Robbar

সতু সেন: যে আঁধার আলোর অধিক

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 17, 2026 1:52 pm
  • Updated:August 17, 2026 1:52 pm  

হাসান শহিদ সারাওয়ার্দির এই পরামর্শকে নিজের জীবনে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন সতু সেন। বিদেশ-বিভুঁইয়ের ভয়ঙ্কর প্রতিকূলতা সামলে আমেরিকা ও ইউরোপের জগৎ-বিখ্যাত নাট্যগুরুদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি। দেশে ফিরে সেই শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার বলিষ্ঠ প্রয়োগ করেন। বলা বাহুল্য, ভারতীয় নাট্যে আধুনিকতার ছোঁয়া তাঁর হাতেই। কটু সত্যিটা হল বাংলা তথা ভারতের এই আন্তর্জাতিক মানের নাট্যব্যক্তিত্ব আজ বিস্মৃতপ্রায়। ফলে ‘এবং অধ্যায়’ প্রকাশিত দেবেশ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘সতু সেন: এক মঞ্চ সাধক’ গ্রন্থটি অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকাশনা।

কিশোর ঘোষ

সম্প্রতি সারাওয়ার্দি এভিনিউয়ের নামবদল ঘিরে বিতর্ক দানা বেধেছিল। হাসান শহিদ সারাওয়ার্দির নাম মুছে গোপাল পাঁঠার নামে রাস্তা হল। বাঙালি কূটনীতিক, অনুবাদক, কবি, শিল্প-সমালোচক, নাট্যপ্রেমী গবেষক ও অধ্যাপক এই হাসান শহিদ সারাওয়ার্দির সঙ্গে যুবক সতু সেনের দেখা না হলে বাংলা তথা ভারতের কিংবদন্তি নাট্যব্যক্তিত্ব সতু সেনের ‘জন্ম’ই হয় না। ভেবে দেখলে সেই ১৯২৫ সালে, অর্থাৎ কি না আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে বাংলা তথা ভারতের আধুনিক থিয়েটার চর্চার অভিমুখ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কীভাবে?

হাসান শহিদ সারাওয়ার্দি

কাকতালীয় কাণ্ড। প্যারিসের একটি রেস্তরাঁয় আলাপ হয় বরিশালের সতু আর কলকাতার হাসানের। মস্কোয় বাগীশ্বরী (আমন্ত্রিত) অধ্যাপক হিসাবে পড়াতে গিয়েছিলেন হাসান। তার ফাঁকে শিল্পভূমি প্যারিসকে চেখে দেখতে, বিশেষত থিয়েটারের স্বাদ নিতে ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ হাজির হয়েছিলেন কৃতি এই অধ্যাপক। অন্যদিকে কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বৃত্তি পেয়ে ১৯২৫ সালের এক মেঘলা দুপুরে টমাস কুকের জাহাজে চেপে বসেন ‘বরিশাইল্লা’ সতু। মতলব ছিল প্যারিসে কিছুদিন কাটিয়ে তারপর আমেরিকায় যাবেন। কিন্তু নিয়তি– বিলেতি ভাষা, সংস্কৃতি, খাবার নিয়ে বিভ্রান্ত সতুর সঙ্গে প্যারিসের রেস্তরাঁয় দেখা হয় হাসানের। বেশ খানিকটা আলাপচারিতার পর বয়সে ১২ বছরের বড় নাট্যপ্রেমী অধ্যাপক হাসান স্বদেশি যুবকের নাটকের প্রতি তীব্র ভালোবাসা অনুভব করেন। ‘আত্মস্মৃতি’তে সতু সেন লিখছেন– ‘এক সময় খুবই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন তিনি (হাসান শহিদ সারাওয়ার্দি), বললেন, নাটকের ব্যাপারে তোমার যখন এত আগ্রহ, তখন এসব ইঞ্জিনিয়ারিং-টিয়ারিং পড়ার কী দরকার তোমার? এখানে এসেছ, নাটক নিয়ে পড়াশোনা কর, হাতেকলমে কাজ শেখো, তারপর দেশে ফিরে গিয়ে তোমার শিক্ষাকে কাজে লাগাও।’

হাসান শহিদ সারাওয়ার্দির এই পরামর্শকে নিজের জীবনে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন সতু সেন। বিদেশ-বিভুঁইয়ের ভয়ঙ্কর প্রতিকূলতা সামলে আমেরিকা ও ইউরোপের জগৎ-বিখ্যাত নাট্যগুরুদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি। দেশে ফিরে সেই শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার বলিষ্ঠ প্রয়োগ করেন। বলা বাহুল্য, ভারতীয় নাট্যে আধুনিকতার ছোঁয়া তাঁর হাতেই। কটু সত্যিটা হল বাংলা তথা ভারতের এই আন্তর্জাতিক মানের নাট্যব্যক্তিত্ব আজ বিস্মৃতপ্রায়। ফলে ‘এবং অধ্যায়’ প্রকাশিত দেবেশ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘সতু সেন: এক মঞ্চ সাধক’ গ্রন্থটি অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকাশনা।

২৮২ পাতার এই গ্রন্থপাঠ যেমন কিংবদন্তি নাট্যবক্তিত্ব সতু সেনের বাংলা থিয়েটারে অপরিসীম তথা অমূল্য অবদান সম্পর্কে ধারণা দেয়, তেমনই পাঠকের আন্দাজ হয়– কীভাবে গিরিশ ঘোষ থেকে শিশিরকুমার ভাদুড়ী হয়ে শম্ভু মিত্র কিংবা উৎপল দত্তের যুগে পৌঁছেছিল নাটকচর্চা। এখানে তিন পর্বে রচনা সংকিলত হয়েছে। প্রথম পর্ব ‘লেখালিখি: সতু সেন’ সম্ভবত সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। এই অংশে রয়েছে ‘আত্মস্মৃতি’ ছাড়াও থিয়েটারের বিভিন্ন দিক, যেমন মঞ্চ, আলো, রূপসজ্জা, অভিনয় ইত্যাদি বিষয়ক খোদ সতু সেনের ১৪টি মূল্যবান রচনা। দ্বিতীয় পর্ব ‘বিষয়: সতু সেন’-এ একাধিক নাট্যব্যক্তিত্ব, সমালোচক ও গবেষকেরা নাতিদীর্ঘ গদ্যে স্মৃতির পথে হেঁটে সতু সেনের মূল্যায়ন করেছেন। কীভাবে দেশে প্রথম রিভলভিং স্টেজ তৈরি করেন সতু সেন, তিনিই যে হোল নাইট অনন্তকালীন নাটকে দাড়ি টানেন এবং মঞ্চ পরিবেশনাকে তিন ঘণ্টার সময়সীমায় বাঁধেন, তাঁর নাট্যশিক্ষায় স্বদেশি মঞ্চে প্রথমবার মুড লাইটের প্রচলন হয় ইত্যদি বিষয় উঠে এসেছে সুধী প্রধান, শিবনারায়ণ ঘোষ, অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়, তাপস সেন, কনিষ্ক সেন প্রমুখের লেখায়।

‘আধুনিক নাট্য ব্যক্তিত্ব: সতু সেন’ রচনায় সুধী প্রধান লিখছেন, ‘আগেকার থিয়েটার আমরা সারা রাত ধরে দেখতাম কারণ রাত্রিতে তো বাস, ট্রাম পাওয়া যাবে না, কাজেই মানুষ যেতেই পারত না। কিন্তু পরে caplitalist development যেভাবে হচ্ছে তার সঙ্গে মানুষের সময়ের দাম এসে গেছে, প্রতিটা মিনিটই এখন মানুষের দরকার। সেই কারণেই অল্প সময় অর্থাৎ তিন ঘণ্টায় একটা নাটক সম্পূর্ণ করা দরকার– এই ভাবনায় সতুদাই প্রথম অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তার technological experience দিয়ে। তিনি বাংলা থিয়েটারকে একটা modern form দেওয়ার জন্য ছটফট করেছেন।’ সতু সেনকে নিয়ে লেখা কিংবদন্তি আলোকসম্পাত শিল্পী তাপস সেনের গদ্যটির শিরোনাম ‘আমার অনুপ্রেরণা ও পথপ্রদর্শক’। সেখানে তিনি লিখছেন– ‘দেশে প্রত্যাবর্তনের পর সতু সেন মঞ্চে নাটকের উপস্থাপনা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। নাটককে তিন ঘণ্টার সময়সীমা মধ্যে বেঁধে দেওয়া, মনস্তত্ত্ব-সম্মত আলোক-সম্পাত, বিভিন্ন নৈসর্গিক পরিস্থিতির মঞ্চ রূপদান, ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চ নির্মাণ, শোভন শিল্পরুচির সঙ্গে কারিগরি দক্ষতার মিশ্রণ ইত্যাদি বিষয়গুলির উদ্ভাবনা এদেশে তিনিই প্রথম করেছিলেন।’

সতু সেন

সতু সেনের শূন্য থেকের শুরুর কথা মনে করিয়ে দেন তাপস। তিনি লেখেন– ‘তিনি যে-সময়ে এদেশে আলোক-সম্পাত ও মঞ্চস্থাপত্যের কাজে ব্যাপৃত ছিলেন, সে-সময় প্রয়োগের উপযোগী উন্নতমানের যন্ত্রপাতি বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। রঙমহল থিয়েটারে যুক্ত থাকার সময় আমি একটি কক্ষে কালের ধুলোয় জীর্ণ নানা ধরনের যন্ত্রপাতি দেখতে পাই। আমার ঔৎসুক্য বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় পরিণত হয় যখন জানতে পারি সেসব কিছুই সতু সেন আধুনিক প্রয়োগ-কৌশলকে প্রকাশ করার জন্য নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মাণ করেছিলেন।’ ভারতবিখ্যাত আলোকসম্পাত শিল্পীর কলমে আক্ষেপের সুর– ‘গভীর পরিতাপের বিষয় এদেশে আজ পর্যন্ত নাট্য সংক্রান্ত কোনো মিউজিয়ম গড়ে ওঠেনি, যেখানে বিগত যুগের শিল্পীদের কাজকর্মের নিদর্শনগুলিকে রক্ষা করা, সেগুলির মডেল বা আলোকচিত্র একালের সামনে তুলে ধরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

থিয়েটারপ্রেমী আমরা জানি, সতু সেনের মতো একথা তাপস সেনের ক্ষেত্রেও ষোলো আনার উপর আঠারো আনা অপ্রিয় সত্য। ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বিষয়টি তৃতীয় বিশ্বের সিলেবাসেই যেন নেই! এই কারণেই এই লেখার শুরুতেই আলোচ্য গ্রন্থটিকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, বইটিতে প্রধান দুই পর্ব ছাড়াও রয়েছে তৃতীয় একটি জরুরি পর্ব। যেখানে সংকলিত হয়েছে সতু সেনের জীবনপঞ্জি, সতু সেন পরিচালিত ও শিল্পনির্দেশিত নাটক ও চলচ্চিত্রের তালিকা এবং অসংখ্য ছবির উজ্জ্বল উদ্ধার। এই সমস্ত কারণে অসীম ‘ধন্যবাদার্হ’ ‘সতু সেন: এক মঞ্চ সাধক’-এর সম্পাদক সমকালীন বাংলা থিয়েটার ও সিনেমার অন্যতম মুখ দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। বিশেষত ‘মঞ্চকারু’, ‘মঞ্চে আলোক-সম্পাতের ইতিহাস’, ‘রং ও আবেগমূল্য’, ‘রং ও প্রতীক চেতনা’, ‘আলো বনাম রঙিনবস্তু’, ‘নাটক নির্বাচন’, ‘রূপসজ্জা’র মতো খোদ সতু সেনের মণিমুক্তর মতো রচনাগুলি বিস্মৃতির অতল থেকে তুলে আনার জন্য প্রণম্য দেবেশ। সতু সেনের এই রচনাগুলি ‘নাট্য বিশ্ববিদ্যালয়ে’র আজকের শিক্ষার্থীদের জন্যও অবশ্যপাঠ্য। এবং ‘আত্মস্মৃতি’।

সহজপাঠ্য নান্দনিক এই গদ্য প্রমাণ করে সতু সেনকে কেবল নাট্যব্যক্তিত্ব তকমা দিলে ছোট করা হবে। বরং তিনি ছিলেন বিশ্বপথিক এক নাট্যসাধক। উনিশ শতকের শুরুতে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্য পরিচালক হিসেবে মান্যতা পেয়েছিলেন যিনি, সেই স্তানিস্লাভস্কির সুযোগ্য শিষ্য রিচার্ড বলিস্লাভস্কির শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে মৃত্যুর পরোয়া পর্যন্ত করেননি সতু সেন। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বৃত্তি পেয়ে আমেরিকায় যাওয়া মানুষটা থিয়েটারের শিক্ষা নিতে দিনের পর দিন না খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন। একদিন তো মরণাপন্ন অবস্থা হয়। আত্মস্মৃতিতে লিখছেন– ‘এক রাতে চূড়ান্ত ক্ষুৎকাতর অবস্থায় ভয়ংকর ঠান্ডার মধ্যে একটি পার্কের বেঞ্চে বসেছিলাম। হিমে চারপাশের আলো ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছিল। পেটের মধ্যে এক অব্যক্ত যন্ত্রণা– দুই কানে অবিশ্রান্ত ঝিঁঝি পোকার ডাকের মতো শব্দ শুনছিলাম। হাতে-পায়ে অসম্ভব জ্বালা– বুঝতেই পারিনি কখন ঠান্ডায় সারা শরীর একেবারে অসাড় হয়ে আসছে। মনে হচ্ছিল, চোখের ওপর একটা গভীর কালো পর্দা নেমে আসছে। ক্রমশ জ্ঞান লুপ্ত হচ্ছিল।’ কিন্তু হাসান সারওয়ার্দির সঙ্গে দেখা হওয়ার মতোই এ-ও ভাগ্যবিধাতার এক ম্যাজিক! আমেরিকান এক পুলিশকর্মী প্রাণ বাঁচান সতু সেনের। শুধু সুস্থ করে তোলাই নয়, ভারতীয় যুবকের খাওয়া-থাকার বন্দোবস্তও করেন তিনি। ওই আমেরিকান পুলিশকর্মী নিশ্চিত কোনওদিন জানতে পারেননি, আদতে আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারকেই সেদিন রক্ষা করেছিলেন।

মনে রাখতে হবে, কেবল নিজে আধুনিক থিয়েটার রীতির শিক্ষাগ্রহণ করা এবং দেশে ফিরে তা প্রয়োগেই ক্ষান্ত দেননি সতু সেন, বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় থিয়েটারের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য শিশিরকুমার ভাদুড়ীকে বিলেতে পারফর্ম করতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এর জন্য বিপুল দেনার দায়ে পড়েন। রঙ্গমঞ্চের প্রতি মানুষটার তীব্র ভালোবাসার কথা ধরা রয়েছে সতু সেনের ‘আত্মস্মৃতি’তে।

এমন একজন মানুষকেই কি না বিস্মৃতির অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে একালের বাঙালি! সম্ভবত একই কারণে ‘সারওয়ার্দি’ বিভ্রম ঘটে আমাদের। যে হাসান শহিদ সারাওয়ার্দির নাম মুছে গোপাল পাঁঠার নামে রাস্তা হয়, তিনিই যে বাংলা তথা ভারতীয় থিয়েটারের যুগপুরুষ সতু সেনের অনুপ্রেরণা-দাতা। প্যারিসের রেস্তরাঁয় ওই আলাপচারিতাতেই যে লেখা হয়েছিল আজকের থিয়েটারের অভিমুখ, বোকার মতো ভুলে গেলাম আমরা!

সতু সেন: এক মঞ্চ সাধক
সম্পাদনা: দেবেশ চট্টোপাধ্যায়
এবং অধ্যায়
৫৫০ টাকা