AI’s Hunger for Old Books: Inside the Bulk-Order Boom। Robbar
Robbar
  • ১১ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ২৯ আগস্ট ২০২৬

স্মৃতি সত্তা এআই

বইয়ের সঙ্গে পাঠকের যে পাওনাগন্ডার সম্পর্ক, তা তো মূলত অপ্রয়োজনেরই বস্তু। প্রিয়তম বই কবেই বা পাঠককে অব্যর্থ ঠিক রাস্তায় নিয়ে গিয়েছে! ঠিক রাস্তায় গেলে আর বই পড়ার আকর্ষণ কোত্থেকে আসবে! চন্দ্রাহত পাঠক যে জীবনকে বইয়ের ভিতর খুঁজে পেত, খুঁজে পায় হয়তো এখনও, সেই জীবন তথ্যভাণ্ডারের সম্পত্তি নয়। হতেও পারবে না কখনও। বইয়ের স্মৃতি, আত্মা যদি কালক্রমে প্রায় নিখুঁতভাবে যন্ত্রের হাতে চলে যায়, শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতে ঠিক কী পড়ে থাকবে?

শেষ আপডেট: আগস্ট ২৯, ২০২৬, ২০:৪২   
Facebook WhatsApp Messenger

১.

সক্রেটিস লেখাকে সন্দেহ করতেন। ঘোরতর সন্দেহ। প্লেটোর ‘ফেড্রাস’-এ এই নিয়ে একটা চমৎকার গল্প আছে। মিশরীয় দেবতা থেউত অনেক কিছু আবিষ্কার করেছিলেন। সংখ্যা, গণনা, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা। এবং লেখা। নিজের শেষ আবিষ্কারটি নিয়ে থেউত বিশেষভাবে রোমাঞ্চিত ছিলেন। রাজা থামাসকে জানিয়েছিলেন, লেখা মানুষকে আরও জ্ঞানী করবে, তার স্মৃতিশক্তি বাড়াবে। স্মৃতি আর প্রজ্ঞার একটা ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে যেন। কিন্তু থামাস কথাটা মানলেন না। তাঁর আশঙ্কা ছিল প্রায় উল্টো। লিখিত শব্দ স্মৃতির বিকল্প হয়ে উঠলে মানুষ আর নিজে থেকে কিছু মনে রাখবে না। বাইরের চিহ্ন দেখে-দেখে মনে করার চেষ্টা করবে। জ্ঞান তার নিজের মধ্যে থাকবে না, থাকবে তার বাইরে। 

সক্রেটিসও এই যুক্তিরই শরিক। তবে তাঁর আপত্তিটার জায়গাটা অবশ্য আরও খানিক বড়। জীবন্ত মানুষকে প্রশ্ন করলে সে উত্তর দেয়। নিজের কথা ব্যাখ্যা করতে পারে, তর্ক করতে পারে, প্রয়োজনে একই কথা অন্যভাবে বলতে পারে। লিখিত শব্দ তা পারে না। তাকে হাজারবার প্রশ্ন করুন, সে একই কথা দেখিয়ে যাবে। কথা লিখিত হলেই যেন তার মৃত্যুঘোষণা হয়ে গেল! অনন্ত সম্ভাবনার শব্দগুচ্ছ আটকে গেল সীমিত অর্থের গর্তে। অথচ সক্রেটিসের এই আপত্তি, তাঁর দর্শন, তেড়েফুঁড়ে করা সব তর্ক, সবটাই আমরা আড়াই হাজার বছর পরেও জানি, কারণ প্লেটো সেইসব লিখে রেখেছিলেন। ইতিহাসের রসিকতা হয়তো, লেখার বিরুদ্ধে সক্রেটিসের আপত্তিকে বিস্মৃতির হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল লেখাই। বলা ভালো, বই।

zoom
সক্রেটিস

এই গল্প যেন শুধু গ্রিসের নয়। একেবারে অন্য সময়, অন্য ভূগোল, অন্য দর্শনের দুনিয়ায় দেখব বৈদিক জ্ঞানের বিপুল অংশ শতকের পর শতক কাগজের বদলে মানুষের কণ্ঠ ও স্মৃতির ভিতর দিয়ে বয়ে চলেছে। উচ্চারণ থেকে স্বর, শব্দের ক্রম থেকে ছন্দ, স্মৃতিকে নির্ভুল রাখার অনুশীলন। শ্রুতি। খ্রিস্টীয় স্মৃতিতেও একটা অদ্ভুত দৃশ্য আছে। ‘জন’-এর গসপেলে যিশু আঙুল দিয়ে মাটিতে কিছু লিখছেন, তৎক্ষণাৎ হাত দিয়ে মুছেও দিচ্ছেন সেসব। কেউ যেন পড়ে না ফেলে। 

এগুলো এক বিষয় নয়, এক করে দেখার কোনও কারণও নেই। তবু কোথাও যেন একটা টানাপোড়েন তিড়তিড় করে বইছে। জ্ঞান কোথায় থাকবে? মানুষের অন্তর্গত স্মৃতিতে, না কি মানুষের বাইরে? কথা কি জীবন্ত স্মৃতির ভিতর দিয়ে বয়ে চলবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে? না কি তাকে বেঁধে ফেলা হবে লিখিত শব্দের ধাঁচায়?

মানুষ শেষ পর্যন্ত অবশ্য ঝুঁকিটা নিতে চায়নি। কারণ মানুষের স্মৃতির একটা গুরুতর সমস্যা আছে। মানুষ ভুলে যায়। তার চেয়েও গুরুতর সমস্যা, মানুষ মরেও যায় যখন-তখন। ফলে কথাকে মানুষের শরীর থেকে বের করে এমন কোথাও রাখতে হয়, যা ধ্বংসের ঊর্ধ্বে। যেখানে মানুষের মৃত্যুর তবুও মানব থেকে যায়।

zoom
মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে মানব-কথা

মানুষ বই আবিষ্কারের অনেক আগে থেকেই লিখেছে। লিখতে লিখতে একদিন নৌকো এসে ভিড়েছে বইয়ের ঘাটে। মানুষের স্মৃতি, শোক, আনন্দ, বিস্ময়, মানুষের চেনা দুনিয়ার সবটুকু ক্রমে সেই বইতে বাঁধা পড়ে গিয়েছে এরপর। এবং সে আবিষ্কার করেছে, বইতে কথার অপমৃত্যু নয়, বরং নতুন জীবন। অনন্ত জীবন। যত পাঠ, ততগুলো জীবন! সেই বিস্ময়ের উপত্যকা পেরতে পেরতে মানুষ একদিন বুঝেছে, বইয়ের দুনিয়ায় সে আসলে অবিনশ্বর।

কিন্তু এই বই যদি একদিন মরে যায়? যদি বইয়ের প্রয়োজনই না পড়ে আর? তাহলে মানুষের জয়-পরাজয়-স্মৃতি-সত্তা-অনাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে এত এত চর্চার সর্বস্ব কোথায় যাবে? 

ধরা যাক, কোনও এক অতিকায় না-মানুষী তথ্যভাণ্ডার বইয়ের সুবিপুল সাম্রাজ্য দখল করে নিতে চাইছে! গিলে নিতে চাইছে বই আর পাঠকের নিজস্ব সেই চিররহস্যের সর-জমিন! ওরহান পামুকের ভাষায় বলতে গেলে, এক অনন্ত আয়নামহল! যে-দুনিয়ার অধিকারী পাঠক ছাড়া আর কেউ নয়। যদি পাঠক আর সেই বইয়ের মাঝে, মানুষ আর তার স্মৃতি-সংবেদের মাঝে, সেই অলীক দুনিয়ার মধ্যে ঢুকে পড়ে অন্য কোনও পাঠক! যার অসীম ক্ষমতা। যে আমার আগেই ছানবিন করে চিনে ফেলেছে সেই বইয়ের মধ্যেকার সম্ভাব্য সব গোপন কেন্দ্র। মনে রেখেছে এমন নানাকিছুই, যা আমি পড়ার সময় ভুলে গেলে ক্ষতি হত না। অথচ তার পাঠের পিছনে কোনও নির্দিষ্ট শৈশব নেই, কোনও হারিয়ে যাওয়া শহর নেই, মৃত বাবার স্মৃতি নেই, প্রথম প্রেম নেই, কোনও শরীর নেই যার বয়স বাড়ে। জীবনের এক গলি থেকে অন্য গলিতে হাঁটতে হাঁটতে সে বইটাকে নিজের করে নেয়নি। সে বই পড়েছে আপাদমস্তক নির্মোহভাবে। নির্মমভাবে। কোনও বইকেই যে অকারণ পক্ষপাতে আপন করে নেয়নি।

zoom
লেখক ও তাঁর অনন্চ আয়নামহল: লেখার টেবিলে ওরহান পামুক

তারপর তার সেই পাঠ পড়ছি আমরা! বাধ্য হচ্ছি, তার চোখকেই আমাদের চোখ বলে ধরে নিতে! এবং ক্রমে বুঝতে পারছি, আমাদের আর বইয়ের স্পর্শ-গন্ধের প্রয়োজন পড়ছে না। ওই পাঠকই আমাদের পড়াচ্ছে। তার পড়া বই, তারই মতো করে! 

সক্রেটিস ভয় পেয়েছিলেন, লেখা মানুষের স্মৃতিকে খেয়ে ফেলতে পারে। একটা বই কথার জীবন্ত স্রোত গিলে ফেলতে পারে অনায়াসে। আর ২,৫০০ বছর পরে আমরা এমনই এক বাস্তবের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যে-বাস্তব হয়তো গিলে নিতে চলেছে বই নামক আমাদের লিখিত অস্তিত্বের সমস্ত অণু-পরমাণুকেই।

২.

এই লেখা যখন লিখছি, ঠিক সেই সময়েই ব্রিটেন আর আয়ারল্যান্ডের পুরনো বইয়ের দোকানগুলোতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। গত কয়েক মাস ধরে কিছু দোকানে একসঙ্গে শ’য়ে শ’য়ে পুরনো বইয়ের অর্ডার আসছে। বইগুলোর মধ্যে আপাতভাবে কোনও যোগসূত্র নেই। একই ক্রেতা হয়তো এস্তোনীয় ভাষায় অনূদিত জন লে ক্যারে কিনছেন, সঙ্গে অ্যান ব্রন্টির নির্দিষ্ট সংস্করণের ‘অ্যাগনেস গ্রে’, তার পাশে ১৯৮৩ সালের কোনও যুদ্ধজাহাজের পত্রিকা। অন্য কোথাও আফ্রিকার কৃষিযন্ত্র নিয়ে পুরনো বইয়ের পাশে মোটর রেসিংয়ের জীবনী।

সাধারণ বইয়ের ক্রেতাদের চেনাজানা এক জাতের আগ্রহ থাকে। সাহিত্য, ইতিহাস, যুদ্ধ, গাড়ি, পাখি, রান্নাবান্না, রাজনীতি। অথচ, এই ক্রেতাদের আগ্রহটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অর্ডারে কোনও ধারাবাহিকতা নেই। আরও আশ্চর্য, দাম নিয়েও তাঁদের মাথাব্যথা নেই বিশেষ।

zoom
লন্ডনে পুরনো বইয়ের চিরন্তন ঠিকানা, ফস্টার বুকস

‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর একটা লেখায় পড়লাম, ব্রিটেনের একজন মাত্র পুরনো বইবিক্রেতার কাছ থেকেই জানুয়ারি মাসের পর এমন আশ্চর্য ক্রেতারা প্রায় ছ’হাজার বই কিনেছেন। নর্থাম্বারল্যান্ডের ‘বার্টার বুকস’ বিগত কয়েক মাসে তিন রহস্যময় ক্রেতার কাছে বিক্রি করেছে কয়েকশো এলোমেলো বই। দাম প্রায় চার হাজার পাউন্ড। আয়ারল্যান্ডেও একই ধরনের অসংখ্য অর্ডার এসেছে। এমন ঘটনার খবর মিলছে অন্য দেশ থেকেও।

কিন্তু কিনছেন কারা? নিশ্চিত উত্তর নেই। কখনও আলাদা নামে কেনা বই যাচ্ছে একই ঠিকানায়। ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর দেখা তেমন একটি পোস্টকোড গিয়ে পড়েছে হিথরো বিমানবন্দরের কাছের মালবাহী গুদাম এলাকায়। ফলে, পুরনো বইয়ের ব্যবসায়ীদের একাংশের সন্দেহ হয়েছে, এহেন বিচিত্র বই কেনার পিছনে আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থাগুলোর হাত রয়েছে। সন্দেহ এখনও সন্দেহই, তার অকাট্য প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু সন্দেহটা একেবারে আকাশ থেকে পড়েনি, বলাই বাহুল্য।

zoom
নর্থাম্বারল্যান্ডের ‘বার্টার বুকস’

 কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও তো পড়াশোনা করতে হয়। আমরা যন্ত্রকে প্রশ্ন করি আর সে উত্তর দেয়, তার অনেক আগে বিপুল পরিমাণ মানুষের লেখা তাকে গিলতে হয়েছে। হজমও করতে হয়েছে। মনে রাখতে হয়েছে। ওয়েবসাইট, খবর, গবেষণাপত্র, আলোচনা, বই, মানুষের তৈরি বিপুল শব্দভাণ্ডার তার খাদ্য।

কিন্তু গত কয়েকবছরে একটা অন্য সমস্যা দেখা দিয়েছে। ইন্টারনেটে এখন মানুষ আর একা লিখছে না। মানুষের লেখা খেয়ে যে-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি হল, সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই এখন বিপুল পরিমাণ লেখা তৈরি করে ফের ইন্টারনেটে ঢেলে দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামনে ক্রমশ বাড়ছে তার পূর্বসূরিদের তৈরি লেখা। যন্ত্রের লেখা দিয়ে যন্ত্রকে শেখাতে থাকলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, তা নিয়ে প্রযুক্তির জগতে ইতিমধ্যেই শোরগোল তুঙ্গে। ফলে নির্ভেজাল মানুষের লেখার দাম আচমকাই বেড়ে গিয়েছে অনেকটা। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বিস্ফোরণের আগে লেখা বই।

zoom
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রাস করেছে লেখার জগৎ

২০২২-এর আগে ছাপা কোনও বইয়ের অন্তত একটা গুণ নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিন্ত থাকা যায়। তার পাতার পর পাতা ভর্তি শব্দগুলো কোনও জেনারেটিভ এআই লেখেনি। লিখেছে মানুষ। সম্পাদনা করেছে মানুষ। ছেপেছে মানুষই। সেসব লেখা ভুল হতে পারে, বাজে হতে পারে, এমনকী মিথ্যেও হতে পারে। কিন্তু সে ভুলও মানবিক, সে মিথ্যেও মানবিক। তার সবটাই মানুষের।

এতদিন পুরনো বইয়ের দাম ঠিক হত তার লেখক, বিষয়, সংস্করণ, বয়স অথবা তা কতখানি দুর্লভ সেই ভিত্তিতে। এখন তার আরও একটা বিক্রয়মূল্য তৈরি হয়েছে। সেই বই মানুষের লেখা, মানুষের তৈরি। সেই বই যদি এখনও ডিজিটাল জগতের আলো মেখে ভূত না হয়ে থাকে, তাহলে তার দাম আরও বেশি। যদি সেই বই বিস্মৃতপ্রায় হয়, তাহলে তা দুর্মূল্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শেখানোর জন্য বিস্মৃতির চাইতে ভালো স্মৃতির আকর আর কী হতে পারে!

ব্রিটেনের পুরনো বইয়ের দোকানগুলো যে-বিপুল অর্ডারের কুল রাখতে পারছে না, তার পিছনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এহেন খিদেই হয়তো দায়ী। বইতে মিশে থাকা মানুষী স্বাদগন্ধ গিলে নেওয়ার খিদে। কেউ কেউ বলছেন, এই খিদে অচিরেই বইয়ের আস্ত দুনিয়াটাই খেয়ে ফেলবে। তারপর হয়তো বইয়ের আর প্রয়োজনই পড়বে না। সবাই যা পড়ার সবই যন্ত্রের চোখ দিয়ে পড়বে। 

‘অ্যানথ্রপিক’ নামের এক সংস্থা ‘ক্লডে’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছিল। বিপুল পরিমাণ ছাপা বই কিনেছিল তারা। এরপর আদালতের একটা মামলায় প্রকাশ্যে আসা নথি থেকে জানা গেল, লক্ষ লক্ষ বই সংগ্রহ করা হয়েছিল শুধু সেই যন্তরকে খাওয়ানোর জন্য। তার জন্য খরচ হয়েছিল কয়েক কোটি ডলার। বই খাওয়ানোর প্রক্রিয়াটাও রোমাঞ্চকর। প্রথমে বইগুলোর মেরুদণ্ড কেটে ফেলা হয়, তারপর পাতাগুলো আলাদা করা হয়। দ্রুতগতির স্ক্যানারে সেগুলো ডিজিটাইজ করা হয়। কাজ শেষ হলে সেই ‘কাগজ’ পাঠানো হয় পুনর্ব্যবহারের জন্য।

প্রকল্পটির নাম ছিল ‘প্রজেক্ট পানামা’। বিরাট উচ্চাকাঙ্ক্ষায় সাজানো প্রজেক্ট। পৃথিবীর সমস্ত বইকে ধ্বংসাত্মক পদ্ধতিতে স্ক্যান করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। সমস্ত বই অবশ্য ক্লডেকে গেলানো যায়নি। কিন্তু বেশ কয়েক লক্ষ বই গিয়েছে।

আমেরিকার আদালত রায় দিয়েছে, বৈধভাবে কেনা বই ডিজিটাইজ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণে ব্যবহারের ওই প্রক্রিয়া জায়েজ। অর্থাৎ বইটা বৈধভাবে কেনা হলে তার মেরুদণ্ড কেটে, পাতা স্ক্যান করে, কাগজের শরীর শেষ করে দিয়ে তার ডিজিটাল পাঠ যন্ত্রকে গেলানো– এর কোনওটাই আদালতের চোখে কপিরাইট লঙ্ঘন নয়।

আর বইয়ের শরীর! তার কথা ভাবা অনর্থক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সারটুকু শুষে নিয়ে খোলা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ওসবে তার আগ্রহ নেই। তাছাড়া বই ব্যক্তিগত সম্পত্তি। ইচ্ছে হলে ছিঁড়েও ফেলতে পারি। ব্যক্তিগত সম্পত্তির সাধারণ যুক্তিতে তাতে বিশেষ সমস্যাও নেই।

কিন্তু একটা সংস্থা যদি দশ লক্ষ বই কিনে সব বইয়ের মেরুদণ্ড কেটে ফেলে! তখনও কি ঘটনাটা কেবল দশ লক্ষ আলাদা ব্যক্তিগত সম্পত্তির গল্প হয়ে থেকে যায়? না কি কোনও একটা সংখ্যার পরে গিয়ে তা সভ্যতার স্মৃতি-কেন্দ্রিক প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়?

এবার কেউ বলতেই পারেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বইয়ের খুনি হিসেবে দেখানোটা অতি সরলীকরণ। বইয়ের শরীর তো আগেও কতবার বদলেছে। প্যাপিরাস থেকে কোডেক্স, হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি থেকে ছাপা বই, ছাপা বই থেকে ডিজিটাল পাঠ। কোনও একটা প্রযুক্তিকে জ্ঞানের চিরন্তন শরীর বলে ভাবার ঐতিহাসিক কারণ নেই। আজ আমরা যাকে ‘বই’ বলে স্বাভাবিক ধরে নিয়েছি, সেটাও মানুষের জ্ঞান সংরক্ষণের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে একটা বিশেষ প্রযুক্তি ছাড়া কিছুই নয়। বরং বইয়ের শরীর থেকে জ্ঞান আরও একবার অন্য কোনও শরীরে চলে যাচ্ছে, এর ভিতরে একটা বিপুল মুক্তির সম্ভাবনা পাক খাচ্ছে।

যে-মানুষ কোনওদিন অক্সফোর্ডের বোডলিয়ান বা কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে ঢোকার সুযোগ পাবেন না, তাঁর কাছেও এখন কয়েক হাজার বছরের সঞ্চিত জ্ঞান পৌঁছে যেতে পারে। যে-কোনও বইকেই এখন নিজের ভাষায় পড়ে ফেলা সম্ভব। জ্ঞান শ্রেণি-নির্বিশেষে মুক্ত হচ্ছে ক্রমশ। 

কিন্তু মুক্তিরও তো একটা প্রশ্ন থাকে। মুক্ত হয়ে সে গেল কোথায়?

এতদিন জ্ঞানের একটা ঠিকানা ছিল। সক্রেটিসের ওই কথাটা কোথায় আছে? ‘ফেড্রাস’-এ। একটা নির্দিষ্ট লেখা, নির্দিষ্ট লেখক। সংস্করণভেদে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাও খুঁজে বার করা সম্ভব। কোনও একটা কথা কোথা থেকে এল, তার বংশপরিচয় ধরে উল্টোদিকে হাঁটা যেত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সবসময় এত সরল নয়। লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি শব্দের ভিতর দিয়ে তৈরি একটা ব্যবস্থা আমার সামনে কোনও একটা প্রশ্নের চটজলদি উত্তর হাজির করছে। সেই উত্তরের পিছনে কোন বইয়ের কোন বাক্য, কোন মানুষের কোন ভাবনা কতখানি মিশে আছে, তার হিসেব আমার সামনে নাও থাকতে পারে। 

জ্ঞান থাকছে। তার ঠিকানাটা ক্রমশ আবছা হচ্ছে।

এই জায়গাটা বইয়ের মেরুদণ্ড কেটে স্ক্যান করার দৃশ্যের চেয়েও হয়তো বেশি অস্বস্তিকর। একটা বই ধ্বংস হলে অন্তত জানি কী ধ্বংস হল। কিন্তু কয়েক কোটি বইয়ের জ্ঞান একটা যন্ত্রের ভিতরে মিশে গিয়ে যদি নতুন জ্ঞান তৈরি করতে শুরু করে, তখন জ্ঞানের শরীর বেঁচে থাকলেও তার বংশপরিচয় কতখানি বাঁচল আদৌ?

প্রশ্নটা শুধু কপিরাইটের ছিল না কখনওই। প্রশ্নগুলো  তার চেয়েও চরিত্রে পুরনো। ভাবনাটা কার? কোথা থেকে এল? কোন সময় তাকে নির্মাণ করেছিল? কোন মানুষ, কোন অনুশীলন, কোন সমাজ বা রাজনীতি তার নেপথ্যে?

বই মানে তো নিছক অন্তরঙ্গ শব্দের ঝাঁক নয়৷ কোনও বইকে শরীরে ধ্বংস করলেই কি সেই বই ধ্বংস হয়ে যায়? তার সঙ্গে জুড়ে থাকা স্মৃতিরা ধ্বংস হয়ে যায়? না কি একটা বইয়ের প্রতিটা শব্দ আদ্যোপান্ত বেঁচে গেলেও বইটা আসলে বেঁচে থাকে কোথাও? কোনও দুর্বোধ্য সমষ্টিগত নির্জ্ঞানে!

৩.

রে ব্র্যাডবেরির একটা ডিসটোপিয়ান উপন্যাস ‘ফারেনহাইট ৪৫১’। সেখানে রাষ্ট্র বই পুড়িয়ে দিচ্ছে। বই রাখা অপরাধ। রাষ্ট্র চায় বই নিশ্চিহ্ন হোক। অথচ তার চোখ এড়িয়ে একদল মানুষ মুখস্থ করে ফেলছে একটা করে আস্ত বই। বইয়ের বাছাই করা কোনও বাক্য বা অংশ নয়, গোটা বইটাই। কাগজের শরীর পুড়ে যাচ্ছে, কিন্তু বইটা মরছে না। একজন মানুষ তার সমস্ত স্মৃতি, সমস্ত শরীর দিয়ে নিজেই একটা বই হয়ে উঠছে। সমস্ত বই পুড়িয়ে দেওয়ার পরেও গোটা জনপদটাই যেন হয়ে উঠেছে একটা জীবন্ত গ্রন্থাগার।

মানুষ তাঁর ইতিহাসের রাস্তায় জ্ঞানকে ক্ষণস্থায়ী মানব-শরীর থেকে বের করে বইয়ের শরীরে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করে গেল। আর ব্র্যাডবেরি সেই ইতিহাসটাকেই উল্টোদিকে হাঁটিয়ে দিলেন। বইয়ের শরীর বিপন্ন বলে জ্ঞান আবার মানুষের শরীরে ফিরে যাচ্ছে। মানুষ নিজেই নিজের স্মৃতি হয়ে উঠছে। মানুষই বই হয়ে উঠছে।

‘আলমানসোর’-এ হাইনরিশ হাইনে লিখেছিলেন, যেখানে বই পোড়ানো হয় শেষ পর্যন্ত সেখানে মানুষও পোড়ে। এক শতাব্দীরও বেশি পরে নাৎসিদের আগুনে হাইনের নিজের বইও পুড়েছে। কিন্তু ব্র্যাডবেরির গল্পে সেই সমীকরণটাই উলটে যায়। বই পুড়ল ঠিকই, কিন্তু বই হয়ে মানুষগুলো বেঁচে রইল। ফলে বই পুড়েও পুড়ল না।

অ্যানথ্রপিকের কারখানায় গেলে হয়তো এখনও দেখা যাবে লক্ষ লক্ষ কাটা বইয়ের স্তূপ, বইয়ের শব। অথচ, এখানে কেউ বই ধ্বংস করতে চাইছে না। বইয়ের ভিতরে থাকা শব্দ, জ্ঞান ধ্বংস করতে চাইছে না। বরং একটা শব্দও যাতে হারিয়ে না যায়, তারই আয়োজন চলছে। মেরুদণ্ড কাটা হচ্ছে, পাতা স্ক্যান করা হচ্ছে, কাগজের শরীরটা পুনর্ব্যবহারে চলে যাচ্ছে। তার ভিতরের শব্দ, তথ্য, জ্ঞান ঢুকে পড়ছে যন্ত্রের স্মৃতিতে।

‘ফারেনহাইট ৪৫১’-এ বইয়ের শরীর ধ্বংস হয়েছিল, স্মৃতি আশ্রয় নিয়েছিল মানুষের শরীরে। এখানে বইয়ের শরীর ধ্বংস হচ্ছে, স্মৃতি আশ্রয় নিচ্ছে যন্ত্রে।

দুটো স্মৃতি কি এক?

ব্র্যাডবেরির উপন্যাসে মানুষগুলো বই মুখস্থ করেছিল, কিন্তু তারা শুধু বইয়ের শব্দ বহন করেনি। সে আত্মস্থ করেছিল বইয়ের অন্তর্বস্তু। যে জ্ঞান, যে স্মৃতি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। যে-মানুষটা নিজেই বই হয়ে উঠেছিল, সে তখনও মানুষ। তার শরীর আছে, অভিজ্ঞতা আছে, ভয় আছে, বিদ্রোহ আছে। রাষ্ট্রের হাত থেকে পালিয়ে বেড়ানোর স্মৃতিও আছে। বইটা তার অস্তিত্বের থেকে আলাদা কিছু নয়।  আর যন্ত্রের স্মৃতি কেমন? তার স্মৃতি মানুষের চাইতে ঢের বেশি তীক্ষ্ণ। নির্ভুল। তার স্মৃতি প্রায় অসীম। সে লক্ষ লক্ষ বইয়ের সর্বস্ব মনে রাখবে। কোনও বাক্য হারাবে না, কোনও নাম ভুলবে না। কিন্তু পাঠক আর বইয়ের মাঝের যে রহস্যময় দুনিয়া, তার কী হবে?

ব্র্যাডবেরির মতো খানিক কল্পনা ফেঁদে বসি চলুন। ধরে নিই, কালক্রমে সব বই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দখলে চলে এল। বই নামক বাস্তব বস্তুটার আর প্রয়োজন পড়ল না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই আমাদের বই জোগান দিচ্ছে, বই পড়াচ্ছে। পদে পদে সাহায্যও করছে বিস্তর। একটা আস্ত বইকে স্তরে স্তরে খুলে পড়ার ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে না আর৷ বইয়ের কোনও আকস্মিক বিস্ময়ই আর আমার জন্য অপেক্ষা করে বসে নেই। সবটাই আগাম জানা, বোঝা, খুঁটিয়ে বিশ্লেষণও করা। কোনও আপাত বোকা-বোকা বা অযৌক্তিক গল্পে, কোনও অতি-আবেগের বাক্যে আমার আর কান্না পাচ্ছে না। আমি কোথাও আটকে নেই। বইয়ের সমস্তটা জেনে-বুঝে বইয়ের থেকে আমি সহজেই বিচ্ছিন্ন। বইয়ের যাবতীয় অপ্রয়োজনীয় জায়গা ছেঁটে যাওয়ায় বইটা ক্রমশ আমার চাওয়ার মাপে ছোট হয়ে এসেছে।

কেউ তর্ক জুড়তেই পারেন, এতে আর ক্ষতি কী! যেটুকু পাওয়ার, সেটুকু সহজে আর দ্রুত পেলেই তো হল। হয়তো তাই। কিন্তু বইয়ের সঙ্গে পাঠকের যে পাওনাগন্ডার সম্পর্ক, তা তো মূলত অপ্রয়োজনেরই বস্তু। প্রিয়তম বই কবেই বা পাঠককে অব্যর্থ ঠিক রাস্তায় নিয়ে গিয়েছে! ঠিক রাস্তায় গেলে আর বই পড়ার আকর্ষণ কোত্থেকে আসবে! 

চন্দ্রাহত পাঠক যে জীবনকে বইয়ের ভিতর খুঁজে পেত, খুঁজে পায় হয়তো এখনও, সেই জীবন তথ্যভাণ্ডারের সম্পত্তি নয়। হতেও পারবে না কখনও। বইয়ের স্মৃতি, আত্মা যদি কালক্রমে প্রায় নিখুঁতভাবে যন্ত্রের হাতে চলে যায়, শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতে ঠিক কী পড়ে থাকবে?

৪.

বিগত শতাব্দীর শেষে বিশ্ব-জুড়ে একটা বাতিক উঠেছিল, নানাকিছুর শেষ ঘোষণা করা। মায় ‘এন্ড অব হিস্ট্রি’ অবধি দর উঠে গিয়েছিল, কিন্তু বইয়ের মৃত্যুঘোষণা তখনও সেভাবে কেউ করেনি। করার সাহসও পায়নি।

ভয়াবহ কল্পবিজ্ঞানের গল্প ফাঁদলে একরকম, না হলে বইয়ের অপমৃত্যুর কথা চিৎকার করে বলার মতো সময় আজও আসেনি। অদূর ভবিষ্যতেও আসার সম্ভাবনা কম। 

কিন্তু বিষয়টা বই বেঁচে থাকবে কি না, আসলে তা নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আরও খানিক জটিল। বই আর পাঠক কীভাবে একত্রে বেঁচে থাকবে? কেমনতর সম্পর্কে? মিলান কুন্দেরা উপন্যাস সম্পর্কে বলেছিলেন, এই মৃতপ্রায় শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে একমাত্র সার্ভেন্তিসের অবমূল্যায়নের উত্তরাধিকার। একটা বিচিত্র বিস্ময়। বিগত-র শরিক হয়ে বদলাতে থাকা সময়কে আবিষ্কারের বিস্ময়।

zoom
মিলান কুন্দেরা

এই বিস্ময় হয়তো আজকের যে কোনও পাঠকের ক্ষেত্রেই সত্যি। উপন্যাস ব্যতিরেকে যে কোনও বইয়ের ক্ষেত্রেই সত্যি। বইকে ঘিরে এই বিস্ময় না থাকলে বই আর পাঠকের মাঝে কৃত্রিম পাঠক ঢুকে পড়বেই। সে আসল পাঠকের গন্তব্যকে সরল করবে, দ্রুতগামী করবে। কিন্তু পথের বিস্ময়টা উবে যাবে অবধারিতভাবে। সেই বিস্ময়কে বাঁচিয়ে রাখার দায় বোকা পাঠক ছাড়া আর কারও নয়।

বাঁচিয়ে রেখে তার লাভ? একটা বই তার অকুলান আয়ু খেয়ে নেবে, অনবরত ঠোক্কর খেতে হবে সেই পাঠে, অকারণ শ্রম-হতাশা জমাট বাঁধবে। ক্রমসম্প্রসারণশীল পুঁজির দুনিয়ায় এসবই খরচের খাতায়। সন্দেহাতীত লোকসানের গল্প। কিন্তু ওই যে, একটা বিচ্ছিরি শব্দ– বিস্ময়। পাঠের বিস্ময় বোকা পাঠক ছাড়তে পারে না। সেটা তার আঠা। তার নিজের দুনিয়া সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূতকে ছাড়বে কেন?

অচিরেই হয়তো বোকা পাঠকদের এই বোকামি মানুষের সম্মিলিত স্মৃতি-সংবেদন-শোক-আনন্দ বাঁচিয়ে রাখার আন্দোলনে পরিণত হবে। বা হয়তো এসব কিছুই হবে না। প্রযুক্তি আসবে, দেখবে, জয় করবে।

সক্রেটিস ভয় পেতেন, মানুষ নিজের স্মৃতির বদলে বাইরের স্মৃতির উপর নির্ভর করতে শুরু করবে। আড়াই হাজার বছর পরে মনে হচ্ছে, জ্ঞানীরা সত্যদ্রষ্টা হন। শুধু মাঝেমধ্যে মাঝের অঙ্কে সামান্য ভুল হয়ে যায়। লেখা বই নিয়ে অহেতুক সন্দেহও কি সক্রেটিসের তেমনই এক সামান্য ভুল?

হলে হবে। মানুষ তো ভুল করে, বেশ করে, ভুল হলেও তা মানুষের ভুল। অকৃত্রিম মানুষেরই ভুল।

Artificial intelligence Fahrenheit 451 Gospel of John Jesus christ old books Project Panama Ray Bradbury Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Socrates

Share this article on