


‘বিবর্তন’ কেবল একটি প্রদর্শনী নয়– এক নীরব সংলাপ, যেখানে শিল্প এবং দর্শক একসঙ্গে সময়ের স্রোতে নিজেদের অবস্থান খুঁজে নেয়। এই প্রদর্শনী আমাদের শেখায়, পরিবর্তন মানেই বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং পরিবর্তনই সেই সেতু, যা অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে এবং বর্তমানকে ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করে।
কলকাতার ওল্ড কারেন্সি বিল্ডিংয়ের পরিসর যেন সাময়িকভাবে এক শিল্প-মানচিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে– যেখানে সময়, ঐতিহ্য ও সমকাল একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে। ‘বিবর্তন’ শীর্ষক এই প্রদর্শনী শুধু শিল্পকর্মের প্রদর্শন নয়; এটি এক গভীর মানস-অভিজ্ঞতা, এক বৌদ্ধিক যাত্রা, যেখানে দর্শক হয়ে ওঠেন অংশগ্রহণকারী। NGMA, নতুন দিল্লির উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রদর্শনী সমকালীন ভারতীয় শিল্পের বহুমাত্রিক সত্তাকে একত্রে উপলব্ধির সুযোগ করে দিয়েছে।


প্রায় ১২৫ জন শিল্পীর কাজ ছয়টি গ্যালারি জুড়ে যে পরিসরে বিন্যস্ত হয়েছে, তা নিছক পরিমাণগত বিস্তার নয়, বরং ভাবনার বৈচিত্রের এক অন্তর্মুখী পরিক্রমা। প্রতিটি গ্যালারি যেন এক একটি ধারণাগত অধ্যায়– যেখানে ‘বন্দেমাতরম’-এ জাতীয়তার নির্মাণ, ‘দেবত্বের লোকজ প্রতিধ্বনি’-তে আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অনুরণন, ‘নারীত্বের অন্তরাল’-এ নারীর জীবন ও অভ্যন্তরীণ অনুভব, ‘মনের অন্তরাল’-এ মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, ‘বিবর্তমান দিগন্ত’-এ সময়ের প্রবাহ এবং ‘নগর দর্শন’-এ প্রাচীন ও আধুনিক কলকাতার শহুরে অস্তিত্বের বহুবর্ণ বাস্তবতা– সব মিলিয়ে এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক মানচিত্র নির্মিত হয়েছে।


প্রদর্শনীর মূল শক্তি নিহিত রয়েছে এর ধারণাগত ভিত্তিতে– পরম্পরা এবং প্রবাহ। এই ধারণাটি শিল্পকর্মগুলির মধ্য দিয়ে এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে ঐতিহ্য কোনও স্থবির স্মৃতি নয়, বরং ক্রমাগত পরিবর্তনশীল একটি ভাষা। উদাহরণস্বরূপ, বিমল কুণ্ডুর ভাস্কর্যে বুদ্ধের উপস্থিতি ঐতিহ্যের পরিচিত বিষয়বস্তুকে ধারণ করেও সম্পূর্ণ নতুন অস্তিত্ব পায়। ভারতীয় শৈলীতে বুদ্ধচিত্র সাধারণত স্থিত, ধ্যানস্থ ও অনুভূমিক ভারসাম্যে নির্মিত; কিন্তু এখানে বুদ্ধ যেন মাটির গভীরতা ভেদ করে উল্লম্ব ঊর্ধ্বগমনে আকাশের দিকে ধাবমান– এক রূপক, যা আধ্যাত্মিক উত্তরণের সঙ্গে আধুনিক উদ্বেগের মিলন ঘটায়। এই ক্ষুদ্র পরিসরে ‘মনুমেন্টালিটি’-র নির্মাণ– যা ভারতীয় শিল্পের অন্তর্গত এক গুরুত্বপূর্ণ নান্দনিক বৈশিষ্ট্য– এখানে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত।


একই ধারা অন্যভাবে প্রতিফলিত হয়েছে আয়ুস্মান সেনের ‘রাবণ’-এ। ছাপাই মাধ্যমে নির্মিত এই চিত্রে রাবণের শরীরী ছন্দ এমন এক গতিশীলতা সৃষ্টি করে, যা তাকে বাস্তবতার মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। দিগন্তরেখার সূক্ষ্ম প্রয়োগ রাবণকে এক অতিমানবিক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়– তার অহংকার যেন ভৌত অস্তিত্বকে অতিক্রম করে এক মনস্তাত্ত্বিক প্রতীকে পরিণত হয়। এখানে পুরাণ আর সমকাল একে অপরকে ছুঁয়ে যায়, নতুন অর্থ তৈরি করে।


এই প্রদর্শনীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল মাধ্যমের বৈচিত্র এবং তার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ। চিত্রকলা, ভাস্কর্য, মৃৎশিল্প, বয়ন, আলোকচিত্র, ভিডিও আর্ট, ইনস্টলেশন– প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিল্পীরা নিজেদের ভাষা খুঁজে নিয়েছেন। বিশেষ করে ‘দেবত্বের লোকজ প্রতিধ্বনি’ বিভাগে দেখা যায় লোকশিল্পের অভ্যন্তরীণ শক্তি কীভাবে সমকালীন প্রেক্ষাপটে পুনর্নির্মিত হয়েছে। এখানে দেবত্ব আর নিছক ধর্মীয় ধারণা নয়; বরং সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও সামাজিক চেতনার বহুমাত্রিক অভিব্যক্তি।


‘নারীত্বের অন্তরাল’ অংশটি আবেগতাড়িত ও বৌদ্ধিকভাবে নিবিড়। এখানে নারীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক অবস্থান ও মানসিক জটিলতাগুলি নানান রূপে প্রতিফলিত হয়ে এক সংবেদনশীল ও শক্তিশালী পরিসর তৈরি করেছে। এই অংশে শিল্পকর্মগুলি দর্শককে কেবল দেখার নয়, অনুভব করার জন্য আহ্বান জানায়।


সমগ্র প্রদর্শনী জুড়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে– সমকালীন ভারতীয় শিল্প একটি নিরন্তর অনুসন্ধানের জায়গা, যেখানে বিষয়, মাধ্যম এবং মনস্তত্ত্ব পরস্পরের সঙ্গে মিশে এক নতুন ভাষা তৈরি করছে। এখানে ঐতিহ্য শুধুমাত্র অতীতের ছায়া নয়; বরং বর্তমানকে বোঝার এক অপরিহার্য উপাদান।


‘বিবর্তন’ তাই কেবল একটি প্রদর্শনী নয়– এক নীরব সংলাপ, যেখানে শিল্প এবং দর্শক একসঙ্গে সময়ের স্রোতে নিজেদের অবস্থান খুঁজে নেয়। এই প্রদর্শনী আমাদের শেখায়, পরিবর্তন মানেই বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং পরিবর্তনই সেই সেতু, যা অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে এবং বর্তমানকে ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করে।


শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ‘বিবর্তন’ সমকালীন ভারতীয় শিল্পের এক জীবন্ত দলিল– যেখানে অনুভূতি, চিন্তা ও ইতিহাস মিলেমিশে তৈরি করেছে এক গভীর মানবিক অভিজ্ঞতা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved