


বিশ্ব-দেবভাবনায় ত্রিত্ব সাধারণ বৈশিষ্ট্য। প্রাচীন ব্যাবিলনের প্রধান তিন দেবতা স্বর্গ-মর্ত-পাতালের অধিশ্বর যথাক্রমে– আনু, বেল এবং ইয়া। প্রাচীন মিশরের তিন দেবতা প্রধান: ওসাইরিস, আইসিস ও হোরাস। বৈদিক ঋষিগণ দেবতামণ্ডলীকে তিনভাগে বিভক্ত করেছিলেন। দ্যুস্থানের, অন্তরীক্ষস্থানের এবং পৃথিবীস্থানের। মোট দেবতার সংখ্যা ‘ডবল তিন’ অর্থাৎ, ৩৩ জন। আবার একের মধ্যেও তিনের অবস্থান লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য, যেমন মিশরীয় সূর্যদেবতার তিন রূপ। উদয়কালীন রূপের নাম ‘খেপরি’, মধ্যসূর্যের নাম ‘বে’ এবং অস্তগামী অরুণ– ‘অতম’। ঠিক যেন সূর্যরূপী বৈদিক-বিষ্ণুর তিন পদক্ষেপ– ত্রিবিক্রম, উরুক্রম ও উরুগায়।
‘তিন’ সংখ্যাটি বিশ্বের ধর্ম-সভ্যতা-সংস্কৃতির ত্রিবেণী সঙ্গমে যেন পূর্ণতার সোনার তরী। তিন মানেই অঙ্কের ম্যাজিক। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট এবং প্রথম ম্যাজিক-স্কয়ারের মাত্রা বা সাইজ– তিন। ম্যাজিক স্কয়ার হল এমন একটি ছক, যার প্রতিটি ঘরকে এমনভাবে সংখ্যা দিয়ে পূরণ করা হয়, যাতে যে কোনও দিক থেকে যোগ করা হোক না কেন, যোগফল সবসময় একই থাকে। ফলে রহস্যময়, পবিত্র জাদুসংখ্যা হিসেবে তিনের উত্তরণ ঘটে দ্রুত। দৃশ্যমান জগৎকে আকার দিতে হলে সর্বনিম্ন তিনটি বিন্দু বা রেখার প্রয়োজন। দার্শনিক প্লেটো তিন সংখ্যাটিকে ত্রিভুজের প্রতীক হিসাবে দেখতেন। বিশ্বাস করতেন, পৃথিবী ত্রিভুজ দ্বারা গঠিত। পিথাগোরাস মনে করতেন, তিন সংখ্যাটি নিখুঁত; কেননা এর মধ্যেই আছে আদি-মধ্য-অন্ত্যের পূর্ণতা।
অঙ্কের জাদুসংখ্যাটি বিশ্বের ধর্ম সংস্কৃতিতেও এনেছে পূর্ণতার ধারণাটি। যেমন খ্রিস্টান ধর্মে তিন পবিত্র হলেন– ঈশ্বর-পিতা, ঈশ্বর-পুত্র এবং ঈশ্বর পবিত্র আত্মা। প্রাচীন পারস্য জরথুস্ট্রবাদের মূল কথা, সৎচিন্তা-সৎবাক্য-সৎকর্ম। বৌদ্ধধর্মে ত্রিরত্ন– বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘ। জৈনধর্মেও মোক্ষলাভের তিন শর্ত: সম্যক দর্শন, সম্যক জ্ঞান এবং সম্যক চারিত্র। লোকধর্মে তিনের জয়জয়কার। সেখানে ‘তে-মাথা’র মোড় থেকে বাউলের ‘ত্রিবেণী’ পেরিয়ে ‘তেপান্তরে’র মাঠে যতসব আপাত আজগুবি কাণ্ড!

বিশ্ব-দেবভাবনায় ত্রিত্ব সাধারণ বৈশিষ্ট্য। প্রাচীন ব্যাবিলনের প্রধান তিন দেবতা স্বর্গ-মর্ত-পাতালের অধিশ্বর যথাক্রমে– আনু, বেল এবং ইয়া। প্রাচীন মিশরের তিন দেবতা প্রধান: ওসাইরিস, আইসিস ও হোরাস। বৈদিক ঋষিগণ দেবতামণ্ডলীকে তিনভাগে বিভক্ত করেছিলেন। দ্যুস্থানের, অন্তরীক্ষস্থানের এবং পৃথিবীস্থানের। মোট দেবতার সংখ্যা ‘ডবল তিন’ অর্থাৎ, ৩৩ জন। আবার একের মধ্যেও তিনের অবস্থান লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য, যেমন মিশরীয় সূর্যদেবতার তিন রূপ। উদয়কালীন রূপের নাম ‘খেপরি’, মধ্যসূর্যের নাম ‘বে’ এবং অস্তগামী অরুণ– ‘অতম’। ঠিক যেন সূর্যরূপী বৈদিক-বিষ্ণুর তিন পদক্ষেপ– ত্রিবিক্রম, উরুক্রম ও উরুগায়।
সনাতন বা বৈদিক দর্শনে তিন সংখ্যাটি মহাজাগতিক ভারসাম্য বা সৃষ্টি-পালন-ধ্বংস চক্রের প্রতীক। এর সঙ্গে জড়িত আছে ত্রিলোক-ত্রিকাল-ত্রিগুণ ইত্যাদি ধারণা। আর এই সূত্রে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের ইউনিটি ‘ত্রিদেব’ নামে খ্যাত হয়েছে। হিন্দুপুরাণ দর্শন অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সৃষ্টি স্থিতি ও লয়ের অধিকর্তা যথাক্রমে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর।
সনাতন ভাবনা অনুসারে, সৃষ্টির পূর্বে চারদিক ঘন অন্ধকার ব্যাপ্ত ছিল। না-ছিল গ্রহতারকাদি, না-ছিল স্থান-কাল-পাত্রের কোনও ব্যক্ত রূপ। সমগ্র মহাবিশ্ব অখণ্ড অন্ধকার, গতিহীন সুপ্ত শক্তির সমুদ্র মাত্র। শাস্ত্রে একেই বলা হয়েছে– ‘কারণ-বারি’। সেই অপার অনন্ত কারণবারিতে শায়িত মহাবিষ্ণু বা নারায়ণ।

‘কারণ-বারি’ কোনও বিপিনবাবুর ‘কারণসুধা’ নয়। যদিও তার প্রতীক হিসেবে সাধারণ আসব কালী বা তারাপুজোয় কিংবা তন্ত্রসাধনায় ব্যবহৃত হয়। কারণ-বারি প্রাক্-সৃষ্টি পর্বে অদৃশ্য শক্তির তরঙ্গায়িত রূপক মাত্র। আধুনিক বিজ্ঞানও বলছে– মহাজাগতিক ‘বিগ ব্যাং’-এর পূর্বে মহাবিশ্ব সম্পূর্ণ শূন্য বা ‘নাথিংনেস’ ছিল না। বিজ্ঞানের পরিভাষায়, ‘কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম’ আপাত শূন্যস্থান বলে মনে হলেও অসীম অদৃশ্য ফুটন্ত মহাজাগতিক শক্তিতে ভরপুর। অপার শক্তিতে ফুটতে থাকা অদৃশ্য তরঙ্গের মতো। এই আপাত অদৃশ্য মহাজাগতিক শক্তি তরলতার প্রতীক।
তরলের একটি বিশেষ গুণ হল, যে কোনও আকার প্রাপ্তির সম্ভাবনা। সৃষ্টির আদি অবস্থা ছিল তেমনই। পরবর্তীতে অর্থাৎ, সৃষ্টি পর্যায়ে কঠিন গ্রহ নক্ষত্র বা গ্যাসের জন্ম হয়েছে। কারণ-বারিতে অনন্তনাগের শয্যায় শায়িত থাকেন অবিনশ্বর সত্তা বা পরম-ব্রহ্ম। অনন্তনাগ হলেন চক্রাকার সময়ের প্রতীক। মহাপ্রলয়ে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড কারণবারিতে মিশে গেলেও অনন্তনাগ অক্ষত থাকেন। তিনি হলেন সেই শেষ বা অবশিষ্টাংশ, যাঁকে অবলম্বন করে নতুন সৃষ্টির বীজ ধারণ করে পরম-ব্রহ্ম বা মহাবিষ্ণু যোগনিদ্রায় শায়িত হন। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম– ‘ব্যাকগ্রাউন্ড এনার্জি’।
ঋক্-বেদের দশম মণ্ডলের ১২১ নম্বর সূক্তের বর্ণনা অনুযায়ী, সৃষ্টি-কল্পে পরম-ব্রহ্মের ইচ্ছা অনুযায়ী একটি স্বর্ণডিম্ব বা হিরণ্যগর্ভ সৃষ্টি হয়েছিল। হিরণ্যগর্ভ থেকে প্রথম যে দেবতার জন্ম হল তাঁর নাম– ‘ব্রহ্মা’। ব্রহ্মা তাঁর নিজের মন ও শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করলেন গ্রহ-নক্ষত্র-দেবতা-মানুষ-গাছপালা ইত্যাদি। ব্রহ্মার এই সামগ্রিক সৃষ্টিকে পুরাণে বলে ‘ব্রহ্মাণ্ড’।

সেই ব্রহ্মাণ্ডের সময়কাল ব্রহ্মার ‘একদিন’ মাত্র। দিনে তার সূচনা-বিকাশ, বিষ্ণু সেই সময়পর্বে ব্রহ্মাণ্ডের পালনকর্তা। রাত্রে ধ্বংসের আংশিক আয়োজন। সেই ধ্বংস নিয়ে আসেন স্বয়ং মহাদেব। বিষয়টি সম্যক-রূপে বুঝতে হলে দৈবী বৎসর গণনায় আসতে হবে।
পুরাণ মতে, চতুর্যুগ– সত্য বা কৃত, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি। পুরাণকারদের মতে, উল্লিখিত চারটি যুগ চক্রক্রমিক ভাবে পুনরাবৃত্ত হয়। এইভাবে চারটি যুগচক্র সহস্রবার সম্পন্ন হলে এক ‘কল্প’ হয়। পৌরাণিক যুগ বিভাগে দৈববছর হল একক। ৩৬০ সৌরবছর সমান এক দৈববছর। সেইসময়ে বিষ্ণু অবতার রূপে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করেন। এখানে শিবের কোনও ভূমিকা নেই। যখন দিন শেষে ব্রহ্মার রাত নামে, তখন পৃথিবীর আংশিক প্রলয় ঘটে।
এইভাবে ব্রহ্মার শত বছরের আয়ুষ্কালে সৃষ্টি-প্রলয়ের আংশিক খেলা চলতে থাকে। ব্রহ্মার আয়ুষ্কাল ১০০ বছর পূর্ণ হলে কেবল পৃথিবী নয়, সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের লয় ঘটে। সেই লয় ঘটান মহাকাল ভৈরব-রূপী মহাদেব। তিনি রুদ্র তাণ্ডব নৃত্য শুরু করেন। শাস্ত্রীয় তাণ্ডব নৃত্যের পাশাপাশি শিবের গাজনে অনুষ্ঠিত শকুন-নাচ লোকনৃত্যে ব্রহ্মাণ্ড প্রলয়ের রূপকল্পটি দৃশ্যায়িত হয়েছে।

মহাপ্রলয়ে সব কিছু ধ্বংস হলে আবার সেই আদিশূন্যে বা পরম ব্রহ্মে লীন হয়ে যায় সব কিছু। শিবের ধ্বংসলীলার পর কিছুকাল স্তব্ধ থাকে। তারপর আবার পরম ব্রহ্মের ইচ্ছা হলে নতুন হিরণ্যগর্ভ তৈরি হয়। নতুন এক ব্রহ্মা জন্মান । শুরু হয় আবার নতুন সৃষ্টি।
‘পরম-ব্রহ্ম’ ও ব্রহ্মা সম্পূর্ণ দু’টি আলাদা দেবচরিত্র। পরমব্রহ্ম হলেন সৃষ্টির আদি উৎস ও পরম সত্য। আর ব্রহ্মা হলেন উৎপন্ন সৃষ্টির প্রথম দেবতা। ব্রহ্মার জন্ম হয় কিন্তু পরমব্রহ্মের আদি এবং অবসান নেই। কবি বিদ্যাপতি লিখেছেন, ‘কত চতুরানন মরি মরি যাওত ন তুয়া আদি অবসানা’।
বিষ্ণু, মহেশ্বরের সঙ্গে এখানেই ব্রহ্মার মূল পার্থক্য। বিষ্ণুপুরাণ, মৎস্যপুরাণ অনুসারে, ব্রহ্মা হলেন নির্দিষ্ট মহাবিশ্বের জন্য কার্যনির্বাহী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত দেবতা। ব্রহ্মা মরণশীল। কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিশ্বাস অনুসারে, বিষ্ণু বা মহাদেব নামহীন পরমব্রহ্ম বা আদ্যশক্তি। সৃষ্টির ভারসাম্য বা ধ্বংসের প্রয়োজন হলে তাঁরা লীলা বা প্রকাশ করেন। মহাপ্রলয়ের সময় আবার তাঁরা পরমব্রহ্মে লীন হয়ে যান। বিষয়টি নিয়ে কবি নজরুল ইসলাম লিখেছেন– ‘প্রলয়-সৃষ্টি তব পুতুল-খেলা।’
সৃষ্টিতত্ত্ব ও তিন দেবতার ভূমিকার প্রসঙ্গে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান বা কসমোলজির ঘনিষ্ঠ মিল দেখা যায়। আধুনিক বিজ্ঞান বলে মহাবিশ্ব সবসময় এমনটি ছিল না। প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর (১,৩৮০ কোটি বছর) আগে একটি ক্ষুদ্র উত্তপ্ত বিন্দু থেকে মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছিল। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একেই বলে ‘বিগ ব্যাং থিয়োরি’।

‘বিগ ব্যাং থিয়োরি’ বর্তমানে স্বীকৃত এক ‘কসমোলজিক্যাল মডেল’। আলেকজান্ডার ফ্রিডম্যান, জর্জেস লেমাত্রা, এডউইন হাবল প্রমুখ বৈজ্ঞানিকের মতে, মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। আর্নো পিনজিয়াস এবং রবার্ট উইলসন দুই মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী আকাশ থেকে ভেসে আসা অবিরাম এক মৃদুধ্বনি আবিষ্কার করেন। এর নাম দিয়েছিলেন ‘কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন’। এটি বিগ ব্যাং-এর ফলে মহাশূন্যে থেকে যাওয়া মহাজাগতিক বিকিরণের অবশিষ্টাংশ।
ঋক্-বেদেও একইভাবে সৃষ্টির আদি অবস্থাকে ‘হিরণ্যগর্ভ’ বলা হয়েছে। এটিও ছিল পরম আলো শক্তির ঘনীভূত রূপ। হিরণ্যগর্ভের যখন স্ফূরণ হয়, তখন যে মহাজাগতিক কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল তাকে বলে ‘ওঁকার ধ্বনি’।
বিগব্যাং-এর পাশাপাশি ‘বিগ ক্রাঞ্চ থিয়োরি’ বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিসের দৃষ্টান্ত। এর অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন আলেকজান্ডার ফ্রিডম্যান-সহ হেনরি টাই, মুস্তাফা ইশাক বুশাকি প্রমুখ বৈজ্ঞানিক। বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমে মহাবিশ্ব যেভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, ঠিক তার বিপরীত প্রক্রিয়ায় মহাকর্ষ বলের টানে সমস্ত স্থান ও পদার্থ আবার একটি বিন্দুতে সংকুচিত হয়ে আসবে। এর নাম ‘বিগ ক্রাঞ্চ’। এরপর আবার নতুন করে ‘বিগ ব্যাং’ শুরু হবে। ঠিক যেন মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। সনাতন দর্শনে সৃষ্টি-ধ্বংস সরল রৈখিক নয়। এটিও আসলে বৃত্তকার বা চক্রাকার। সুতরাং, শিবের তাণ্ডব-নাচ আসলে বিগ ক্রাঞ্চের নৃত্যায়িত রূপক।

পরম ব্রহ্ম নিয়ে সম্প্রদায়গত ও অদ্বৈত বেদান্ত-দর্শনে মতভেদ রয়েছে। সনাতন ধর্মের বহুত্ববাদের উৎস মূলত পরমব্রহ্মের স্বরূপ নিয়ে। উপনিষদ বা অদ্বৈত বেদান্ত-দর্শন অনুযায়ী, পরমব্রহ্ম কোনও ব্যক্তি বা দেবতা নন। বিষ্ণু তার একটি সাকার বা মহাজাগতিক রূপ মাত্র। শাক্তদর্শন অনুসারে, পরম-ব্রহ্ম আদ্যাশক্তি-মহামায়া। অন্যদিকে, বৈষ্ণবদর্শন অনুসারে, বিষ্ণুই হলেন পরমব্রহ্ম। শ্রীমদ্ভাগবত বিষ্ণুপুরাণ কিংবা শ্রীমদ্ভাগবত গীতা অনুসারে, পরমব্রহ্ম হলেন মহাবিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণ। মহাবিষ্ণু হলেন কারণোদকশায়ী। তিনি কোনও সাধারণ দেবতা নন। সৃষ্টির পূর্বে যখন কিছু ছিল না, তখনও তিনি ছিলেন। কারণ-বারি হল মহাবিষ্ণুর আধ্যাত্মিক শক্তি, যাঁর নাম যোগমায়া। তাঁর নাভিমূল থেকে পদ্মফুল উৎপন্ন করে ব্রহ্মাকে সৃষ্টি করে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ভগবদ্গীতায় কৃষ্ণ অর্জুনকে যে নিজের বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন, তা আসলে পরমব্রহ্মের রূপ। সব কিছুই তাঁর থেকে উৎপন্ন হয়েছে আবার সবকিছু তাঁর মধ্যে লীন হয়ে আছে।
শৈবসিদ্ধান্ত ও আগম গ্রন্থানুসারে, সদাশিব হলেন শিবের মহাজাগতিক রূপ বা পরম-ব্রহ্ম। শিবের তিন রূপ ‘নিষ্কল’ (রূপহীন), ‘সকল-নিষ্কল’ (রূপ ও রূপহীনতার মাঝামাঝি), আর সকল হলেন রূপধারী। সদাশিবের পাঁচটি মহাজাগতিক কাজ: সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের পাশাপাশি তিরোভাব অর্থাৎ মায়ার আবরণে সত্যকে লুকিয়ে রাখা এবং ‘অনুগ্রহ’ রূপে সাধককে মোক্ষ প্রদান করা।
সদাশিবের মূর্তি পঞ্চমুখী। পঞ্চভূত, পাঁচ দিক ও পাঁচ শক্তির প্রতীক। যেমন ‘সদ্যোজাত’ পশ্চিমদিক, ক্ষিতি এবং সৃষ্টিশক্তি ব্রহ্মার প্রতীক। ‘বামদেব’ উত্তরদিক, জল, স্থিতিশক্তি– বিষ্ণুর প্রতীক। ‘অঘোর’ দক্ষিণদিক, তেজ, রুদ্রের প্রতীক। ‘তৎপুরুষ’ পূর্বদিক, মরুৎ, তিরোভাবের প্রতীক। এবং ঈশান ঊর্ধ্বমুখী, ব্যোম, অনুগ্রহ বা মোক্ষের প্রতীক। পঞ্চমুখী দশভুজ সদাশিব ছিলেন বাংলা সেনবংশের রাষ্ট্রীয় দেবতা।

এলিফান্টার একনম্বর গুহায় ত্রিমূর্তি বা সদাশিবের ২০ ফুট উচ্চতার মূর্তি দেখা যায়। তিনটি মুখ দৃশ্যমান। কেন্দ্রের মুখ শান্ত সৌম্য ধ্যানমগ্ন। ডানদিকের মুখ বামদেব, সৃষ্টি বা পালনের প্রতীক। বামদিকের মুখ অঘোর, ভৈরব বা রুদ্ররূপ।
প্রাচীনকালে ব্রহ্মাকে কেন্দ্র করেও পরমব্রহ্মের এক উপাসক সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। বৈদিকযুগে ব্রহ্মার অপর নাম প্রজাপতি। ঋক্-বেদের হিরণ্যগর্ভ সূক্ত কিংবা শতপথ ব্রাহ্মণে মহাবিশ্বের একমাত্র পরম উৎস বলা হয়েছে প্রজাপতিকে। তবে এই ধর্মমত ক্রমশ বিলুপ্ত হয়। গবেষকদের মতে, বৈদিক যাগযজ্ঞ, শৈব-মতবাদের জনপ্রিয়তা, ভক্তি আন্দোলনের প্রভাব ইত্যাদির জন্য ব্রহ্মা উপাসনা ভারত থেকে যেমন লুপ্ত হয়ে যায়, তেমনই লুপ্তপ্রায় দেবতা হয়ে যান ব্রহ্মা।
লোকায়ত স্তরে ক্রমশ, বিশেষ করে মহারাষ্ট্র, গুজরাট, দক্ষিণ ভারতে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের একক ও সমন্বিত রূপ ‘দত্তাত্রেয়’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কালান্তরে। দত্তাত্রেয়– ‘দত্ত’ ও ‘আত্রেয়’ শব্দ দু’টি নিয়ে গঠিত। দত্ত– দান করা এবং আত্রেয় হলেন অত্রিমুনির বংশধর। পুরাণ অনুযায়ী, অত্রি সপ্তঋষির একজন। সাধ্বী অনসূয়া তাঁর পত্নী।
একবার অনসূয়ার সাধনবল পরীক্ষা করার জন্য ছদ্মবেশে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর উপস্থিত হলেন। মুনি আশ্রমে ছিলেন না। তাঁরা অনসূয়ার আতিথ্য স্বীকার করে অদ্ভুত শর্ত দিলেন। অনসূয়াকে নগ্ন হয়ে তাঁদের পাতে খাদ্য পরিবেশন করতে হবে। অনসূয়া সবই বুঝতে পারলেন। তিনি যোগবলে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরকে তিন দুগ্ধপোষ্য শিশুতে পরিণত করে তাঁর স্তন্যপান করালেন। অনসূয়ার মাতৃত্বে মুগ্ধ হয়ে ত্রিদেব ‘দত্তাত্রেয়’ রূপে তাঁর গর্ভে জন্মালেন।

ভগবান দত্তাত্রেয়র মূর্তিতে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের তিন মাথা ছয় হাত। ছয় হাতে তিন দেবতার আয়ুধ ও লাঞ্ছন। সঙ্গে পৃথিবীর প্রতীক গাভী এবং চতুর্বেদের প্রতীক চারটি কুকুর। রয়েছে জ্ঞানবৃক্ষ– যজ্ঞডুমুর।
বাংলায় সম্ভবত দত্তাত্রেয়র অনুপ্রেরণায় ষড়ভুজ গৌরাঙ্গের দারুবিগ্রহ গড়ে উঠেছিল। দত্তাত্রেয় ও ষড়ভুজ গৌরাঙ্গের মধ্যে দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক মিল আছে। দত্তাত্রেয় যেমন ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের প্রতীক, ষড়ভুজ গৌরাঙ্গে রাম, কৃষ্ণ এবং হ্লাদিনী শক্তির প্রতীক মহাপ্রভুর ত্রয়ী মূর্তি। দত্তাত্রেয় ছিলেন অবধূত। গৌরাঙ্গ নিজে অবধূত না-হলেও গৌরাঙ্গলীলায় উল্লেখযোগ্য হলেন– ‘নিত্যানন্দ অবধূত’।
বাংলায় ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের সংযুক্ত একরূপের আরাধনা ‘ত্রিনাথের মেলা’ ব্রত বা পূজা নামে বিখ্যাত। পুজোয় পাঁচালিপাঠ অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ওড়িশাতেও এর ব্যাপক প্রভাব আছে। ব্রতকথা অনুসারে, সদানন্দ নামে দরিদ্র কাঠুরের একমাত্র সম্বল বলতে একটি গাভী। একদিন সেটিও বনের মধ্যে হারিয়ে যায়। হন্যে হয়ে যখন বনের মধ্যে গোরুটিকে সদানন্দ খুঁজছিলেন তখন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর অবধূত সন্ন্যাসীর বেশে তার কাছে হাজির হয়ে বললেন, যদি সে তিন পয়সার উপচার দিয়ে ত্রিনাথের মেলা বা ব্রতকথা শোনে, তাহলে তার হারানিধি ফিরে পাবে।

ভক্তরা আজও বিশেষ দিনে সূর্যাস্তের পর বাড়িতে ছোট পিঁড়ির ওপর তিনটি সুপারি রাখেন। পূজার উপকরণ গাঁজা সিদ্ধি (শিব), তেলের প্রদীপ (বিষ্ণু) এবং পান সুপারি (ব্রহ্মা)। পূর্ববঙ্গে একসময় মাঝি, মাল্লা, চাঁড়াল প্রভৃতি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে অতি জনপ্রিয় রূপে পরিচিত ছিল ত্রিনাথের মেলা। আজও নদিয়ার শান্তিপুর ফুলিয়ায় ত্রিনাথের মৃণ্ময়-মূর্তির পূজা হয় ঘটা করে। পাঠ হয় পাঁচালি এবং সেই উপলক্ষে মেলা বসে জমজমাট।
রাঢ়বঙ্গের জনপ্রিয় লোকদেবতা ধর্মরাজ প্রসঙ্গে রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণে বলা হয়েছে, সৃষ্টির আদিতে যে মহাশূন্যতা ছিল, তার থেকে প্রথম উদিত হন নিরঞ্জন। তাঁর গায়ের ঘাম হল কারণ-বারি। কিন্তু জগজীবন ঘোষালের ‘মনসামঙ্গল কাব্য’-এ ধর্মরাজ হলেন নিরঞ্জনের প্রতিনিধি। আদ্যা ও ধর্মের মিলনের পর উভয়ে অনুশোচনাগ্রস্ত হয়ে দেহত্যাগ করেন (বা লীন হন)। পরে তৎপুত্র মহাদেবের সঙ্গে অদ্বৈত রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। এই শঙ্কর ও ধর্মরাজের সম্মিলিত লোকদেবতা ‘বুড়োরাজ’ নামে পূজিত হচ্ছেন রাঢ়বঙ্গের বিভিন্ন স্থানে, যার মধ্যে পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের বুড়োরাজ বিখ্যাত।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved