Robbar

যেখানে, যখন লিখি সেটাই আমার লেখার টেবিল

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 30, 2026 5:49 pm
  • Updated:June 30, 2026 6:05 pm  

সত্যি বলতে কাঠখোদাই যে সেঞ্চুরি করবে, যে যাই ভাবুক, আমি দিবাস্বপ্নেও এমন আহাম্মক স্বপ্নকে পাত্তা দিইনি। শুরুতেই জানিয়েছি, পাঠকের কাছে আমার গভীর কৃতজ্ঞতা। তাঁরা টানা ১০০ সপ্তাহ ধরে আমার বই নিয়ে লেখা গুমোট গদ্য সহ্য করে এই সিরিজটাকে পৌঁছে দিলেন সেঞ্চুরিতে। আপনারা কি বাঙালি নন? না কি আপনারা সেই সুবর্ণরেখা বাঙালি-তলানি, যাঁরা এখনও বাংলা পড়েন, লেখেন, বসেন ভাবনার আসনে? ভাগ্যিস আছেন আপনারা! এখনও আপনারা বই কেনার জন্যে ধার করেন তো? এমনকী কাবুলির কাছে? পানশালায় বসে বইয়ের পাতা ওল্টান? আর স্মোকিং রুমে বসে সিগারে টান দিতে দিতে বই নিয়ে তর্ক বা মধুর রস?

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

১০০.

কাঠখোদাই ১০০-এ পা! আশ্চর্য সহ্যশক্তি আপনাদের! আমি কৃতজ্ঞ, এতদিন আমার মধ্যমেধা সহনের জন্য।

আমি বোধহয় একমাত্র বাঙালি লেখক, যে নিজের লেখা একেবারে পড়ে না। বরং অন্যের লেখা পড়ে। সেইসব লেখা নিয়ে লেখে। তবে তাঁদের বেশিরভাগই বিদেশি লেখক। বিদেশি লেখা। কেননা আমি চাইনি আমার কাঠখোদাই হয়ে উঠুক অনুরোধের আসর। এবং আমার বাড়ি হয়ে উঠুক বিনি পয়সায় পাওয়া বাংলা বইয়ের অসহনীয় আড়ত।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

আমি প্রতিটি বই কিনে পড়ি। আমার গ্রন্থ উৎস মূলত দু’টি। এক, বুকসেলার তরুণ। যে আমার সানডাউনারের সঙ্গে শুঁড়িখানায় মিশিয়ে দেয় আনকোরা কিংবা ক্লাসিকের স্বাদ। দুই, পার্কস্ট্রিটের অক্সফোর্ড থেকে ফোন আসে, আমার পছন্দ হতে পারে– এমন কোনও বই এলেই। ‘স্যর, আপনার বই এসে গিয়েছে।’ আমি বই কিনি। বই কিনে অক্সফোর্ড-এর দোতলায়, সেখানে চায়ের ভারি সুন্দর দোকান। পাওয়া যায় ফ্লুরিজ-এর চা আর কেক। যে-কোনও বই কিনে প্রাথমিক উপভোগ আমি এখানে করি। কাচের দেওয়ালের নিচে বয়ে চলেছে পার্কস্ট্রিট। নিস্তব্ধ। এটা আমার জীবনে একমাত্র বিলাস। সে যখন আমার জীবনে ছিল, পাশে পেয়েছি। তার কি মনে পড়ে?

অক্সফোর্ড-এর দোতলায়, চা বার। ছবি: বিশ্বরূপ গাঙ্গুলি

এবার আসি আমার আসল বিষয়ে: আমার নিজের লেখার টেবিল। যে টেবিল আমাকে নিয়ে এসেছে বই নিয়ে লেখার সেঞ্চুরি পর্বে! আমি আমার সমস্ত বদলে বদলে যাওয়া টেবিলের প্রতি কৃতজ্ঞ। তা বলে তাদের মাথায় তুলে নাচতে হবে? তাছাড়া এ-ব্যাপারে আমার একটু অসুবিধে আছে, জেনুইন অসুবিধে। আমাদের শ্যামপুকুরের বাড়ির ছাদে যাওয়ার সিঁড়িটা ছিল কালো কাঠের। আমি সিঁড়ির শেষ ধাপটাকে করেছিলাম, ভারি বুদ্ধি খাটিয়ে– আমার টেবিল। সে এতটাই চওড়া টেবিল যে, কাগজ কলম দোয়াত খাতা পেনসিল সব ধরে গিয়েও জায়গা থাকত। সেটা ছিল দোয়াত কলম কালি কাগজ ব্লটিং-পেপারের যুগ। সিঁড়ির চওড়া শেষ ধাপটা আমার টেবিল। আর তার আগের ধাপটা আমার চেয়ার। সামনেই ছাদ। আলো-বাতাসের অভাব নেই। এই সিঁড়ির টেবিল-চেয়ারে বসেই আমি শুরু করেছিলাম ছ’বছর বয়সে আমার মহাকাব্য। বিষয়, একটি চড়ুইবাচ্চার মৃত্যু!

বাচ্চাটা এতই ছোট যে তখনও চোখ ফোটেনি। এবং তার গোলাপি গায়ে পালক ছিল না। কেন জন্ম, কেন মৃত্যু, এই জীবনের কী মানে? এভাবেই শুরু করেছিলাম সেই মহাকাব্য। এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আইডিয়ার স্পার্কটা এসেছিল আমার সিঁড়ি টেবিল আর চেয়ারের কাছ থেকেই। কিন্তু তাই বলে কৃতজ্ঞতায় একটা পেল্লায় কাঠের সিঁড়িকে মাথায় তুলে নাচানাচি করাটা কি বেশ বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না?

রাইটিং ডেস্ক বলতে যা বোঝায়, তার একটা মিনি সংস্করণ আমার জীবনে এল ১২ বছর বয়সে। ছোট টেবিল। তস্য ছোট চেয়ার। কোথায় আমার ছাদের পাশে সিঁড়ি টেবিলটার লম্বা-চওড়ামি, ছাদের হাওয়ার বদলে বদলে যাওয়া চালবাজি; আর কোথায় বাবার দৌলতে পাওয়া নতুন টেবিলটার সচেতন ক্ষুদ্রবাদ! আর মাথার ওপর অস্টলার ফ্যানের একঘেয়ে হাওয়া। মরি মরি, ছোটদের মন আর লেখাপড়া নিয়ে বড়দের কী অসহনীয় মুরুব্বিয়ানা! সেই প্রথম আঘাত করল আমাকে। ছোট যখন, তার লেখার টেবিলও যেন হয় ছোট। কিন্তু ততদিনে তো আমি রবীন্দ্রনাথে প্রবিষ্ট হয়েছি। আর যে বাবা আমার জন্য কিনেছে, লেখাপড়ার খুদেতম টেবিল, সেই বাবা-ই চার্লস ল্যাম্ব (উচ্চারণ ল্যাম, ‘বি’ নিস্তব্ধ)-এর ‘টেলস ফ্রম শেক্সপিয়র’ পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কিনে আমার হাতে দিয়ে বলেছে, ‘এটা পুরোটা পড়লেই তোর আদ্দেক শেক্সপিয়র পড়া হয়ে গেল। অনেকটা এগিয়ে থাকলি ম্যাট্রিকের আগেই।’ বাবার কিছুতেই খেয়াল থাকত না, আমি স্কুল-ফাইনালের প্রথম বছর। বাবার মনের এইসব ছোটখাটো গুলিয়ে যাওয়া কিন্তু বিষয় নয় আমার। বিষয় আরও গভীর এবং ব্যাঁকাটেরা।

বুঝি না-বুঝি, প্রতি বয়সের একজন আলাদা রবীন্দ্রনাথ আছেন। তেমনই আছেন প্রতি বয়সের জন্য বাড়ন্ত শেক্সপিয়র। এই সামান্য ব্যাপারটা আমার বাবা বুঝতে পারেননি! তার অশেষ আধুনিকতায় এক ফোঁটা চোনা। যে টেবিল আমাকে বড় করে ভাবতে শেখাবে না, সেই টেবিল নিয়ে আমি কী করব? এখন অবিশ্যি বুঝি, টেবিলের গা-গতরের সঙ্গে দর্শনের সম্পর্ক খুবই পলকা। কিন্তু ১২ বছর বয়সে মনে একটা আস্ত ফরাসি বিপ্লব থাকে। আমার তো ছিলই। আমি ছাদের সিঁড়িতে ফিরে গেলাম। আর যে টেবিলটার হওয়ার কথা ছিল আমার লেখাপড়ার টেবিল, সেটা অবতীর্ণ হল ভিন্ন অবতারে।

ক’দিনের মধ্যে বাবা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখল, টেবিলে সাজানো মায়ের ক্রিম, পাউডার, পমেটম, আতর, আলতা! টেবিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে স্বাবলম্বী আয়না। বাবা যতদূর সম্ভব পলিটিক্যালি সঠিক তৃপ্তি উচ্চারণে এনে বাংলায় মাত্র চারটি শব্দ উচ্চারণ করল: ‘বাঃ, এ বেশ হয়েছে।’ কিন্তু পরক্ষণেই বাবার টেবিল উল্টে দেওয়া প্রশ্ন: ‘কিন্তু রাত্তিরে খোকা কোথায় লেখাপড়া করবে? ছাদের অন্ধকার সিঁড়িতে?’ খোঁপায় কাঁটা গুঁজতে গুঁজতে ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের উত্তর: ‘এতদিন যেখানে করেছে। মেঝেতে। মাদুরে।’ মাত্র দু’টি শব্দ। শুনেই আমি তিরিং করে খাট থেকে নিচে। দ্বিতীয় তিরিংয়ে ঘরের বাইরে!

প্রশ্ন উঠতে পারে, আমার নিজের টেবিল নিয়ে এই লেখা কি ইগো ট্রিপ নয়? প্রয়োজন ছিল কি? এই দুটো প্রশ্ন পেরেকের মাথায় হাতুড়ি। অতএব উত্তর দিতেই হয়। যেহেতু এই লেখাটা কাঠখোদাই সিরিজের ১০০তম, সত্যি বলতে কাঠখোদাই যে সেঞ্চুরি করবে, যে যাই ভাবুক, আমি দিবাস্বপ্নেও এমন আহাম্মক স্বপ্নকে পাত্তা দিইনি। শুরুতেই জানিয়েছি, পাঠকের কাছে আমার গভীর কৃতজ্ঞতা। তাঁরা টানা ১০০ সপ্তাহ ধরে আমার বই নিয়ে লেখা গুমোট গদ্য সহ্য করে এই সিরিজটাকে পৌঁছে দিলেন সেঞ্চুরিতে। আপনারা কি বাঙালি নন? না কি আপনারা সেই সুবর্ণরেখা বাঙালি-তলানি, যাঁরা এখনও বাংলা পড়েন, লেখেন, বসেন ভাবনার আসনে? ভাগ্যিস আছেন আপনারা! এখনও আপনারা বই কেনার জন্যে ধার করেন তো? এমনকী কাবুলির কাছে? পানশালায় বসে বইয়ের পাতা ওল্টান? আর স্মোকিং রুমে বসে সিগারে টান দিতে দিতে বই নিয়ে তর্ক বা মধুর রস?

আমি শুনেছি লন্ডনের পানশালায় সাহিত্য নিয়ে সুরাস্নাত এমন আলোচনা, ঠিক যেন বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জয় গোস্বামী– সবাই সায়েব হয়ে জন্মেছেন! আপনারা সেই তলানি বাঙালি, যাঁরা বাংলা ভাষাকে আজও ভালোবেসে চলেছেন, ভীতু চোরাস্রোত হয়ে হাজার মুখঝামটার ঠোক্কর খেতে খেতে। আপনাদের জানাই আমার অকুণ্ঠ ভালোবাসা। এবং অভিনন্দন।

এইবার আসি আমার আসল সমস্যায়।

আমার বলতে আমার কিছু নেই! বাড়ি নেই! গাড়ি নেই! নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই! সংসার নেই! বউ নেই! অনেক রকম বউয়ের সঙ্গে থেকেছি। কেউ টিকে থাকেনি! পৃথিবীর সমস্ত নারী, কোনও না কোনওভাবে আমার থেকে উচ্চতর জীব। কেন? কেননা তারা নারী। থাকার মধ্যে আছে একটা পাসপোর্ট, যার ভরসায় আমি বারবার গিয়েছি বিদেশে। কিন্তু সেই পাসপোর্ট এখন শুনছি আমার ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট নয়। আর আছে টিম টিম করা একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। সুতরাং, আমার নিজের লেখার টেবিল, সত্যি বলতে– নেই! আমি যেখানে খুশি লিখতে পারি। যখন খুশি, যে-কোনও আকস্মিকতায় লিখতে পারি। শুধু বললেই হল, লেখা চাই।

লেখকের বর্তমান পড়ার টেবিল

একটা ছোট্ট একেবারে স্মৃতির নিদর্শন, প্রতিভার নয়। আমার তাড়নার রাত একটা বেজে গিয়েছে। বিছানায় আমার পাশে শুয়ে থাকা সেলফোন হঠাৎ বেজে উঠল। ওপার থেকে রোববার ডিজিটালের সম্পাদকের বেদনার্ত স্বর: ‘টুটু বসু নেই, রঞ্জনদা। আড়াইটের মধ্যে লেখা চাই।’ সম্পাদক আর কথা বাড়ায়নি। আমিও না। পাঁচ মিনিটের মধ্যে লিখতে বসলাম। মনে হল সমস্ত ‘সংবাদ প্রতিদিন’টাই আমার লেখার টেবিল। সেই নাতিদীর্ঘ দুঃখের লেখা সেই রাত্রে শেষ হয়েছিল এইভাবে: আমি তো সাত বছরের বড় টুটু বসুর থেকে। আমি পিছিয়ে থাকলাম কেন? গভীর রাতের অন্তরাল থেকে আমার চেতনায় ঝরে পড়ল এই উত্তর: কী আস্পর্ধা তোমার! টুটু বসুকে হারাবে?

আরও একটা লেখার কথা বলব, যেটা লিখেছিলাম দফতরের ডেস্কে বসে। বিষয় সেকেন্ড হ্যান্ড। শুরু করলাম এইভাবে, একমাত্র হ্যান্ডের কোনও সেকেন্ড হ্যান্ড নেই। প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ ফিঙ্গার প্রিন্টে অনন্য। একটানা লিখে শেষ করলাম এই প্রত্যয়ে: একদা ভারতীয় পুরুষ বুঝেছিল, একটি মেয়ে অক্ষতযোনি, শুধুমাত্র এই তথ্যটুকু জেনে কী লাভ পুরুষের? যদি সেই মেয়ে হয় নির্বোধ, মূর্খ, মেধাহীন?

আজও আমি এই বিশ্বাসে আরামবোধ করি: মেধাবিহীন সেক্স, নুনবিহীন ডিম। হাতফেরতা নারী আমার কাছে শুধুমাত্র এই কারণে বেশি ইন্টারেস্টিং, সেও আমারই মতো একই দহন দাহনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। এবং সম্ভবত আমারই মতো জন্মেচ্ছে অন্য এক বোধের মধ্যে। এই আইডিয়াটা আমার না কি লেখার টেবিলের?

যা খুশি ভেবে নিন। আমি অন্তত রেগে যাব না!

…………….. রোববার.ইন-এ পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য লেখা ………………..