Robbar

অতল জলের আহ্বান

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 18, 2026 6:15 pm
  • Updated:July 18, 2026 8:58 pm  

প্রাচ্য ও প্রতীচ্য পৃথিবীতে নদী ও মানুষের প্রণয়কথা অতি চর্চিত বিষয়। প্রত্যেক প্রফেটের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকটি নদী। শুধু প্রফেটদের কথাই নয়, যাঁরা অপারে কাব্যসংসারে প্রজাপতিস্বরূপ কবি, তাঁদেরও প্রত্যেকেরই আছে একটি করে প্রিয়া স্রোতস্বিনী।কেন যাবতীয় সৃজনশীলতার ভিতর অন্তঃস্রোতা হয়ে বয়ে চলেছে নদী? এ কি নিছকই সমাপতন? অথবা কোনও এক অমোঘ মহাসত্য লুকিয়ে আছে এই আপাত-সমাপতনের মধ্যে?

সন্মাত্রানন্দ

১৪.

আমাকে টান মারে রাত্রি-জাগা নদী
আমাকে টানে গূঢ় অন্ধকার
আমার ঘুম ভেঙে হঠাৎ খুলে যায়
মধ্যরাত্রির বন্ধ দ্বার…

আমতলির সেই পরিচিত কুঠিয়ায় অতন্দ্র নিশীথেশ হয়ে শুয়ে থাকি। অদূর মুকুরটিলা থেকে রাতজাগা কোনও পাখি ‘কুব্‌-কুব্‌’ করে ডাকে। প্রিয় কবিতার প্রারম্ভিক পঙক্তিগুলি ভেসে আসে মনের মধ্যে; একদিন যে-কবিতা হারিয়ে যাওয়া কোনও ‘স্মৃতির শহর’-এর সমাধিফলকে এপিটাফের মতো উৎকীর্ণ হয়েছিল, আজ সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ পরিবেশে– এই অতিশয় নির্জন গ্রামদেশের সুনীল রাত্রির অণুভাষ্য হয়ে তা ফিরে আসে; কবিতার স্থান-কাল-অতিক্রমী শক্তির এই হয়তো অনিবার্য প্রমাণ। শুয়ে শুয়ে মনে পড়ে ফেলে আসা দিনরাত, জীবনের পরিত্যক্ত অধ্যায়ের বল্কল, চির-একাকী মানুষের মনে তার চেয়ে বেশি আর কী ঐশ্বর্য আছে? এই যে কয়েকমাস কাটিয়ে এলাম কাঁকরডাঙা গ্রামে সতী-ভৈরবীর আশ্রমে, সেই আশ্রমটির কথা, আশ্রমিকদের কথা অনর্গল মনে পড়ে। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে সেই প্রেমময়ী স্নেহের মূর্তি, যাঁকে দেখে, যাঁর জীবনের কথা শুনে আমিও কখনও দুর্মর আবেগে ভেবে বসেছিলাম, ওই আশ্রমেই, তাঁর কাছেই থেকে যাব অবশিষ্ট জীবন। কিন্তু সে হল না আমার, তিনিও চাইলেন না আর, আবার ফিরে আসার পথ অনবরুদ্ধ হল। ফিরে এসে দেখি, পূর্বপরিচিত সেই ঘরখানি তেমনই রয়েছে; সামান্য ধুলামলিন, শুকনো পাতায় ঈষৎ বিবর্ণ হয়ে ওঠা ছাড়া সেই কুটিরের অন্য কোনও পরিবর্তন হয়নি। মনে হয়, তাহলে কি মধ্যবর্তী এই কয়েকমাস– সবই কি স্বপ্ন তবে? মনের উপরিতলে ভেসে উঠে মিলিয়ে গিয়েছে? অথবা এর আগে যে-উপমাটি ব্যবহার করেছি, পুনরুক্তিভয় সরিয়ে এখানে হয়তো সেটিই ফিরিয়ে আনব আমি আবার। আয়নার ওধারে যে একটি জগৎ, আমাদের অজ্ঞাতসারে যা বয়ে চলেছে নিঃসাড়ে, সতী ভৈরবী ও তাঁর আশ্রম কি তবে সেই নিত্য ঘটমান, নিত্য স্পন্দমান চলচ্ছবিরই অকিঞ্চিৎকর একটি অংশ? আয়নাতে মুখ রাখো, সেই ঘটনাস্রোতের একটা টুকরো শুধু তুমি দেখতে পাবে। সরিয়ে নাও মুখ, অমনি মিলিয়ে যাবে সেই চলস্রোত, আর কিছুই দেখতে পাবে না। কী অদ্ভুত, নয় কি? আছে বলে দেখি, তা নয়। দেখি বলেই তা আছে। না-দেখলে নেই!

শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

ক’দিন শুয়ে-বসে কাটল। অভিজ্ঞতারও ক্লান্তি আছে, তার থেকে মুক্তি পেতে হলে বিশ্রামের প্রয়োজন। একটা কথা শুধু ঝড়ের বাতাসে মোমবাতির শিখার মতো দপদপিয়ে ওঠে মাঝে মাঝে। ‘তোমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে একটি নদী; সে-ই তোমার আপনজন, তোমার ভালোবাসার জন।’ কোনও গূঢ় সাংকেতিক রূপকার্থে যে তিনি এই ‘নদী’ শব্দটি প্রয়োগ করেননি, এটা সেদিনই তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। এমনকী একথার যেন কোনও স্বকপোলকল্পিত অর্থ আমি বের না করি, সে-ব্যাপারেও সতর্ক করে দিয়েছেন আমাকে যথাযথ। তাহলে কে বা কী এই নদী? আমি তো মানুষ, অমানুষী নিসর্গের অংশ তো নই! মানুষের সঙ্গে কি কখনও নদীর ভালোবাসাবাসি হয়?

দুপুরের রোদে মুকুরটিলার ধবলধূসর পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সচমকে মনে পড়ে, আমাদের দেশের মহাকাব্য মহাভারত তো এক অর্থে আরম্ভই হয়েছে মানুষ আর নদীর প্রণয়কাহিনি দিয়েই। সেই যে রাজা শান্তনু নদী গঙ্গাকে ভালোবেসেছিলেন। রূপক অর্থে নয় তত। নদী গঙ্গা রাজা শান্তনুর কাছে নদীমাত্র নন। তিনি তাঁর জীবনসঙ্গিনী। গঙ্গাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি শান্তনু। অপত্যস্নেহের বশীভূত হয়ে মুখ ফুটে আপত্তি করে ফেলেছিলেন, যখন আটটি সন্তানের অন্তিম সন্তানটিকেও স্রোতোবক্ষে ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ভাগীরথী। সেই অন্তিম সন্তানই মহাভারতের কালজয়ী চরিত্র ভীষ্ম। শান্তনু প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি বলে অভিমানিনী গঙ্গা চিরতরে শান্তনুর কাছ থেকে বিদায় নেন। এই যে প্রণয়, মিলন, সন্তান, প্রতিশ্রুতি, অভিমান– এসব কি একটি প্রায়-নিরবয়ব জলধারার সঙ্গে সম্ভব? অথবা গঙ্গা এখানে কেবল নদীমাত্র নয়, পরন্তু নদীনির্ভর কোনও মানব-প্রজাতিতে উদ্ভূতা জনৈকা নারীরই প্রতীকায়িত রূপ? কিংবা এ শুধু কবিকল্পনা, যা প্রত্যক্ষগোচর বাস্তবতার অংশ নয়? বাস্তবতা মানেই বা আসলে কী? যে যা দেখে, তার কাছে সেটাই বাস্তব। বাস্তবতার সর্বজনীন সংজ্ঞা নির্ণয় করা বড়ই দুর্ঘট ব্যাপার।

প্রাচ্য ও প্রতীচ্য পৃথিবীতে নদী ও মানুষের প্রণয়কথা অতি চর্চিত বিষয়। প্রত্যেক প্রফেটের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকটি নদী। সেই নদীটিকে ছাড়া ওই প্রফেটকে চিন্তা করা মুশকিল। শ্রীরঘূত্তমের সঙ্গে সরযূ, বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যমুনা, শাক্যসিংহ শ্রীবুদ্ধের সঙ্গে নৈরঞ্জনা, মেরিতনয় ইয়েশুয়ার সঙ্গে জর্ডন, আচার্য শংকরের সঙ্গে অলকানন্দা, মরুপথিক মুহাম্মদের সঙ্গে ফোরাৎ, শচীনন্দন শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে গঙ্গা, শ্রীগদাধর রামকৃষ্ণের সঙ্গে ত্রিপথগা ভাগীরথী– একেক প্রফেটের সঙ্গে একেক নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ওই ওই প্রফেটের ধ্যান করতে গিয়ে দেখেছি, ওই ওই নদীর কথাও মনে পড়ে।

শুধু প্রফেটদের কথাই নয়, যাঁরা অপারে কাব্যসংসারে প্রজাপতিস্বরূপ কবি, তাঁদেরও প্রত্যেকেরই আছে একটি করে প্রিয়া স্রোতস্বিনী। বাল্মীকীর সরযূ, ব্যাসদেবের গঙ্গা, কালিদাসের রেবা কিংবা শিপ্রা, ভর্তৃহরির নর্মদা, শেক্সপীয়রের অ্যাভন, রবীন্দ্রনাথের পদ্মা, জীবনানন্দের ধানসিড়ি, বিভূতিভূষণের ইছামতী। কেন যাবতীয় সৃজনশীলতার ভিতর অন্তঃস্রোতা হয়ে বয়ে চলেছে নদী? এ কি নিছকই সমাপতন? অথবা কোনও এক অমোঘ মহাসত্য লুকিয়ে আছে এই আপাত-সমাপতনের মধ্যে?

শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

থাক না হয় প্রফেটদের কথা। কবিদের কথা? থাক, থাক! যাই ভেসে ভেসে কোনও সাধারণ মানুষের কাছে। চিনদেশের একটি উপকথার কাছে। অবশ্য এই একই লোককথা কোরিয়াতেও প্রচলিত আছে। সে এক পরিশ্রমী যুবকের কাহিনি। পরিশ্রমী, কিন্তু বড় দরিদ্র। এবং একাকী। আত্মীয়স্বজনহীন। নাম তার শাই দুয়ান। সে থাকত গ্রামের এক প্রান্তে নির্জন একটি কুটিরে। সকালে ঘুম থেকে উঠে সে রোজ অন্য মানুষের জমি চষতে যেত। পারিশ্রমিক হিসেবে যা পেত, তা অল্পই। দিনের শেষে শাই দুয়ান ঘরে ফিরত। কাঠ কেটে, জল গরম করে, রান্না করে, তারপর স্নান সেরে খেতে বসত একা একা। খেতে খেতে ভাবত শাই দুয়ান, কেউ যদি থাকত তার একান্ত আপন, যার সঙ্গে গল্প করতে করতে দিনান্তে সে খাবার খেত।

একদিন কাজ সেরে ঘরে ফিরছে শাই দুয়ান। ফেরার পথে পড়ে একটি নদী। রোজই এই নদী পেরিয়ে সে ঘরে আসে। কিন্তু সেদিন নদীর তীরে সবেমাত্র এসে পৌঁছেছে, এমন সময় শাই দুয়ান দেখল, নদীর চরে কী যেন একটি বস্তু চকচক করছে। হাতে তুলে নিল সে বস্তুটিকে শাই দুয়ান। প্রাণহীন বস্তু নয়, জীবন্ত একটি প্রাণ। একটি সুদৃশ্য শামুক। নীল রঙের শামুক। ভারি সুন্দর।

ফেলে না দিয়ে শামুকটিকে নিয়ে ঘরে ফেরে শাই দুয়ান। একটি জলপাত্রে সে রেখে দেয় শামুকটিকে। অনেকক্ষণ জলের বাইরে থাকায় শামুকটি প্রায় মরতে বসেছিল। এখন জল পেয়ে আনন্দে পাত্রের ভিতর তরতর করে সাঁতরে বেড়ায় নীল শামুকটি।

পরের দিন ঘরে ফিরে শাই দুয়ান তো অবাক। দেখে কী, ঘরের চিমনি থেকে ধোঁয়া বেরচ্ছে! ঘরে ঢুকে দেখে, খাবার জায়গায় গরম ভাতের পাত্র ঢাকা দেওয়া। পাশে ছোট ছোট পাত্রে তরকারি। গেলাসে ভরতি জল। ঘরটি কেমন সুন্দর করে সাজানো! কে করেছে তার জন্যে এসব?

কিন্তু সেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগে খিদেয় পেট চুঁই-চুঁই শাই দুয়ান খেতে বসে। পরিতৃপ্তি সহকারে আহারের পরে মনে হয় তার, সারা জীবনে এই প্রথম সে সত্যিকারের কিছু খেয়েছে।

তবু প্রশ্নটা থেকেই যায়। দিনের পর দিন শাই দুয়ান ঘরে ফিরে দেখে একই ছবি। জলপাত্রগুলি পূর্ণ, আহার্য প্রস্তুত, ঘর সুসজ্জিত। কে এভাবে ঘরের কাজগুলো তার করে চলেছে নিষ্ঠাভরে দিনের পর দিন?

একদিন কী জানি কী হল, ক্ষেত থেকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরল শাই দুয়ান। খোলা জানালায় উঁকি দিয়ে দেখে, ভিতরবাগে কে একটি মেয়ে উনুনের দিকে মুখ ফিরিয়ে রান্না করছে। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢোকে শাই দুয়ান। মেয়েটি চমকে ওঠে। নীল পোশাক পরা ভারি সুন্দর দেখতে এক যুবতী।

শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

শাই দুয়ান জিজ্ঞেস করে, ‘কে তুমি?’

মেয়েটি উত্তর দেয়, ‘আমাকে চিনতে পারছ না? আমি সেই শামুক, যাকে তুমি নদীধার থেকে যত্ন করে তুলে এনেছিলে!’

শাই দুয়ান প্রশ্ন করে, ‘তুমি শামুক। তাহলে তুমি মেয়ে হলে কী করে?’

মেয়েটি জবাব দেয়, ‘যেভাবে শামুক হয়েছিলাম একদিন, সেভাবেই আজ মেয়ে হয়েছি!’

শাই দুয়ান শুধোয়, ‘তবে তো তুমি মেয়েও নও, শামুকও নও। আসলে তুমি কে?’

মেয়েটি বলে, ‘আমি ওই নদীটির আত্মা। আমি আসলে নদী!’

‘কিন্তু কেন তুমি আমার ঘর গুছিয়ে রাখো, কেন আমার জন্যে রেঁধে রাখছ রোজ?’

‘কেননা…’ একটু ইতস্তত করে মেয়েটি বলে এবার, ‘কেননা আমি তোমার বন্ধু। আমি তো রোদে বৃষ্টিতে ঝড়ে মরেই যেতাম, তুমি আমাকে রক্ষা না-করলে, আমাকে আশ্রয় না-দিলে মরেই তো যেতাম আমি। সেই জন্যেই আমি তোমার ঘর গুছিয়ে রাখি, রান্না করে রাখি কৃতজ্ঞতাবশত।’

“চলো, দু’জনে খেয়ে নিই আগে”, এই বলে স্নান সেরে খেতে বসে শাই দুয়ান। মেয়েটিও খেতে বসে তারই পাশে। দু’জনে গল্প করতে করতে ওরা খেয়ে নেয়। খাওয়ার শেষে হাতমুখ ধোওয়ার পরে শাই দুয়ান আদর করে মেয়েটিকে। মেয়েটির গালে গাল ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আবার শামুক হয়ে যাবে না তো তুমি?’

কালক্রমে বিয়ে হয় শাই দুয়ান ও সেই মেয়েটির। এইখান থেকেই গল্পটা কিঞ্চিৎ জটিল হয়ে ওঠে। খুবই স্বাভাবিক। বিবাহ মানেই জটিলতা। এইখান থেকে গল্পটা একেক স্থানে একেকরকম পরিণতির দিকে এগোয়। চিনারা এ গল্পের একরকম পরিণতি জানে, কোরিয়ানরা অন্যরকম পরিণতি। সেসব জটিলতায় আমি এখানে প্রবেশ করব না।

কিন্তু এই উপকথার মধ্যে যেটা বিশেষভাবে আমার নজর টেনে নেয়, সে হচ্ছে ওই নদীর আত্মার সঙ্গে মানুষের ভালোবাসাবাসির কথা। নদী ও মানুষের সুনিবিড় ভালোবাসা। কিন্তু এসবই তো উপকথা। পুরাণকথা। প্রফেটকথা। কবিকথা। আর কিছু তো নয়। তাহলে সতী-ভৈরবী আমাকে যে বললেন, নিঃসঙ্গ আমার জীবনে আসবে একটি নদী, তার মানেটা কী? ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে উঠি মুকুরটিলার পথে হাঁটতে হাঁটতে। কী যে সব ওলটপালট বলেছেন না সতী!

আরে আমি কি আর সেই চৈনিক উপকথার পরিশ্রমী যুবক শাই দুয়ান?

……………………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন আয়নার ওধারে-র অন্যান্য পর্ব

……………………………..