the fisherman by ganesh pyne got record price in auction | Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

ছবির আলো জীবনের ছায়া

‘দ্য ফিশারম্যান’ নামে যে ছবিটি সর্বোচ্চ মূল্য পেল, তার নেপথ্যে রয়েছে তাঁর দীর্ঘ দিনের নিবিষ্ট শিল্প-অনুশীলন, যা ভারতীয় মিনিয়েচার শিল্পের সূক্ষ্মতার সঙ্গে আধুনিক পাশ্চাত্যশিল্পের অসামান্য এক মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। আর তার মধ্যে সুপ্ত হয়ে রয়েছে তাঁর গভীর শিল্প আর জীবনদর্শন– যার অভাব থাকে অনেক খ্যাতিমান শিল্পীর ছবিতেও। অবনীন্দ্রনাথের ‘স্বপ্ন ধরার জাল’-কে তিনি যেন জেলেদের জালের মেটাফরে মেলে ধরেছেন! জালের ওই নিবিড় জটিল ক্রিস-ক্রস রেখার টেক্সচার, জেলের উলম্ব অবস্থান আর নৌকোর হাড় দিয়ে তৈরি কৌণিক ভঙ্গির অভিঘাত এই ছবির কম্পোজিশনকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীদের কাজের সমকক্ষ করে তুলেছে।

Published by: Robbar Digital

Posted:July 8, 2026 12:23 pm | Updated:July 8, 2026 12:23 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

খুব সম্প্রতি লন্ডনের ক্রিস্টির নিলামে গণেশ পাইনের টেম্পারায় আঁকা একটি ছোট ছবি ‘দ্য ফিশারম্যান’ প্রায় ৪৪ কোটি টাকায় বিক্রি হল! বাঙালি শিল্পী হিসেবে বোধহয় পৃথিবীতে প্রথম তিনি এই সর্বোচ্চ মূল্য পেলেন। এবং আশ্চর্যের বিষয় এই যে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যাঁকে গণেশ পাইন আজীবন ‘মেন্টর’ বলে মেনে এসেছিলেন, তাঁর ছবির মূল্যও এই নিলামে অনেকটা নিচে। নিলামে আকাশছোঁয়া মূল্য পেলেই যে একটা ছবি সার্থক হয়ে ওঠে তা সবসময় সত্যি নয়। নিলামে ছবির দাম বাড়ার পেছনে অনেক অঙ্ক, অনেক রাজনীতি কাজ করে যায়। এজন্য গণেশ পাইন নিজেই এসব থেকে এমনকী শিল্পক্রেতাদের থেকেও সাত হাত দূরে থাকতে চাইতেন। তবে গণেশ পাইনের ছবি এত উচ্চ মূল্য পাওয়ায় আশা জাগে যে, মননশীল ছবির সমঝদার এখনও আছে, শুধুমাত্র গিমিক আর টেকনিক-সর্বস্ব ছবির চিৎকারে নিলামঘর ভরে নেই।

zoom
গণেশ পাইনের ‘দ্য ফিশারম্যান’

তরুণ গণেশ পাইনকে প্রথম জহুরির মতো আবিষ্কার করেছিলেন মকবুল ফিদা হুসেন। তিনি একদিন দুপুরবেলায় খালি পায়ে গণেশ পাইনের কবিরাজ রো’য়ের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলেন, তাঁর ভাইঝি তাঁকে চিনতে না পারায় ঢুকতে দিতে চাননি! হুসেন তৎক্ষণাৎ একটা স্কেচ এঁকে বলেন, ‘কাকাকে গিয়ে দেখাও! চিনতে পারবেন…’ হুসেনের বারবার উল্লেখে ও সুপারিশে গণেশ পাইনের নাম খুব অল্পবয়সেই সারা ভারতবর্ষে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে গণেশ পাইনের সমসাময়িক শিল্পীদের মনে অনেক অসূয়া কাজ করত। গণেশ পাইন আমায় ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন যে, বিখ্যাত অভিনেতা, শিল্পবোদ্ধা ও সংগ্রাহক ভিক্টর ব্যানার্জি তাঁকে একবার বলেছিলেন, ‘এখন যেসব শিল্পীদের নিয়ে এত হৈচৈ হচ্ছে তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই টিকবেন না, কিন্তু আপনি থেকে যাবেন’। আজ বিদেশে এই নিলামের পরে মনে হচ্ছে যে, হুসেন বা ভিক্টর ব্যানার্জি কিছু ভুল করেননি বা ভাবেননি। প্রখ্যাত শিল্পবিশেষজ্ঞ অশোক মিত্র আমায় ব্যক্তিগত আলাপে বলেছিলেন যে, বিদেশে ছবির ক্রেতারা বহুমূল্য বিদেশি শিল্পীদের ছবি কিনতে পারেন না বলেই অনেক কমদামি ভারতীয় শিল্পীদের ছবি কিনে সান্ত্বনা পান! আজ বোধহয় তাঁর কথা ভুল প্রমাণিত হল, বিদেশে ভারতীয় ছবি এখন কাঞ্চনমূল্যে বিক্রি হচ্ছে তার নিজস্ব গুরুত্বে আর বৈশিষ্ট্যের জন্যই।

zoom
মকবুল ফিদা হুসেন

গণেশ পাইনের ছবির এই মহতী সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে ছিল তাঁর অনেক কান্না-বিষণ্ণতা-যন্ত্রণা, যা তাঁর শিল্পজীবন ও ব্যক্তিজীবনের জার্নিটা অনুধাবন করলে বোঝা যায়। আর্ট স্কুল থেকে পাশ করার পরে দীর্ঘ একটা যুগ গণেশ পাইনকে কীভাবে নিরন্তর দারিদ্রের সঙ্গে লড়তে হয়েছে, কীভাবে নিরবিচ্ছিন্ন ডিপ্রেশনে তিনি ডুবেছিলেন দিনের পর দিন, কীভাবে খুঁজে পেলেন তাঁর নিজস্ব চিত্রভাষা, তাঁর প্রার্থিত মিডিয়াম– তা অনুপুঙ্খ ডিটেলে ধরা আছে তাঁর নিজের ডায়েরিতে। যে গণেশ পাইনের চিত্রকলা এখন হীরকমূল্যে বিক্রি হয় গ্যালারিতে বা নিলামে, সেই পাইন ২০ জানুয়ারি ১৯৬৪-তে লিখছেন: ‘টাকাকড়ির মুখ দেখি না বহুদিন। বহু বহু দিন।’ ওই বছরেই ২৭ মার্চ লিখছেন: ‘মাসে চারখানা ছবি আঁকার খরচ তিরিশ থেকে চল্লিশ টাকা। অনেক কষ্টে দিন চালাতে হবে।’ ২০ মে লিখছেন, ‘কতদিন ছবি বিক্রয় হয়নি। ছবি কম এঁকেছি ঠিকই, তবুও বাঁধাতে রঙে একজিবিশনে কিছু কম যায় নি। বিফলে গেছে।’ ছবি বিক্রি না হওয়ার এই যন্ত্রণাটা কমবেশি সব শিল্পীই প্রথম জীবনে ভোগ করেন। তবে গণেশ পাইনের সঙ্গে অন্য অনেকের তফাত হয়ে যাবে এইখানে যে, পরে যখন তিনি কাঞ্চনমূল্যে নিজের ছবি বিক্রি করতে পারলেন, তখন তিনি তাঁর এই পূর্ব স্মৃতিটাকে আঁকড়ে রইলেন। টাকার স্রোতে ভেসে গিয়ে তিনি বহুপ্রজ শিল্পী হয়ে উঠলেন না, নিজের ছবির মানকে হারাতে দিলেন না। জীবনের একেবারে প্রান্তে এসে তিনি কয়েকটি ‘সোলো’ প্রদর্শনী করলেও, তার আগে এতবছর একটিও একক করেননি। যখন তিনি অর্থসাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন তখনও তিনি নিজের চুল নিজে কাটতেন, এইভাবে সেলুনের পয়সা বাঁচাতেন। কেন এটা করেন জিজ্ঞেস করাতে একবার বললেন, ‘রেমব্রান্টের মতো যদি আমার কোনওদিন দশা হয়! যদি আমি দেউলিয়া হয়ে পড়ি? তাই নিজের জন্যে খরচাটাকে খুব লিমিটের মধ্যে রাখতে চাইছি।’ আসলে গণেশ পাইনের ‘যে দিন ভেসে গেছে চোখের জলে’ তা তিনি কখনও ভুলতে পারেননি, ভুলতে চাননি! যে রেমব্রান্টের ছবির আলোছায়া প্রথম জীবনে তাঁকে অপূর্ব প্রেরণা দিয়েছিল সেই রেমব্রান্টের জীবনের সর্বনাশা পরিণাম তাঁকে অবসন্ন করত।

zoom
রেমব্রান্ট

’৬৪ সালে ডায়েরির পাতায় এক জায়গায় সারি করে কিছু রঙের নাম লেখা আছে, তার পাশে কিছু মূল্য টাকাপয়সায়; হয়তো তিনি এগুলো সংগ্রহ করার কথা ভাবছিলেন। এই রঙের সারিতে একটা অদ্ভুত রং চোখে পড়ে যায়, সেটা হল ‘আইভরি ব্ল্যাক’। অথচ আশির দশকে গণেশ পাইন আমাকে বলছেন, ‘আমি কালো রঙ ব্যবহার করি না একেবারেই। আমার ছবিতে অন্ধকার আছে অবশ্যই, খুব পর্যাপ্তভাবেই আছে, কিন্তু ওই দুর্ভেদ্য কালো আমার অভিপ্রায় নয়’। এখানে তিনি যেন উপনিষদ-প্রভাবিত মানসিকতায় রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির অনুসারী, কবি বোদলেয়ারের মতো ‘পিচকালো’ নয়, যা আবু সৈয়দ আইয়ুব দেখিয়েছিলেন। ছয়ের দশকে গণেশ পাইন যখন গভীর অন্ধকারে ডুবে আছেন, তাঁর সামনে আলোর এতটুকু দিশা নেই, তখন হয়তো তিনি এই নিরেট কালো রঙকেও আঁকড়ে ধরেছিলেন।

গণেশ পাইন তাঁর টেম্পারা মাধ্যমের মধ্যে চিত্রকলার চরম উৎকর্ষে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু তার আগে দু’ দশক ধরে তাঁর বিভিন্ন মিডিয়ামের মধ্যে দিয়ে যে জার্নিটা– তা না অনুসরণ করলে তাঁর টেম্পারার সার্থকতাটা অধরা থেকে যাবে হয়তো। ‘একটু বড়ো ছবি, oil এর মতো গভীর রং আর অনায়াসে আঁকার আনন্দটুকুর জন্যই এতশত Experiment, যদি বাঞ্ছিত পাই এই আশা। খরচ কমাতে হবে, নইলে পারবো না।’ তিনি তাঁর অভীপ্সিত মিডিয়ামের সন্ধানে সদাজাগ্রত রয়েছেন, নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে সর্বদা, তবু অর্থকরী সমস্যাটা তাঁকে সবসময়েই ন্যুব্জ করে দিচ্ছে। কিন্তু এইটেই কি ‘শাপে বর’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে না তাঁর চিত্রকলা চর্চায়?

ছোট ছবি আঁকব না বড় ছবি? এই দ্বন্দ্ব ছয়ের দশকের গণেশ পাইনকে অহরহ জর্জরিত করেছে। শেষপর্যন্ত ’৬৩ সালের ১১ জানুয়ারী তিনি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ‘বড়ো ছবি করবো না। তেলরঙের ছবি করবো না আপাততঃ। জলরঙই আমার ভালো। জলরঙ জানি। আর জানি কালিকলম।’ একটা মিথ প্রচলিত আছে যে, তিনি চাকরি করতে চাননি, চাকরি করা সবসময়ে এড়িয়ে গেছেন। তিনি অনেক চাকরির ইন্টারভিউ এই সময়ে দিয়েছিলেন এবং একটা চাকরির জন্যে মাথা খুঁড়ে ঘুরেছিলেন। জীবনানন্দের সম্পর্কেও এইরকম মিথ প্রচলিত আছে যে তিনি চাকরি করতে চাইতেন না। এই কথাটাও পুরোপুরি সত্যি নয়। ৪ আগস্ট ’৬৪-তে গণেশ পাইন মন্দার মল্লিকের স্টুডিওতে কাজ করার সময়ে খুব মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে অস্ফুট প্রার্থনায় একটা চাকরি চাইছেন, ‘চাকরী দাও। তিনশোটা টাকা মাসে পাবো না কি। না হয় দুশো। না হয় দেড়শো। একটা চাকরী। যা হোক করবো। শুধু পয়লায় কিছু টাকা। কী লজ্জা।’ আর্ট কলেজ থেকে বেরিয়ে চাকরি পাবার অজস্র চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু পাননি। শেষ পর্যন্ত একবার ইন্টারভিউ থেকে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরবার সময় একটি জনাকীর্ণ বাসে বসে লক্ষ করেন যে, একটি বাচ্চা ছেলে তার হাতের শিঙাড়াটা ওই ভিড়ের মধ্যে সযত্নে রক্ষা করে চলেছে। এই দৃশ্য তাঁকে প্রতিজ্ঞা করাল যে তিনি কিছুতেই আর চাকরি করবেন না। ওই শিশুর শিঙাড়ার মতো তাঁর পরমপ্রিয় চিত্রচর্চাকে আজীবন বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাবেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠা বা সিকিউরিটি তিনি পেয়েছিলেন আটের দশকের মাঝামাঝি এসে। তার আগে অবধি, বিশেষত দাদার মৃত্যুর পর তিনি গভীর অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছিলেন।

zoom
গণেশ পাইন

গণেশ পাইন থাকতেন মেডিকেল কলেজের উল্টোদিকে কবিরাজ রোতে। এইখানেই ওঁর পৈতৃক বাড়ি, জন্মাবধি তিনি এখানেই বড় হয়েছেন। কবিরাজ রো-র বাড়ির আলো-অন্ধকার, শ্যাওলা ধরা পুরনো দেয়াল, বাড়ির পাশের মন্দিরের চৈতন্যমূর্তি তাঁর শিল্পমননে পাকাপাকি ছাপ রেখে গিয়েছিল। বলা যেতে পারে যে, এই বাড়িই তাঁর মনে শিল্পবীজের জন্ম দিয়েছিল শৈশবের দিনগুলো থেকেই।

শৈশবে স্লেটই ছিল গণেশ পাইনের ছবি আঁকার ক্যানভাস। একটা ছবি এঁকে, সেটা মুছে তিনি নিজস্ব নিভৃতে এঁকে যেতেন অজস্র স্কেচ। তাঁর ঠাকুরমার গভীর প্রভাব পড়েছিল তাঁর শিশুমনের চেতনায়। পাশের বাড়ির ছাদে গরুড়মূর্তি, ঠাকুরদালানে অর্জুনের বিশ্বরূপের ছবি– এইসব পুরাণভিত্তিক কল্পমূর্তি তাঁকে ভবিষ্যতে মিথ অবলম্বনে ছবি আঁকার দিকে যাত্রা করাল।

পুরাণ বা ইতিহাস-কেন্দ্রিক বিষয়কেও পাইন সম্প্রসারিত করে দিতেন বিমূর্ততায়, যাতে সেই বিষয়টি একটি আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছতে পারে। রবীন্দ্রনাথের ‘রথের রশি’ অবলম্বনে আঁকা তাঁর ‘বিফোর দ্য চ্যারিয়ট’ ছবিটির উৎস তিনি একদিন বোঝাচ্ছিলেন আমাকে। বললেন, ‘ছবিটি চৈতন্যদেব ও রথ নিয়ে হলেও এখানে তাঁর মূর্তি ছাপিয়ে একটি “ইউনিভারসাল” মানুষের কথা কল্পনা করলাম আমি।’ এইভাবে ছবিটির অর্থ ছড়িয়ে যায় বহুস্তরীয় দিগন্তে।

তাঁর সমসাময়িক বা পূর্বসূরি শিল্পীরা অনেকেই বিদেশে গিয়েছিলেন, সেখানকার শিল্পকলার সম্পর্কে ধারণা পেতে, বা গ্রেট মাস্টারদের কাজ দেখতে। গণেশ পাইনকে যখন জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, তিনি কেন বিদেশে যাননি কোনওদিন, তার উত্তরে বলেছিলেন– ওইসব মহান শিল্পীদের কাজ দেখলে নিজের মধ্যে একটা ডিপ্রেশন আসত, কারণ ঐ ধরনের স্কিলফুল কাজ তো কোনওদিন আর করে উঠতে পারব না! তারপরে হয়তো ছবি আঁকাই বন্ধ হয়ে যেত আমার! তবে জীবনের উপান্তে এসে গণেশ পাইন কয়েকবার বিদেশে গিয়েছিলেন অবশ্য।

‘ভেসেল’ ছবিটার উৎস তিনি পেয়েছিলেন মহাবোধি সোসাইটি হলে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের স্বকণ্ঠে একটি কবিতা ‘স্বেচ্ছাচারী’ শুনে। কবিতাটি ছিল–

‘তীরে কি প্রচণ্ড কলরব
জলে ভেসে যায় কার শব
কোথা ছিল বাড়ি?

রাতের কল্লোল শুধু বলে যায়–
আমি স্বেচ্ছাচারী।’

এই কবিতাটি গণেশ পাইনকে আমূল বিদ্ধ করেছিল। তাঁর সত্তার গভীরে এক অভাবনীয় আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। এই জলে ভেসে যাওয়া শব তাঁর মনে এক ‘হিউম্যানাইজড ভেসেল’-এ রূপকল্পের জন্ম দিয়েছিল। পরে তাঁর বিভিন্ন ছবিতে এই কল্পমূর্তি ঘুরে ঘুরে এসেছে, কখনও মানুষের আকারের এক ভেলার রূপ নিয়ে, কখনও মানুষের পাঁজরের আকার নিয়ে। সেই নৌকা ভেসে যাচ্ছে কোন নিরুদ্দেশে– কোন অনন্ত অবগাহনে।

‘দ্য ফিশারম্যান’ নামে যে ছবিটি সর্বোচ্চ মূল্য পেল, তার নেপথ্যে রয়েছে তাঁর দীর্ঘ দিনের নিবিষ্ট শিল্প-অনুশীলন, যা ভারতীয় মিনিয়েচার শিল্পের সূক্ষ্মতার সঙ্গে আধুনিক পাশ্চাত্যশিল্পের অসামান্য এক মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। আর তার মধ্যে সুপ্ত হয়ে রয়েছে তাঁর গভীর শিল্প আর জীবনদর্শন– যার অভাব থাকে অনেক খ্যাতিমান শিল্পীর ছবিতেও। অবনীন্দ্রনাথের ‘স্বপ্ন ধরার জাল’-কে তিনি যেন জেলেদের জালের মেটাফরে মেলে ধরেছেন! জালের ওই নিবিড় জটিল ক্রিস-ক্রস রেখার টেক্সচার, জেলের উলম্ব অবস্থান আর নৌকোর হাড় দিয়ে তৈরি কৌণিক ভঙ্গির অভিঘাত এই ছবির কম্পোজিশনকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীদের কাজের সমকক্ষ করে তুলেছে।

বিদেশি বই পড়ার গভীর অভ্যাস ছিল গণেশ পাইনের। ‘আউটসাইডার’ ছবিটি যখন আঁকছেন তখন তিনি কলিন উইলসনের ‘দ্য আউটসাইডার’ পড়ছেন। কাফকার ‘মেটামরফসিস’ তাঁর ছবিতে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। দর্শনের বই পড়তে ভালোবাসতেন তিনি। সার্ত্র, কির্কেগার্ড, পাস্কালের দর্শন তাঁর চেতনায় মিশে থাকত নিরবিচ্ছন্নভাবে। অস্তিত্ববাদী দর্শন তাঁকে খুব নাড়া দিত। জীবনের যে অর্থহীনতা, তা নিয়ে খুব ভারাক্রান্ত ছিলেন তিনি। সেইসময়ে তাঁর জীবনের যে ব্যর্থতার বোধ তাঁকে কুরে কুরে খেত– সেটা হয়তো এই দর্শনের কাছে তাঁকে পৌঁছে দিত। অথচ জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে যখন তিনি দক্ষিণ কলকাতার লেকের কাছে থাকতেন, তখন তাঁর জীবন সম্পর্কে প্রাচ্যদর্শনের পথ ধরে এক পরিপূর্ণ প্রশান্তি যেন মনের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। এই সময়ে আমি একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম: মৃত্যুচিন্তা কি তাঁকে ভাবায়? তিনি বলেছিলেন, মৃত্যুর প্রয়োজন আছে জীবনের। একটা বাক্যের শেষে যেমন দাঁড়ির প্রয়োজন আছে, তেমনই জীবনের শেষে মৃত্যুর ওই অন্তিম উপস্থিতিটা খুব জরুরি!

Abanindranath Tagore Ganesh Pyne Indian Art Indian Artist Maqbool Fida Husain Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shakti Chattopadhyay The fisherman

Share this article on