল আমান তাঁর ‘নজরুল রচনা সম্ভার (দ্বিতীয় খণ্ড)’-এর ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, “এই বালক বয়সে (১২/১৩ বছর) প্রচলিত রচনা থেকে তাঁর রচনায় এমনই সুস্পষ্ট ও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ফুটে ওঠে যে তিনি ‘গোদাকবি’ (শ্রেষ্ঠ লেটোপালা রচয়িতা) আখ্যায় ভূষিত হন এবং ওস্তাদের পদ পান।” নজরুলের নাটকের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি হল এই শেকড়ের টান। তিনি কখনওই কলোনির খাঁচায় বন্দি এলিট ড্রয়িংরুমের থিয়েটার করেননি; তাঁর নাটক ছিল আপামর গণমানুষের। তাঁর রচিত পালাগুলির মধ্যে ‘শকুনি বধ’, ‘চাষার সঙ’, ‘দাতা কর্ণ’, ‘রাজপুত্র’ (বা ‘রাজপুত্রের সঙ’), ‘আকবর বাদশা’, ‘মেঘনাদবধ’ (মাইকেলের কাব্যের নাট্যরূপ), ‘কবি কালিদাস’, ‘রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ’, ‘বিদ্যাভুতুম’ (বা ‘বিদ্যাভূষণ’), ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ (মাইকেলের প্রহসনের নাট্যরূপ) প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই পালাগুলিতে পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক– বিভিন্ন ধরনের বিষয়বস্তু স্থান পেয়েছিল, যা নজরুলের বহুমুখী প্রতিভার পরিচায়ক।

নজরুলের নাট্যচেতনার আরেকটি অনন্য দিক হল– নতুন গণমাধ্যমের প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ এবং তার সার্থক প্রয়োগ। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেও যিনি নাটক রচনা ও মঞ্চস্থ করতে পারেন, তাঁর অদম্য জীবনীশক্তি সহজেই অনুমেয়। নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তীর ‘নজরুলের সঙ্গে কারাগারে’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, জেলের কয়েদিদের অভিনয়ের জন্য নজরুল এই নাটকটি লিখেছিলেন এবং মঞ্চসজ্জাতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন: “…স্টেজ তৈরী হল। শিল্পী অমরেশবাবু।… সঙ্গে কাজী ও আমরা ক’জন। লতায়-পাতায় ফুলে আর কাগজের রং-বেরং-এ অপরূপ হয়ে উঠল বন্দীশালার প্রেক্ষাগার।” মুজফ্ফর আহমদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মাদারিপুরের শান্তি-সেনা চারণদলের জন্য পূর্ণচন্দ্র দাসের অনুরোধে নজরুল আরও একটি নাটক লিখেছিলেন। এই নাটকটির পাণ্ডুলিপি জেল থেকে নিরাপদে বাইরে পাঠানো গেলেও, পরবর্তীকালে তা হারিয়ে যায়। তবে এর একটি গান, ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া’, তৎকালীন বিখ্যাত পত্রিকা ‘বিজলী’ ও ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়েছিল।

কিন্তু কারামুক্তির পর তিনি যখন এইচ.এম.ভি-র মতো গ্রামোফোন কোম্পানি এবং কলকাতা বেতারের সঙ্গে যুক্ত হলেন, তখন বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত খুলে গেল। তিনি বুঝলেন, প্রসেনিয়াম মঞ্চের দর্শক সংখ্যা সীমিত, কিন্তু রেডিও বা গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনো সম্ভব। তাঁর রচিত শ্রুতি-নাটক বা রেকর্ড-নাটকগুলো, বিশেষ করে শিশুতোষ নাটকগুলো, বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। ‘পুতুলের বিয়ে’-র মতো শিশুনাটকে তিনি অত্যন্ত সহজ ও কৌতুকপূর্ণ ভাষায় শিশুদের মনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে অমোঘ বার্তা (‘মোরা এক বৃন্তে দুটী কুসুম হিন্দু মুসলমান’) দিয়ে গেছেন, তা আজও আমাদের জন্য এক পরম শিক্ষা। শিশু-কিশোরদের উপযোগী করেও তিনি একাধিক নাটক লেখেন, এবং এই ধারায় তিনিই ছিলেন পথিকৃৎ। তাঁর উল্লেখযোগ্য রেকর্ড-নাটকগুলির মধ্যে রয়েছে ‘খাঁদু-দাদু’ (১৯৩২), ‘পুতুলের বিয়ে’ (১৯৩৩), ‘পণ্ডিত মশায়ের ব্যাঘ্র শিকার’ (১৯৩৩), ‘শ্রীমন্ত’ (১৯৩৫), ‘বিদ্যাপতি’ (রেকর্ড ভার্সন, ১৯৩৬), ‘ঈদলফেতর’ (১৯৩৬), ‘পুরনো বলদ নতুন বউ’ (১৯৩৯), ‘বনের বেদে’ (১৯৪০) ইত্যাদি। এই সময়ে তিনি প্রায় ৮০টির মতো গীতি-আলেখ্য রচনা করেন, যেগুলির নাট্যধর্মিতা অনস্বীকার্য। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল: ‘গুলবাগিচা’, ‘অতনুর দেশ’, ‘কাবেরী তীরে’, ‘কাফেলা’, ‘ছন্দসী’, ‘দেবীস্তুতি’, ‘নবরাগ-মালিকা’, ‘অন্নপূর্ণা’, ‘নীলাম্বরী’, ‘আকাশবাণী’, ‘শারদশ্রী’, ‘দীনলীলা’ ইত্যাদি। বেতারে প্রচারিত তাঁর অন্যান্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘জাগো সুন্দর চির কিশোর’, ‘বিজয়া’, ‘হরপ্রিয়া’, ‘ঈদ’ (১৯৪১) ইত্যাদি।

একইভাবে চলচ্চিত্রের মতো শক্তিশালী মাধ্যমেও তাঁর বিচরণ ছিল স্বচ্ছন্দ। ‘বিদ্যাপতি’ (১৯৩৮) বা ‘সাপুড়ে’ (১৯৩৯)-র মতো চলচ্চিত্রে তিনি কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার এবং সংগীত পরিচালক হিসেবে যে মৌলিকত্ব দেখিয়েছিলেন, তা প্রমাণ করে তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা একজন শিল্পী। শোনা যায় তিনি ‘মদিনা’ নামে একটি চলচ্চিত্রের কাহিনি ও চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন, যদিও সেটি সম্পূর্ণ হয়েছিল কি না বা মুক্তি পেয়েছিল কি না, তা জানা যায় না। ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনকে তিনি যে দরদের সঙ্গে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন, তা তাঁর লোকায়ত জীবনবোধেরই প্রতিফলন। চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনাতেও কাজী নজরুল ইসলাম অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘ভক্ত ধ্রুব’ (১৯৩৪), ‘পাতালপুরী’ (১৯৩৫), ‘গ্রহের ফের’ (১৯৩৭), ‘গোরা’ (১৯৩৮) প্রভৃতি সিনেমার সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তিনিই।

কাজী নজরুল ইসলামের নাট্যরচনার প্রেক্ষাপট বিচার করলে দেখা যায়, তাঁর সাহিত্যিক জীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত (প্রায় ২২-২৩ বছর) এবং অসম্ভব কর্মবহুল। পত্রিকা সম্পাদনা, রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ, অসুস্থ স্ত্রীর নিরন্তর সেবা এবং তীব্র আর্থিক সংকটের সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম– এই প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও তিনি সৃষ্টিশীল থেকেছেন, যা এক বিস্ময়কর মানসিক শক্তির পরিচায়ক। তাঁর বহু নাটকই রচিত হয়েছে বেতার বা গ্রামোফোন কোম্পানির তাৎক্ষণিক চাহিদা বা ফরমায়েশে। নবেন্দু সেন যথার্থই বলেছেন, ‘নজরুলের ধনী মনে গৃহিনীপণার অভাব ছিল। নাটকগুলির ভাষায় সেই অযত্ন, সেই অবহেলার এলোমেলো শিথিল সৌন্দর্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আস্বাদনের তার পূর্ণধরণ নেই। বিশ্লেষণে হঠাৎ বিজুলি চমকের ক্ষণপ্রভা লক্ষিত হয়।’ এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁর নাট্যসৃষ্টিতে যে বিষয়বৈচিত্র, জীবনবোধের গভীরতা এবং শৈল্পিক নিরীক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে, তা বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved