Robbar

রাজার মুকুট, রাজার সাজ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 19, 2026 7:10 pm
  • Updated:July 19, 2026 7:59 pm  

‘রাজার মুকুট’-এ প্রতিটি বিশ্বকাপ আসলে এক একটি স্টেশন, যেখানে ভিড় করে আছেন জয়ী-পরাজিত তারকারা। রেনাস মিশেলের ‘টোটাল ফুটবল’ কাপ না পেলেও মন জিতেছিল, যেমন জিতেছিল ২০০২-এর হিডিঙ্কের কোরিয়া, ২০১০-এ ফোরলানের উরুগুয়ে। সেই স্টেশনের ভিড়ে হয়তো জায়গা হয়নি আজকের মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো কিংবা ’৯৮-এর সাড়া ফেলে দেওয়া দাভর সুকেরের। তাতে কী! ‘রাজার মুকুট’-এর ঔজ্জ্বল্য ফিকে হয়নি একফোঁটাও।

সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়

বিসর্জনের বাদ্যি বাজলে আমাদের মনের কোণে বিষাদের মেঘ জমে। আমাদের চেনা সুখের অভ্যাসে তখন আচমকা হ্যাঁচকা টান লাগে। চেনা, চনমনে চারপাশকে বড্ড শূন্য মনে হয়। ২০২৬-এর বিশ্বকাপ ফুটবল পায়ে পায়ে শেষ লগ্নে। ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এর গায়ে বিজয়া দশমীর আঘ্রাণ। কিন্তু শেষ বললেই কি সমাপ্তিচিহ্ন এঁকে দেওয়া যায়? আশা-আশঙ্কা, স্বপ্ন-হতাশার কুয়াশা ঠেলে জেগে থাকে এক ভবিতব্যের পথ। জেগে থাকে এক অপেক্ষার ঘোর, বছর চারেকের জন্য। শিশিরবিন্দুর মতো জমে জমে সেই অপেক্ষা প্রত্যাশার রূপ নেয়। ফুটবলের মায়াকাজল চোখে নিয়ে আমরা ভুলে যাই রাতজাগার ক্লান্তি।

এ অনুভব কমবেশি প্রতিটি ফুটবলপ্রেমীর, যারা এই খেলাকে ঘিরে বাঁচেন, স্বপ্ন দেখেন, কিংবা পাড়ার মোড়ে তর্ক জুড়ে থাকেন। অথবা প্রিয় দলের হারে স্বজন-হারানোর শোক অনুভব করেন। তবে ফুটবল নেহাত‌ই আবেগের ধারাস্নান নয়, বরং তা অধ্যবসায়, সংগ্রাম আর অসম্ভবকে সম্ভব করার সোনালি ফসল। খেলার সীমান্ত পেরিয়ে ফুটবল সেই গ্যালারির যোগ্য প্রতিনিধি হয়ে ওঠে, যেখানে মানুষের অস্তিত্ব, সংগ্রাম, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান মর্যাদা লাভ করে। বিশ্বকাপের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই জানা-অজানা গল্পকে দুই মলাটে ধরতে চেয়েছেন লেখক সৌরাংশু, তাঁর ‘রাজার মুকুট’ ব‌ইটিতে।

ফুটবলের সঙ্গে বাঙালির নাড়ির যোগ। সেই যোগকে আর‌ও নিবিড় করেছে বিশ্বকাপের উপস্থিতি। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল-মহমেডানে মজে থাকা বঙ্গসন্তান চার বছরে এই একবার, এই মাসদেড়েকের জন্য হয়ে ওঠেন বিশ্বনাগরিক। কেউ গলা ফাটান ব্রাজিলের জন্য, কেউ আর্জেন্টিনা, কেউ আবার জার্মানি, স্পেন। আর সেই সূত্র ধরেই আপন হয়ে ওঠেন রোনাল্ডো, মেসি, মডরিচ, এমবাপে, লামিল ইয়ামালের মতো তারকা। যেমনভাবে এককালে বাঙালির ঘরের সন্তান হয়ে উঠেছিলেন পেলে থেকে মারাদোনা। ক্রুয়েফ থেকে জিদান। রোনাল্ডো নাজারিও থেকে আন্দ্রে ইনিয়েস্তারা। সার্বিক আবেদনে বিশ্বকাপের মঞ্চ তখন হয়ে ওঠে বিশ্বের ছাদ, যেখানে কখন‌ও বিশ্বকাপে খেলার স্বাদ না-পাওয়া ভারতবাসী মাথা গোঁজার ঠাঁই পায়।

বিশ্বকাপ হাতে মারাদোনা

ট্যাকটিক্যাল ব্রিলিয়ান্স থেকে প্রতিভার বিচ্ছুরণ, শিল্পের ছোঁয়া থেকে অঘটনের চমক– বিশ্বকাপ মানেই এমন টুকরো ছবির মুহূর্ত লাভ। তবে বিশ্বকাপের আসর শুধু ট্যাকটিক্স বা তত্ত্বের পরীক্ষাগার নয়, বরং সেসব ছাপিয়ে বিশ্বকাপ লড়াইয়ের গল্প বলে। সেই গল্প মাঠ এবং মাঠের বাইরের। ১৯৩০ থেকে ২০২২– দীর্ঘ এই সময়পর্বে ফুটবল বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্ট থেকে বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’! সেই সুদীর্ঘ সময়ের ৩৩টি খেলার বিশ্লেষণ ও গল্প নিয়ে ২৫টি প্রবন্ধে সাজানো ‘রাজার মুকুট’ এক অবিচ্ছিন্ন যাত্রা, যেখানে গল্পের সঙ্গে পরবর্তী গল্পের যোগসূত্র গড়েছেন লেখক।

অধরা কাপ-স্বপ্ন পূরণ

২০২২-এর কাতারে অধরা কাপ-স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন লিওনেল মেসি। সেই স্বপ্নপূরণের সাক্ষী ছিল গোটা বিশ্ব। নীল-সাদা আবেগের সুনামিতে ভেসেছিল আলবিসিলেস্তের সমর্থকরা। জনজোয়ারে ভেসে গিয়েছিল বুয়েনস আয়ারেস, আর্জেন্টিনার রাজধানী, লাতিন আমেরিকার ফুটবলের ধাত্রীভূমি। বিশ্বকাপের সলতে পাকানোর কাজটাও শুরু হয়েছিল সেখানে। তবে আর্জেন্টিনা নয়, বিশ্বকাপের প্রথম সংস্করণে বাজিমাত করেছিল হোসে নাসাজ্জির উরুগুয়ে। মন্টেভিডিও-র উত্তাল ৯০,০০০ দর্শকের সামনে দেশনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন স্যান্টোস ইরিয়ার্তে, হেক্টর কাস্ত্রোরা। চার বছর পর, ১৯৩৪-এর বিশ্বকাপ যত না ইতালির মুসোলিনির অঙ্গুলি হেলনে ‘কলঙ্কিত’ বিজয়, তার চেয়েও বেশি করে অস্ট্রিয়ার ‘উন্ডারটিম’-এর। বিনি সুতোয় মালা গাঁথার মতো করে যাকে তৈরি করেছিলেন হুগো মাইলস। ১৯৩৪ বিশ্বকাপ ম্যাথিয়াস সিন্ডেলার, যাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যু যবনিকা টেনে দিয়েছিল ভিয়েনার স্বপ্নে, অস্ট্রিয়ার ‘উন্ডারটিম’ টিমের সোনালি অধ্যায়ে।

অস্ট্রিয়ার ‘উন্ডারটিম’

বাঙালির বিশ্বকাপ-যাপনে আবেগ বরাবর ফার্স্ট টিম প্লেয়ার। তথ্য, বিশ্লেষণ রিজার্ভ বেঞ্চের সারথি। আর তাই পেলের ফুটবল সম্রাট হয়ে ওঠার আড়ালে চলে যায় গ্যারিঞ্চার ’৬২-এর বিশ্বকাপে অতিমানবীয় পারফরম্যান্স। পুসকাস-হিদেকুটিদের ছাপিয়ে মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নেন ফ্রিৎজ ওয়াল্টার, যিনি কি না রাশিয়ার কুখ্যাত গুলাঘ, স্তালিনের বিশেষ জেলখানায় কাটাতেন বন্দিজীবন। ২০১৪-র মারাকানায় ব্রাজিলের ১-৭ গোলে জার্মানির হাতে বিধ্বস্ত হ‌ওয়া মনে করিয়ে দেয় ’৫০-এর ‘মারাকানাজ্জো’! প্রতিটি বিশ্বকাপ নির্দিষ্ট ম্যাচের পরিপ্রেক্ষিতে এভাবেই হয়ে উঠেছে লেখকের ডেস্টিনেশন, যা ফুটবলের গল্পকে তুলে ধরে।

উরুগুয়ের জয়ের পর ‘মারাকানাজ্জো’ পোস্টার

আমরা সেই সূত্রে খুঁজে পাই মারাদোনা নামক এক দামাল ছেলের ঈশ্বরত্বে উত্তরণ, যে উত্থান বঞ্চনার ক্লেশ মুছিয়ে প্রাপ্তির গল্প বলে। ‘রাজার মুকুট’-এ প্রতিটি বিশ্বকাপ আসলে এক একটি স্টেশন, যেখানে ভিড় করে আছেন জয়ী-পরাজিত তারকারা। রেনাস মিশেলের ‘টোটাল ফুটবল’ কাপ না পেলেও মন জিতেছিল, যেমন জিতেছিল ২০০২-এর হিডিঙ্কের কোরিয়া, ২০১০-এ ফোরলানের উরুগুয়ে। সেই স্টেশনের ভিড়ে হয়তো জায়গা হয়নি আজকের মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো কিংবা ’৯৮-এর সাড়া ফেলে দেওয়া দাভর সুকেরের। তাতে কী! ‘রাজার মুকুট’-এর ঔজ্জ্বল্য ফিকে হয়নি একফোঁটাও। প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে নিখুঁত অলংকরণে প্রাঞ্জল হয়েছে গ্রন্থ পাঠ। যার জন্য বিশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য আলংকারিক দিবাকর চন্দ ও প্রকাশক ‘সৃষ্টিসুখ’-এর।

’৯৮-এর সাড়া ফেলে দেওয়া দাভর সুকের

লেখক সৌরাংশু এই গ্রন্থে দ্রষ্টার ভূমিকায়। পাঠকের সামনে বিশ্বকাপের গল্পকে তিনি তুলে এনেছেন মার্জিত আবেগে, তথ্যনিষ্ঠভাবে, ইতিহাসের বিশ্বস্ততায়। ১৯৩০-এর বিশ্বকাপ দিয়ে এই ব‌ইয়ের পথচলা শুরু, ২০২২-এ মেসির হাতে কাপ ওঠার মধ্যে দিয়ে শেষ। কিন্তু বিশ্বকাপ তো আবহমান। তার শুরু আছে, শেষ নেই। ফলত, ‘রাজার মুকুট’ গল্পের লেখক কেবলমাত্র সৌরাংশু নন, পাঠক‌ও। চাইলে ২০২২-এর সমাপ্তির পর পাঠকের মন অদৃশ্য পৃষ্ঠায় লিখে ফেলতেই পারে ২০২৬-এর বিশেষ মুহূর্ত। মাঠের লড়াই ছাপিয়ে সেখানে জায়গা করে নিতেই পারে শত্রু দেশে ইরানের প্লেয়ারদের বল পায়ে মন জয়, কিংবা কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য ফুটবল, জায়গা করে নিতেই পারে সন্তানহারা গ্যাকপোর চোয়ালশক্ত লড়াই, বাবাকে হারিয়েও ফুটবলকে আঁকড়ে কঙ্গোতে স্বপ্ন দেখানো প্রশিক্ষক সেবাস্তিয়ান ডিসাব্রের নাছোড় মনোভাব। কিংবা ‘শেষের কবিতা’য় রাঙিয়ে দিতে চাওয়া নেইমার, রোনাল্ডো, মডরিচদের জয়ের আকুতি।

‘শেষের কবিতা’য় রাঙিয়ে দিতে চাওয়া নেইমার

উৎসবের আলো নিভে এলে মনখারাপের অভ্যাস আমাদের গ্রাস করে। অপেক্ষার চার বছর তখন অনন্ত মনে হয়। ‘রাজার মুকুট’-এ ছড়িয়ে থাকা বিশ্বকাপের গল্প সেই প্রতীক্ষাকালে যোগ্য সফরসঙ্গী। তার সান্নিধ্যে বিসর্জনের একলা আকাশ যদি মিষ্টিমুখর হয়, তবে ক্ষতি কী!

রাজার মুকুট
সৌরাংশু
সৃষ্টিসুখ প্রকাশন
৩৯৯ টাকা