


নিকোলাই গুমিলভের পুত্র হওয়ার দায়ে গ্রেফতার করা হয় আখমাতোভার একমাত্র সন্তান লেভকে। প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায় আখমাতোভাকে দাঁড়াতে হত খাবারের লাইনে। যে খাবার শুধু তাঁর নিজের নয়, রাষ্ট্রদ্রোহে অভিযুক্ত সন্তানকে পাঠাবার জন্যও। এমনই এক লাইনে তাঁকে চিনতে পেরে আরেক মহিলা প্রশ্ন করেন যে, তিনি এই নরকের বর্ণনা লিখতে পারবেন কি না! আখমাতোভা জানান, পারবেন। এইভাবেই জন্ম নেয় কবিতাক্রম ‘Requiem’ বা শোকগাথা।
মেয়ে কবিতা লিখছে শুনে বাবা বলেছিলেন– যেন সে পিতৃদত্ত পদবি ব্যবহার না করে লেখার কাজে। কারণ অভিজাত বংশের লোকে লেখে না। যারা লেখে, তারা অন্য কিছু করে পরিচিতি তৈরি করতে না পেরে এই কাজ করে। যদিও মেয়েটির বংশ তেমন কিছু অভিজাত শোণিতধারা বহন করছিল না। বরং তাদের বলা যেত বর্ধিষ্ণু। তবু বিশ শতকের গোড়ার সেই ১৭ বছরের কিশোরী বাবার কথা ফেলতে পারেনি। সে খুঁজে বের করে তার মামার বাড়ির দূরতর পদবি। তার মামার বাড়ি ছিল আখমত খানের বংশধর। যিনি কি না ছিলেন চেঙ্গিস খানের বংশ। মেয়েটি নিজের নাম আনা-র সঙ্গে জুড়ে দিল আখমাতোভা। আখমতের বংশজাত। এভাবেই জন্ম হল বিশ শতকের প্রধান কবি আনা আখমাতোভার।

তাঁর জন্ম ও কাজের শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ, পরে নাম বদলে লেনিনগ্রাদ। রাশিয়া ও তাঁর জীবদ্দশায় তৈরি হওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নে এই ‘আখমাতোভা’ পদবি ছিল বেশ ‘বহিরাগত’। বিশেষ করে লোকে মনে করত তাতারদের বংশজাত। আমাদের বামুন-বদ্যি-কায়েত প্লাবিত বাংলা সাহিত্যে কেউ ‘হাঁসদা’ পদবি নিয়ে লিখতে এলে যা হতে পারে আর কী! কিন্তু তাঁর নিখুঁত ছন্দে লেখা সুস্পষ্ট কবিতাকে কেউ ফেলে দিতে পারল না। আনা আখমাতোভা শুধু পরিচিত হলেন তাই নয়, তিনি হয়ে উঠলেন পিটার্সবার্গ শহরের কবি-জগতের এক প্রধান আকর্ষণ।

তাঁর তীক্ষ্ণ ইগলের ঠোঁটের মতো নাক, ধারালো বিষাদমাখা ধূসর চোখ এবং সুতীব্র বাকভঙ্গি তাঁকে তাঁর শহরের এবং পরে প্যারিসের শিল্পীদের, এমনকী আমেদিও মোদিগ্লিয়ানির বিখ্যাত প্রতিকৃতির বিষয় করে তোলে। আমাদের চারপাশে যেমন কবিতা এখন আর কোথাও নেই। কবিরা এক সমান্তরাল দুনিয়ার বাসিন্দা, খানিকটা-বা জলের বাস্তুতন্ত্রের মতো আলাদা হয়ে বাঁচেন। যেমন জলজগতে ডুব না দিলে জানা যায় না জ্যান্ত জলজ প্রাণীদের উপস্থিতি, তেমনই কবিদের জগত। লিখতে এসে ডুব দিলে তবেই জানা যায়, হ্যাঁ, কবিরা আছেন। তেমনই ছিল বিশ শতকের ইউরোপ। তবে সেখানে কবিতার বই দোকানে পাওয়া যেত এবং কেউ কেউ কিনে পড়তেন। সেই কবিতার নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রে প্যারিসের অবস্থান তো সকলেরই জানা।

আনা আখমাতোভা সেই শহরেই আসেন, সদ্য-বিবাহিতা। মধুচন্দ্রিমায়। সেই শহরেই আলাপ বন্ধুত্ব হয় আমেদেও মোদিগ্লিয়ানির সঙ্গে। আনা, মোদিগ্লিয়ানির এতটাই ভক্ত ছিলেন যে নিজে খুঁজে পৌঁছে যান তাঁর স্টুডিওতে। মোদিগ্লিয়ানি ছিলেন না। আখমাতোভা এক তোড়া গোলাপ নিয়ে গিয়েছিলেন। সে ফুল ছিঁড়ে ছড়িয়ে দিয়ে আসেন স্টুডিওতে। যদিও তিনি কোনওদিন জানাননি কী করে ঢুকেছিলেন সেই বন্ধ স্টুডিওতে। পরে সেই ইতালীয় বাউন্ডুলে শিল্পীর সঙ্গে পরিচয় হলে আখমাতোভা জানিয়েছিলেন, কী মায়াময় ছিল সেই গোলাপের পাপড়িগুলোর পতন। নিজের জীবনে তিনটি বড় সামাজিক পরিবর্তন দেখেছেন কবি আখমাতোভা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। রুশ বিপ্লব এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। দ্বিতীয় ঘটনাটি তাঁকে বদলে দেয় চিরতরে।

আনা আখমাতোভার প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থ রচিত হয়েছিল রুশ সাহিত্যের ঐতিহ্যবাহী আবহে। নিটোল ছন্দে বাঁধা। চমকপ্রদ অন্ত্যমিল, যার সঙ্গে জুড়েছিল তাঁর নিজস্ব প্রায়-কথ্য ভাষায় লেখা অন্বয়। এইসব বৈশিষ্ট্য তাঁকে পরিচিতি দিচ্ছিল প্রতিভাময়ী কবি হিসেবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তাঁকে নাড়িয়ে দিয়ে গেলেও, রুশ বিপ্লবের মতো প্রভাব তাঁর কবিজীবন ও জীবনীর উপর আর কোনও ঘটনা ফেলেনি। তাঁর মন্ত্রশিষ্য কবি ইওসিপ ব্রদস্কির লেখা থেকে জানা যায়– রুশ বিপ্লবের সময় ২৮ বছর বয়সী আখমাতোভার পক্ষে বিপ্লবকে অন্ধ সমর্থন করার মতো তারুণ্য বা বিপ্লবের ন্যায্যতা বোঝাবার মতো প্রৌঢ়তা ছিল না। আর তার ফল ভোগ করেছেন হাতেনাতে। তাঁর প্রথম স্বামী রুশ কবি নিকোলাই গুমিলভকে অন্য আরও ৬১ জনের সঙ্গে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয় কমিউনিস্ট-বিরোধী হওয়ার কারণে। গুমিলভের প্রাণের বন্ধু কবি ও ঔপন্যাসিক ভ্লাদিমির নবোকভ প্রাণে বাঁচেন আমেরিকা পালিয়ে।

আনা আখমাতোভার প্রথম যৌবনের আকমেইস্ট কবিদের ঠেক ‘নেড়ি কুকুরের ক্যাফে’ ও তার ফ্রেস্কো ছিল কবির জীবনের এক আন্তরিক উপস্থিতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে একদিন বোমাতঙ্কে আশ্রয় শিবিরে কিছুক্ষণ থাকার পরে আখমাতোভা বুঝতে পারেন, সেই আশ্রয় শিবির আসলে সেই নেড়ি কুকুরের ক্যাফে। পরিচর্যার অভাবে ম্লান হয়ে গেলেও তার দুঃখী ফ্রেস্কো তাঁর মনে চিরস্থায়ী দাগ রেখে যায়।
স্তালিনের সন্ত্রাসের দিনে (আজও আমাদের দেশে কমিউনিস্ট পার্টিরা সেই সন্ত্রাসকে মার্কিন অপপ্রচার বলে চালায়, স্তালিনের ছবিতে মালা দেয়।) ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে সোভিয়েত দেশে তাঁদের সরকারি হিসাব অনুসারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ৬ লক্ষ ৮১ হাজার ৬৯২ জন মানুষের। ১ লক্ষ ১৬ হাজার লোক মারা যান গুলাগে। লেঅন ত্রোতস্কির মতো অজস্র মানুষকে খুন করা হয় দেশের বাইরে। এইসব ঘটনা নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক বই। (মরমী পাঠকের মনে থাকবে– প্রথম জীবনে কমিউনিস্ট কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় অনুবাদ করেছিলেন আলেকসান্দের সলইয়েনিৎসিন-এর ‘ইভান দেনিসোভিচের জীবনের একদিন’ নামক দুনিয়া-কাঁপানো উপন্যাস।)

আখমাতোভার জীবনে এই সন্ত্রাস ফিরে আসে বারবার। তাঁর লেখা ছাপানো নিষিদ্ধ হয়। ১৯২৫ সালের পর তিনি দিন চালিয়েছেন বহু কষ্টে কিছু অনুবাদের কাজ করে। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে সন্ত্রস্ত লেখকমহল তাঁকে মৃত বলে ধরে নেয়। আখমাতোভার প্রায় সমানেই ঘটে যায় আরেক প্রধানতম রুশ আধুনিক কবি ও আখমাতোভার নিকটতম বন্ধু ওসিপ মান্দেলস্তামের গ্রেপ্তার ও পরবর্তীকালে ঘটে তাঁর গুমনামী মৃত্যু। গুলাগের নরকে। মান্দেলস্তামের স্ত্রী নাদিয়েজদা ছিলেন আনা আখমাতোভার একমাত্র বন্ধু। দু’জনে দু’জনের গভীর বিষাদে পাশে ছিলেন, ১৯৩৮ সালে নাদিয়েজদার মৃত্যু পর্যন্ত। সেই একই সময়ে কেবল নিকোলাই গুমিলভের পুত্র হওয়ার দায়ে গ্রেফতার করা হয় আখমাতোভার একমাত্র সন্তান লেভকে। প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায় আখমাতোভাকে দাঁড়াতে হত খাবারের লাইনে। যে খাবার শুধু তাঁর নিজের নয়, রাষ্ট্রদ্রোহে অভিযুক্ত সন্তানকে পাঠাবার জন্যও। এমনই এক লাইনে তাঁকে চিনতে পেরে আরেক মহিলা প্রশ্ন করেন যে, তিনি এই নরকের বর্ণনা লিখতে পারবেন কি না! আখমাতোভা জানান, পারবেন। এইভাবেই জন্ম নেয় কবিতাক্রম ‘Requiem’ বা শোকগাথা। জীবনের তিন দশক ধরে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন এই বই। স্বাভাবিক কারণেই তাঁর স্বদেশে এই কবিতা প্রকাশ পেতে দেওয়া হয় না। এই বই গোপনে জার্মানিতে প্রথম আলোর মুখ দেখে ১৯৬৩ সালে। ১৯৮৭ সালে আখমাতোভার শতবর্ষে এই কবিতা প্রথমবার প্রকাশিত হয় কবির স্বদেশে। একই সময়কালে, ১৯৪০ থেকে ১৯৬৫ সাল অবধি তিনি রচনা করেন আরও এক সুদীর্ঘ কবিতা ‘নায়কবিহীন কবিতা’। এই দু’টি কবিতার বইকে কবির জীবনের শ্রেষ্ঠতম কীর্তি তথা রুশ ভাষার কবিতার এক সুউচ্চ মিনার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

১৯৬৫ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় আনা আখমাতোভাকে সাম্মানিক ডি লিট দেয়। সেই উপলক্ষে তাঁকে প্রায় চার দশক বাদে দেশ ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। দেশে ততদিনে প্রায় বিস্মৃত অবহেলিত কবি বিদেশের মাটিতে তাঁর পরিচিতি দেখে অপরিসীম বিস্মিত হন। ‘আখমাতোভার অনাথ সন্তানেরা’ নামে এক রুশ কবিদের দল তৈরি হয়েছিল, যার এক প্রধান অংশ ছিলেন নোবেলজয়ী রুশ কবি ইওসিপ ব্রদস্কি। ১৯৬৫ সালের নভেম্বর মাসে অক্সফোর্ড থেকে ফেরার সামান্য পরেই আখমাতোভার হার্ট-অ্যাটাক হয়, যার ফলে ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসে ৭৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

আনা আখমাতোভা সারা পৃথিবীর সমস্ত রকমের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা-বলা কবিতার এক অমর দিকনির্দেশ হিসেবে প্রতিদিন যেন বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন। তাঁকে নিয়ে ক্রমাগত বেড়ে চলা গবেষণা, তাঁর কঠিন কবিতায় সুরারোপ, তাঁকে নিয়ে নির্মিত নাটক, এই সবকিছুই তাঁকে আমাদের বিক্ষত পূর্বজ শতকের প্রতীকে পরিণত করেছে। হয়ত ২১ শতকের সিকিভাগ কাটার আগেই দুনিয়া জুড়ে শুরু হয়ে যাওয়া স্বৈরতান্ত্রিক দাপাদাপি ও যুদ্ধ আমাদের আরও বেশি করে তাঁর কবিতার কাছে নিয়ে যাচ্ছে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved