effect of heat wave and pollution on mental health | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উষ্ণায়ন কি মনকেও পোড়ায়?

বাতাসে আণুবীক্ষণিক পদার্থ থাকার ফলে সূর্যকিরণ দীর্ঘসময়ের জন্য শহরের বাতাসে আটকে থেকে তাকে উষ্ণ করে তুলছে, যার ফলে বেড়েছে তাপপ্রবাহ। ২০২১ সালে যেখানে তাপপ্রবাহের দিন ছিল বছরের ২৮ দিন তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০২৫-এ প্রায় ৬২ দিন এবং ২০২৬ হতে চলেছে ৭২ দিনের বেশি। অতিরিক্ত গরমের ফলে শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি অনিদ্রা ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসের সমস্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে, যা সরাসরি মানুষের মানসিক উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ১৭:১৫   
Facebook WhatsApp Messenger

‘শহর’ শব্দটা ঘিরে ভালো-মন্দ নানা মত রয়েছে। ‘শহর’ বললেই একটা ব্যস্ত জীবনের ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একটা চকচকে, উজ্জ্বল জীবনের হাতছানির কথা মনে পড়ে। সব হাতের মুঠোয় চলে এসেছে মনে হয়। কিন্তু, অর্থনীতি, রাজনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষার কেন্দ্রস্থল এই শহরে ব্যস্ততার আড়ালে জন্ম নেয় মৃত্যুফাঁদ। সে কিন্তু ধীরস্থির ভাবে নিজের কাজ করে যায় নিঃশব্দে, শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের মধ্যে বাসা বাঁধে ধীর গতিতে, সম্ভবত ব্যস্ত মানুষের চোখের আড়ালে থাকতে গেলে এই পদ্ধতিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। একটা জনপদকে ধীরে ধীরে গিলতে শুরু করে মৃত্যু, যখন মৃত্যুর অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে শরীরে তখন আর কিছু করার থাকে না। ঠিক তেমনই সকলের প্রিয় কলকাতা শহর ধুঁকছে নানা রোগের যন্ত্রণায়।

কলকাতা আমাদের সকলেরই প্রিয় কিন্তু গত পাঁচ বছরে কলকাতার পরিবেশগত পরিস্থিতি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে শহর কার্যত এক ‘পরিবেশগত জরুরি অবস্থার’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বায়ুদূষণ, তাপপ্রবাহ এবং তার ফলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার দ্রুত বৃদ্ধি শহরবাসীর জন্য বিশাল মৃত্যুফাঁদ তৈরি করেছে।

zoom
কলকাতায় লকডাউন

তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের লকডাউনের সময় দূষণের মাত্রা কিছুটা কমলেও পরবর্তী সময়ে তা দ্রুত বেড়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে PM2.5 এর মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০২৬ সালের শীতকালে দূষণের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। প্রশ্ন হতে পারে ‘PM2.5’-টা আবার কী?

PM2.5 (Particulate Matter 2.5) হল বাতাসে ভাসমান অত্যন্ত সূক্ষ্ম কণিকা, যার ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারেরও কম। এই কণাগুলি এত ছোট যে মানুষের চুলের ব্যাসের প্রায় ৩০ গুণ ছোট। আকারে ক্ষুদ্র হওয়ায় এগুলি সহজেই মানুষের শ্বাসযন্ত্রের গভীরে প্রবেশ করে ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে দ্রুত।

বায়ুদূষণের প্রভাব সরাসরি পড়ছে মানুষের জীবনের উপর, আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক ল্যানসেট-এর তথ্য অনুযায়ী, কোলকাতার বায়ুদূষণ জনিত বার্ষিক মৃত্যুর হার গত পাঁচ বছরে প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালে এই সংখ্যা ৫৮০০ ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও, ২০২১ সালে প্রতি হাজার জনে শ্বাসকষ্টজনিত রোগী ছিল প্রায় ১৪৫ জন, যা ২০২৬ সালে বেড়ে ২৩০ জনে পৌঁছেছে।

zoom
কলকাতায় বায়ুদূষণ

অন্যদিকে বাতাসে আণুবীক্ষণিক পদার্থ থাকার ফলে সূর্যকিরণ দীর্ঘসময়ের জন্য শহরের বাতাসে আটকে থেকে তাকে উষ্ণ করে তুলছে, যার ফলে বেড়েছে তাপপ্রবাহ। ২০২১ সালে যেখানে তাপপ্রবাহের দিন ছিল বছরের ২৮ দিন তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০২৫-এ প্রায় ৬২ দিন এবং ২০২৬ হতে চলেছে ৭২ দিনের বেশি। অতিরিক্ত গরমের ফলে হিটস্ট্রোক ও তীব্র শারীরিক ক্লান্তির ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কংক্রিটের কাঠামো, উদ্ভিদের অভাব কোলকাতাকে একটি ‘হিট চেম্বারে’ পরিণত করেছে। এছাড়া বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন অবস্থানের কারণে আর্দ্রতা ও তাপের মিলিত প্রভাব শহরের হিট ইনডেক্স বা অনুভূত তাপমাত্রাকে এতটাই বাড়িয়ে তুলছে যে, অনিদ্রা ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসের সমস্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে, যা সরাসরি মানুষের মানসিক উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরাসরি মানুষের শরীরে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও দূষণের কী প্রভাব তা জানা গেলেও, মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার মাত্রা কিছুতেই চক্ষুগোচর হচ্ছে না। এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা জানিয়েছেন ডাক্তার আনন্দময় মুখোপাধ্যায় (Gynecologist, Kakdwip super speciality hospital) ওঁর কথা অনুযায়ী, ‘দূষণ শারীরিক ক্ষতি করে সবাই জানি। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরেও এর কুপ্রভাব থাকে।’

বিষয়টা একটু তলিয়ে দেখা যাক।

প্রথমেই ধরা যাক বায়ুদূষণ। PM2.5, অর্থাৎ, ক্ষুদ্র ভাসমান ধুলিকণার দ্বারা অ্যাজমা, নিউমোনিয়া, স্ট্রোক, লাং ক্যান্সার ইত্যাদি হতে পারে। তাছাড়া ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি, ডিমেনশিয়াও হতে পারে, বিশেষ করে শিশু বা কিশোরদের। অনেকক্ষেত্রে আলঝাইমার হতে পারে বলেও বিজ্ঞানীরা ইঙ্গিত পেয়েছেন। বিজ্ঞানীরা এমন প্রমাণও পেয়েছেন যে, ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটি রুগিদের চারজনের মধ্যে তিনজনেরই মূল কারণ বায়ুদূষণ।

এছাড়াও, চিন্তাশক্তির ক্ষয় হতে পারে, যাকে বলে কগনিটিভ ডিক্লাইন। কিছুক্ষেত্রে সিজোফ্রেনিয়ার সঙ্গেও এর যোগ পাওয়া গেছে। কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে, আত্মহত্যার প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়! দূষিত বায়ু শুধু বাইরে নয়, বদ্ধ ঘরের ভেতরও হতে পারে, যেমন রান্নাঘরে বা কলঘরে যথেষ্ট পরিমাণ হাওয়া চলাচল না হলে।

আসা যাক শব্দদূষণে। দিনরাত মাইকের চিৎকার, রাস্তায় গাড়ির হর্নের আওয়াজ, সর্বক্ষণ মোবাইলের শব্দ। কান খারাপ তো হতে পারেই; কিন্তু মনের ওপর কেমন প্রভাব পড়ে?

বিরক্তিভাব, খিটখিটে মেজাজ, কথায় কথায় রেগে যাওয়া, অশান্তি, অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন, ফ্রাস্ট্রেশন। শব্দের দরুন ঘুমের ব্যাঘাতের ফলেও মেজাজ খারাপ হয়, বুদ্ধিমত্তার স্বাভাবিক বিকাশও বিঘ্নিত হতে পারে। বিশেষ করে শৈশব এবং কৈশোরে শব্দদূষণের কুপ্রভাব একাধিক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ও পরীক্ষায় প্রমাণিত।

zoom
শহরে শব্দদূষণের কুপ্রভাব

সবশেষে বলি আলোকদূষণ নিয়ে। বায়ু বা শব্দদূষণ নিয়ে তবু আমরা আলোচনা করি; আলোকদূষণ বিষয়ে সচেতনতা চোখেই পড়ে না! আমাদের শরীরে বেশ কিছু ক্রিয়া, দিন-রাত্রির আলো-অন্ধকার অনুযায়ী ঘটে। একে বলে সারকাডিয়ান রিদম। রাত জাগলে, বা বেশিরভাগ সময়ে কৃত্রিম আলোয় কাজ করলে, এই সারকাডিয়ান রিদম ব্যাহত হয়। ফলে স্লিপ ডিসটার্বেন্স, ডিপ্রেশন, মুড ডিসঅর্ডার, কগনিটিভ ডিক্লাইন, ডিমেনশিয়া ইত্যাদি হতে পারে। মেয়েদের শরীরে হরমোনের সাম্যও বিঘ্নিত হতে পারে, ফলে স্বাভাবিক ঋতুচক্রে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।’

কয়েকটি পরিসংখ্যান তুলে ধরলে হয়তো আরও মজবুত হবে কথাগুলো, বিগত ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে শ্বাসকষ্টে মৃত্যুর সংখ্যা (প্রতি হাজারে) দাঁড়িয়েছে ৪৫ জন থেকে ১১৮ জনে। এবং হিট-স্ট্রোকে সেই সংখ্যা ১৪৯ জন থেকে বেড়ে ২১০ জন। মানসিক সমস্যায় ভুগছেন প্রায় ২০০ জন মানুষ, যা আগামীতে আরও বাড়তে চলেছে।

তাহলে এই সংকটের জন্য দায়ী কে? এই উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ক্লাইমেট চেঞ্জ নয়, বরং এর পেছনে মানুষের ভূমিকা সবচেয়ে অগ্রগণ্য। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি ও যানজট, ডিজেলচালিত পরিবহনের আধিক্য, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং শহরের সবুজায়ন দ্রুত কমে যাওয়া এসব মিলেই এই পরিস্থিতি।

zoom
আলোক দূষণ। প্রতীকী ছবি।

অর্থাৎ, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক বছরে কলকাতার অধিকাংশ পরিবারই দীর্ঘমেয়াদী ফুসফুসের রোগ বা মানসিক সমস্যার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং নির্মাণকাজে কঠোর পরিবেশগত বিধি কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া দরকার। সর্বোপরি মানুষের সচেতন হওয়া বিশেষ প্রয়োজন, অবহেলায় যেমন কিছুই ভালো করে করা হয় না, সেরকম জীবনটাও বাঁচা যায় না। একথা মাথায় রেখে রোজ যদি আমরা আমাদের অভ্যেসগুলো বদলাতে না পারি, এই ধ্বংসের মোকাবিলা করা অসম্ভব। আমাদের প্রিয় শহর মেট্রোপলিস থেকে নেক্রোপলিস যাতে না হয় যায় সেই ব্যবস্থা আমাদেরকেই করতে হবে। সচেতন নাগরিকই টেনে তুলতে পারে এই শহরকে আবার।

এইসব নিয়েই কথা হচ্ছিল সেদিন যাদবপুরে চায়ের আড্ডায়, শেষে সব শুনে বয়স্ক বীরেনবাবু বলে উঠলেন– ‘আজকাল এই জায়গায় আর বসতে ইচ্ছে করে না, জানো! এত শব্দ, ধুলোবালি, কিছুই ছিল না। একটা চায়ের দোকান পর্যন্ত ছিল না এই চত্বরে। এই যে এখন রাত ১০টা বাজে প্রায়, কত মানুষের ভিড়, আমাদের ছোটবেলায় বাবারা সন্ধে ৭টা বাজলে বাড়ি ফেরার লোক পেতেন না এই পথে। জঙ্গল ছিল এখানে। শিয়াল, বাঘরোলের ভিড় ছিল এই রাস্তায়। গাছ, জলাশয়গুলোই আর নেই। তারাও সব অন্যত্র পাড়ি দিয়েছে নিশ্চয়ই। আমরা কি পারব তাদের আবার ফিরিয়ে আনতে? পুরনো জায়গা ফিরিয়ে না দিতে পারলেও, বর্তমান বসতিগুলো ভেঙে না দিয়ে উন্নয়ন করতে পারব কি আমরা?’ এই বলে তিনি উঠলেন। আর আমাদের সকলের জন্য রেখে গেলেন অনেকগুলো প্রশ্ন।

………………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন দীপাঞ্জন মিশ্র-র অন্যান্য লেখা

………………………..

air pollution anxiety depression frustration Global Warming light pollution Mental Health pollution Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on