


সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কি ক্রমশ বদলে যাবে প্রফেশনাল এটিকেট? এর উত্তর এখনও না ঝোলানো ক্যালেন্ডারের পাতাগুলোর গর্ভে। আরও ১০ বছর পরের কথা ভাবলে শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে চলে ঠান্ডা স্রোত। প্রযুক্তির কাছে হেরে যাওয়া, তাল মিলিয়ে চলতে না পারা আমরা যদি ফস করে কোনও মিটিংয়ে বলে উঠি, ‘জাস্ট এ সেকেন্ড! একটু নোট করে নিই?’
জীবিত থাকলে মলয়স্যর দুঃখ পেতেন খুব। এ যুগের হালচাল দেখে ‘অমনোযোগী ছোকরা কোথাকার!’ বলে চিৎকার করে উঠতেন কতবার? চেয়ে থাকতেন। কিছু করতে না পেরে গুমরোতেন। তারপরে কি হাল ছেড়ে দিতেন ক্রমশ? জানি না। কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর না-পেলেই বরং তৃপ্ত লাগে।
স্কুলজীবন। ইতিহাস পড়াতেন মলয়স্যর। পাঠ্যবইয়ের ছাপার অক্ষর থেকে বেরিয়ে গিয়ে চরিত্র এবং ঘটনাগুলোকে অনর্গল চিত্রায়িত করার চেষ্টা করতেন তিনি। আড়াই দশক আগের কথা। অবসর নিতে তখনও পাঁচ বছর বাকি ছিল মলয়স্যরের। নীরস বিষয়কে যথাসম্ভব রঙিন করে বোঝানোর সময় তাঁর বলা কথাগুলো মনে পড়ে আজও। ‘কী হল? নোট নিচ্ছ না কেন তোমরা? যে বাড়তি তথ্যগুলো দিচ্ছি, তার একটাও পাঠ্যবইতে পাবে না।’ অথবা, ‘হচ্ছেটা কী? ১৫ মিনিট ধরে বলে চলেছি টানা। তোমার খাতা সাদা কেন এখনও?’ কারও শূন্য খাতার দিকে চেয়ে কখনও দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলতেন, ‘আমি কি তাহলে ভালো করে পড়াতে পারছি না? এত বছরের অভিজ্ঞতা কি আমার বৃথা চলে গেল?’ স্যরকে খুশি রাখতে আমরা কয়েকজন যতটা পারা যায় নোট নিতাম। কোনও পয়েন্ট খাতায় লিখতে দেখলেই দৈব হাসি খেলে যেত স্যরের মুখে। বলতেন, ‘এই তো, লক্ষ্মী ছেলে! নতুন কোনও তথ্য শোনার সঙ্গে সঙ্গে লিখে ফেললে মনে রাখার প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। লেখাগুলো তো থেকেও যায়। ধ্বনি উদ্বায়ী। অক্ষরের মৃত্যু নেই। বুঝলে তোমরা?’ এক ফিচকে সহপাঠী হাত তুলে ‘বুঝিনি স্যর’ বলাতে, ওর দিকে বেশ কয়েক সেকেন্ড ঠায় তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বলেছিলেন– ‘বড় হয়ে বুঝবে। মুশকিলটা হল, বুঝতে গিয়ে বড্ড দেরি না হয়ে যায়।’

সম্প্রতি একটি মিটিংরুমে ঢোকার পরে বহুযুগের ওপার থেকে মলয়স্যর মনের মধ্যে এসে পড়েছিলেন হঠাৎ। স্যরের বলা কথাগুলো দু’-কানে অনুরণিত হতে শুরু করেছিল। একটা বহুজাগতিক সংস্থার সঙ্গে আগামী দিনের ব্যবসার রূপরেখা নিয়ে মিটিং। সংস্থাটি নির্মাতা। আমরা বিক্রেতা। এমন মিটিং তো হয়ে থাকে প্রায়ই। বিরাট এলসিডি পর্দায় নানা চার্ট, গ্রাফ দেখতে দেখতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো দু’-পক্ষই লিখে নেয় সামনে খোলা ডায়রিতে। সাম্প্রতিক মিটিংটিতে অন্য সংস্থার তরফ থেকে আমাদের উল্টোদিকে বসে ছিলেন তিনজন। দু’টি ছেলে, একটি মেয়ে। বয়স খুব বেশি হলে ২৫-২৬ হবে। ‘হাই, লেটস্ স্টার্ট!’ বলার পরেই আমরা যখন ঝটিতি চোখের সামনে মেলে ধরেছিলাম ডায়রির নতুন পাতা, তখন ওঁদের মধ্যে একজন মোবাইলের স্ক্রিনে কী একটা করে ফোনটিকে রেখে দিলেন টেবিলের মাঝবরাবর। ওঁর সঙ্গে বাকি দুজনের চোখে চোখে কিছু কথা হল। ওঁরা বললেন, ‘গ্রেট’। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে এবারে আরাম করে বসলেন ওঁরা সবাই। যেন সিনেমার প্রেক্ষাগৃহ! একজন বললেন, ‘হোয়াই নট? প্লিজ স্টার্ট।’ আধ ঘণ্টা পেরতে না পেরতেই আমার ডায়রির দেড় পাতা ভরে গেল প্রায়। ওঁরা ডায়রিই আনেননি। ক্রমাগত তথ্য বাতলে যাচ্ছিলাম আমরাও। কথাগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছিল। রাত জেগে বানানো প্রেজেন্টেশন। ক্লান্তি মিশেছিল প্রতিটি স্লাইডে। এমন সময় হুড়হুড় করে আমার মনের মধ্যে উজিয়ে এসেছিলেন মলয়স্যর। কিছুক্ষণ পরে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল আমার। আমাদের মধ্যে এর পরে ঘটে যাওয়া বিস্ময়কর কথোপকথনের নির্বাচিত অংশ আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে বড় ইচ্ছে হচ্ছে।
–স্যরি, কিছু যদি মনে না করেন, কয়েকটা কথা বলি।
–প্লিজ।
–বেশ কিছু অ্যাকশানেবল আমরা এর মধ্যে আলোচনা করেছি। আগামী দিনের রোডম্যাপ।
–জানি তো।
–এগুলো কিন্তু ব্যবসা বাড়ানোর জন্য খুব জরুরি কিছু পদক্ষেপ হতে চলেছে।
–অ্যাবসোলিউটলি। জানি তো।
–এর সব কিছু প্রেজেন্টশনে উল্লেখ করা নেই।
–এগ্রিড। একদম নেই। জানি তো।
–বেশ কয়েকটা জরুরি পয়েন্ট বলা হল।
–অস্বীকার করছে কে? নোটেড।
শেষ শব্দটার জন্যই হয়তো অপেক্ষা করছিলাম আমি। লোপ্পা বলের মতো খপ করে ধরে ফেললাম। বললাম, ‘একটা পয়েন্টও তো নোট করলেন না ডায়রিতে। না কি ডায়রি আনতেই ভুলে গিয়েছেন? আরও বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনা হবে। মিটিংয়ের পরে সব মনে থাকবে তো?’

আমার এ কথাগুলো ওঁদের মনে হাসির উদ্রেক করল। একজন জল খাচ্ছিলেন। হালকা বিষম খেলেন। ওই সংস্থার তরফে আগে যাঁদের সঙ্গে মিটিং করতাম, তাঁরাও আমার মতো, সদ্য চল্লিশ ছোঁয়া লোক। ডায়রিতে নোট নিতেন জব্বর! এঁদের কী বলে? জেন-জি না কি? না ওয়াই? নাকি জেড? সব গুলিয়ে যায় আমার।
একজন মুখ খুললেন। হাতে উঁচিয়ে ধরা মোবাইল। ওটাই টেবিলের মাঝবরাবর রাখা ছিল এতক্ষণ।
–জমানা বদলে গিয়েছে, স্যর। বললাম তো, নোটেড। প্রতিটা কথা রেকর্ড হয়েছে মোবাইলে, পাওয়ার্ড বাই এআই। মিনিটস অফ দ্য মিটিং চলে আসবে দু’ মিনিটের মধ্যে।
–তাই বলে ডায়রিতে নোট নেবেন না?
–কী হবে নিয়ে?
–কোন তথ্যটা জরুরি, রেকর্ডার বুঝবে কী করে?
–হা হা। এটা দারুণ বলেছেন। এর কিন্তু আবার একটা ওয়ান লাইনার উত্তর আছে। বুঝে যাবে।
–কী করে? ও কি সব বোঝে না কি?
–বোঝে। না বুঝলে বোঝাতে হয়। ওটাও একটা আর্ট। ডায়রিতে খসখস করে লিখে কেন এত পরিশ্রম করছেন? ট্রাই দিস।
–না লিখলে মনে থাকবে?
–মেশিন যখন মনে রাখছে, নিজের মনকে আর এই বাড়তি কষ্ট না-ই বা দিলাম!

মলয়স্যরের চেহারাটা মনের মধ্যে প্রকট হল ফের। দেখতে পেলাম, স্যর প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখের জল মুছছেন। সমস্যা হল, শেষ লাইনের খচখচানি আমার মনের থেকে গায়েব হচ্ছে না কিছুতেই। প্রতিবার ডায়রি খোলার আগে কিছুটা ব্যাকফুটে চলে যাচ্ছি মানসিকভাবে। মনে হচ্ছে, কাজটা ঠিক করছি তো? পিছিয়ে পড়ছি না তো? বেশ কয়েকদিন ধরে এ নিয়ে ক্রমাগত খোঁজ নিলাম আন্তর্জালে। কথা বললাম বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে। যা বুঝলাম তা হল, দ্রুত বদলে যাচ্ছে মিটিংয়ের ধরন, বিশ্ব জুড়ে। উদ্গ্রীব হয়ে প্রতিটি কথা শোনার দিন হয়তো খুব তাড়াতাড়ি পাড়ি দেবে নিরুদ্দেশের ঠিকানায়।
জানতে পারলাম, আধুনিক কর্পোরেটের অন্দরমহলেও এই নিয়ে নিয়মিত যুদ্ধ বাঁধছে সদ্য চাকরিতে আসা নতুন প্রজন্ম এবং বছর ১০-১৫ পুরনো হয়ে যাওয়া মানুষদের মধ্যে। প্রযুক্তির মোহময় আশীর্বাদে নয়া প্রজন্ম পেপারলেস। ‘মেঘ’ বললে ওঁদের মনে সবার আগে উঁকি দিয়ে যায় ক্লাউড। আর ক্লাউড মানেই ডেটা। আমরা এখনও পর্দা সরিয়ে জিরাফের মতো গলা উঁচু করে ঊর্ধ্বপানে চাই। মিটিংয়ে ঢোকার আগে পকেটে স্পর্শ করে দেখে নিই কলম আছে কি না। নতুন প্রজন্ম সঙ্গে নিয়ে নেয় মোবাইলের পাওয়ার ব্যাংক। বিখ্যাত অসরকারি ব্যাংকে কাজ করা এক বন্ধুর কথায়, “ছ’ মাস আগে চাকরি পাওয়া একটা বাচ্চা ছেলেকে দেখি, গুরুগম্ভীর মিটিংয়ে হাতে হালকা তুড়ি মেরে ফিসফিসিয়ে একটা গান গাইছে দিব্যি। অথচ সবার আগে, সবচেয়ে ভালো মিনিটস্ অফ দ্য মিটিং ওই পাঠাল। পুরোটাই এআই। আমরা কি বড্ড তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি ভাই? মিটিংয়ে যাব, নোট নেব না?”
নিজের হাতে নোট নেওয়া নিয়ে কার্যত দ্বিধাবিভক্ত আমরা। এক পক্ষের স্পষ্ট দাবি, সম্ভ্রমমূলক শারীরিক ভাষা বা জেসচার বলতে যা বোঝায়, তাতে রেকর্ডারের থেকে এখনও অনেক আগে এগিয়ে থাকবে সাবেকি ডায়রি। আরও সহজভাবে বলা যেতে পারে, কারও কথা শুনে যদি আমরা কিছু লেখার চেষ্টা করি, তা বক্তার মনের মধ্যে আত্মতৃপ্তির জায়গা করে দেয়। তিনি সম্মানিত বোধ করেন। আরও কিছু বলতে উৎসাহিত হন। শ্রোতার আরও শোনার ইচ্ছের বহিঃপ্রকাশ হয় খসখস করে নিয়ে চলা নোটস-এ। এটি আমাদের আদিম অভ্যাস বলা যেতে পারে। কিছু না লেখা সেক্ষেত্রে বক্তাকে উপেক্ষা করার বার্তা দেয়। বিরোধীপক্ষের মানুষরা অবশ্য জানাচ্ছেন, হার্ড ওয়ার্কের বদলে স্মার্ট ওয়ার্কের এই নতুন সময়ে এটাই নিউ নর্মাল। যে কাজ মেশিন করে দিতে পারে অনেক ভালোভাবে, তা মানুষ করবে কেন? এ প্রসঙ্গে নয়া প্রজন্মের একজন তাঁর ব্লগে লিখছেন, ‘চিল্ মারার ফাঁকে ফাঁকে কাজ করব আমি। কনফিডেন্টলি বলতে পারি, জ্ঞান দেওয়া বুড়োদের থেকে ভালো করব। অ্যাপের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে আমার মায়াবী অস্ত্রভাণ্ডার। সেগুলোকে যারা লুকতে বলে, তারাই আজকের দিনে রিয়্যাল হেরো।’

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কি ক্রমশ বদলে যাবে প্রফেশনাল এটিকেট? এর উত্তর এখনও না ঝোলানো ক্যালেন্ডারের পাতাগুলোর গর্ভে। আরও ১০ বছর পরের কথা ভাবলে শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে চলে ঠান্ডা স্রোত। প্রযুক্তির কাছে হেরে যাওয়া, তাল মিলিয়ে চলতে না পারা আমরা যদি ফস করে কোনও মিটিংয়ে বলে উঠি, ‘জাস্ট এ সেকেন্ড! একটু নোট করে নিই?’
ঘড়ঘড় করতে থাকা হাজার লরির ইঞ্জিনের মতো আমাকে ঘিরে ফেলবে ব্যঙ্গ-হাসির কোরাস।
ঠিক ঘিরে ফেলবে, তাই না?
জানি, দুঃসময়ে মাথার উপরে হাত রাখবেন মলয়স্যর। ওঁর মুখে সেই আনন্দ হাসি। ক্লাসরুম।
ভীষণ ঠান্ডা সেই হাত।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved