

সুমিত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝায় পরিচালক দেবকী বসু কী প্রকারে গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেও পরবর্তী সময়ে একজন নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব হয়ে ওঠেন। ইতিহাস বোঝায় এই বৃত্তান্ত বিভ্রান্তিকর ঠেকলেও, অসম্ভব নয়। ফলে, ‘চণ্ডীদাস’ ছবিতে বৈষ্ণবীয় ভাবধারা ও জাতীয়তাবাদের মিলন বোধগম্য হয়। সমাজের ইতিহাসে নারীদের কণ্ঠস্বর যেখানে ধাপে-ধাপে মুছে দেওয়া হয়েছে, সেখানে ‘চণ্ডীদাস’-এর ক্ষেত্রে দেখা যায়, রামীই হয়ে উঠছে একটি সমগ্র শ্রেণি, জাতি, বর্ণ ও সামাজিক অবিচারের প্রধান কণ্ঠস্বর।
প্রায় তিন দশক আগের কথা। আমার কাছে চলচ্চিত্র চর্চা সবে উন্মীলিত হয়েছে। বিভাগের এক মাস্টারমশাইয়ের ঘরে দেখলাম একখানা পাতলা বই– ‘খাকি শর্টস অ্যান্ড স্যাফরন ফ্ল্যাগস’ (১৯৯৩)। বললাম: ‘স্যর, নেব? পড়ব।’ প্রফেসর বললেন: ‘নিবি? ফেরত দিবি।’ সেই বই অবশ্য আর ফেরত দেওয়া হয়নি, তবে বইটি পড়েছিলাম। সেই আমার সুমিত সরকারের সঙ্গে, বা বলা ভালো তাঁর লেখার সঙ্গে, প্রথম পরিচয়। বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ হওয়ার প্রেক্ষাপটে সাম্প্রদায়িকতার জনজোয়ার, হিন্দুত্ববাদীদের রমরমা ছাড়াও এই বই বুঝতে শিখিয়েছিল কী প্রক্রিয়ায় মিডিয়া, বিশেষত ভিডিও, গান, পোস্টার এবং বক্তৃতা এক বিদ্বেষী পরিসর নির্মাণ করে। ফিল্ম ও মিডিয়া স্টাডিজের ছাত্রের জন্য এই বই ছিল প্রথম ও বিশেষ পাঠ।

‘আমাদের সময়’ বলতে সাধারণত তারুণ্য বোঝায়। বলা চলে, ‘আমাদের সময়’, অথবা এই সময়, একটি প্যারাডাইম্যাটিক (paradigmatic) শিফট ঘটে গিয়েছিল। একদিকে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ বিধ্বংস হওয়া, অপরদিকে অর্থনৈতিক উদারনীতি (liberal economic policies) ও সংস্কৃতির তথা গণমাধ্যমের বিশ্বায়ন (globalisation of culture and mass media)। ফলে, আমরা যখন ‘আমাদের সময়ে’ পদার্পণ করি, ততদিনে দুনিয়াটা পাল্টে গিয়েছে। কাজেই, নয়ের দশকের শেষদিকে, সুমিত সরকারের সঙ্গে আমার প্রথম ‘আলাপ’– তাঁর বইয়ের মাধ্যমে– যা আমার জীবনে একটি জরুরি অধ্যায় হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে, ফিল্ম স্টাডিজের কোর্স শেষ হলে, আমি ‘দ্য সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস, কলকাতা’তে রিসার্চ ট্রেনিং প্রোগ্রাম (এম. ফিল-এর সমতুল্য) করতে যাই। অবশ্য, ঠিক সরাসরি ‘সেন্টার’-এ যাইনি। মাঝের কিছু মাস নানা ‘খুচরো’ টিভি সিরিয়ালে অ্যাসিস্ট করে এবং একটি টক-শো ডিরেক্ট করতে-করতে, হঠাৎ শটের মাঝে মনে হল: ‘না, লেখাপড়ায় ফিরে যাই।’ ‘আমাদের সময়’ কেরিয়ার নিয়ে স্পেকুলেশনের সুযোগ ছিল, লেখাপড়ার টাইম ছিল, কারণ বিশেষ কোনও প্ল্যান ছিল না। আশা করব, এখনও সে সুযোগ রয়েছে বা থাকবে। সে সময়, সেন্টারে ছিলেন হিস্ট্রি, কালচারাল স্টাডিজ ও সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের দিকপালরা– যেমন অধ্যাপক পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং অধ্যাপক গৌতম ভদ্র। এছাড়াও ছিলেন আমার খুব প্রিয় অধ্যাপক– তপতি গুহ-ঠাকুরতা, প্রদীপ বসু, অঞ্জন ঘোষ, কেয়া দাশগুপ্ত।

সেন্টারের ‘আর. টি. পি’ কোর্স-এ মোটামুটি নিয়ম ছিল: প্রত্যেক দিন একটি গোটা বই পড়ে আসতে হবে; হ্যাঁ, গোটা-গোটা বই। ফলে, চাপে পড়ে সোশ্যাল সায়েন্সের সমস্ত গঠনকারী (formative) লেখাগুলি পড়তেই হল। পড়া হল রণজিৎ গুহ, জ্ঞান পাণ্ডে, সুদীপ্ত কবিরাজ, সুজি থারু এবং আরও অনেকের লেখা। তাছাড়া, প্রেজেন্টেশন, পেপার লেখা তো ছিলই। ফলে ক্রমে পেটে কিছুটা হলেও বিদ্যা ঢুকল। ঠিক করলাম– রিসার্চ করব, পিএইচডি করব, ফিল্মের ইতিহাস নিয়ে কাজ করব, অর্থাৎ ‘ফিল্ম হিস্টোরিওগ্রাফি’। তবে, এই কাজের বেশ খানিকটা বিপত্তি ছিল। এক, মাধব প্রসাদের মৌলিক বই, ‘ইডিওলজি অফ হিন্দি ফিল্ম’ (১৯৯৮), এবং রবি বাসুদেবন সম্পাদিত ‘মেকিং মিনিং ইন ইন্ডিয়ান সিনেমা’ (২০০১) ছাড়া, এই শতকের গোড়ায়, ভারতীয় ছবি নিয়ে তেমন কোনও তাত্ত্বিক বই ছিল না। দুই, হলিউড ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে যেসব বই ছিল, তার গুটিকতক ব্যতীত, আমাদের হাতের নাগালে প্রায় কিছুই ছিল না।

এদিকে আমি কাজ করতে চাইছি ১৯৩০-৫০-এর ছবি নিয়ে। ভাবছি, বাংলা ছবির ধারণা কী প্রকারে ধীরে-ধীরে দানা বাঁধে; এবং এই প্রক্রিয়ায় মতাদর্শ, প্রযুক্তি, কলাকৌশল, চলচ্চিত্রশৈলী, ভাষা, শ্রম, লিঙ্গ রাজনীতির কী ভূমিকা থাকতে পারে? এক মাস্টারমশাই তো ফস করে বলেই বসলেন: ‘এই সব ছবি নিয়ে কেউ কাজ করে? বসে দেখবি কী করে?’ সৌভাগ্যবশত, আমার সুপারভাইজার ছিলেন অধ্যাপক মাধব প্রসাদ ও কবিতা পাঞ্জাবি। ফলে, যুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ ও ভারত-ভাগের (১৯৩১-’৫৫) প্রেক্ষাপটে, ঔপনিবেশিক আমলের শেষ পর্যায়ে চলচ্চিত্র বিষয়ক আলোচনা ও চর্চা, গোড়ার দিকের বাংলা ছবির গঠনশৈলী, নির্মাণ-প্রক্রিয়া এবং সেই সঙ্গে ‘বাঙালি ভদ্রলোক-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র’র ধারণা ও তার সূচনা নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম। সহায় হলেন সুমিত সরকার, এবং আরও কয়েকজন ইতিহাসবিদ (যেমন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, এবং আরও বেশ কয়েকজন)। অবশ্য, পার্থদা ছাড়া, আমি কাউকেই ব্যক্তিগতভাবে চিনি না; কিন্তু তাঁদের লেখা ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস-এর বিশ্লেষণ ও পাঠ-পদ্ধতি (methodology) আমাকে একেবারে ব্যক্তিগত স্তরে সঞ্চালিত করে।

যেমন, দেবকী বসুর ‘চণ্ডীদাস’ (১৯৩২) ও ‘বিদ্যাপতি’ (১৯৩৮): অসম্ভব প্রগাঢ় দৃশ্য-পন্ঞ্জী, তেমনই শক্তিশালী নারী চরিত্র, সংগীতের প্রয়োগ ও প্রেমের উন্মোচন। এই ছবিগুলির সঠিক বিশ্লেষণ সহজ ছিল না। ‘মডার্ন ইন্ডিয়া: ১৮৮৫-১৯৪৭’ পড়তে-পড়তে দেখলাম সুমিত সরকার লিখছেন (১৯৮৩):
“In Bengal, the intellectual mood has been changing under a variety of influences from the 1870s…”। এ ছাড়াও উনি লিখছেন: “Defence of Hindu traditions become more respective as scholars like Max Muller rediscovered the glories of ancient Aryans,… But revivalism was most effective when it sought to appeal to emotions rather than to the intellect: through the neo-Vaishnavism of the Amrita Bazar Patrika, seeking inspiration in Chaitanya…”
বস্তুত, সুমিত সরকার একাধিক ধারা ও চিন্তাধারা চিহ্নিত করছেন— যেমন, চরমপন্থী (বিশেষত ১৯২৮-৩৪ সময়কালে), রিভাইভালিস্ট (হিন্দু মহাসভা গোষ্ঠী এবং অন্যান্যরা) এবং সেই সঙ্গে ছিলেন কমিউনিস্টরা– যাঁরা শ্রমিকশ্রেণির অধিকার ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলছিলেন। তাছাড়াও ছিল গান্ধীর প্রভাব তৎসহ সুভাষচন্দ্র বসু এবং জওহরলাল নেহরুর বিপরীতগামী উত্থান। এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ বলা চলে।

সুমিত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বুঝলাম: দেবকী বসু কী প্রকারে গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করে কলেজ ত্যাগ করেন, পরবর্তী সময়ে ‘শক্তি’ নামক একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন, এবং তৎসত্ত্বেও নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব হয়ে ওঠেন। বুঝলাম, এই বৃত্তান্ত বিভ্রান্তিকর ঠেকলেও, অসম্ভব নয়। ফলে, ‘চণ্ডীদাস’ ছবিতে বৈষ্ণবীয় ভাবধারা ও জাতীয়তাবাদের মিলন বোধগম্য হল। এমনকী, একধাপ এগিয়ে, নিজের একটা তর্ক খাড়া করলাম: জাতীয়তাবাদী বয়ানে নারীদের কণ্ঠস্বর যেখানে ধাপে-ধাপে মুছে দেওয়া হয়েছে, সেখানে চণ্ডীদাসের ক্ষেত্রে দেখা যায়, রামীই হয়ে উঠছে একটি সমগ্র শ্রেণি, জাতি, বর্ণ ও সামাজিক অবিচারের প্রধান কণ্ঠস্বর। উচ্চবর্ণের পুরুষের (চণ্ডীদাস) প্রতি, ধোপার বিধবা মেয়ের (রামী) যে তীব্র আকর্ষণ, তা বৈষ্ণব ভাবধারার ‘ফিল্টার’ ছাড়া জাতীয়তাবাদীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হত বলে মনে হয় না। বস্তুত, এই ধরনের ঐতিহাসিক-সামাজিক জটিলতা সুমিত সরকারের কাজের সাহায্যেই বুঝতে শিখেছি।

এরপর, প্রমথেশ বড়ুয়ার কালজয়ী ছবি ‘দেবদাস’ (১৯৩৫)– যার একাধিক রূপান্তর হয়েছে। কিন্তু আমি দেখছিলাম একটি ক্ষয়িষ্ণু শহরে আগত হওয়ার কাহিনি, শহরের প্রতি অনবদ্য টান ও একইসঙ্গে ঘৃণার কথা। এবং আবারও সহায়ক সুমিত সরকার। ‘রাইটিং সোশ্যাল হিস্ট্রি’ বইটিতে সুমিত সরকার (১৯৯৭) লিখছেন:
Nineteenth-century Calcutta had become a real metropolis for the Bhadralok, providing education, opportunities for jobs, printed books, a taste for new cultural values. It was also, by and large, a city where the Bhadralok did not yet feel at home, an experience embodied in the practice of the Bengali gentleman, till well into the twentieth-century, calling his city residence basha, reserving the more intimate term bari for the ancestral village home…
বুঝলাম, চন্দ্রমুখীর ঘরে দেবদাস ‘বাসার’ খোঁজে যায়, আর মরতে-মরতে পার্বতীর দুয়ারে গিয়ে হাজির হয় সেই হারিয়ে যাওয়া বাড়ির খোঁজে। মনে হল, দেবদাসের সময়ের এটাই মূল গল্প। দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ফাঁদে পড়া আত্মঘাতী বাঙালি, যে শহরের টানে ‘পরওয়ানা’র (moth) মতো উড়ে-উড়ে বেড়ায়, কিন্তু, কখনওই কোথাও ঠাঁই পায় না। শহর যেন এক ধাঁধার মতো– যা কখনওই পুরোপুরি নাগাল বা আওতায় আসে না। ‘দেবদাস’ ছবি হয়ে ওঠে একটি সময়ের প্রতিবিম্ব এবং পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। A picture of cruelty of transition, a story of arriving at the brutal story– ট্রেনে করে দেবদাসের অবিরাম ও আশাহীন চলাচল সেই ইঙ্গিতই দিয়ে যায়। আশীষ নন্দী যাকে বলেছেন ‘আন অ্যাম্বিগুয়াস জার্নি টু দ্য সিটি’ (২০০১)। এমন এক বিষয় যার সঙ্গে অন্তহীন বোঝাপড়া চালিয়ে যেতে হয়, অথচ কোনও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বা সমাপ্তি কখনওই ঘটে না।

বলাই বাহুল্য, যাঁদের কাছ থেকে যুদ্ধ, মন্বন্তর, দেশভাগ, জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে যতটুকু জেনেছি, বুঝেছি– তাঁদের মধ্যে সুমিত সরকার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সর্বোপরি, যা বুঝেছি তা হল: ইতিহাস কোনও ইভেন্টের তালিকা নয়; ইতিহাস চর্চার অর্থ হল– ইতিহাস বোধ এবং চেতনা। ‘রাইটিং সোশ্যাল হিস্ট্রি’ বইতে সুমিত সরকার আরও লিখছেন:
History, in other words, tends to become hagiography, and this opens the way towards giving hagiography the present-day status and aura of history… They are evidently related to the ways in which history came to be taught, written, and exceptionally valorized under the colonial and then postcolonial conditions… History thus came to acquire a new centrality in the concerns of the Indian intelligentsia, for it became a principal ‘way of talking about collective self, and bringing it into existence…’
অর্থাৎ, ইতিহাস প্রায়শই জীবনী বা আখ্যানে পরিণত হওয়ার প্রবণতা দেখায়; এবং সেই আখ্যানকে ইতিহাসের সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়। ঔপনিবেশিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক সময় ইতিহাস যেভাবে পঠিত, রচিত ও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়িত হয়েছে, তার সঙ্গে এই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে সম্পৃক্ত। পরিশেষে বলি, সুমিত সরকারের কাজ ইতিহাস-এর জটিলতা, বক্রচলন এবং সম্ভাব্য ব্যাখ্যা ও তার গতিপথগুলি চিনিয়ে দেয়। যাঁরা দেশ ও সমাজ নিয়ে চিন্তিত তাঁরা সুমিত সরকারের ‘দ্য স্বদেশি মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল, ১৯০৩-১৯০৮’ (১৯৭৩) ও ‘এসেস অফ আ লাইফটাইম’ (২০১৭) পড়ে দেখতে পারেন।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved