


কোনও কাজে ক্লান্তি ছিল না হাবিলের। শিখে নেওয়ার আগ্রহ আর ক্ষমতা– দুটোই চমকে দেওয়ার মতো। সংকোচের আড়াল ভেঙে হাবিল যখন কথা বলতে শুরু করল, আমাদের সামনে খুলে যেত চেনার সঙ্গে অচেনা এক অন্য ভুবনও। কী যে অদ্ভুত একরকম ভাষা ছিল ওর! বলতে শুরু করত গ্রামসম্পর্কে এক ভাগ্নে-বউয়ের সঙ্গে ওর কথোপকথনের গল্প, সেই বউটি, যে না কি আবার মৃত, হাবিল নাকি নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছিল তার উলটো গোড়ালি!
১৮.
এক ছিল হাবিল। রিকশা চালাত। নিজেকে বলত ‘প্যাডেলওয়ালা’। আমার ধারণা, বিশ্বকর্মার হাতির মুখে যে পদ্মফুলগুলো দেখা যায়, তারই কোনও একটা পাপড়ির কিনারে বোধহয় হাবিলের জন্ম। শহর থেকে গ্রামে কাজ করতে আসা দাদাদের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। ক’দিন পর তাদের একজনের পায়জামা ইস্তিরি করতে নিয়ে সব সেলাই খুলে ফেলে আবার জুড়ে দিয়ে, হাবিল পায়জামা সেলাই শিখেছিল। একসময় ওই একই পদ্ধতিতে শিখল মোটরবাইক মেরামতি। সে যন্ত্র চালানোয় ওর দক্ষতা দেখতাম যখন বীরভূমের লালমাটির মাঠজঙ্গল দিয়ে আসার সময় বাইকের পিছনে বসা শাড়িধারিণীর পোশাকের কথা মনে রেখে ধুলো না উড়িয়ে গাড়ি চালাত।

গ্রামের কাছাকাছি ছোট শহরে রিকশা চালানো হাবিলের ঘরে ছিল নিজের তিন ছেলে, এক মেয়ে ছাড়া বোনের দুই সন্তান আর দু’টি এতিম ছেলেমেয়ে– যাদের ও মসজিদ থেকে নিয়ে এসেছিল। টিনের চালের বাড়ির পিছনে এক চিলতে জমিতে দুটো সজনে গাছ, কুমড়ো লতা। কষ্টে চলা সংসার মাঝে মাঝে হাবিলের মুখখানা কালো করে দিত, কিন্তু নতুন কোনও কাজ কিংবা সমস্যার কথা উঠলেই সে আবার চনমনে!
কোনও কাজে ক্লান্তি ছিল না হাবিলের। শিখে নেওয়ার আগ্রহ আর ক্ষমতা– দুটোই চমকে দেওয়ার মতো। সাঁওতাল গ্রামে আসা-যাওয়া করতে করতে শিখে ফেলল বেনাঘাস বোনার কৌশল। এই আমাদের ‘বেনাবনে মুক্তো ছড়ানো’ অবহেলার বেনাঘাস সাঁওতালদের কাছে পবিত্র। একে তারা মনে করে পৃথিবীর প্রথম উদ্ভিদ, যার ওপরে প্রাণীর জন্ম হয়েছিল। বেনাঘাস যাকে ওরা বলে– ‘সীররম’, তা দিয়ে যে কত কিছু তৈরি করে এই শিল্পকুশল জনগোষ্ঠী। রামপদর সঙ্গে প্রাণের বন্ধুত্ব থেকে হাবিল আয়ত্ত করে ফেলল সেই ঘাসের মধ্যে নানারকম বীজ গেঁথে গয়না তৈরি করা। দিনে-দিনে এমনকী, বড় শহরের শিল্পমেলাতেও আদিবাসীদের তৈরি গয়নার মধ্যে ক্রেতাদের আলাদা মনোযোগ টানল হাবিলের তৈরি অদ্ভুত সব ডিজাইন। প্যাডেল-টানার ক্লান্তি থেকেও সময় চুরি করে এসে হাজির হত গ্রামে। একাগ্র আগ্রহে শুনত নতুন রকমভাবে দিন-কাটানোর কথা, অন্য মানুষদের জীবনযাপনের কথা।
সংকোচের আড়াল ভেঙে হাবিল যখন কথা বলতে শুরু করল, আমাদের সামনে খুলে যেত চেনার সঙ্গে অচেনা এক অন্য ভুবনও। কী যে অদ্ভুত একরকম ভাষা ছিল ওর! বলতে শুরু করত গ্রামসম্পর্কে এক ভাগনে-বউয়ের সঙ্গে ওর কথোপকথনের গল্প। সেই বউটি, যে না কি আবার মৃত– হাবিল নাকি নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছিল তার উল্টো গোড়ালি, আর সেই কথোপকথন ঘটছিল মাঝরাত্রির অন্ধকার মাঠে, যখন হাবিল লোকের বাগান থেকে একখানা বড় কাঁঠাল চুরি করে নামিয়ে নিয়ে পালাচ্ছে! ভাগনে-বউ নিজের ভূতনি প্রভাব খাটিয়ে চেষ্টা করছে মামাশ্বশুরকে শ্মশানের দিকে টেনে নিতে। একবার শ্মশানে নিতে পারলেই ঘাড় মটকে রক্ত খাবে! হাবিলও তো জানে সে-কথা। সে তাই মনে মনে উপযুক্ত সুরা আউড়ে চলেছে। তার মারে সে ভাগনে-বউ এগতে পারছে না, ছিটকে ছিটকে পড়ছে। হাবিল আবার চেষ্টা করছে তাকে মসজিদের দিকটায় টেনে আনতে। এসবের মধ্যে তার ঘাড় ভেঙে যাওয়ার জোগাড় দু’মনি এক পাকা কাঁঠালের ভারে! সেটা সে ভূতের ভয়েও ফেলে পালাতে পারবে না। এই স্পিরিচুয়াল টানাটানির মধ্যে ভোরের আলো ফুটে গেল– তাই রক্ষে! এই সব উপাখ্যানে দু’-একটি আরবি শব্দ মেশানো প্রাকৃত বাংলার সাবলীল সংমিশ্রণে যে অদ্ভুত ভাষা সে ব্যবহার করত, তা শ্রোতাদের নড়তে দিত না। সাঁওতাল বিদ্রোহ খ্যাত গণপুরের ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে তার চালানো বাইকের পিছনে বসে থাকার সময়ে শুনেছি এই বনে বাস করা দীদার গুন্ডার কথা, ধনীদের বাড়িতে হানা দিয়ে লুট করে আনা টাকাপয়সা যে রেখে আসত সেই দরিদ্র মানুষদের বাড়ি, দু’দিন যাদের বাড়িতে চুলো ধরেনি, রাত্রে খালিপেটে ঘুমিয়েছে বাচ্চারা। তার গায়ে গুলি লাগত না। গাছ থেকে গাছে লাফ দিয়ে দূরে চলে যেত সে। কতবার পুলিশ এসেছে তাকে ধরতে, কিন্তু পুলিশরাও জানত যে দীদার গুন্ডাকে ধরা তাদের সাধ্য নয়। তার গায়ে গুলি লাগে না। আর সেই দীদার গুন্ডা মারা পড়ল কীসে? এক ছোট্ট বাচ্চা নতুন গুলতি ছুড়তে শিখে এদিক সেদিক নিশানা করছিল, তার ভুল করে ছোড়া একটা ছোট ঢিল কী করে লেগে গেল দীদার গুন্ডার পায়ের গোড়ালিতে। তাতেই পড়ে মরে গেল সে। পরে চিরফাড় করে পুলিশ দেখেছিল তার কলজেটা ছিল দশ সের ওজনের। এত বড়। গল্প শুনিয়ে ধাক্কা খেয়েছিল অন্য এক জায়গায়– এই যে অবধ্য, অভেদ্য, বীরভূমের লোককথার এক দীদার গুন্ডা, তার গোড়ালিতে অবোধ বাচ্চার গুলতি কী করে মিলে যায় মহাভারতের মহানায়ক শ্রীকৃষ্ণের গোড়ালিতে বিঁধে যাওয়া অকিঞ্চিৎকর ব্যাধের সামান্য বাণের সঙ্গে? কোথা থেকে কোথায় যে যেত হাবিলের মতো মানুষদের গল্প শোনা আর গল্প বলা!

২০১০-এর পর ক্রমশ কমে এল সেই সাঁওতাল গ্রামের স্বজনদের কাছে যাওয়া। জড়িয়ে গেলাম অন্য টানে। সকলেই কম বেশি তাই। সেই সময়ই ছিল এক ঝড়ের সময়। কিছুদিন পর পর্যন্ত তবু কিছু যোগাযোগ থেকে গিয়েছিল ফোনে। তারপর স্মার্টফোন এল। গিলে ফেলল পুরনো অভ্যাস, পুরনো মায়া। মিহিরের থেকে পেয়েছিলাম হাবিলের অকালে আচমকা চলে যাবার খবর। খুব মন খারাপ হয়েছিল। ফোনে দু’-একবার বলেছিল হাবিল, দিদি অনেক কথা আছে আপনার সঙ্গে। হয়নি গিয়ে ওঠা। এই কাজটা সেরে নিয়েই যাব– ভাবতে গিয়ে কত যে অমূল্য সময় খুইয়েছি, তার হিসাব নেই। বিয়ে হয়ে গিয়েছিল হাবিলের দুই সদ্যকিশোর ছেলের। এতদিনে তারা নিশ্চয়ই সব প্রতিষ্ঠিত গৃহস্থ। বাকি ছেলেমেয়েদের জীবনও চলেছে বাঁধাপথেই। কোনও দিন কি তারা মনে করে সেই আশ্চর্য মানুষটাকে যে তাদের হাতে হাতে বানিয়ে দিত নানারকম আশ্চর্য খেলনা?
……………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন ধুলোমাটির মুখ-এর অন্যান্য লেখা
……………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved