Amit Shah’s ‘Slums City’ Remark on Kolkata Sparks Controversy। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিভেদের রাজনীতি উসকে দিচ্ছে বস্তি নিয়ে অবজ্ঞা

সেই বিভেদ বা বিদ্বেষ শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে করা হচ্ছে, এমনটা নয়, তা তৈরি করা হচ্ছে উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যেও। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নির্বাচনী প্রচারে এসে বলেছেন, কলকাতা না কি বস্তিতে ভরে গিয়েছে! এবং সেই বস্তিতে না কি অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা থাকেন। এখানেই থামেননি, আরও বলেছেন– কলকাতা শহর অত্যন্ত নোংরা, ঘিঞ্জি এবং দূষিত! সঙ্গে যোগ করেছেন, তাঁরা অর্থাৎ, বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই শহরকে তাঁরা বিকাশিত করবেন।

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১৮:২১   
Facebook WhatsApp Messenger

দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখন বাংলায় নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত। এসেছেন বললে ভুল বলা হবে, প্রচারে আছেন এবং সেই প্রচারে যত না দেশের উন্নয়নের কথা, তার থেকে অনেক বেশি আছে বিভেদের রাজনীতির কথা। সেই বিভেদ বা বিদ্বেষ শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে করা হচ্ছে, এমনটা নয়, তা তৈরি করা হচ্ছে উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যেও। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নির্বাচনী প্রচারে এসে বলেছেন, কলকাতা না কি বস্তিতে ভরে গিয়েছে! এবং সেই বস্তিতে না কি অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা থাকেন। এখানেই থামেননি, আরও বলেছেন– কলকাতা শহর অত্যন্ত নোংরা, ঘিঞ্জি এবং দূষিত! সঙ্গে যোগ করেছেন, তাঁরা অর্থাৎ, বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই শহরকে তাঁরা বিকশিত করবেন।

এমন কথা যখন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, তখন তা বিশ্বাসও করছেন বহু মানুষ। কেউ তখন অন্য শহর বা বস্তির কথা বলে উল্টে তাঁকে প্রশ্ন করে বিব্রত করছেন না। মনে পড়ে যাচ্ছে, চিনের রাষ্ট্রপতি শি জিং পিং এবং জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে যখন আহমেদাবাদে এসেছিলেন, তখন সেই শহরের বেশ কিছু বস্তি কিন্তু ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে বিদেশি অতিথিদের এই ‘নোংরা’ অঞ্চল চোখে না-পড়ে। ২০২০ সালে যখন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এসেছিলেন, তখন ‘শরণ্যবাস’ বস্তি অঞ্চলে কিন্তু ত্রিপল দিয়ে ঢাকা হয়নি, স্থায়ী কংক্রিটের দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, সামনে থেকে বিদেশি অতিথিরা এই বস্তিবাসীদের যাতে দেখতে না পান এবং তাঁরাও যাতে ওই নির্দিষ্ট বস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন। আহমেদাবাদ মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন ইন্দিরা সেতুর অদূরে অবস্থিত ‘শরণ্যবাস’ বস্তির চারপাশে প্রায় ৪ থেকে ৭ ফুট উঁচু এবং ৪০০ থেকে ৬০০ মিটার দীর্ঘ একটি অস্থায়ী প্রাচীর নির্মাণ করেছিল। এই এলাকাটি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সবরমতী আশ্রম এবং মোতেরা স্টেডিয়ামগামী পথের ওপর অবস্থিত। এই প্রকল্পের জন্য না কি খরচ হয়েছিল ১০০ কোটি টাকা!

zoom
গুজরাতে বস্তি আড়াল করতে তোলা হয়েছে পাঁচিল

এইরকম উদাহরণ তো, রবীন্দ্রনাথের ‘জুতো অবিষ্কার’-এ আমরা পেয়েছি। শহরের ধুলো ঢাকতে সারা শহরকে চাদর দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়ার উদাহরণ তো রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখে গিয়েছেন। তার বদলে যে সাধারণ একটি জুতো পরলে পায়ে ধুলো লাগানো থেকে বাঁচা যায় এবং তা যে সাধারণ বোধবুদ্ধি কাজে লাগিয়েই করা যায়– সেটাও আমরা জানি। কিন্তু তার সঙ্গে আজকের বস্তির বা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষণের কোথায় মিল, সেটা হয়তো অনেকে বুঝতে পারছেন না।

আসলে গত ১২ বছরের নরেন্দ্র মোদীর সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল, মানুষের জীবনযাত্রার মানকে উন্নত করার। প্রতিশ্রুতি ছিল চাকরি দেওয়ার, কর্মসংস্থান তৈরি করার, তা কি তাঁরা করেছেন? ‘গরিবি হঠাও’ করতে গিয়ে তো গরিবদেরই আরও দরিদ্র বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সঞ্জয় গান্ধী তো উন্নয়ন করতে গিয়ে বেশ কিছু বস্তি উচ্ছেদও করেছিলেন, তা নিয়ে কংগ্রেসকে কম সমালোচনা শুনতে হয়নি। গত ১০-১২ বছরের বিজেপি সরকার নানা শহরে এই বস্তি উচ্ছেদ করেছে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে, দিল্লির নয়ডার আশেপাশে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী খোঁজার নাম করে, বাংলাভাষী মানুষদের নানাভাবে যে হেনস্তা হতে হয়েছে, তার বহু উদাহরণ ভুরিভুরি আছে। বাংলা থেকে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিক মালদহের আমির শেখকে ওই গুরগাঁওয়ের বস্তি থেকে তুলে, কীভাবে পে লোডার করে বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল, তা কি আমরা ভুলে গিয়েছি? না কি ভুলে যাব সোনালি খাতুন বা সুইটি খাতুনদের মতো বীরভূমের পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা? সুইটি খাতুন আমাদের দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও, কোনও কারণ ছাড়াই এখনও বাংলাদেশের জেলে আছেন।

zoom
বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিক দেশের নানা প্রান্তে হেনস্তার শিকার

সমস্যা হচ্ছে, আমরা কোনওদিনই এই গরিব, বস্তিবাসীদের ঠিক আমাদের সমতুল্য মানুষ ভাবিনি, ভাবি না। তার ওপর সেই মানুষদের কেউ যদি ধর্মে মুসলমান হন, তাহলে তো কথাই নেই! আমরা ধরেই নিই, মুসলমান মানেই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী! তাঁদের দিয়ে বাড়ির সমস্ত রকম কাজ করাই, কিন্তু কোনওদিনও ভাবি না, তাঁদের জন্য আমরা যে বেতন দিই, তাতে তাঁদের সংসার চলে কী করে? আমরা একসময়ে মনে করেছি, এই বস্তিবাসীরা কোভিডের সংক্রমণ বাড়িয়েছে, তাই তাঁদের জন্য আমাদের বহুতল আবাসনের দরজা বন্ধ করে দিয়েছি। আমরা এই সমস্ত কিছু করেছি, করি বলেই আমাদের উদ্দেশ্য করেই দেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, মধ্যবিত্তরা যাতে ভালো থাকেন, তার জন্য তিনি না কি অনেক চেষ্টা করেছেন গত ১২ বছরে। সেই জন্যেই তিনি এবং তাঁর মন্ত্রীসভার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী সহজে মধ্যবিত্তের মধ্যে ওই বস্তিকে নোংরা এবং বস্তিবাসীদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দিতে পারেন এবং আমরা কোনও প্রতিবাদ ছাড়া তা মেনেও নিই। বস্তিবাসী মানুষদের কীভাবে দারিদ্রসীমার বাইরে নিয়ে আসা যায়, তার কোনও চেষ্টাই কিন্তু ওই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে করা হয়নি।

এই বাংলায় কিন্তু গত কয়েক বছরে সেইরকম একটা চেষ্টা চোখে পড়ছে। গত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে কলকাতার প্রায় সমস্ত বস্তি অঞ্চলগুলোর উন্নয়নের চেষ্টা হয়েছে। প্রায় ৩৫০০ বস্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘উত্তরণ’। সকল বস্তির প্রবেশপথে খিলান ও সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। ২০২৫-’২৬ স্যানিটেশন প্রোগ্রামে ১৮৪টি নতুন স্যানিটারি শৌচালয় নির্মাণ এবং বিদ্যমান ২৮০০টি মেরামত করা হয়েছে। ময়লা পথ পাকা সড়কে রূপান্তর এবং স্ট্রিটলাইট স্থাপিত হয়েছে। ১৫০০টিরও বেশি পরিবারকে জলের কল, ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ পাইপলাইন এবং ধোঁয়াবিহীন চুল্লির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বেসরকারি প্রোমোটারদের দ্বারা উচ্ছেদ হওয়া থেকে বাসিন্দাদের রক্ষা করার জন্য, কলকাতা কর্পোরেশন স্পষ্ট করেছে যে, এই অঞ্চলগুলি ‘ঠিকা’ জমি বিভাগের অধীনে নিবন্ধিত হবে। এপ্রিল ২০২৫ সালে, কলকাতা কর্পোরেশন বাসিন্দাদের ‘ঠিকা’ বা ভাড়াটে হিসাবে নিবন্ধন করার জন্য আবেদন উইন্ডোটি পুনরায় চালু করে। গত বছরের ১ মে থেকে শুরু হওয়া সমস্ত ৩০৭৯টি নিবন্ধিত বস্তিকে ছয় মাসের জন্য ঠিকা সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করার অনুমতি দেয়। এই আইনি সুরক্ষার লক্ষ্য ভূমি অধিকার এবং রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন সংক্রান্ত চলমান উত্তেজনা সত্ত্বেও স্থানচ্যুতি রোধ করা। এইগুলো আসলে উন্নয়ন, যা মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন আনতে পারে। উন্নয়ন মানে শুধু শিল্পের জন্য পরিকাঠামো তৈরি নয়, উন্নয়ন মানে শুধু বড় বড় ব্রিজ আর চওড়া রাস্তা, যা বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের মাথায় আছে, তা নয়। উন্নয়ন মানে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, সমস্ত মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাওয়া।

নাট্যকার কৌশিক সেনের একটি সাক্ষাৎকার দেখছিলাম। তিনি বলছিলেন একটা সময়ে বাচ্চাদের বলা হত, ‘তুমি কি বস্তিতে থাকো, যে এই রকম কাজ করছ?’ যেহেতু তাঁদের বাড়ি বরাবরই বামপন্থী, কৌশিক সেনকে শুনতে হয়েছিল, ‘তোর বাবা তো বস্তির পার্টি করে’। তাতে ছোটবেলায় খুব কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি, তখন তাঁর বাবা নাট্যকার শ্যামল সেন বলেছিলেন ‘তুমি গর্ব বোধ কর, তোমার বাবা বস্তিতে যাঁরা থাকে, তাঁদের দল করে।’ বস্তিতে যাঁরা থাকে তাঁরা তো গরিব, সেই দরিদ্র মানুষদের থাকার জায়গাকে কেউ যদি বলে অনুপ্রবেশকারীদের ডেরা, তাহলে তো তার বিরোধিতা করতেই হয়। আসলে অনুপ্রবেশকারী থাকে বলে ওই বস্তিগুলোকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে, সেখানে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের বহুতল আবাসন বানাতে চান তাঁরা। সেই জন্যই এই কথাগুলো তাঁরা হাওয়ায় ভাসিয়ে দেন, আর আমরা যাঁরা শহরের সুবিধাভোগী অংশ, সেই রাজনীতিটা ধরতেও পারি না, ভাবি ওঁরা হয়তো উন্নয়নের কথা বলছেন।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন সুমন সেনগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা

……………………

Bengal Election 2026 Bengal Politics Development Elections2026 Kolkata Migrant worker Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Slums City Sonali Khatun উন্নয়ন

Share this article on