


‘তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল!’ এ তো নিছক গানের কথা নয়! বরং একগুচ্ছ জরুরি প্রশ্নের উৎসমুখ! যুদ্ধের বাজেট যদি খাবারের খাতে বরাদ্দ হত? অস্ত্রের কারখানার বদলে যদি আরও হাসপাতাল, আরও স্কুল তৈরি করা যেত? তাহলে গুপী-বাঘার জগৎবাড়ি এই পৃথিবী কি কিছুটা অন্যরকম হত?
‘চাইব কী! তিনের বেশি তো বর ছিল না! আমি তখনই বলেছি, তিন বর যথেষ্ট নয়…’, নদীর তীরে থেবড়ে বসে গজগজ করে বলেছিল হরতুকি গাঁয়ের বাঘা। বাঘা বাইন। খানিক দূরে ভ্যাবাচ্যাকা মুখ করে কথাগুলো আধবুঝুন্তের মতো শুনছিল গোপীনাথ, আমলকী গাঁয়ের ছেলে গুপী গাইন।
ব্যাপার গুরুতর! ভাবনারও বটে! সবেমাত্তর একরাত হল তারা ভূতের রাজার নেকনজরে এসেছে। নতুনগাঁয়ের বাঁশবনে অশরীরী রাজামশাইকে খুশি করতে পেরেছে তারা। গ্রাম থেকে বিতাড়িত দুই তরুণের দুর্দশা শুনে ভূতসম্রাট তিনখানা বরই দিয়ে ফেলেছেন তাদের। এক নম্বর– তারা হাততালি দিয়ে যা খুশি তাই খাবার আনতে পারবে, দুই নম্বরে ওই একই পদ্ধতিতে জাদুজুতো পায়ে তারা চোখের নিমেষে স্থানান্তরে পৌঁছতে পারবে। আর তিন নম্বর? গুপীর গান আর বাঘার ঢোল মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতাকে সুরতালের সম্মোহনে পাথর করে দেবে– যাকে বলে এক্কেবারে নট নড়নচড়ন অবস্থা!

ছপ্পর ফুঁড়ে এত কিছু পাওয়ার পর আর কী-ই বা সমস্যা? সমস্যা আছে! এর আগেই একবার জঙ্গলে বাঘের মুখোমুখি পড়ে গুপী-বাঘা ভয়ে সাদা হয়ে গিয়েছিল! তারা ঘরছাড়া, চালচুলোহীন। ‘কোথা যাবে-কী বা খাবে জানা নেই।’ ভূতের রাজা সমাধান বাতলে দিলেও, তারা ‘ঘর’-এর বর চাইতে বেমালুম ভুলে গেল। পরদিন হাততালি দিয়ে হাতেগরম খাবারদাবার এনে খ্যাঁটন শেষে আঁচাতে গিয়ে হঠাৎ বাঘার মনে হল ‘রেতের বেলা কী গাছতলায় থাকব?’ কে না জানে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই ঝুপ করে সন্ধে হয়। ফের যদি বাঘ আসে?

সত্যজিৎ রায়ের গুপী গাইন বাঘা বাইন– ১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সেই আশ্চর্য রূপকথা– শুরুই হয় দুই তথাকথিত ‘অযোগ্য’ শিল্পীর নির্বাসন দিয়ে। গুপীর গান শুনে আমলকী গাঁয়ের রাজা তাকে তাড়িয়ে দেয়, বাঘার ঢোল শুনে হরতুকিতেও একই পরিণতি। দুই বিতাড়িত মানুষ জঙ্গলে এসে একে অপরকে খুঁজে পায়। বাড়ি না-থাকলে মানুষের চাওয়াগুলোও একটু অন্যরকম হয়। যার ঘর আছে, সে হয়তো আরও বড় ঘর চায়; যার উঠোন আছে, সে উঠোনের ধারে হয়তো একটা বাহারে গাছ চায়; আর যার পেল্লায় দেরাজ আছে, তার হয়তো সে-কারণেই আর-একটা ঘরের দরকার। কিন্তু গুপী-বাঘার সেসব বালাই নেই। দু’জনেই গ্রামছাড়া, দু’জনেই প্রায় ভবঘুরে, এবং দু’জনেরই একমাত্র সম্বল গান আর বাজনা– যার কোনওটাই এতদিন তাদের বিশেষ সুরে-তালে লাগেনি।


গুপী-বাঘার চাওয়া তিনটি বর, নিজেদের অজান্তেই যেন ভবিষ্যতের অর্থনীতি, কূটনীতি এবং যুদ্ধবিরোধী রাজনীতির একটি ছোট্ট নকশা তৈরি করে ফেলে। হয়তো আজকের কোনও উন্নয়ন অর্থনীতিবিদের হাতে গুপী-বাঘার চাহিদার তালিকাটি পড়লে তিনি নির্ঘাত এর মধ্যে ‘হিউম্যান কেপেবিলিটি এনহ্যান্সমেন্ট’ বা ‘সক্ষমতা বৃদ্ধির’ ঝলমলে নীল-নকশা টের পেতেন! খাবার চাই। কাপড় চাই। পৃথিবীর যে-কোনও জায়গায় যাওয়ার স্বাধীনতা চাই। আর চাই এমন শিল্প, যা মানুষকে মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিতে পারে। আর বাসস্থান? নেই। এই ‘নেই’-টাই সম্ভবত তিন বর-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে গভীর জায়গা। ছোটদের রূপকথা শোনাতে বসে সত্যজিৎ রায় তার মধ্যে সুনিপুণভাবে বুনে দেন বাস্তব পৃথিবীর রূপক! বাড়ি দেয় নিরাপত্তা; কিন্তু ভ্রমণ মানে স্বাধীনতা। একটি মানুষকে শুধু ঘর দিলে সে হয়তো নিরাপদ হবে, কিন্তু তাকে চলার ক্ষমতা না দিলে তার পৃথিবী ছোটই থেকে যাবে। গুপী-বাঘা যেন বলছে– আমাদের আশ্রয়ের চেয়ে গতিময়তা বা মোবিলিটি বেশি দরকার। সম্পদের চেয়ে সার্বিক প্রবেশাধিকারের গুরুত্ব অনেক বেশি।

আজকের অর্থনীতির ভাষায় বললে, এটি প্রায় capability approach-এর এক রূপকথা সংস্করণ। মানুষের কল্যাণ শুধু তার হাতে কত টাকা আছে, তা দিয়ে মাপা যায় না; সে কী করতে পারে, কোথায় যেতে পারে, কী খেতে পারে, কীভাবে নিজের জীবন বেছে নিতে পারে– সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। গুপী-বাঘার প্রথম দুই বর তাই আশ্চর্যরকম আধুনিক।
প্রথম বর– হাততালি দিয়ে চাইলেই পাবে খাবার ও পোশাক। অর্থাৎ দেদার ভোগ করা নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্থান। আমাদের পৃথিবীতে অবশ্য হাততালির বদলে এখন ‘ক্লিক’লভ্য বিস্তর কিছু আছে। গুদাম আছে, বাজার আছে, শেয়ারবাজার আছে, ফিউচার মার্কেট আছে, সরবরাহের বিশাল নেটওয়ার্ক আছে। এক দেশের মাটিতে উৎপন্ন জিনিস অন্য দেশের রান্নাঘরে পৌঁছতে পৌঁছতে পেরিয়ে যায় অগণিত সমুদ্র, বন্দর, ট্রাক, জাহাজ, মুদ্রা ও চুক্তি। সেই বিপুল আয়োজনের দিকে তাকালে গুপী-বাঘার হাতযশকে ঈর্ষা হওয়াই স্বাভাবিক। পৃথিবী এত জটিল হয়ে গেল, অথচ শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রয়োজনটা রয়ে গেল একই– ‘আমাদের যেন খাওয়া পরার কোনও ভাবনা না থাকে।’


গুগাবাবার একতালিতেই কিস্তিমাত। ‘কোর্মা-কালিয়া-পোলাও-জলদি লাও-জলদি লাও!’ অর্থনীতির নিয়মকানুন এখানে একটি অদ্ভুত সমস্যার মুখোমুখি। গুপী-বাঘা যখন হাততালি দিয়ে মুহূর্তে পোলাও, মিষ্টি কিংবা পোশাক পেয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের কাছে মুদ্রাস্ফীতির কোনও অর্থ নেই। সাপ্লাই শক? পরোয়া নেই। লজিস্টিকস তো তুশ্চু! এ তো ভূতের রাজার দান! ইনভিজিবল হ্যান্ডের মতো তিনিই তো নেপথ্যে থেকে চালাচ্ছেন সব। ইঁয়াহা কা মাল উঁয়াহা! মনোবিজ্ঞানী অ্যাব্রাহাম ম্যাসলোরও বোধহয় এ ছবি দেখলে কপালে পড়ত চিন্তার ভাঁজ। মানুষের জীবনে প্রয়োজনের সিঁড়ি কোথায় কেমন তা তিনিই চিনিয়েছিলেন। কিন্তু এই দুই ছোকরা সব গুলিয়ে দিচ্ছে যে! গাড়ি-বাড়ি-সিন্দুক-বন্দুক (এমনকী নিন্দুকও) গুপী-বাঘা চায়নি। কিন্তু ‘রোটি-কাপড়া-মকান’-এর শেষ উপাদানটি তারা ভুলে গেল কেন? নেহাত বেবভুলো হয়ে? উঁহু। দু’জনের মনেই ‘গাঁ-ছাড়া’ হওয়ার দুঃখ, ‘আশ্রয়’ সম্পর্কে হয়তো একটা ধোঁয়াটে মনোভাব এনেছিল অবচেতনে। উপেন্দ্রকিশোরের গল্পে ঘরে ফেরার কথা থাকলেও সত্যজিতের গুপী বাঘা কিন্তু আর কখনও তাদের গাঁয়ের বাড়িতে ফিরে যায়নি! যেহেতু আর কোনও নির্দিষ্ট ঠিকানা রইল না, ফলে ‘তাইরে-নাইরে-বাইরে-যাই রে’ সহজেই হয়ে উঠল তাদের জীবনের সুর! বসুধৈব কুটুম্বকম! সব ঘরে মোর ঠাঁই আছে– ভারতীয় বৌদ্ধিক চর্চার আদিসূত্রের পথ।

গুপী আর বাঘা তো শুরু থেকেই সফল ছিল না। বরং ঠিক তার উল্টো। গুপীর গান শুনে গ্রামের লোকজন অতিষ্ঠ; বাঘার ঢোল শুনে লোকের ঘুম দফারফা। দুই রাজাই শেষ পর্যন্ত তাদের বিদায় করে দেন। আজকের ভাষায় বললে, তারা দু’জনেই ছিল শ্রমবাজারের দুই দুর্ভাগা। তাদের না ছিল চুলো, না ছিল চাল। ভূতের রাজা কিন্তু তাদের চাকরি পাইয়ে দেননি, টাকা বা জমি কিছুই দেননি। দিয়েছিলেন সক্ষমতা। প্রথম বর অভাবকে সামলাল। দ্বিতীয় বর দূরত্বকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিল। গুপী-বাঘার জাদু জুতো যেন প্লেনের আগের টেলিপোর্টেশন, ইন্টারনেটের চেয়েও তুরন্ত, গ্লোবালাইজেশনের চেয়ে এক-পা এগিয়ে থাকা গ্লোবাল মোবিলিটি। গেছোদাদার মতো শুন্ডি থেকে হল্লা, আবার প্রয়োজনমতো অন্যত্র। পৃথিবী তাদের কাছে দূরত্ব হারায়। গোটা দুনিয়াই এক জগৎবাড়ি! গুপী-বাঘার সেই জাদু জুতো এবং হাততালিকে প্রযুক্তি যেন অনুবাদ করে নিয়েছে আজকের ভাষায়। বিমান আছে, মেট্রো আছে, দ্রুতগতির ট্রেন আছে, ভিডিও কল আছে, ডিজিটাল পেমেন্ট আছে। কলকাতায় বসে নিউ ইয়র্কের মানুষের সঙ্গে কথা হচ্ছে। বাড়িতে বসে অন্য দেশে টাকা পাঠানো যাচ্ছে। ফোনের পর্দায় অহরহ ভেসে উঠছে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের হালহকিকত।

কিন্তু এই mobility-রও একটি শর্ত আছে: তারা একা কিছুই নয়। তাদের জাদু কেবলমাত্র একজোটেই কাজ করে। গুপী-বাঘা তাই নিছক দুই বন্ধু নয়; তারা যেন একটি interconnected system-এর রূপক। তাই বোধহয় গুপীর মুখে শোনা যায়– ‘একা তো পায়ে হাঁটতে হবে, আর ভিক্ষে করে খেতে হবে– এক হাতে তো তালি বাজবে না!’ এই ছোট্ট ব্যাপারটি আজকের পৃথিবীর জন্য ভয়ানক গুরুত্বপূর্ণ। কোনও সমাজব্যবস্থা এবং অর্থনীতি একা চলে না। একটি দেশের খাদ্যব্যবস্থা অন্য দেশের জ্বালানি, প্রযুক্তি বা সার-নির্ভর হতে পারে। একটি দেশের যুদ্ধ অন্য দেশের বাজারকে ভয়ানক আঘাত দিতে সক্ষম। এক দেশের মুদ্রানীতি বদলে দিতে পারে অন্য দেশের ক্যাপিটাল ফ্লো-কে। একটি মহামারি বিমানবন্দর পেরিয়ে মুহূর্তে বিপন্ন করতে পারে অসংখ্য দেশকে। কিন্তু একটা জিনিস প্রযুক্তি এখনও পুরোপুরি কবজা করতে পারেনি। তা হল সহাবস্থান। জাদুশক্তি গুপী বা বাঘার একার নয়। তাদের শক্তিটা তৈরিই হয় দু’জনের সম্মিলিত উপস্থিতিতে। একক প্রচেষ্টায় জাদুর জৌলুস খানিক কমে যায় বইকি!

এখানেই সত্যজিৎ রায় অনন্য। নিছক রূপকথার ঝুলি ঝেড়ে গল্পের গাছকে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনেন নিমেষে। আমাদের পৃথিবীতে যোগাযোগের অভাব নেই। কিন্তু বোঝাপড়ার অভাব আছে। সংযোগ বেড়েছে, কিন্তু যোগসূত্র গড়ে ওঠেনি। হুণ্ডী-ঝুণ্ডী-শুণ্ডী-র মানুষের মুখ আমরা দেখতে পাচ্ছি, অথচ পাশের মানুষটার কথা শুনতে পারছি না।

বেসুরো গুপীর গলায় যেদিন প্রথম সুরের লহর খেলে গেল, সেদিনের সুর্যোদয় দেখে সে আনন্দে ডিগবাজি খেয়েছিল। অন্যদিকে ‘ব-এ কাঠি, ঘ-এ কাঠি, ঢোলে চাঁটি’ দিয়ে বাঘা-ও যখন ঢোলে তুমুল বাজনা শুরু করে দিল, তখন তিন নম্বর বরের দাপট বিলক্ষণ টের পাওয়া গেল। এই গানের জেরেই গুগাবাবা একসময় পৌঁছে গেল শুণ্ডীরাজের দরবারে। ‘সে দেশের লোকের মুখে নাইরে ভাষা, তারা তাও কাছে এসে, হেসে হেসে জানায় কত ভালোবাসা।’ শুণ্ডীর রাজসভায় গান শোনাতে গিয়ে গুপী-বাঘা টের পেল ভূতের রাজার বিচক্ষণতার বহরখানা! দুই হাতে তালি দিলে প্রথম দু’টি বর কাজ করে, কিন্তু একটা গোপন বোঝাপড়া বা শর্ত সেঁধিয়ে আছে তিন নম্বরের অন্দরে। গানবাজনার মধ্যিখানে তিনবার তালি দিলে গানের সম্মোহনী জাদু যায় ফুরিয়ে। ‘মহারাজা তোমারে সেলাম’ গানের শেষে ‘এসেছি তাহারই জন্য রাজা,… মহারাজ’ উচ্চারণের শেষেই গুপী নির্দিষ্ট বিরতি মেনে গুনে গুনে তিনবার তালি দেয়। স্পেলব্রেক! জবর জবর তিন বরের জাদু তিন তালিতেই গায়েব! আন্তরিক দর্শক নিশ্চিত খেয়াল করেছেন গানের পরের অংশ– ‘মোরা সেই ভাষাতেই করি গান/রাজা শোনো ভরে মনপ্রাণ’ থেকেই গানের লয় বদলায়! পর্দায় ফুটে ওঠে অন্য জাদু– রাজা সহ সভাসদ প্রত্যেকে স্থিরভাব কাটিয়ে উঠে গান শুনছেন। সুর-তাল-লয় মেনে দুলছেন, ভাসছেন আনন্দে! ব্যাপারটা বুঝে গুপীবাঘা এরপর গোটা গান জুড়ে তালি দিয়ে রাজা-সহ প্রজাদের শোনায় ‘ও রাজা শোনো’ গানটি, যাতে পাথর হয়ে থাকার বদলে সজীব হয়ে মূক প্রজারা সুরের আনন্দের ভাগ নিতে পারে।

এরপরেই বিনা মেঘে বজ্রপাত! রূপকথাটি হঠাৎ হয়ে ওঠে যুদ্ধের গল্প।
হাল্লার রাজা শুন্ডী আক্রমণ করতে চলেছেন। সেনাবাহিনী প্রস্তুত। অস্ত্র প্রস্তুত। রাজনীতি চোখ রাঙিয়ে তৈরি। যুদ্ধের অর্থনীতি শুরু হয়ে গেছে। সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছে। এরই মধ্যে গুপী-বাঘা এসে গান শুরু করে। সৈন্যরা পাথরের মতো থেমে যায়। এক আশ্চর্য ব্রহ্মাস্ত্র! আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ থামাতে অগুনতি মিসাইল, নিউক্লিয়ার ডকট্রিন, ডেটারেন্স– গালভরা নাম আর শব্দের ছড়াছড়ি। সত্যজিৎ রায় তাঁর এই ছোটদের ছবিতে অবলীলায় লিখে দেন এক যুদ্ধবিরোধী ইস্তেহার!

আরও মজার ব্যাপার হল, গুপী-বাঘা সেনাদের আহত করে না, তাদের রুখে দেয়। যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে শত্রুপক্ষের বদলে মানুষ হিসেবে তাদের চিনে নেয়। সৈন্যরা তখন আর ‘enemy combatant’ নয়; তারা ক্ষুধার্ত মানুষ। যুদ্ধের মহৎ আদর্শ, রাজকীয় অহংকার, ভূখণ্ড দখলের স্বপ্ন– সব কিছুর আগে তাদের পেট, তাদের খিদে। লড়াইয়ের ময়দানে হঠাৎ দেখা যায় গুপীবাঘার জাদু। আকাশ থেকে অলিখিত শান্তিচুক্তির মতো নেমে আসছে হাঁড়ি হাঁড়ি মণ্ডামিঠাই! খাবার নামতেই বুভুক্ষু সেনারা লড়াই ফেলে দৌড়য় মিষ্টি খেতে। যুদ্ধের অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের উদ্দেশে সত্যজিতের এ এক নির্মম রসিকতা।

যে সৈন্যকে রাষ্ট্র বরাবর যুদ্ধ করার জন্য উসকানি দিয়েছে, তাকে যদি লড়াইয়ের পরিবর্তে দু’বেলা ভরপেট খেতে দেওয়া যায়, তাহলে সে মানুষের আচরণ যায় বদলে। অর্থাৎ সংঘাতের নেপথ্যে কোনও তাত্ত্বিক আদর্শ থাকলেও মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলি বরাবরই একইরকম সংবেদনশীল থেকে যায়। ‘তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল!’ এ তো নিছক গানের কথা নয়! বরং একগুচ্ছ জরুরি প্রশ্নের উৎসমুখ! যুদ্ধের বাজেট যদি খাবারের খাতে বরাদ্দ হত? অস্ত্রের কারখানার বদলে যদি আরও হাসপাতাল, আরও স্কুল তৈরি করা যেত? সীমান্তে যে টাকা নিরাপত্তার জন্য ব্যয় হয়, তার সামান্য অংশ যদি জল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে যেত? তাহলে গুপী-বাঘার জগৎবাড়ি এই পৃথিবী কি কিছুটা অন্যরকম হত? ভূতের রাজার তৃতীয় বর তাই সবচেয়ে গভীর। হাল্লার রাজার হিংস্রতার উৎস বরফির যে জাদুর প্রভাবে তৈরি হয়েছিল, সংগীত তার প্রভাবও কাটিয়ে দেয়। সম্মুখ সমরের অব্যর্থ দাওয়াই গুপীর গান, বাঘার ঢোল!

গুপী গাইন বাঘা বাইনের গোটা সিরিজ জুড়েই ‘তিন’ সংখ্যাটির প্রবল প্রতাপ। কেবল তিন বর নয়। গানের তেহাই, গাইন ও বাইন পদবির অক্ষর সংখ্যা, আমলকী গ্রামের রাজার ব্যঙ্গ (তৃতীয় সুর), এমনকী, জাদুকর বরফির মেয়াদ, সেও তিনদিন! অন্যদিকে হাল্লা রাজা যখন যুদ্ধঘোষণা করে চিঠি পাঠায় শুণ্ডীতে, সেখানেও ছিল তিনদিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ করার আদেশ। একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়ে যে, ভূতের রাজার প্রতিটি কথা তিন বার করে বলার ঝোঁক, আর তার ঝিকমিকে তারাটিও আদতে দু’টি উল্টোনো ত্রিভুজের সমাহার! গুপী-বাঘা হাতে তালি দিয়ে বরফ-ঘেরা হুণ্ডী আর ধু-ধু মাঠের ঝুণ্ডীতে ভুলবশত হাজির হওয়ার পর তিনবারের চেষ্টাতেই সঠিক গন্তব্য শুণ্ডীতে গিয়ে পৌঁছয়। সর্বোপরি বড়পর্দায় গুপী বাঘার অভিযানের সংখ্যাও যে তিন! আর তিনবারই তারা বাঘমামার মুখোমুখি গিয়ে পড়েছিল প্রতিকূল পরিস্থিতিতে।

‘এভাবেই গাও, স্যাঁসায়ো না!’ হাল্লা রাজার জেলখানায় বসে গুপীকে বলা বাঘার এই মন্তব্য ভাবিয়ে তোলে। গানের এমন দুরন্ত সমঝদার বাঘা এমন কথা কেন বলল? গুপীর অসংখ্য ভালো গানের ভিড়ে ‘এক যে ছিল রাজা, তার ভারি দুখ’ নামের এই বিষাদসুরের মায়াকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত করে বাঘা বলে, ‘বাহ্! বড় ভালো বেঁধেসো তো গানখানা!’ মানিকজোড় তখন বেকায়দায়। সেনাদের জালে বন্দি হয়ে জাদুজুতোর একপাটি খোয়া গিয়েছে। ফাটক পেরিয়ে চম্পট দেওয়ার জো নেই। একটি বরের কার্যকারিতা উধাও হলেও, জেলের মধ্যে খাওয়া আর গাওয়ার যেন কোনও বিরাম নেই। বন্দি গুগাবাবা যেন নির্লিপ্ত নির্জনতায় সুরের জাল বুনে চলে, আর সেই জাদুতে মোহাবিষ্ট হাল্লা রাজা নেশা ছুটে গিয়ে আধো আধো স্বরে বলে ওঠেন, ‘আমার… ছুটি হবে না?’ এ যেন বর্তমান পৃথিবীর ইঁদুরদৌড়ে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত মানুষের ক্লান্ত উচ্চারণ।

গানের সুর, ঝাঁকে ঝাঁকে এসে মনে বাসা বাঁধে, আশা জাগায় মানুষের। সুদিনের আশা। বোবা হয়ে যাওয়া পৃথিবীর মুখে সুরের ভাষা, ছন্দের ভাষা, আনন্দের ভাষা! সকলে বোঝে বলেই তা ভোরের আলোর মতো সুন্দর। মনের কালো মুছিয়ে দিতে পারে সে অবলীলায়! এক্ষেত্রে আর তিন তালি নয়! নয় স্পেলব্রেক বা চটকা ভাঙিয়ে বাস্তবকে দেখানোর চেষ্টা। যা সত্যি তা-ই জাদু! নীল দিগন্তে তখন ম্যাজিক। কয়েদখানায় বসে গাওয়া গুপী গাইনের সুরেলা উচ্চারণ যেন স্পর্শ করে মানুষের বিমর্ষ মনকে– ‘দুঃখ যাবে কি?’ গানের সুর, প্রাণের সুর মিলেমিশে উধাও হয়ে যায় এই অনন্ত তেহাইয়ের গভীরে!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved