


রোববার.ইন-এ এবার মাঝে মাঝেই গল্পের আসর। তবে, শুধুই রবিবার করে। কেমন লাগছে সেইসব গল্প আপনাদের? জানাতে পারেন [email protected]এই মেল আইডিতে। গল্প পাঠাতেও পারেন আমাদের। গল্পের শব্দসীমা ২০০০। পাঠাতে হবে ইউনিকোড, ওয়ার্ড ফাইলে। সঙ্গে পরিচয় ও ফোন নম্বর দিতে ভুলবেন না।
১.
ওয়াশি কাগজের গায়ে কলমের ছোঁয়া পড়তেই অক্ষরগুলো নরমভাবে ছড়িয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা শীর্ণ আঙুলে বাঁশের ওপর বসানো সূক্ষ্ম তুলিতে লিখল– ‘ইম্পেরিয়াল জাপানিজ আর্মি, ভালো থেকো’। কেন এটা লিখল শিগেরু কিমুরা, নিজেও ঠিক জানে না। রেডিও শুনতে শুনতে তার অবচেতন মন থেকে যেন উঠে এল এই শব্দগুলো।
এখন বসন্ত নয় তবুও দূরে কোথাও, একটা উগুইসু পাখি নরম, বাঁশির মতো সুর করে ডাকছে– ‘হো-হোকেকিও…’ ‘হো-হোকেকিও…’।
আলো ফোটেনি সম্পূর্ণ। আকাশের রং গাঢ় নীল থেকে ধীরে ধীরে লালচে হতে শুরু করছে। উরাকামি গ্রামের বাড়িগুলো খুব কাছাকাছি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কাঠের বাড়িগুলো উবু হয়ে মাথা নিচু করে বসে কোনও সভা করছে। ভেজা ভেজা বাতাসে কাঠ আর মাটির গন্ধ মিশে। কোথাও ছোট সবজি বাগান, কোথাও বাঁশের বেড়া, আর একটু দূরে ধানের জমি– সেসবের মাঝে কুয়াশা জমে আছে নরম সাদা প্রলেপের মতো।
ইউতো থাকে কাঠের বাড়িগুলোর একটাতে, গ্রামের উত্তর দিকে। বাড়ির ভিতরে এখন মৃদু আলো– একটা তেলের বাতি জ্বলছে।
ঘরের কোণে বসে আছেন ইউতোর ঠাকুরদা, শিগেরু কিমুরা। বয়স তার অনেক– চোখের কোণে ভাঁজ, গালের চামড়া আলগা হয়ে গিয়েছে। সাদা চুল পিছনে ছোট করে বাঁধা। পরনে হালকা রঙের পুরনো ইউকাতা, তার ওপর একটা পাতলা হাওরি চাপানো। হাত দুটো শিরা ওঠা, কিন্তু স্থির। তবে ভিতরে কোনও চাপা উত্তেজনা হলে হাত কাঁপতে শুরু করে।
তার সামনে রাখা একটা ছোট রেডিও– কাঠের বাক্সের মতো, ডায়ালে হালকা আলো জ্বলছে।
রেডিওর সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে শুনছেন– ‘এনএইচকে রেডিও সম্প্রচার’। ভেসে আসছে একটা গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠ– স্বরে চাপা উত্তেজনা, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত। ‘…ইম্পেরিয়াল জাপানিজ আর্মি… প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে… শত্রুপক্ষের বিমান চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে…’
কথাগুলো ভেঙে ভেঙে আসছে। তার মাঝে আবার ঝিরঝির শব্দ হচ্ছে। শিগেরু কিমুরা একটু ঝুঁকে রেডিও-র ভলিউম বাড়ালেন।
‘…জাপান-সহ বিশ্বের বহু দেশে সতর্কতা জারি করা হয়েছে…’ কথার মাঝখানে হালকা এক সুর কথাগুলোকে থামিয়ে দিল– আবার কোনও সরকারি ঘোষণা।
বাইরে দূরে একটা কুকুর ডাকছে। বাড়ির উল্টোদিকে খামার ঘরের দরজা খোলার শব্দ হল। শিগেরু বুঝতে পারলেন তার নাতি ইউতো, ভেড়াদের এখন ঘুম থেকে ডেকে তুলবে।
তিনি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।
খামার ঘরের ভিতরে হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে ইউতোকে দেখা যাচ্ছে। চোখে তার অদ্ভুত এক মনোযোগ। ভেড়াগুলোর গলার ছোট ঘণ্টা টুংটাং শব্দ করে উঠছে মাঝে মধ্যে। নতুন ভেড়াগুলোও আজ দিব্য মিশে গিয়েছে।
ইউতো ধীরে ধীরে গুনতে শুরু করল, ঠোঁট নড়ছে, ‘ইচি… নি… সান…’।
ঠাকুরদা একটু উঁচু গলায় বললেন, ‘গুনে নাও ঠিক করে, ইউতো। ভুল করলে কিন্তু ওরা পথ হারাবে।’
ইউতো হেসে বলল, ‘ওজিসান, আমি ভুল করি না আর।’
নতুন ভেড়াগুলোর দিকে তাকিয়ে সে একটু থামল। ওরা যেন বেশ স্বচ্ছন্দ। পুরনো দলের একদম মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, যেন বহুদিনের চেনা। একটা সাদা ভেড়া– যার কপালে ছোট কালো দাগ– আস্তে করে নতুন এক ভেড়ার গা ঘেঁষে দাঁড়াল।
ইউতো ফিসফিস করে বলল, ‘দেখেছ, ওরা নিজেরাই বন্ধু হয়ে গিয়েছে কেমন…’
ইউতো এবার লাঠিটা কাঁধে তুলে নিল। ভেড়াগুলো ধীরে ধীরে এগচ্ছে, নতুন আর পুরনো মিলেমিশে।
একটা ছোট ভেড়া হঠাৎ তার দিকে তাকাল। চোখ দুটো কেমন যেন মায়া-মায়া নরম।
ইউতো নিচু হয়ে বলল, ‘তুমি নতুন, তাই না ? কিন্তু এখন তুমি, আমাদের সবার বন্ধু। ভয় নেই, আমি আছি তো।’
হাওয়ায় একটা শান্ত গন্ধ– ঘাস, মাটি আর ভোরের।
দিন শেষে সন্ধের আগে ঘরে ফিরে আসার সময় আবার গুনতে হবে। এই নিয়মটা পালন করলে মনে জোড় পাওয়া যায়।
ইউতো মনে মনে বলল, ‘যতক্ষণ আমি গুনে যাচ্ছি, ততক্ষণ কেউ হারাবে না…’
মাঠের ঘাসে হালকা শিশির। ঠাকুরদা বারান্দা থেকে নেমে খামার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
ইউতো ভেড়াদের সঙ্গে চলতে চলতে আবার গুনল। ‘চল্লিশ… একচল্লিশ…’।
হঠাৎ থেমে গেল। চোখ একটু কুঁচকে গেল। ‘একটা কম?’
তার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। ‘ওজিসান!’ সে একটু জোরে ডাকল। ‘একটা কম মনে হচ্ছে!’
ঠাকুরদা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। ‘আবার গুনে নাও। তাড়াহুড়ো করো না।’
ইউতো এবার আরও মন দিয়ে গুনল। তার মনে হল বাতাস যেন হঠাৎ থেমে গিয়েছে। শুধু নিজের গলার শব্দ আর ভেড়াগুলোর নিশ্বাসের শব্দ সে শুনতে পাচ্ছে এখন।
‘বিয়াল্লিশ… তেতাল্লিশ… চুয়াল্লিশ…’।
শেষে এসে থামল। ‘না গো… সবাই আছে…’।
সে ফিক করে হেসে ফেলল, ‘আমিই ভুল করেছিলাম।’
ঠাকুরদা মৃদু হাসলেন, ‘ভুল করা খারাপ নয়। ভুল বুঝতে পারাটাই বড় কথা।’
এই গ্রামে বেশিরভাগ মানুষই কৃষক। কেউ ধান চাষ করে, কেউ শাকসবজি। কয়েকটা পরিবার অবশ্য মাছ ধরতে যায় নদীর দিকে। আর ইউতোর মতো দু’-একজন মেষপালকও আছে। তারা অবশ্য বয়সে ইউতোর থেকে অনেক বড়। ইউতোর মাত্র সাত।
*************
ঘরের ভিতরটা অদ্ভুতভাবে শান্ত। বাইরে ভোরের আলো ধীরে ধীরে বাড়ছে। কাগজের স্লাইডিং দরজা– শোজি– পেরিয়ে সেই আলোটা নরম হয়ে এসে পড়েছে মেঝের ওপর। তাতামি মাদুরের গন্ধ নাকে আসে কখনও-সখনও। কোথাও কোনও বাড়তি সাজসজ্জা নেই– একটা নিচু কাঠের টেবিল, কোণে গুটিয়ে রাখা ফুতন, আর দেওয়ালে ঝোলানো ছোট্ট একটা ক্যালিগ্রাফি স্ক্রল।
রান্নাঘর বলতে ঘরের একপাশে মাটির চুল্লি। তার ওপর ছোট হাঁড়িতে ধোঁয়া উঠছে। ভাতের গন্ধ, সঙ্গে ধোঁয়া ওড়া মিসো স্যুপের গন্ধে ঘর ভরে গিয়েছে– এই দুয়ে মিলে এটাই যেন রোজকার কর্মব্যস্ত সকালের গন্ধ।
ইউতো ঘরে ঢুকে দরজার কোণে হাতের লাঠিটা রেখে এগিয়ে গেল।
শিগেরু কিমুরা অর্থাৎ ঠাকুরদা টেবিলের পাশে বসে আছেন। সামনে দুটো ছোট বাটি– গরম ভাত, পাশে মিসো স্যুপ, আর দু’জনের জন্য দু’টুকরো গ্রিল করা মাছ। হাতে কাঠের চপস্টিকটা রেখে বলল, ‘ইউতো, খেয়ে নাও আগে। খালি পেটে কাজে রওনা দেওয়া ঠিক না।’
ইউতো হাঁটু-মুড়ে কোলের ওপর হাত রেখে ঠাকুরদার সামনে বসল।
‘ওজিসান…’
ঠাকুরদা চোখ তুলে তাকালেন, ‘হ্যাঁ?’
ইউতো একটু ইতস্তত করে বলল, ‘এই ভেড়াগুলোর লোম… বিক্রি করলে সত্যিই কি অনেক টাকা পাওয়া যায়?’
ঠাকুরদা মিসো স্যুপের বাটিটা হাতে তুলে নিয়ে এক চুমুক খেলেন। গরম বাষ্প তার চোখ-মুখে লাগল। একটু থেমে বললেন, ‘অনেক না, তবে যতটা দরকার… ততটা হয় ঠিকই।’
তিনি চপস্টিক দিয়ে ভাতটা একটু নাড়লেন। ‘সবটা একবারে আসে না, ইউতো। ধীরে ধীরে আসে।’
উগুইসু পাখিটা আবার ডেকে উঠল– ‘হো-হোকেকিও…’
ইউতো নিচু গলায় বলল, ‘তাহলে… আমি কি ওই বড় স্কুলে যেতে পারব?’
ঠাকুরদা এবার একটু থামলেন। হাতের চপস্টিকটা নামিয়ে রেখে ইউতোর দিকে তাকালেন।
‘চেষ্টা করলে পারবে। সবকিছু শুধু টাকায় হয় না… মনও লাগাতে হয়। ইচ্ছাশক্তি সবচেয়ে বড় শক্তি।’
ইউতো মাথা নাড়ল। তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘কিন্তু… ভেড়াগুলোর কষ্ট হবে না তো, লোম কেটে নিলে?’
ঠাকুরদা এবার হালকা একটা নিশ্বাস ফেললেন। ইউতোর পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘দেখো, আমরা যদি যত্ন না করি, তাহলে ওদের কষ্ট হবে। কিন্তু যদি ঠিকমতো লালন-পালন করি, তাহলে আবার নতুন পশম গজাবে। এইটাই প্রকৃতির নিয়ম।’
তিনি আবার ভাতের দলা মুখে তুলে বললেন, ‘মেষপালক মানে শুধু ভালোবাসা না, দায়িত্বও।’
ইউতো একটা মাছের টুকরো মুখে দিল।
বাইরের আলো একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। শোজির কাগজে সেই আলো পড়ে যেন একটা শান্ত ছবি তৈরি করেছে।
ঠাকুরদা হঠাৎ বললেন, ‘আজ মিজুকাগের ওপরে উঠবে?’
ইউতোর চোখ চকচক করে উঠল। মুখ তুলে তাকাল, ‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে খেয়ে নাও। পাহাড়ে ওঠার আগে পেট ভরা থাকা দরকার।’
ইউতো এবার দ্রুত খেতে লাগল।
২.
গ্রামের শেষ মাথাটা পেরতে না পেরতেই রাস্তা সরু হয়ে আসে। দু’পাশে কাঠের ছোট ছোট বাড়ি, জানালায় কাগজের পর্দা– হালকা হাওয়ায় দুলছে। কোথাও রান্নার ধোঁয়া উঠছে, কোথাও আবার একটা বয়স্ক মহিলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঝাঁটা দিচ্ছেন।
ইউতো ভেড়াগুলোকে নিয়ে এগতে থাকে। গ্রামে জনবসতির মধ্যে দিয়ে ভেড়াগুলোর ঘণ্টার টুংটাং শব্দ বয়ে চলছে।
একজন বৃদ্ধ পাশ থেকে ডাকলেন, ‘ওহায়ো, ইউতো!’
ইউতো মাথা নুইয়ে বলল, ‘ওহায়ো গোজাইমাসু, তানাকা-সান।’
ইউতো সামনে হাঁটছে। তার পরনে ফিকে নীল রঙের একটা ছোট ইউকাতা– অনেকবার ধোয়ার ফলে রংটা একটু ম্লান হয়ে গিয়েছে। কোমরে বাঁধা পাতলা কাপড়ের ওবি। হাঁটুর একটু নিচে পর্যন্ত নামা, যাতে হাঁটতে সুবিধে হয়। পায়ে কাঠের গেটা– চলার সময় টক… টক… শব্দ হচ্ছে। কাঁধে একটা পুরনো কাপড়ের থলি, আর হাতে সেই বাঁশের লাঠি।
ইউতো হঠাৎ থেমে গেল। ঠিক এক্ষুনি তার চোখে পড়েছে– মাটির ওপর পড়ে থাকা একটা টুকটুকে লাল পাঁপড়ি। যেন কেউ এক চিমটে রং ছিটিয়ে দিয়েছে পথের ধারে!
চারপাশে তাকাল। কাছেই একটা নিচু গাছ– পাতার ফাঁকে আরও কয়েকটা লাল জংলি ফুল ফুটে আছে। কিন্তু এই পাঁপড়িটা আলাদা রকমের– মাটিতে পড়ে আছে, তবুও কেমন যেন উজ্জ্বল।
ইউতো চট করে পাঁপড়িটা তুলে নিল। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখে একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
ইউতো পাঁপড়িটা হাতের তালুতে রেখে চিৎকার করে বলল ভেড়ার দলকে, ‘দেখো, কী সুন্দর!’
ভেড়ারা মাথা হেট করে এগিয়ে চলছে।
ইউতো আর কিছু বলল না। খুব যত্ন করে লাল ফুলের পাঁপড়িটাকে তার ইউকাতার পাশের ছোট পকেটে ঢুকিয়ে দিল। তারপর পকেটটা একটু চেপে ধরে থাকল কিছুক্ষণ।
ভেড়াগুলো তখন আবার এগোতে শুরু করেছে। ঘণ্টার শব্দটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।
ইউতো লাঠিটা তুলে ওদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে শুরু করল। তার মুখে এখনও সেই হালকা হাসি লেগে। ফুলের পাঁপড়ি– একটা সামান্য জিনিস, তবু তার মনে হচ্ছে, আজকের দিনটা কেমন যেন ভালো হয়ে গিয়েছে।
ভেড়াগুলোও যেন থেমে একটু তাকাল, তারপর আবার এগিয়ে গেল। গ্রামের শেষে এসে পথটা ধীরে ধীরে উঁচু হতে থাকে। সামনে যে পাহাড়টা উঠে গিয়েছে, ওটাই মিজুকাগে পাহাড়– গ্রামে সকালবেলায় যার গায়ে ছায়া পড়লে জলের মতো নরম লাগে।

ইউতো হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘আজ একটু তাড়াতাড়ি উঠেছ সবাই… কেমন লাগছে?’
একটা ছোট ভেড়া তার পাশে এসে হাঁটতে লাগল। ইউতো হেসে বলল, ‘তোমার তো নতুন জায়গা… ভয় লাগছে না তো?’
তার নিজের গলার শব্দ ছাড়া আশেপাশে– শুধু বাতাসে পাতার ঘর্ষণ, আর দূরে একটা কাকের ডাক শোনা যাচ্ছে।
ইউতো একটু বিশ্রাম নিতে থামল। চোখটা তার আরও দূরের পাহাড়ে গিয়ে আটকে রইল। মনে মনে ভাবল, মা থাকলে আজ বলত… ‘ঠান্ডা লাগবে, একটু গরম জামা পরে যা’…
কথাটা বলেই সে নিচু হয়ে একটা ভেড়ার মাথায় হাত রাখল।
‘শোনো, তোমরা কি সত্যিই বোঝো আমাকে?’
ভেড়াগুলো ঘাস খেতে খেতে এগচ্ছে। কিন্তু দলের সবচেয়ে বড় ভেড়াটা– যার লোম একটু ঘন, আর চোখে অদ্ভুত শান্তি– ধীরে ধীরে ইউতোর দিকে এগিয়ে এল।
সে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। খুব আস্তে, কোনও শব্দ না করে।
ইউতো একটু চমকে তাকাল, তারপর অল্প হেসে বলল, ‘তুমি আবার এলে…’
সে হাত দিয়ে ভেড়াটার গা চাপড়ে দিল। ‘আমি যখন মন খারাপ করি, তখনই তুমি আসো… কেন বলো তো?’
ভেড়াটা কিছু বলল না। শুধু নিশ্বাসের উষ্ণতা ইউতোর হাতে লাগল।
দূরে হাওয়া একটু জোরে বয়ে গেল। গাছের ডালগুলো একসঙ্গে দুলে উঠল– একটা নরম শব্দ তৈরি হল, যেন কেউ খুব আস্তে কিছু বলছে।
ইউতো ফিসফিস করে বলল, ‘বাবা আজ বাড়ি ফিরবে কি? আমি জানি না… তুমি জানো?’
তার গলায় কোনও অভিযোগ নেই।
ভেড়াগুলো তখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠছে। ঘণ্টার শব্দটা একটু দ্রুত হচ্ছে, পাথরের সঙ্গে খুরের ঠোকাঠুকির শব্দও শোনা যাচ্ছে।
ইউতো হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘চলো, আজ আরও একটু ওপরে যাই… মিজুকাগের ওই বাঁকটা থেকে না কি পুরো গ্রামটা দেখা যায়।’
একটা ছোট ভেড়া লাফিয়ে উঠল সামনে।
ইউতো হেসে উঠল, ‘এই ! এত তাড়াহুড়ো করো না… সবাইকে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু।’
তার হাসির শব্দটা হাওয়ায় মিশে গেল।
পাহাড়ের ঢালটা যত উপরে উঠছে, বাতাসটা তত ঠান্ডা আর স্বচ্ছ হয়ে আসছে। মাটির গায়ে ছড়ানো ছোট ছোট পাথর, তার ফাঁকে ফাঁকে নরম ঘাস। ভেড়াগুলোর খুরে সেই পাথরে ঠোকাঠুকির শব্দ– ‘টিক… টিক…’– মাঝে মাঝে ভেঙে দিচ্ছে নীরবতা।
ইউতো লাঠিটা কাঁধে রেখে হাঁটতে হাঁটতে ভেড়াগুলোর দিকে তাকাল। সকালের আলোয় তাদের লোমগুলো যেন একটু সোনালি দেখাচ্ছে।
ঠাকুরদার কথা মনে পড়ে গেল। বেশ অনেকদিন আগে বলেছিলেন, ‘এই পশমই আমাদের ভরসা, ইউতো। ঠিকমতো কাটতে পারলে, ভালো দাম পাওয়া যায়।’
ইউতো নিচু হয়ে একটা ভেড়ার লোমে হাত বুলিয়ে দিল।
মিজুকাগে পাহাড়ের এক জায়গায় এসে তারা থামল। এখান থেকে পুরো উরাকামি গ্রামটা দেখা যায়। নিচে ছোট ছোট বাড়ি, সেগুলোকে একপাশে রেখে উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাথোলিক গির্জার চূড়া। গ্রামের মধ্যে সরু পথ, আর দূরে একটা নদী চিকচিক করছে।
পাহাড়ের ঢালে কয়েকটা পুরনো গাছ– তাদের ছায়া মাটিতে পড়ে যেন জলের ঢেউয়ের মতো দুলছে। এই জন্যই হয়তো নামটা– মিজুকাগে, জলের ছায়া।
হাওয়াটা এখানে এসে একটু অন্যরকম– কানে হালকা শোঁ শোঁ শব্দ করে, কিন্তু বিরক্ত করে না। বরং মনে হয়, কেউ যেন গল্প বলছে।
ইউতো দলের সবচেয়ে বড় ভেড়াটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
‘এই দেখো… নিচে আমাদের গ্রামটা। কেমন লাগছে?’
ভেড়াটা মাথা একটু তুলল, তারপর হঠাৎ ডেকে উঠল ‘ভ্যা…’
ইউতো হেসে ফেলল। ‘তুমি কি খুশি হয়েছ?’
ভেড়াটা আবার চুপ করে গেল।
ইউতোও চুপ করে গেল। তার চোখ দূরে গ্রামের দিকে। তবে মনটা বিন বিন করে আরও বহু দূর চলে গিয়েছে।
ইউতো ভাবল, তার বয়স এখন সাত। তার মনের মধ্যে সারাদিন যে প্রশ্নগুলো উঁকিঝুঁকি মারে, সেই একই প্রশ্ন কি গ্রামে তার বয়সি অন্য বাচ্চাদের মনেও আসে? মাঝে মাঝে মনে হয় সারাদিন যে এত প্রশ্ন সে ঠাকুরদাকে করে, উনি নিশ্চয়ই খুব রেগে যান। কিন্তু কী করবে, ইউতো যে এখনও জগৎ-সংসারের কতও কিছুই জানে না, সেগুলো জানার জন্যই তো বড় স্কুলে ভর্তি হতে চায়।
কেন গ্রামের বাড়ির জানালায় রাতে আলো জ্বলে না?
কেন মাঝে মাঝে আকাশে সেই বড় বড় বিমানগুলো যায়, আর সবাই তখন চুপ হয়ে যায়?
কেন ঠাকুরদা রেডিও-র সামনে বসে থাকেন, আর তারপর অনেকক্ষণ কিছু বলেন না?
যুদ্ধ মানে ঠিক কী? সেটা কোথায় হয়?
যুদ্ধ যদি দূরে হয়, তাহলে গ্রামের বড়রা এত চিন্তা করে কেন?
বাবা কি সেই যুদ্ধের জন্যই বাড়ি ফিরতে পারে না ঠিকমতো?
আর যদি আমি বড় হই… তাহলে আমাকেও কি কোথাও যেতে হবে?
এই প্রশ্নগুলো ইউতো কখনও জিজ্ঞেস করে উঠতে পারে না, শুধু মনের ভিতর ঘুরপাক খায়। একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিল শুধু, ‘ওজিসান… যুদ্ধ কেমন দেখতে?’
পাল্টা কোনও উত্তর পায়নি সে।
ঠাকুরদা তাকে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু তবুও ইউতোর কেন মনে হয়, যদি সঙ্গে বাবা-মা থাকত, তবে হয়তো সে আরও বেশি ভালোবাসা পেত। যদিও এসব কথা, সে কোনওদিনও কাউকে ভুল করেও বলবে না। এমনকী এই মিজুকাগে পাহাড়, জল, হাওয়া, নরম রোদ, গাছপালা, এই ভেড়ার দল– কাউকে নয়। একটা লম্বা শ্বাস ফেলল।
ইউতো আর কিছু বলল না। শুধু ভেড়াগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। হাওয়ায় তাদের লোমগুলো নড়ছে। ঘণ্টার শব্দ খুব আস্তে আস্তে বাজছে। এসব মুহূর্তে মনের ভিতর সবকিছু খুব শান্ত লাগে তার। ঠাকুরদা বলেছেন, একজন মেষপালকের জীবনে এগুলোই পরম প্রাপ্তি।
৩.
পাহাড়ের ওপরে পৌঁছে ইউতো লাঠিটা মাটিতে গেঁথে দিল। ভেড়াগুলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। ওদের মধ্যে কেউ নরম ঘাসে মুখ ডুবিয়ে দিল, কেউ আবার একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। ঘণ্টার টুংটাং শব্দটা এবার যেন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। হাওয়ার মিশে যেন শব্দটা পাহাড় থেকে বহুদূর যাচ্ছে।
ইউতো চারপাশে তাকাল। মিজুকাগে পাহাড়ের এই অংশটা একটু খোলামেলা। নরম ঘাসে মোড়া আর সেখানে মাঝখানে একটা বড় সুগি গাছ দাঁড়িয়ে। গাছটা সোজা উঠে গিয়েছে আকাশের দিকে, ডালপালাগুলো ছাতার মতো ছড়ানো।
গাছটার নিচে ইউতো গিয়ে বসল। খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর আস্তে-আস্তে শুয়ে পড়ল।
উপরে তাকাতেই আকাশটাকে একটু বেশিই নীল মনে হল তার। খুব ঝকঝক করছে। যেন এই মাত্র জল দিয়ে ধুয়ে কেউ পরিষ্কার করে গিয়েছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আলো এসে ইউতোর মুখে পড়ছে– কখনও উজ্জ্বল, কখনও ছায়া। হাওয়ায় পাতাগুলো নড়ছে ঝিরিঝিরি।
দূরে ভেড়ার ঘণ্টা বাজছে। কাছেই একটা পোকা একটানা ডাকছে– খুব তীক্ষ্ণ, সম্ভবত ঘাস-পোকা জাতীয় কিছু। গ্রাম থেকে গির্জার ভারী ধাতব ঘণ্টার শব্দ কানে এল।
ইউতো হাত দুটো মাথার পিছনে রেখে চোখ আধখোলা করল। হঠাৎ মনে হল, এই যে পাহাড়… এই নরম ঘাসের বিছানা… ফুল… পাখি… এই ভেড়ার দল… তাদের ছোট গ্রাম… এসব ছেড়ে সত্যিই কি সে দূরে কোনও দিন, কোথাও যাতে পারবে? বড় স্কুলে কি পড়তে গেলে সত্যি কি আর সে মেষপালক থাকতে পারবে না?
ইউতোর বুকের ভিতরটা একটু হালকা খালি খালি লাগছে।
হাওয়াটা একটু জোরে এল। সুগি গাছের পাতাগুলো একসঙ্গে দুলে উঠল শোঁ শোঁ করে।
ইউতো চোখ বন্ধ করল আলগা করে। কখন যে ঘুম এসে গেল, সে টেরই পেল না।
তারপর ইউতো নিজেকে দেখতে পেল এক অদ্ভুত জায়গায় দাঁড়িয়ে।
চারপাশে লাল তোরি গেট– একটার পর একটা, যেন শেষ নেই। গেটগুলো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে গিয়েছে। প্রতিটা গেটের নিচ দিয়ে হাঁটলে একটা ঠান্ডা ছায়া গায়ে লাগে।
মাটিতে ছোট পাথর বিছানো। পায়ের নিচে খচখচ শব্দ।
দূরে একটা মন্দির– কাঠের, ছাদের কারুকাজে সূক্ষ্ম নকশা কাটা। সামনে ঝুলছে একটা বিশাল ঘণ্টা। হাওয়ায় সেটা একটু দুলছে, আর খুব আস্তে ডং… ডং… শব্দ করছে।
চারপাশে কেউ নেই, তবু মনে হচ্ছে যেন কেউ আছে। হালকা গা ছমছম করছে। গাছের ডালে কয়েকটা সাদা কাগজের ফিতে হাওয়ায় নড়ছে। মন্দিরের সামনে একটা পাথরের মূর্তি। মুখে শান্ত ভাব। আর সেই মূর্তিকে দেখতে অবিকল ইউতোর মায়ের মতো।
ইউতো এগিয়ে যাচ্ছে সেদিকে। আর মূর্তির ভিতর থেকে এক নারী কণ্ঠ ইউতোর নাম ধরে ডাকছে।
মাটিতে পড়ে আছে ছোট ছোট কাঠের ট্যাবলেট, যাকে জাপানি ভাষায় ‘এমা’ বলে। তাতে কেউ কিছু লিখে রেখেছে। অক্ষরগুলো সে পুরো পড়তে পারছে না, কিন্তু মনে হচ্ছে– সেখানে সবই মনের ইচ্ছে বা প্রার্থনা লেখা।
হাওয়ায় ধূপ আর পুরনো কাঠের মিশ্রিত গন্ধ– ক্রমাগত তার নাকে আসছে। দূরে কোথাও একটা বাঁশি বাজছে। মন হু হু করা সেই বাঁশির সুর!
ইউতোর মনে হচ্ছে, এই জায়গাটা সে আগেও বহুবার এসেছে। মন্দিরের ঘণ্টাটা আবার দুলল– ডং… ডং… সেই শব্দটা যেন পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এল।
হঠাৎ আর একটা ঘণ্টার জোরালো শব্দ ইউতোর ঠিক একেবারে কানের কাছে বেজে উঠল! শব্দটা খুব চেনা।
ইউতো চোখ খুলল। সে উঠে বসে চারপাশে তাকাল। ঠিক আগের মতোই ভেড়াগুলোর গলার ঘণ্টা বাজছে। হাওয়া এখনও বইছে। সুগি গাছের ছায়া তার মুখে নড়াচড়া করছে।
পাহাড় থেকে নামার পথটা একটু ঢালু। নরম মাটি, তার ওপর ছড়িয়ে শুকনো পাতা। ভেড়াগুলো একে একে নামছে ঘাস খেতে খেতে– খুরের নিচে পাতার খচমচ শব্দ হচ্ছে।
সে উঠে বসল। গায়ে আর চুলে লেগে আছে ছোট ছোট শুকনো ঘাসের টুকরো। হাত দিয়ে সেগুলো ঝাড়তে লাগল।
দূরে একটা ভেড়া ডাকল, ‘ভ্যা…’
ইউতো হেসে বলল, ‘আমি আছি… পালিও না।’ গলায় ঘুমঘুম ভাবটা এখনও আছে।
হাঁটতে শুরু করল ইউতো। পাহাড়ের দক্ষিণ দিক কিছুটা নিচু হয়ে নেমে গিয়েছে। এখন হাওয়া আগের থেকে আরও হালকা ও উষ্ণ হয়ে উঠেছে।
ইউতো বিশ-ত্রিশ পা এগতেই হঠাৎ থেমে গেল। আরে! সেই আশ্চর্য ফুলটা!
অবিশ্বাস্য! তার সামনে ওই লাল ফুলের আস্ত একটা গাছ– পাতাগুলো সরু, লম্বাটে ধরনের আর তার মাথায় ফুটে আছে থোকা থোকা টুকটুকে লাল ফুল। ফুলগুলো যেন ওপরে মুখ তুলে, আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
ইউতো নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল এক মুহূর্তের জন্য। খুব আস্তে বলল, ‘আরিব্বাস! এই পাহাড়ে এই ফুলগাছ আছে… জানতাম না তো!’
সে আগে এই ফুল দেখেছে– এদিক-সেদিক পথে, খেলার সময়, কাজে যাওয়া-আসার সময় ঝোপের ধারে। কিন্তু এভাবে একটা পূর্ণ গাছ– ইউতো এই প্রথম দেখল।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ইউতো। হাত বাড়িয়ে একটা ফুলকে ছোঁয়ার চেষ্টা করল। গাছটা ইউতোর থেকে লম্বা হওয়ায় লাফিয়েও ফুলগুলোকে নাগালের মধ্যে করতে পারল না।
সত্যি বলতে কী, এই ফুল দেখলে ইউতোর মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। ‘আচ্ছা, মা যদি এমন টুকটুকে লাল কিমোনো পরত… মাকেও নিশ্চয়ই এমন সুন্দর লাগত…! কে জানে!’
চোখের সামনে যেন একটা ছবি ভেসে উঠে, আবার মিলিয়ে গেল। ইউতো দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলল। মাটি থেকে আরেকটা গোটা ফুল কুড়িয়ে পকেটে রাখল।
‘ওজিসানকে জিজ্ঞেস করব… আজই… এই আশ্চর্য ফুলের নাম?’ যে ফুল দেখলে তার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়, সেই ফুলের নাম তাকে জানতেই হবে। ইউতোর গলায় একটা নরম দৃঢ়তা।
সে একটু ঘুরে দাঁড়াতেই, সামনে দেখতে পেল আরও অনেক গুলো লালফুল পড়ে আছে ঘাসের ওপর। সেগুলো পেরিয়ে আরও কয়েক পা এগিয়ে যেতেই, দেখল একটা গোটা আশ্চর্য লাল ফুলের বন।
এখন যেদিকেই তাকাচ্ছে, শুধুই লাল ফুল। বাতাসে দুলছে গাছগুলো। যেন মনে হচ্ছে একটা লাল রঙের ঢেউ সামনে আসছে, আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। এই মিজুকাগে পাহাড়ে যে এত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, ইউতো সে-কথা তার সাত বছরের জীবনে জানত না!
ইউতোর পায়ের নিচে এখন নরম ঘাস আর চারপাশে সেই ফুল। দূরে ভেড়াগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কেউ মাথা নিচু করে ঘাস খাচ্ছে, কেউ এদিক ওদিক ঘুরছে। ঘণ্টার শব্দ খুব ক্ষীণ হয়ে এসেছে এখানে। ভেড়াগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে, এক একটা উলের ছোট ছোট গোলা।
ইউতো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল খানিকক্ষণ। তার মাথায় হঠাৎ একটা চিন্তা এল।
‘যদি ঠাকুরদা এই গাছের কথা, এই ফুলের কথা জানত… তাহলে তাকে আগে বলেনি কেন? স্কুলে যায় না ঠিকই, কিন্তু সে তো রোজ সন্ধেবেলা পড়তে বসে ঠাকুরদার কাছে। গান, কবিতা, অঙ্ক, ইতিহাস, ভূগোল– কত কিছু নতুন জিনিস শেখে! কত কিছু সে জানে! তাহলে এই ফুলের নাম সে জানে না কেন?’
ইউতো একটু নিচু হয়ে একটা ফুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার নাম কী গো?’
হাওয়ায় একটা ফুলটা একটু দুলল। বাকি ফুলগুলোও সঙ্গে সঙ্গে নড়ে উঠল। রোদটা আগের থেকে আরও চড়া হয়েছে।
ইউতো নিজের মনে বলল, ‘হয়তো ওজিসানও জানে না…’।
এই ভাবনাটা আসতেই তার কেমন অদ্ভুত লাগল– একটু অবাক হল আবার একই সঙ্গে আনন্দও হল। তাহলে এই আশ্চর্য ফুলের গাছটা… সে নিজেই খুঁজে পেল!
ইউতো ধীরে ধীরে ফুলের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে লাগল। মনে হচ্ছে, এখনই দৌড়ে গিয়ে ঠাকুরদাকে জানিয়ে দেবে, সে এই গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাবে না! কোনও দিনও যাবে না! এই গ্রাম, এই পাহাড়, এই ফুল… এগুলোই ওর প্রিয়।
দূরে আবার একটা ভেড়া ডাকল। ইউতো মাথা তুলে তাকাল। লাল ফুলের ফাঁক দিয়ে ভেড়াগুলোকে দেখা যাচ্ছে– ছোট ছোট সাদা বিন্দুর মতো নড়ছে।
মনে হল, এই মুহূর্তটাকেও সে পকেটে ভরে বাড়ি নিয়ে যাবে। যাতে কখনও হারিয়ে না যায়! কাছেই বোধহয় ওই সুগি গাছ থেকে ভেসে আসা কোমাদোরি পাখির সুরটা ইউতোর খুব ভালো লাগছে।
বেলা বাড়চ্ছে। সূর্য এখনও ঠিক মাথার উপর ওঠেনি, কিন্তু সূর্যের আলো আর নরম নেই– তীক্ষ্ণ, সোজা এসে পড়ছে পাহাড়ের ঢালে। ইউতো এখন আশ্চর্য ফুলের বনের সামনে হাঁটু জড়িয়ে বসে আছে।
মিজুকাগে পাহাড়ের এই দিকটা থেকে নিচে তাকালে উরাকামি গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। ছোট ছোট ঘর, ধূসর ছাদ, সুতোর মতো সরু পথ, মাঝে মাঝে ধোঁয়ার রেখা উঠে যাচ্ছে। মানুষগুলোকে পুতুলের মতো ছোট দেখাচ্ছে। আরও দূরে পাহাড়ের সারি– একটার পর একটা, নীলচে কুয়াশায় ঢাকা। আর তারও ওপরে এক বিস্তৃত নীল আকাশ। আজ আকাশ এত পরিষ্কার যে দূরের সীমারেখাও স্পষ্ট। কোথাও কোথাও মেঘের ছোট টুকরো ভেসে আছে– স্থির, প্রায় নড়ছে না।
হাওয়া খুব ধীরে বইছে। লাল ফুলগুলো মাথা তুলে দুলছে। সূর্যের আলোয় লাল রংটা আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
আচমকা একটা অস্বাভাবিক আলোর ঝলকে ইউতোর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে একটা তীব্র সাদা আলো, যেন হঠাৎ সূর্যটা নেমে আসছে দ্রুত মাটির কাছে!
ইউতো নিজের অজান্তেই চোখ বন্ধ করে ফেলল! প্রচণ্ড গরম তাপ লাগছে। মনে হচ্ছে তার চোখ পুড়ে যাবে। এরপর একটা বিকট শব্দ। আকাশ ফেটে যাওয়া গর্জন– যেন আকাশের ভিতর তীব্র শব্দ করে কিছু ছিঁড়ে যাচ্ছে!
দলের সবচেয়ে প্রবীণ ভেড়াটা ইউতোর দিকে চিৎকার করতে করতে আসাতে চাইছে।
আলোটা সবকিছু ঢেকে দিল– পাহাড়, ফুল, ভেড়া, আকাশ– সব। মাটি– পাহাড় কেঁপে উঠল।
তারপর সব অন্ধকার।
ইউতো তবুও চোখ খুলতে চেষ্টা করল। তার সামনে দৃশ্যটা বদলে যাচ্ছে। দিগন্তের দিকে– একটা বিশাল ধোঁয়ার স্তম্ভ উঠছে। নিচ থেকে ওপরে, তারপর ছড়িয়ে যাচ্ছে– মেঘের মতো, কিন্তু ভারী, কালচে!
হাওয়া হঠাৎ বদলে গেল।
ভারী গরম হাওয়া এসে ইউতোকে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। গাছের পাতা ছিঁড়ে উড়ে গেল, ফুলগুলো একসঙ্গে নুয়ে পড়ল। চারপাশে গ্রাম নেই, বাড়ি নেই, মানুষ নেই– শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া!
ইউতোর চামড়া খসে পড়ছে গা থেকে… সে কোনও রকমে উঠে হাঁটছে টলমল করে, কিন্তু আর কথা বলতে পারছে না।
কয়েক পা গিয়েই ইউতো মাটিতে পড়ে গেল। তার কানে শব্দ গুঞ্জন করছে– সবকিছু যেন দূরে সরে যাচ্ছে। সে আবার উঠতে চেষ্টা করল, কিন্তু শরীরটা সাড়া দিল না পুরোপুরি। চারপাশে শুধু ধুলো, ধোঁয়া, তাপ আর একটা অচেনা গরম ও ধাতব গন্ধ।
দূরে ভেড়াগুলোর বিক্ষিপ্ত পড়ে আছে, এক-দুটো ভেড়ার ভাঙা ডাক কি সে আর শুনতে পাচ্ছে?
ইউতো চোখ মেলল।
তার সামনে লাল ফুলগুলো কি এখনও আছে? ঠাকুরদাকে বলা হয়নি এখনও, এই গাছটার কথা। ইউতোর বুকের ভিতর একটা নরম টান অনুভব করল। ওর চোখের আলোটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে– কেমন যেন সাদা থেকে ফিকে।
ইউতো আকাশের দিকে তাকাল। নীল আকাশটা বোধহয় এখনও আছে।
আর তার নিচে ধোঁয়ার মোড়া একটা পৃথিবী।
আজ ৯ আগস্ট, ১৯৪৫। ইউতোর সেই আশ্চর্য লাল ফুলের নাম জানতে চাওয়ার দিন। এখন সবে মাত্র সকাল ১১টা বেজে ২ মিনিট।
*************
তারপর বহু মাস, বহু বছর এখানে আর কোনও প্রাণের সৃষ্টি হয়নি। কোনও গাছ, ফুল, ফসল জন্মায়নি। এমনকী একটি ঘাসও নয়। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে প্রথম যে গাছটি জন্মালো এই ধূসর ভূমিতে, সেটি ইউতোর আশ্চর্য সেই লাল ফুল গাছ! ফুল ধরল গাছে। এই লাল ফুলটির জাপানি নাম– কিয়োচিকুতো।
অর্থাৎ, রক্তকরবী!
‘দ্য রেড ওলিয়েন্ডার’!
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন রোববারের গল্প-র অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved