


পূর্ণশশী দেবী ছিলেন শিল্পী মুকুলচন্দ্র দে-র মা। ভাঙা পাথরের থালার উপর নরুন দিয়ে কুরে কুরে তার ওপর অপূর্ব সব আমসত্ত্বের ছাঁচ বানাতেন, নকশিকাঁথা সেলাই করতেন আশ্চর্য দক্ষতায়। আত্মজীবনীতে মুকুলচন্দ্র বলেছেন যে তাঁর পরবর্তী শিল্পী জীবনে engraving-এর কাজ করার আইডিয়া, তিনি সম্ভবত তাঁর মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন।
মায়ের সঙ্গে সন্তানদের প্রথম এবং প্রধান সম্পর্ক খাদ্যের। মাতৃগর্ভের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে জীবনের উন্মেষলগ্নে মা নাড়ির ভেতর দিয়ে খাদ্য সরবরাহ করে ভ্রূণকে জীবিত রাখেন। গোটা মানবসভ্যতার ইতিহাস এবং সংস্কৃতির এটাই হচ্ছে আদিতম অধ্যায়। সমস্ত শিল্প, সংগীত, সাহিত্যের শেকড় পোঁতা থাকে মাতৃজঠরে। ধর্ম এবং দর্শন জন্ম নিয়েছিল ওই অন্ধকার গুহার মধ্যেই।

নিজ সন্তানদের খাদ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা ছাড়াও আমাদের বাংলার মায়েরা তাঁদের ছেলেপিলেদের অন্তরে একটি শিল্পবোধ স্বাভাবিকভাবেই যেন তৈরি করে দেন। তারা খুব ছোটবেলা থেকে মায়েদের কাঁথা সেলাই, আমসত্ত্ব আর সন্দেশের ছাঁচ-কাটা এইসব দেখতে দেখতেই যেন বড় হয়। অবশ্য এটা প্রায় ১০০ বছর পূর্বের কথা। আমার মনে হয়, এখনকার মায়েদের কাছে এতটা সময় এবং স্কিল কোনওটাই নেই। বর্তমানে মিয়া-বিবিতে দু’জনে মিলে অর্থোপার্জন না করলে শহুরে মধ্যবিত্তদের ঘরে আজ অন্নসংস্থান করাই দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে! তার ওপরে আছে সন্তানদের ইশকুল-কলেজে পঠন-পাঠনের বন্দোবস্ত করা। ফলে জীবনযাত্রা আমাদের অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। গ্রামের মানুষদের কথা অবশ্য আলাদা।

বাংলার একাধিক শিল্পী তাঁদের ছোটবেলা থেকে নিজ নিজ মায়েদের মারফত শিল্পের প্রতি যে সংবেদনশীলতা এবং সৃজনস্পৃহা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন, সে-কথা তাঁরা বারবার বলে গিয়েছেন। শিল্পী মুকুলচন্দ্র দে এবং নন্দলাল বসু তার ব্যতিক্রম নন। উভয়েই ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে তাঁদের মায়েদের অবদানের কথা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বিশ শতকের আধুনিক ভারতীয় শিল্প-ইতিহাসের আলোচনার ক্ষেত্রে, এই অজানা অপরিচিতা নারীদের কথা কখনও-ই যোগ্য গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে বলে মনে হয় না।
পূর্ণশশী ছিলেন আমার মাতামহ শিল্পী মুকুলচন্দ্র দে-র মা। বর্তমান নিবন্ধ তাঁকে নিয়েই। সেই সঙ্গে আমার কয়েকটি প্রাসঙ্গিক চিন্তাকে এখানে লিপিবদ্ধ করতে চেষ্টা করব।

ছয়ের দশকে পূর্ণশশী শান্তিনিকেতনে রতনপল্লির বাসিন্দা ছিলেন। তিনি তাঁর কনিষ্ঠপুত্র, পুত্রবধূ এবং দুই নাতনির সঙ্গে সেখানে বসবাস করতেন। তাঁর বাড়িটির নাম ছিল ‘পূর্ণা’। বেশ বড় জমির মধ্যে শাক-সবজির বাগান এবং ফলের গাছ মিলিয়ে বেশ একটি গ্রামীণ অস্তিত্ব ছিল সেই বাড়িটির। পূর্ণশশীর কনিষ্ঠা পুত্রবধূ নিজের ঠাকুরঘরে শাশুড়ির হাতে বানানো আমসত্ত্বের ছাঁচগুলি পরমযত্নে রেখে দিয়েছিলেন।


পূর্ণশশীর চার পুত্র এবং দুই কন্যার মধ্যে একমাত্র মধ্যমপুত্র ছাড়া প্রত্যেকেই যথেষ্ট খ্যাতিমান শিল্পী রূপে কর্মজীবনে আত্মপ্রকাশ করেন। মুকুলচন্দ্র, মনীষী দে, রানী (দে) চন্দ এবং সুহাসরঞ্জন নিজেদের জীবনেও যথেষ্ট খ্যাতিমান ছিলেন। তাঁদের শিল্প ও সাহিত্যের মধ্য দিয়ে পূর্ণশশী যেন আজও বেঁচে রয়েছেন। পূর্ণশশী কেবল যে মুকুলচন্দ্র এবং অন্যান্য সন্তানদের প্রভাবিত করেছিলেন তাই নয়, তিনি তাঁর বড় মেয়ে অন্নপূর্ণার হাতেও নরুন ধরিয়ে দিয়ে তাকে ছাঁচ কাটতে উৎসাহিত করেন। আজকের দিনে আমরা ছোটদের হাতে ছুরি-কাঁচি দিতেই ভয় পাই, কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন শ্লেট কাটিংয়ের ধারাটি যেন তাঁর পরিবারে অক্ষুণ্ণ থাকে। তিনি একটি শিল্পকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন, এটা বড় কম কথা নয়!

আজ থেকে বছর কুড়ি পূর্বে পূর্ণশশীর বাড়িটি যখন বিক্রয় হয়ে গেল, তখন সেটি খালি করে দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপরে। সেই বাড়ির একটি ঘরে দেখলাম, কাদামাটি আর বর্ষার পচা জলের তলায় পড়ে আছে প্রচুর স্লেট-কাটিংয়ের নমুনা। পূর্ণশশীর উত্তরাধিকারীরা এই শিল্পকর্মের মর্যাদা বুঝেছিলেন বলে আমার মনে হয় না।


মুকুলবাবু তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার কথা’ গ্রন্থে আমাদের জানিয়েছেন, বাড়িতে কালো পাথরের থালা ভেঙে গেলে তাঁর মা নরুন দিয়ে কুরে কুরে তার ওপর অপূর্ব সব আমসত্ত্বের ছাঁচ বানাতেন। তিনি এ-ও বলেছেন যে, তাঁর পরবর্তী শিল্পী-জীবনে engraving-এর কাজ করার আইডিয়া, তিনি সম্ভবত তাঁর মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। এই কথার গুরুত্ব অনুধাবন করতে বেগ পেতে হয় না মোটেই!


মুকুলচন্দ্র তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন:
‘মা পূর্ণশশী দে ছিলেন জাতশিল্পী। এত চমৎকার নকশাদার কাঁথা সেলাই করতেন যে, দেখলে চোখ ফেরানো যেত না। রামায়ণ-মহাভারতের ছবি, হাতি, ঘোড়া, নৌকো, সেপাই-শান্ত্রী, রাজকুমারী, পাখি – সব ছুঁচের ফোঁড়ে কাঁথার উপর ফুটিয়ে তুলতেন। সেরকম কাঁথা আজকাল আর দেখতে পাওয়া যায় না। কাঠের ফলকের উপর কুট কুট করে কেটে চমৎকার নকশা ছাঁচ তৈরি করতেন। পাথরের থালা ভাঙলে বা কানা ছেড়ে গেলে কখনো ফেলতেন না। নরুন দিয়ে কুরে কুরে কেটে অতি সুন্দর নকশা করে আমসত্ত্বর ছাঁচ বানাতেন। কতদিন পরে আমি যখন বিলেতে, মা সেই নিজের হাতে-কাটা ছাঁচে আমসত্ত্ব বানিয়ে আমাকে পাঠাতেন। সে আমসত্ত্ব যখন আমার কাছে পৌঁছোত তখন তা পচে গেছে, খাওয়ার মতো নেই কিন্তু সেই ছাঁচকাটা সুন্দর কারুকাজ-করা আমসত্ত্ব ছিল আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দদায়ক। মায়ের এই ছাঁচকাটা থেকেই আমি বোধহয় পেয়েছি তামার ফলক কেটে আঁকার প্রেরণা। মা-র হাতে-তৈরি বাঁশের পিঠচুলকানোর কাঠিতেও এক অপূর্ব শিল্পীহাতের ছাপ। ছেলেবেলায় এই জিনিসগুলো আমার খুবই ভালো লাগত। বড়ো হয়ে তার দু-একটা নমুনা দেখে আমি রীতিমতো বিস্মিত হয়ে গেছি। বুঝতে পারি, আমার অবচেতন মনে মায়ের শিল্পপ্রতিভা ও বাবার কবিমনই কাজ করে আমার ভিতরে এই সৌন্দর্যমুগ্ধতা এনে দিয়েছে। শিল্পী করেছে। মনে পড়ে– বাবা যখন চাকরি উপলক্ষে মেদিনীপুর জেলার তমলুকে এলেন, মা মিশনারি মেমেদের কাছে কার্পেটের ওপর উল দিয়ে ছবি তৈরির কাজ, ভেলভেটের উপর রেশমি সুতোয় ফুল তুলে জুতো তৈরির কাজ কত তাড়াতাড়ি কী সুন্দরভাবে শিখে নিলেন। আসলে মায়ের হাতটাই ছিল শিল্পীর হাত। অতি সূক্ষ্ম, নিপুণ ও পরিপাটি ছিল তাঁর হাতের কাজ, তেমনি ছিল শিল্পবোধ।’

বর্তমান লেখাটির সঙ্গে ‘পূর্ণা’ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা কয়েকটি ছাঁচের ছবি এবং সঙ্গে পূর্ণশশীর নিজের হাতে তৈরি কয়েকটি কাঁথার ছবি আপনাদের সামনে পেশ করলাম। সময়ের বিচারে এগুলি প্রত্যেকটি আনুমানিক ১৫০ বছর আগের শিল্পকর্মের নমুনা।
লেখার সঙ্গে ব্যবহৃত প্রতিটি ছবিই লেখকের সৌজন্যে প্রাপ্ত
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved