Robbar

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 20, 2026 8:27 pm
  • Updated:June 20, 2026 8:39 pm  

চিত্তপ্রসাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজ ‘Hungry Bengal’, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের এক গ্রাফিক রিপোর্ট। জনশূন্য গ্রাম, কঙ্কালসার দেহ এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে; খাদ্যাভাবে ফোলা পেট নিয়ে ধুঁকছে শিশু; আকাশে উড়ছে কাক, শকুন; বিধ্বস্ত স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার পরিবেশন করছে গ্রামবাসীদের। দেহ এখানে বাংলা ঘরানার মাধুর্য মেশানো, আধ্যাত্মিকতায় আচ্ছন্ন, কমনীয় দেহপট নয়। এ দেহ আদর্শ-বিরোধী (anti-ideal)। মন্বন্তরে ক্ষইতে থাকা কর্কশ দেহ। বেঙ্গল স্কুল-এর মাধুর্যের মুখে চাবুক কষে, ঘুম ছুটিয়ে দেওয়া বাস্তবের ছবি। বাংলার শিল্প-ইতিহাসের মোড় গেল ঘুরে।

ঐন্দ্রিলা মাইতি সুরাই

কারও হাতে ধানের গোছা আর কাস্তে। কারও হাতে কাস্তে-হাতুড়ি আঁকা ঝান্ডা। পতপত করে উড়ছে খোলা আকাশের নিচে। শিশু-মহিলা-পুরুষের এক দল হইহই করে হেঁটে আসছে। সন্দেহ নেই, তা কৃষক সম্প্রদায়। তির্যক রেখা ভেঙে দিয়েছে চিত্রপটের সমতল। দলের সদস্যদের জোর কদমে এগিয়ে চলা, ফোরশর্টেন্ড, পেশিবহুল হাত-পা বলে– তারা নির্ভীক। তারা করবে জয় [চিত্র ১]।

চিত্র ১। গতি-কৃষক-দারিদ্র-আন্দোলন। ভারতীয় আধুনিক শিল্পের মোড় গিয়েছিল ঘুরে

এ-ছবি যে সময়ের, সে-সময় শিল্পচর্চার ইতিহাসে এই বিন্যাস-আঙ্গিকে অভ্যস্ত হয়নি ভারতবর্ষ। এই গতি, এই তাপ্পি-মারা কাপড় পরা গরিবগুর্বোরা পাত পায়নি এলিট সম্প্রদায়ের ঘরের কোনও সাজানোর বস্তু হিসেবে। না ছিল কালি-কাগজ-ছাপাই-কলমের মতো সাধারণ মাধ্যমে ভেঙে পড়া অর্থনীতির প্রতিফলন। বরং উৎস সন্ধান করলে দেখা যাবে, এ-ছবি চিন-জার্মানি-সোভিয়েত দেশের সংকটকালের, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছবির অনেক কাছাকাছি। [চিত্র ২] এই সত্যনিষ্ঠ নির্মাণ শিল্পী চিত্তপ্রসাদের। নিছক সৌন্দর্যায়নের কারণে নয়। ‘মাস’-এর প্রতিফলন হিসেবে। 

চিত্র ২। ‘রাইজ! ইএ হু রিফিউজ টু বি স্লেভস’ লি হুয়া। ১৯৩০। সাংহাই মিউজিয়াম। যুদ্ধের সময়ের চৈনিক কাঠখোদাই, চিত্তপ্রসাদের অনুপ্রেরণা এসেছিল এমন বিষয় এবং আঙ্গিক থেকেই

ভারতীয় দর্শকের চোখ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হতে থাকল দৃশ্যকলার এই পরিবর্তনের সঙ্গে। দেখতে শিখলো– সার দিয়ে দাঁড়িয়ে একদল মহিলা-পুরুষ-শিশু। সাঁওতাল-হিন্দু-মুসলিম। বোধহয় শিখও। পুরুষদের হাতে লাঠি। অধিকাংশই তাকিয়ে ডানদিকে। যেন সুদিনের আশায়। মহিলাদের মধ্যে কারও কারও মুখ আনত হলেও, বাকিদের শরীরী ভাষা বলে, ‘আমারে দাবায়ে রাখতে পারবেনি!’ পুরো দলটাই কালোর এক দলা যেন। চারদিকের সাদার ব্যবহার তাদের করেছে পৃথক, ঘন সন্নিবদ্ধ এক জোট। সংহতি বলে যাকে। জাত-ধর্ম নির্বিশেষে রুখে দাঁড়িয়ে। কাঠখোদাইয়ের রুক্ষতায় ধরা পড়ে তাদের রূঢ় বাস্তব আর কঠিন লড়াই। এই বিন্যাস ভারতীয় নয় (এই আঙ্গিক ক্যাথে কোলউইৎজ-এর ‘দ্য মাদার্স’-এর খুব কাছাকাছি)। এই ছাপাই ছবি মেহনতি মানুষের ইস্তেহার যেন। ঘর সাজানোর বস্তু নয়। হাজার হাজার দর্শক ডেকে, ‘কী দারুণ’-এর নিরিখে পুরস্কার জেতার জন্য নির্মিত নয়। এ-ছবি মানুষকে তার পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য। আগামীর জন্য সেই ক্ল্যারিয়ন কল।

এই ছিল চিত্তপ্রসাদের ছবির ভাষা।

চিত্র ৩। ভারতীয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়। চিত্তপ্রসাদের ছাপাই চিত্র প্রভাবিত হয়েছিল একাধিক আন্তর্জাতিক শিল্পীদের থেকে। তার মধ্যে অন্যতম ক্যাথে কোলউইৎজ
চিত্র ৪। ক্যাথে কোলউইৎজ, দ্য মাদার্স, ১৯২২-১৯২৩। কাঠখোদাই। চারদিকে সাদা স্পেস ছাড়া। মাঝখানে কালো সন্নিবদ্ধ মায়েরা যেন একটি একক

২১ জুন বাংলার আধুনিক শিল্পচর্চার অন্যতম ছাপাই চিত্রশিল্পী চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের জন্মদিন। এই নিবন্ধ তুলে রাখা উচিত ছিল সেই সময়ের জন্য– আরও বিশদে, সম্পূর্ণভাবে তাঁর শিল্পী-জীবনের যাত্রা ফিরে দেখার জন্য।

চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য

সদ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন পেরিয়ে এলাম আমরা। ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে এমন যুদ্ধের দামামা বাজতে বোধহয় গত ৫০ বছরেও শোনা যায়নি। এই সুবাদে, জনমোহিনী নীতি-সমকালীন শিল্প-বামপন্থী আদর্শের নিরিখে জাতীয়তাবাদ– এই ত্রয়ীর বহুস্তরীয় সম্পর্ক তলিয়ে দেখার ইচ্ছেকে তাই দমিয়ে রাখা দায়। শিল্পীর (সাহিত্যিক এবং রাজনীতিকেরও) দায়িত্ব কেমন হওয়া উচিত– এই আবহে তা ভাবতে বসা অস্বাভাবিক নয় বোধহয়। এবং এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় আধুনিক শিল্পচর্চার শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস এবং চিত্তপ্রসাদ, স্বভাবতই হয়ে ওঠেন প্রাসঙ্গিক। 

শিল্পীর সামাজিক দায়িত্ব, রাজনৈতিক চেতনা এবং শৈল্পিকচর্চায় আন্তর্জাতিক প্রভাব– এই জটিল, বহুস্তরীয় সমীকরণের নিরিখে এখানে দেখা হল তাঁকে। ফলে চিত্তপ্রসাদের ধারাবাহিক যাত্রাপথের বেশ কিছুটা বাদ পড়ল এই নিবন্ধে।

গত ১৫ বছর ঝিমিয়ে থাকার পর বাম-নেতৃত্বের পুনরুত্থান; সর্ব-ভারতীয় তৃণমূলের স্থায়িত্ব নিয়ে গুঞ্জন সর্বত্র; কেন্দ্রে ভারতীয় জনতা পার্টির মরিয়া চেষ্টা বাংলার মসনদ ছিনিয়ে নেওয়ার।– এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী প্রচারের এক অভূতপূর্ব এবং বেপরোয়া (কিছুটা আগ্রাসীও) ছবি ফুটে উঠছে খবরের কাগজে-সমাজ মাধ্যমে-ডিভাইডারে-পাঁচিলে। এমনিতেই জনমোহিনী নীতি দৃষ্টি-জগতে প্রভাব ফেলেছে নাটকীয়ভাবে এবং দুঃখজনকভাবে ছাঁচে ঢালা নান্দনিকতায় (schematized)। তার ওপর আধ্যাত্মিক বিষয়ের প্রচারের ওপর গুরুত্বের মাত্রা বেড়েছে প্রবলভাবে। এর জেরে যখন চোখ এবং চেতনা, দুই-ই আচ্ছন্ন, তখন চিত্তপ্রসাদ (এবং তাঁর সমসাময়িক শিল্পীদের) মনস্তত্ত্বের কথাটা ফিরে দেখার স্পৃহা বোধ করি স্বাভাবিক।

সরাসরি চিত্তপ্রসাদের কথায় আসার আগে কিঞ্চিৎ তলিয়ে দেখা যেতে পারে শিল্পচর্চা-সংক্রান্ত মূল প্রশ্নটা কী হওয়া উচিত: শিল্প কি সত্যের মাধ্যম হয়ে ওঠার যোগ্য? শিল্পকে টিকে থাকতে হলে এই প্রশ্ন জরুরি, কারণ শিল্প যদি বাস্তব উপস্থাপনের মাধ্যম না-হয়ে উঠতে পারে, তবে তা শুধুই রুচির মাধ্যম (পছন্দ, ভালো লাগার বস্তু) হয়ে পড়বে। এই সত্যি কথাটা আমাদের মানতে হবে, ভালো না লাগলেও।

তবে শিল্প যদি শুধুমাত্র রুচি কিংবা পছন্দ কিংবা ভালো লাগার মাধ্যমই হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তার দর্শক হয়ে ওঠে শিল্পীর চেয়ে বেশি জরুরি। তার ফলে শিল্প হয়ে পড়ে অক্ষম। তার স্বাধীনতা হারিয়ে গিয়ে সে হয়ে দাঁড়ায় অলংকারের (design) সমার্থক। শিল্প সমালোচক এবং মিডিয়া থিওরিস্ট বরিস গ্রইস শিল্পের এই সার্কুলেশনের দিকটা নিয়ে সচেতন করেন আমাদের।

সুতরাং, যে শিল্প নিজের সময়ের কথা বলে না, যে শিল্পী নিজের সময়ের প্রতিফলন ঘটান না– সেসব উৎপাদনকে বা শিল্পীকে কি সত্যনিষ্ঠ হিসেবে দেখা যায়? না কি শিল্প নিছক সৌন্দর্য উৎপাদনের এক মূক কারখানা– বাস্তবের কদর্যতাকে আড়াল করাই তার বাজারনীতি? সজ্জা (decoration) এবং ধর্মীয় বিষয়ের ভিত্তিতে যার উৎপাদন, তা সমসাময়িক শিল্পের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা কি না– এই প্রশ্নগুলোই চিত্তপ্রসাদের শিল্পচর্চাকে বোঝার ভিত্তি। 

স্বাভাবিক নিয়মেই জানতে ইচ্ছে করে– বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সমসাময়িক শিল্পচর্চার চরিত্র কি তাহলে প্রশ্নহীন, মূক, চাক্ষিক এবং মেধাহীন? হিংসার রাজনীতি-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-নিরাপত্তার স্খলন– এই প্রেক্ষাপটে, কারিগরি শিল্পের জয়গানে মেতে উঠে আমরা ভুলে গিয়েছি শিল্পের সামাজিক দায়িত্ব পালনের কথা; আর তার চরিত্রের আরও ডায়নামিক দিকগুলি।

বিদ্বেষের রাজনীতি, নাগরিকত্বের সংকট, অভিব্যক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ– এই প্রেক্ষাপটে ‘কী দারুণ!’– এই অভিব্যক্তিই যদি হয়ে ওঠে শিল্পের চূড়ান্ত ভাষা, তাহলে নিপাট সৌন্দর্যের আড়ালে চাপা পড়েই রয়ে যাবে বাস্তবের কর্কশতা। ধর্মীয় বিষয় অবলম্বন করলেই শিল্প অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে– একথা নয়; কিন্তু যখন তা বাস্তবকে আড়াল করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখনই তার সংকট শুরু হয়। ফলে, সরকারি জনমোহিনী নীতির হাত ধরে ভারতীয় শিল্পচর্চার এক আশ্চর্য ধর্মীয় মোড় বাধ্য করে শিল্প-ইতিহাসের পুনর্পাঠ নিতে।

ভারতবর্ষের আধুনিক শিল্পের ইতিহাস কিন্তু আজকের এই নিছক সৌন্দর্যের ভক্তিরসে মজেনি। বরং আধুনিক শিল্প, হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি গড়া থেকে বেরতে চেয়েই নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে; সোচ্চার হয়েছে; হয়েছে সংগঠিত। 

বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট-এর গণেশ জননী, শিব-পার্বতী-পুরাণ কাহিনি যখন রিভাইভাল ঘটাচ্ছে, দেশভাগের দগদগে ঘা নিয়ে তখন বোম্বে প্রোগ্রেসিভ আর্টিস্ট গ্রুপ-এর (১৯৪৭) শিল্পীরা উঠে আসছেন, এবং রিভাইভাল-এর তীব্র সমালোচনা করছেন– তাকে ‘আইডিলিক’ এবং ‘সেন্টিমেন্টাল’ বলে। [চিত্র ৫ এবং ৬]

চিত্র ৫। নন্দলাল বসু। দময়ন্তীর স্বয়ম্বর। রিভাইভ্যালের শিল্প ছিল এমনই
চিত্র ৬। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অশোকের রানী। অনচ্ছ জলরং। উনিশ শতক

তবে বাংলা ঘরানা ১৯৩৩ সালেই সমালোচিত হয়েছে– গোবর্ধন আশ, অন্নদা দে এবং ভোলা চ্যাটার্জীর নেতৃত্বে আর্ট রেবেল সেন্টার-এর শিল্পীদের দ্বারা, তার স্বপ্নালু শিল্পচর্চার কারণে।

এতএব দেখা যাচ্ছে, জনপ্রিয়তার নিরিখে দেবদেবী-পুরাণকাহিনি-ধর্মীয় রসাশ্রিত শিল্পচর্চা গত দু’ দশক ধরেই বাংলার বুকে আশ্চর্য রমরমায় উৎপাদিত হলেও, ভারতীয় আধুনিক শিল্পের জন্মকাল থেকে ভারতীয় আধুনিক শিল্পীরা এর থেকে বারবার মুক্ত হতে চেয়েছেন। আর্ট রেবেল সেন্টার-এর শিল্পীরা তীব্র সমালোচনা করছেন তৎকালীন সরকারি আর্ট স্কুলে মুকুল দে-র শিল্পশিক্ষা পরিচালনার ধরন দেখে। তাঁদের পরামর্শদাতা গুরু খোদ অতুল বোস।

বোম্বে প্রোগ্রেসিভ আর্টিস্ট গ্রুপ সংগঠিত হয়েছিল শুধুমাত্র দেশভাগের ক্ষত নিয়ে রূঢ় বাস্তবকে উপস্থাপিত করার উদ্দেশ্যে শুধু নয়, বাংলা ঘরানার অবাস্তব, স্বপ্নালু, ম্রিয়মাণ আঙ্গিক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার দরুনও।

১৩২৩-এ জাপান থেকে রবীন্দ্রনাথ ভাইপো অবনীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিতে অভিযোগ করছেন– আমাদের শিল্প একটু ‘কুনো’ ধরনের হয়ে পড়েছে। তাঁর আক্ষেপ এবং চেতাবনীতে ছিল– আমাদের শিল্প ঘরের কোণে আবদ্ধ ও সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ‘আমাদের দেশে আর্টের হাওয়া বয় নি, সমাজ জীবনের সঙ্গে আর্টের কোনো নাড়ির যোগ নেই … এখানে এসে আমি আমি প্রথম বুঝতে পারলুম যে তোমাদের আর্ট সত্য হতে পারেনি।’

ভারতীয় শিল্পের পুনরুজ্জীবনে অবনীন্দ্রনাথের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রাচ্যরীতির (বেঙ্গল স্কুল) পুনর্জাগরণ ঘটালেও, রবীন্দ্রনাথ শিল্পে সত্যনিষ্ঠতার প্রবল সমর্থক। 

বিস্ময়ের অবকাশ থাকে না, যখন আমরা সুকুমার রায়ের লেখাতেও রবীন্দ্রনাথের কথারই প্রতিফলন দেখি, তাঁর ছ’বছর আগেই। ১৩১৭-র অগ্রহায়ণ সংখ্যার ‘প্রবাসী’-তে, ‘ভারতীয় চিত্রকলা’ প্রবন্ধে। তিনি বুঝেছিলেন, কোনও শিল্পই প্রকৃতির সত্যকে বর্জন করতে পারে না। ভারতশিল্পে বাস্তবিকতার আদর কেন হবে না– এই ছিল তাঁর প্রশ্ন। তবে বাস্তবিকতার আদর বলতে তিনি ইউরোপীয় রেনেসাঁস-এর ‘true to nature’ থাকার কথা বলেননি। প্রকৃতে হুবহু নকলীকরণ নয়। তিনি চারদিকের সামাজিক অবস্থার প্রতিফলনের অনুপস্থিতির কথাটা মনে করাতে চেয়েছেন। চিত্তপ্রসাদ, জয়নুল আবেদিন, সোমনাথ হোরের হাত ধরে সেই বাস্তবিকতা প্রবেশ করেছিল আধুনিক শিল্পকলায়।

আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে ভারতীয় শিল্পীদের রুচি-বিশ্বাস-বৌদ্ধিকচর্চা-আর্ট ক্রিটিক্যালিটি এবং প্রতিরোধী সত্তা দেখলে আশ্চর্য হতে হয়, আজকের সরকারি জনমোহিনী নীতির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের অবস্থানের তুলনা করে দেখলে। আরও বিস্মিত হতে হয়, যখন দেখা যায়, গ্লোবাল কনসেপচুয়ালিজমের পরিবর্তে দেবদেবীর মূর্তি গড়ার স্বপ্নে বিভোর শিল্পীরা। তাঁদের পরিচয়, ‘গ্ল্যামার’, রাজনৈতিক সুরক্ষা, লক্ষ লক্ষ দর্শক– সবটাই তৈরি হয়েছে ধর্মাশ্রয়ী শিল্পের ভিত্তিতে। সবটাই চটজলদি, ফর্মালিস্ট। কিন্তু অর্থপূর্ণ কি? অভিভাবক আর্ট স্কুলে পাঠাচ্ছেন সন্তানকে সে ‘দেবীমূর্তি গড়ে নামী শিল্পী হতে পারবে’– এই আশায়। সুতরাং, আমাদের শিল্পবোধ, শিল্প-ইতিহাসের ধারণা, তার দীর্ঘ ইতিহাস, নিজেদের কল্পনাশক্তি থেকে আমাদের প্রত্যাশা– সবটাই কোথাও আপস করে বসে আছে ‘সিস্টেম’-এর সঙ্গে। 

এই অবস্থানের থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়ালে পরিপ্রেক্ষিতটা পাওয়া যায়। ফলে নিজেদের তাৎক্ষণিক অবস্থান বুঝতেও সুবিধে হয়।

১৯৩০-’৪০-এর দশক। ভারতীয় শিল্পচর্চায় আধ্যাত্মিক-রসাশ্রয়ী শিল্প উৎপাদন যখন একটি বিজিত জাতির আত্মপরিচয় বহনের দায়িত্বে অকৃতকার্য হতে বসেছে; ধর্মরসাশ্রয়ী শিল্পের সীমাবদ্ধতা ভেঙে ভারতীয় আধুনিক শিল্প যখন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াতে শিখছে; নিজেকে তুলে ধরছে পারিপার্শ্বিক আর বাস্তবকে ভিত্তি করে। সেই সন্ধিক্ষণের দেড় দশক আগেই জন্ম চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের (২১ জুন, ১৯১৫)। তার প্রায় ২৫ বছর পর শুরু হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। 

সেই সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর ফ্যাসিবাদ-বিরোধের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পৃক্ত বামপন্থা। তার সঙ্গে যুক্ত হল বাংলা ঘরানা থেকে মুক্ত হওয়ার তীব্র ইচ্ছা। ১৯৪০-এর দশকে ভারতীয় আধুনিক শিল্পচর্চার এই ছিল দুই প্রধান চালিকাশক্তি। কারণ, ক্যালকাটা গ্রুপ এবং বম্বে প্রোগ্রেসিভ আর্টিস্টস-এর আদর্শের এই দু’টি ছিল অবচ্ছেদ্য অঙ্গ।

বলা বাহুল্য, কলকাতার শিল্পীদের নিয়ে হলেও, বাংলা ঘরানা নয়, আধুনিক ইউরোপীয় শিল্পের পরীক্ষানিরীক্ষা, আবিষ্কার আর ১৯৪৩-র বাংলার মন্বন্তরই ক্যালকাটা গ্রুপ সংগঠিত হওয়ার মূল কারণ। ১৯৫০ সালে এই দুই শিল্পগোষ্ঠী কলকাতায় যৌথ এক শিল্প প্রদর্শনীও করে। অর্থাৎ, ভারতবর্ষের পূর্ব এবং পশ্চিমের শিল্পীরা সমমনস্কতার কারণে ভূগোলের সীমারেখা অতিক্রম করে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন।

ফ্যাসিজম-বিরোধী, বামমনস্ক, দেশভাগ আর মন্বন্তর দেখা শিল্পীরা এলিট শিল্পচর্চা থেকে সরে এলেন। শিল্পকলার ক্ষেত্রে সবসময় নতুন ধারা শুরু হয় একটা স্পষ্ট প্রতিরোধী আচরণ দিয়েই। ভারতীয় আধুনিক শিল্পের জয়যাত্রার ক্ষেত্রেও একথা সত্যি। 

রাজা রবি বর্মা বা বাংলা ঘরানার শিল্পকলা ছিল এলিট। রাজা-রানি-পৌরাণিক চরিত্রদের ভিড়। রাজকীয় সাজগোজ আর অন্দরমহল; পূর্ণিমা রাতে স্বপ্নালু সব বিষয় [চিত্র ৭]। জাতীয়তাবাদী নান্দনিকতা এল অবনীন্দ্রনাথের হাত ধরে। অনচ্ছ জলরং ব্যবহারের ফলে রবি বর্মার রাজকীয় সজ্জা থেকে বেরলেও, শিব-পার্বতী-গণেশ জননী প্রভৃতি, পারিপাট্য আর আধ্যাত্মিক চেতনায় ছিল ভরপুর। [চিত্র ৮]

চিত্র ৭। রাজা রবি বর্মা। চাঁদের আলোয় রাধা। ওলিওগ্রাফ। ১৮৯০
চিত্র ৮ । অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গণেশ জননী। অনচ্ছ জলরং। ১৯০৮। রেয়ার বুকস সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার ফেসবুক পোস্ট থেকে প্রাপ্ত

কিন্তু জয়নুল আবেদিন এবং চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য, এঁদের দু’জনের মাধ্যমে বাংলার আধুনিক শিল্পে বিষয় হিসেবে গভীরভাবে ফিরে এল ‘দেহ’; তবে এক বিচ্ছন্নতার মধ্যে দিয়ে। নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে। রূঢ় বাস্তবকে উপস্থাপন করে। শীর্ণকায় হাত-পা; অপুষ্টিতে ফুলে ওঠা পেট; ন্যুব্জ শিরদাঁড়া নিয়ে।

চিত্তপ্রসাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজ ‘Hungry Bengal’, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের এক গ্রাফিক রিপোর্ট। জনশূন্য গ্রাম, কঙ্কালসার দেহ এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে; খাদ্যাভাবে ফোলা পেট নিয়ে ধুঁকছে শিশু; আকাশে উড়ছে কাক, শকুন; বিধ্বস্ত স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার পরিবেশন করছে গ্রামবাসীদের। দেহ এখানে বাংলা ঘরানার মাধুর্য মেশানো, আধ্যাত্মিকতায় আচ্ছন্ন, কমনীয় দেহপট নয়। এই দেহ আদর্শ-বিরোধী (anti-ideal)। মন্বন্তরে ক্ষইতে থাকা কর্কশ দেহ। বেঙ্গল স্কুল-এর মাধুর্যের মুখে চাবুক কষে, ঘুম ছুটিয়ে দেওয়া বাস্তবের ছবি। বাংলার শিল্প-ইতিহাসের মোড় গেল ঘুরে। [চিত্র ৯]

চিত্র ৯। পিপল’স ওয়ার পত্রিকায় চিত্তপ্রসাদের রিপোর্ট: লাইফ বিহাইন্ড দ্য ফ্রন্ট লাইন্‌স

‘Hungry Bengal’ নিছক ট্রাভেলগ নয়। তা এক রাজনৈতিক দলিল, যা দুর্ভিক্ষের বিভীষিকাকে তুলে ধরেছিল তা-ই নয়, ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা এবং ভূস্বামীদের নিষ্ঠুরতা প্রকাশ্যে এনেছিল। স্বভাবতই প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার বইটি বাজেয়াপ্ত করে, এবং বহুবার সেই বই সেন্সরড হয়। কিন্তু তার আগেই এটি মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলে। সুতরাং চিত্তপ্রসাদ রাজনৈতিকভাবে সফল হন তাঁর আজন্ম লালিত উদ্দেশ্যে। তাঁকে ভারতের প্রথম ‘পলিটিকাল আর্টিস্ট’-দের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে সেই রাজনৈতিক দলিল। ফলত নিছক প্রতিফলন বা উপস্থাপনা ছাপিয়ে শিল্প হয়ে ওঠে আন্দোলনের শামিল।

পিপল’স ওয়ার পত্রিকায় চিত্তপ্রসাদের রিপোর্ট, লাইফ বিহাইন্ড দ্য ফ্রন্ট লাইন্‌স, আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তিনি সাংবাদিকতা আর মাঠে নেমে গবেষণাকেও জুড়ে নিয়েছিলেন নিজের চর্চার সঙ্গে। তাঁর নিজের ড্রয়িং সমেত ওই নিবন্ধে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আমিনা খাতুনের সঙ্গে চিত্তপ্রসাদের কথোপকথন তুলে দেওয়া গেল কিছুটা: 

In the background at Abdul Rahman of Chakaria village, I met Amina Khatun, wife of Abdul Rahman.
She screamed out:
“Even brothers are better placed than wives. No one takes a wife’s side. There is no one. And who told you they give food and medicine here? They don’t. They give nothing. They beat us.”
She was speaking in broken Hindustani.
As she said it, she lifted her cloth from her breast. It was full of sores. Her body was reduced to skin and bone.
“Look,” she said, “this is what we get.” 

ভারতীয় আধুনিক শিল্পের সঙ্গে কমিউনিজমের সম্পর্ক বৌদ্ধিক এবং ঐতিহাসিকভাবে বহুস্তরীয়, এবং সমৃদ্ধ। শুরুর দিকে (মোটামুটি ১৯২০ থেকে ’৪০-এর দশক অবধি) এবং শেষের দিকে (১৯৫০ এবং ’৭০-এর দশকের পরেও) তা বজায় ছিল নানাভাবে– ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তির আন্দোলন, বৈশ্বিক সামাজিক আন্দোলন, ভারতের নিজস্ব উত্তর-ঔপনিবেশিক বৈপরীত্যের মধ্যে দিয়ে। 

প্রারম্ভিক (early) আধুনিকতাবাদের গোড়ায় দেখা যায়: ঔপনিবেশিকতা-বিরোধিতা, বাস্তববাদিতা (Realism) এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের (the masses) দিকে ফিরে যাওয়ার এক স্পষ্ট ঝোঁক। বিশ শতকের গোড়ায় ভারতীয় শৈল্পিক চেতনায় কমিউনিজম প্রবেশ করেছিল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী রাজনীতির পাশাপাশি। সেই প্রভাবে মতবাদ-কেন্দ্রিকতা ছিল কম; এবং নৈতিকতা ও প্রতিনিধিত্বের প্রভাব ছিল বেশি।

এর পাশাপাশি, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির উত্থান, রুশ বিপ্লবের সার্বিক প্রভাব, এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী এবং ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনও গভীরভাবে শৈল্পিক মননে রেখাপাত করেছিল।

ফলত, ভারতীয় আধুনিক শিল্পচর্চায় যে মুখ্য পরিবর্তনটা লক্ষণীয়, তা হল এলিট সম্প্রদায়ের পৌরাণিক স্বপ্নালু চর্চা বা একই আঙ্গিকের রিভাইভালিস্ট বিষয় থেকে ভেঙে বেরিয়ে– চাষি, মজুর, মন্বন্তরে আক্রান্ত মানুষ এবং দৈনন্দিন দুর্ভোগ ও সাধারণ মানুষের মর্যাদার প্রতি এক গভীর ঝোঁক।

জয়নুল আবেদিন, সোমনাথ হোর এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী ছিলেন। সুতরাং, তাঁদের কাজে এই বিষয়ের প্রতিফলন স্বাভাবিক। চিত্তপ্রসাদ ছিলেন সরাসরি বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে, দলের কাজের সুবাদে গ্রামবাংলা এবং মেহনতি মানুষের জীবন তিনি আরও কাছ থেকে দেখছিলেন।

ঘুরে বেড়ানোর সুবাদে চিত্তপ্রসাদের শিল্পচর্চার মাধ্যম স্টুডিওর বিলাসের গণ্ডিতে থাকার সুযোগ পায়নি। ইস্তেহার আর লিনো বা উডকাট-এর ছাপাই ছবি; পোস্টকার্ডের ওপর কলম দিয়ে স্কেচ; কালি-তুলি স্থাণু নয়, পরিযায়ীর গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখেই তাঁর বেশিরভাগ কাজ নির্মিত হয়েছে। সেসব যেমন সহজলভ্য, তেমনই পুনরুৎপাদনযোগ্য (reproducible forms)।

যদিও সোভিয়েত সোশালিস্ট রিয়ালিজম-কে ভারতবর্ষ পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করতে পারেনি সোভিয়েত দেশের মতো, কারণ, আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র, মার্ক্সিজম, ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদ এবং দেশজ ঐতিহ্যকে সমানুপাতিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। তবু, সোশালিস্ট রিয়ালিজমের ভারতীয় এক রূপ স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় চিত্তপ্রসাদের কাজে।

চিত্তপ্রসাদের কাজকে বাস্তবের প্রতিরোধী বলা চলে না একেবারেই। তাঁর কাজ বাস্তবের স্বাভাবিকীকরণের (normalization) প্রতিরোধী ছিল। বাস্তবকে তিনি দূরে রাখেননি। মন্বন্তরে পীড়িত এবং শ্রমজীবী মানুষ এবং গ্রাম-জীবনের দুঃখ-কষ্টের মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করে রেখেছিলেন তিনি। 

এই জগতকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রতিরোধ করেছিলেন পীড়নের স্বাভাবিকীকরণ; ক্ষমতার ঔদাসীন্য; আর ক্লেশের সৌন্দর্যায়ন।

সুতরাং, চিত্তপ্রসাদের প্রতিরোধ বাস্তব থেকে চোখ ফিরিয়ে রেখে, তাকে অস্বীকার করে তার প্রতিরোধ নয়, বরং, তিনি তা করেছিলেন প্রত্যাখ্যানের মধ্যে দিয়ে। অনিবার্যকে যেভাবে দেখা হয়ে থাকে, তিনি সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তাঁর শিল্পচর্চায়।

অনিবার্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং পীড়নের স্বাভাবিকীকরণের বিরুদ্ধে চিত্তপ্রসাদের প্রতিরোধের আরেক জ্বলন্ত উদাহরণ– হিন্দু মহাসভা ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর প্রতি তাঁর ক্ষোভ এবং সমালোচনা। 

১৯৪৩-’৪৪-এর মন্বন্তর। বাংলায় মানুষের দুর্দশা অবর্ণনীয়। হুগলির জিরাটে হিন্দু মহাসভার ত্রাণ এবং দানের কাজ চলছে। চিত্তপ্রসাদ লক্ষ করেছিলেন ফাঁকটা– হতদরিদ্রদের সুরাহার বদলে নেতা এবং সম্ভ্রান্তদের মুনাফা লোটার সুবর্ণ সুযোগ হয়ে উঠেছিল সেই অছিলা। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন চিত্তপ্রসাদ। এর নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের সমসাময়িক শিল্পীদের সামাজিক দায়িত্ব-অবস্থান-চেতনা-বোধ-প্রতিবাদের স্পৃহা কী হতে পারে ভাবলে হতাশাই জন্মায়।

১৯৪৪-এ চিত্তপ্রসাদ জিরাটে যান কমিউনিস্ট পার্টির জার্নাল, পিপলস এজ-এর জন্য মন্বন্তরের ডকুমেন্টেশন-এর উদ্দেশ্যে। শ্যামাপ্রসাদের বাড়ির খসড়া স্কেচও আঁকেন। [চিত্র ১০]

চিত্র ১০। পিপল’স ওয়ার-এর জন্য চিত্তপ্রসাদ কৃত শ্যামাপ্রসাদের জিরাটের নতুন বাড়ির স্কেচ। ১৯৪৩-’৪৩

জিরাটের খরায় শুকিয়ে যাওয়া ধানি-জমি দেখে বিস্মিত চিত্তপ্রসাদ, শ্যামাপ্রসাদ বিষয়ে লিখছেন:

His was the strongest voice against the Bengal governor in the worst days of the Bengal famine. Lakhs of rupees poured into his Bengal Relief Committee from the four corners of India. Has this man who was given lakhs to save Bengal kept the light burning in his own village? This is what most people would like to know.

চিত্তপ্রসাদের শিল্পী হয়ে ওঠার কাহিনি বিস্ময়কর। গোড়ায় তিনি দুর্দান্ত পট আঁকতেন। সে পট চোখে পড়েছিল বন্ধু শিবাদিত্য দাশগুপ্তের। তিনি তা দেখান রমেন চক্রবর্তীকে। এর ফলস্বরূপ নন্দলালের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় চিত্তপ্রসাদের। ছবি দেখে নন্দলাল বলেছিলেন, ‘তোমার তো শেখা হয়ে গেছে– নতুন করে আর শিখবে কী?’ এই কথায় নন্দবাবুকে ভুল বুঝে ক্ষুব্ধ চিত্তপ্রসাদ তক্ষুনি শান্তিনিকেতন ত্যাগ করেন। এই ঘটনার পর ‘কলকাতায় সরকারি আর্ট স্কুল ও জয়পুর আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েও প্রথাগত শিক্ষায় মন না ভরায় ছেড়ে দেন। স্বশিক্ষিত শিল্পী হিসেবেই নিজেকে গড়ে তুলতে থাকেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ায় ভাঁটা পড়ে।’

এই সামান্য ভুল বোঝাবুঝি শাপে বর হয়ে দাঁড়াল! আর তা থেকে আধুনিক ভারতীয় শিল্পের মোড় গেল ঘুরে। এর সঙ্গে এক এপিস্টেমিক শিফট-ও ঘটল। যা লালিত হতে পারত বেঙ্গল স্কুল অব আর্ট-এর ছত্রছায়ায় অজন্তা-পুরাণ-মুঘল-জাপানি শিল্পের প্রতিফলন; তা হয়ে দাঁড়াল ক্যাথে কোলউইৎজ-কুওমিংতাং-লু স্যুন-এজিটপ্রপ-মায়াকোভস্কি-র ওনকা রোস্টার-এর আশ্চর্য সমন্বয় [চিত্র ১১]। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো যেন এক। চিত্তপ্রসাদ হয়ে উঠেছিলেন আন্তর্জাতিক সাম্যবাদ ও স্বাধীনতাকামী চেতনার এক খোলা জানলা, যা দিয়ে ভারতবর্ষ পরম্পরাগত অভ্যাস কাটিয়ে উঠে চোখ মেলার সুযোগ পেয়েছিল।

ভারতের প্রথম রাজনৈতিক শিল্পীদের অন্যতম, চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের শৈল্পিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে তুলনা করলে সরকারি জনমোহিনী-নীতির দ্বারা পালিত সমসাময়িক শিল্পচর্চা ও তার নির্মাতাদের অবস্থান বুঝতে অসুবিধে হয় না।

একথা বলতে গেলে প্রতিবেশী দেশ এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলির তৎকালীন ইতিহাস একটু ফিরে দেখা দরকার। এতে খানিকটা স্পষ্ট হবে– প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে চিত্তপ্রসাদের নিজেকে বঞ্চিত করার জায়গাটা আন্তর্জাতিক রাজনীতির দ্বারা কীভাবে লালিত হয়; এবং সেই সূত্রে প্রতিবেশী দেশের প্রভাবে বামপন্থার ছায়া ভারতীয় আধুনিক শিল্পের ক্ষেত্রে নীরব এক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলে।

চিত্র ১১। ভ্লাদিমির মায়াকভস্কি নির্মিত ওনকা রোস্টা পোস্টা। আ. ১৯১৯-১৯২১। রুশ গৃহযুদ্ধ চলাকালীন স্বল্প-শিক্ষিত রুশ জনগণকে সোভিয়েত বৈপ্লবিক আদর্শ বোঝানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত
চিত্র ১২। আন্তর্জাতিক আন্দোলন ও বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। সম্ভবত নিউ উডকাট মুভমেন্টের শিল্পীর করা চৈনিক ম্যাগাজিন (৪র্থ সংখ্যা) প্রচ্ছদ
চিত্র ১৩। চিত্তপ্রসাদ। আনটাইটেল্ড বা এআইটিইউসি জিন্দাবাদ। কাঠখোদাই চিত্তপ্রসাদের কাজে স্পষ্ট প্রভাব ছিল এজিটপ্রপ আর তৎকালীন চৈনিক পোস্টারের
চিত্র ১৪। দমিত্রি ম্যুর, সোভিয়েত রাজনৈতিক পোস্টার
চিত্র ১৫। ক্যাথে কোলউইৎজ, উইডোজ দুই, কাঠখোদাই
চিত্র ১৬। চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য, মন্বন্তর, কালি-তুলি

চিত্তপ্রসাদ যে সময় সক্রিয় হচ্ছেন– ১৯৩০-’৪০ নাগাদ, তার দু’ দশক আগে, ১৯১১-তে চিনে মাঞ্চু কিং শাসনকালের পতন ঘটে। ১৯১২-তে সান ইয়াত-সেন-এর জাতীয়তাবাদী দলে, কুওমিংতাং-এর নেতৃত্বে আসে প্রজাতন্ত্র। কিন্তু তার স্থিতিশীলতা নড়বড়ে। একদিকে শত্রুভাবাপন্ন যুদ্ধবাজ নেতা, অন্যদিকে দস্যু। এই দুইয়ের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রায় অসম্ভব। কুওমিংতাং-এর স্থিতিশীলতা এই অনৈক্যের ওপরই টিকে ছিল। এসবের মধ্যেই শুরু হয় ১৯১৯-এর মে ফোর্থ-এর ছাত্র আন্দোলন। যা চিনের সামাজিক, বিশেষত সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। মে ফোর্থ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল কনফুসীয় সংস্কৃতির বিরোধিতা এবং এক নতুন ধারার সংস্কৃতির প্রচার। ফলে, মে ফোর্থ আন্দোলন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরম্পরাগত সাবেকি সংস্কৃতিকে আক্রমণ আর নতুন সংস্কৃতির প্রচারের জন্য তৈরি হয়েছিল ‘গণতন্ত্র’ এবং ‘বিজ্ঞান’-ভিত্তিক স্লোগান। 

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক চৈনিক সাহিত্যের পণ্ডিত ডেভিড ডার-ওয়াই ওয়াং-এর মে ফোর্থ আন্দোলন বিষয়ে মতামত– নিছক এক রাজনৈতিক ঘটনা নয়, সে আন্দোলন চিনের সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক আধুনিকতার অনুসন্ধানের এক জটিল সন্ধিক্ষণ।

ইতিহাসবিদ ওয়াং গুংউ মে ফোর্থ আন্দোলনকে পরবর্তীকালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পূর্বসূরি এবং অনুপ্রেরণা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। ১৯২০-র দশকে সদ্যগঠিত কমিউনিস্ট পার্টির (CCP) সঙ্গে গড়ে ওঠা এক অস্বস্তিকর মৈত্রীর যবনিকা পতন ঘটে ১৯২৭ সালে, যখন চিয়াং কাই-শেকের নেতৃত্বে দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদীরা এক অভ্যুত্থান ঘটায়। অতঃপর গৃহযুদ্ধ। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানিদের বিরুদ্ধে গঠিত একটি ‘যুক্তফ্রন্ট’-এর কারণে এই যুদ্ধে সাময়িক বিরতি এলেও, তা অব্যাহত থাকে ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় না-আসা পর্যন্ত। 

প্রায় অর্ধশতাব্দী জুড়ে প্রতিবেশী চিনের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের প্রভাব ভারতের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ছায়াপাত করেছিল নিভৃতে। বিস্ময়করভাবে। 

চিনে র‍্যাডিক্যাল বুদ্ধিজীবী এবং শিল্পীদের কাছে উপস্থাপনার জরাজীর্ণ পদ্ধতিগুলো আর কার্যকরি হয় না কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসার পর। কনফুসিয়াসের স্কল্যাস্টিক ট্র্যাডিশন-এর রহস্যময় নিসর্গদৃশ্য এবং সাহিত্যও পরিবর্তনশীল সময়ের দাবি মেটাতে সক্ষম হয় না তখন আর। [চিত্র ১৭]

চিত্র ১৭। কনফুশিয়াস-এর শিক্ষাদান। মিং ডাইন্যাস্টি স্ক্রোল। সিল্কের ওপর কালি ও রং। ১৬৭ বাই ৮৫ সেমি। কনফুশিয়াস মিউজিয়াম, কুফু

চিনের আধুনিক সাহিত্যের জনক এবং প্রাবন্ধিক লু স্যুন (১৮৮১-১৯৩৬) সমমনস্ক বুদ্ধিজীবীদের মতো বুঝেছিলেন যে, চিনের অশিক্ষিত বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা সে যুগে একান্ত জরুরি। শিল্প এবং সমাজ অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত এবং শিল্পীরা জনগণের জন্য সামাজিক উন্নতির দায়িত্ব বহন করেন।– এই ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে, চিনে, শিল্পী এবং জনসাধারণের মধ্যে ছাপাই ছবি হয়ে উঠল আদর্শ মাধ্যম। সস্তায় কাগজ আর কালি পাওয়া যেত সর্বত্র। তাছাড়া এক ছবির অগুনতি সংস্করণ ছাপা যেত এই পদ্ধতি অবলম্বন করে। 

এচিং বা লিথোগ্রাফির ক্ষেত্রে প্রেস-এর প্রয়োজন হয়। ফলে তা খরচ সাপেক্ষ। পাওয়াও কঠিন। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পাঠানো বা লুকনো সহজ নয়।– সে সময়, যখন ছাপার সরঞ্জাম সঙ্গে আছে দেখা গেলে কারাবাস বা মৃত্যুদণ্ডের সম্ভবনা প্রতিনিয়ত, কাগজে ছাপা কাঠখোদাই বা লিনোগ্রাফ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল স্বভাবতই।

ফলে যে সময় ভারতে চিত্তপ্রসাদের শিল্পী-জীবন সক্রিয় হচ্ছে, সেই সময় চিনে, লু স্যুন-এর উদ্যোগে, চৈনিক যুব-শিল্পীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিদেশি প্রিন্ট আনানো হচ্ছে। লু স্যুন-এর মর্নিং ফ্লাওয়ার সোসাইটি ছেপে বের করছে ‘দ্য গার্ডেন অফ আর্ট সিরিজ’-এর পাঁচটি খণ্ড। তাতে আধুনিক কাঠখোদাই ছবির নির্বাচিত সংকলনের তিনটি বই ছাপা হয় বিভিন্ন দেশের– ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং জাপান।

এছাড়া, গল্প-প্রবন্ধের অলংকরণে ইউরোপীয় ছবির ব্যবহার, বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদেও লু স্যুন উৎসাহ দিচ্ছেন সেই সময়। যেমন ১৯৩১-এ রুশ সাহিত্যিক গ্ল্যাডকোভ-এর ‘সিমেন্ট’ উপন্যাসের অলংকরণ করানো হয় জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট কার্ল মেফার্ট-এর কাঠখোদাই দিয়ে। [চিত্র ১৮।] 

অর্থাৎ, রাজনৈতিক মানচিত্রের সীমা ছাড়িয়ে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটেছে সে সময়। লু স্যুন-এর এক বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডকে উপজীব্য করে স্বাধীনতার সন্ধান করতে চাওয়ার মনস্তত্ত্বটা যুব চেতনাকে যে উদ্দীপিত করেছে, তাতে সন্ধেহ নেই। 

চিত্র ১৮। অ্যাস্টোরিয়া, ওরেগন-এ আমেরিকান সুওমালাইস্টেন সোশিয়ালিস্টেন কুস্তাননুসলিক্কেইডেন কুস্তান্তমা দ্বারা প্রকাশিত ফিওডর গ্ল্যাডকভের সিমেন্ট-এর প্রচ্ছদ, ১৯২৮

আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে, ১৯২৭ সালের ১২ এপ্রিল। চিনে শুরু হল হোয়াইট টেরর। চিয়াং কাই-শেক-এর অধীনে থাকা জাতীয়তাবাদী সরকার, কুওমিংতাং-এর নির্দেশে, শুরু হল ভয়ংকর কমিউনিস্ট-বিরোধী দমন। চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টি (CCP) এবং সমস্ত বামপন্থী উপাদান নির্মূল করার সেই পৈশাচিক পদ্ধতি। দমনের সূচনা সাংহাই থেকে। সেখানেই মৃত্যু হয় লু স্যুন-এর এক তরুণ লেখকবন্ধুর। এই ঘটনায় মর্মাহত লু স্যুন শোকপ্রকাশ করেন ক্যাথে কোলউইৎজ-এর ১৯২২-’২৩ সালে নির্মিত কাঠখোদাই, ‘ডাস ওপফার বা দ্য স্যাক্রিফাইস’ প্রকাশ করে। [চিত্র ১৯] 

চিত্র ১৯। ডাস ওপফার বা দ্য স্যাক্রিফাইস। ক্যাথে কোলউইৎজ। ১৯২২-’২৩। কাঠখোদাই

নতুন চিনের অগ্রগামী বলয়ে ইউরোপীয় এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পীরা তীব্র আবেগ ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে যেন এক গভীর সহানুভূতির হাত বাড়িয়েছিলেন। সাদা-কালো কাঠখোদাইয়ের তীক্ষ্ণ কনট্রাস্ট ও নাটকীয় টোন চিনের সামাজিক বাস্তব– বিশেষত শোষণ ও নিপীড়নের ছবি– তুলে ধরার ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত কার্যকর। লি হুয়া, ওয়াং শুই, চেন ইয়ান কিয়াও প্রমুখ শিল্পীদের কাজে এই প্রকাশভঙ্গি স্পষ্ট; তাঁদের রেখা ও বিন্যাসে ধরা পড়ে সমাজের নিরাবরণ চরিত্র [চিত্র ২০]। বিশেষ করে লি হুয়া-র কাজে ক্যাথে কোলউইৎজ-এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য। এই প্রেক্ষিতে চিত্তপ্রসাদের কাজও এই আন্তর্জাতিক বামপন্থী ভিজ্যুয়াল ভাষার সঙ্গেই সাযুজ্যপূর্ণ– ইউরোপ, চিন ও সোভিয়েত শিল্পভাবনার এক আন্তঃসংলাপের দৃষ্টান্ত হিসেবে।

চিত্র ২০। ইয়ানকিয়াও চেন, লা ঝুয়াং ডিং বা ফোর্সড কন্সক্রিপশন। ১৯৩৫-১৯৪৫। ন্যাশনাল গ্যালারি অফ অস্ট্রেলিয়া, ক্যাম্বেরি-ক্যানবেরা, পিটার টাউন্সেনড সম্ভার । অস্ট্রেলিয়া-চায়না চউঞ্চিল-এর শায়তায় কৃত। ১৯৮৫

শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে এ-প্রসঙ্গে লু স্যুনের অবদানের কথা আরেকটু বলার লোভ সামলানো দায়। লেখালিখিই শুধু নয়, ছাপাই চিত্রের জগতে নিজেও ঢুকে পড়েছেন লু স্যুন। তাঁর ক্ষেত্রে শিল্পের আঙ্গিকের এক বৈপরীত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। স্থানীয় পরম্পরার বাহ্যিক দিক এবং তার বিপরীতে পাশ্চাত্য এবং সোভিয়েত ছাপাই চিত্রের পদ্ধতির মধ্যে উৎপাদক হিসেবে শিল্পীর ভূমিকা। সম্ভ্রান্ত সাহিত্যিকের হাতে কালি লাগানোর কথা সেই সময় ভাবা যেত না। তাই ছাপ নিয়ে কাঠখোদাই করে ছেপে দেওয়ার সম্পূর্ণ কাজ করে দিতেন লু স্যুনের কাজ করে দিতেন পেশাদার কারিগর। এই কারিগর-এলিট আর্টিস্টের সমমাত্রিকতা সেই সমতার যুগের সঙ্গে দুর্দান্তরকম মিলে গিয়েছিল। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে শিল্প উৎপাদন এক তাৎক্ষণিকতা নিয়ে এসেছিল, যা আগে ছিল বিরল। [চিত্র ২১]

চিত্র ২১। লু স্যুন। কল টু অ্যাকশন। প্রিন্ট। ১৯৩২। ২৬.২ বাই ১৯.৩ সেমি। ইয়েফু ন্যাশনাল আর্ট মিউজিয়াম অব চাইনা-র সংগ্রহ থেকে

এছাড়া, লু স্যুনের নেতৃত্বে চিনে চালু হয় নিউ উডকাট শিল্প-আন্দোলন। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক ছাপাই চিত্রের প্রথা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে, এই আন্দোলন, জনগণের মধ্যে সচেতনতা আনার লক্ষ্যের সামাজিক অবিচার এবং সমালোচনা ভিত্তিক ছবি নির্মাণ করে।

চিত্তপ্রসাদের রাজনৈতিক বোধ যে গভীরভাবে মার্কসবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শিল্পের মূলে শ্রেণি সংগ্রামের আদর্শে উদ্বুদ্ধ চিত্তপ্রসাদ কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সমর্থক ছিলেন; এবং শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। [চিত্র ২২]

ব্রাহ্মণ্যবাদ, জাতপাত, ধর্মীয় কুসংস্কার, এবং শ্রেণি বিভাজনের বিরুদ্ধে নিজের যাপনকে তিনি বেঁধেছিলেন। তাঁর শিল্পে বারবার ফিরে আসে ঐক্যের বার্তা, যে কোনওরকম শোষণের বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার আহ্বান। [চিত্র ২৩]

চিত্র ২২। শিল্পের মূলে শ্রেণিসংগ্রামের আদর্শে উদ্বুদ্ধ চিত্ত কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সমর্থক ছিলেন এবং শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন
চিত্র ২৩। চিত্তপ্রসাদ। তাঁর শিল্পে বারবার ফিরে আসে ঐক্যের বার্তা, যে কোনওরকম শোষণের বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার আহ্বান। কাগজে লিনোকাট প্রিন্ট

চিত্তপ্রসাদের শিল্পে কল্পনার চেয়ে বাস্তব, অলংকারের চেয়ে সত্যই মুখ্য। সরল রেখা, সাদাকালো– রঙের বাহুল্য তিনি সচেতনভাবেই এড়িয়ে গিয়েছেন। কারণ তাঁর কাছে বিষয়টাই প্রধান; দ্রুত অধিক সংখ্যক কাজের মাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্য পৌঁছে দেওয়াই ছিল জরুরি। ফলে তাঁর শিল্প স্বভাবতই এক সমাজতাত্ত্বিক ভাষ্যে রূপ নেয়। [চিত্র ২৪] 

চিত্র ২৪। দ্রুত অধিক সংখ্যক কাজের মাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্য পৌঁছে দেওয়াই ছিল জরুরি

চিত্তপ্রসাদের কাছে শিল্প ও রাজনীতি আলাদা নয়– পরস্পরের পরিপূরক। সমাজকে বাদ দিয়ে শিল্পের কথা তিনি ভাবেননি। তিনি শিল্পী, তবে কেবল সৌন্দর্যের নির্মাতা নন। তিনি সময়ের দলিলকার; সচেতন নাগরিক [চিত্র ২৫]। ভারতীয় আধুনিক শিল্পের ধারার চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে সাম্প্রতিক কালের জনমোহিনী-নীতির ছত্রছায়ায় লালিত শিল্প তুলনা করলে স্পষ্ট হচ্ছে একটা কথা– আমরা বেপথু হচ্ছি; পিছচ্ছি; শৈল্পিক সত্তা হারাচ্ছি। এ-নিয়ে দ্বিমত বাতুলতা। 

চিত্র ২৫। চিত্তপ্রসাদ আনটাইটেলড গ্রাফাইট এবং কালি-তুলিতে কাগজে আঁকা, মার্চ ১৯৪৭, মাপ: সাড়ে আট বাই এগারো ইঞ্চি

চিত্তপ্রসাদ মারা যান ১৯৭৮ সালের ১৩ নভেম্বর। কলকাতায়। তিনি সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁর রাজনৈতিক ও সংহতির বোধ আজও প্রাসঙ্গিক। শিল্প নিছক ঘর সাজানোর উপাদান নয়। তা এক প্রতিবাদ। আন্দোলন। এই বোধ তিনিই আমাদের শৈল্পিক চেতনায় প্রবেশ করিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। সুতরাং, আজ যখন শিল্প আবার সজ্জার দিকে ফিরে যেতে চাইছে, চিত্তপ্রসাদের কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়– শিল্পের দায়িত্ব কী।

তথ্যসূত্র:

১। বাংলা শিল্প সমালোচনার ধারা। শোভন সোম ও অনিল আচার্য সম্পাদিত। অনুষ্টুপ প্রকাশনী। ১৯৮৬। কলকাতা।

২। চাইনিজ উডকাটস অফ দ্য থার্টিজ অ্যান্ড ফর্টিজ। ক্রিস্টিন ডিক্সন। https://nga.gov.au/exhibitions/chinese-woodcuts-of-the-thirties-and-forties/

৩। ওয়ার টাইম উডকাটস: দ্য আর্ট দ্যাট হেল্পড চাইনা ফাইট জাপান। হুয়াং ওয়াই। https://www.sixthtone.com/news/1017568

৪। চিত্তপ্রসাদ একজন সেতু শ্রমিক। তৌসিফ হক। https://cpimwestbengal.org/chittaprosad-bhattacharya-the-legacy

৫। একটি প্রতিবেদন: চিত্তপ্রসাদ। শিবাদিত্য দাশগুপ্ত। https://marxbadipath.org/article/A-report-Chittaprasad/196