

দুর্যোগ মানুষকে শুধু তার ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে না, কখনও কখনও মানুষের মুখোশও খুলে দেয়। মৃতদেহের গয়না খুলে নেওয়া তাই নিছক চুরি নয়– তা আসলে মৃতের অসহায়তার ওপর আক্রমণ। যে হাত জীবিতকে বাঁচাতে পারে না, সে অন্তত মৃতের মর্যাদা রক্ষা করুক– এটাই তো সভ্যতার শেষ দাবি। স্বজন হারানোর শোকের মধ্যেও যদি কেউ মৃতের শরীরকে লুঠের সামগ্রী ভাবে, তবে প্রকৃতির বিপর্যয়ের চেয়েও ভয়ংকর আমাদের নৈতিক বিপর্যয়।
সক্কাল সক্কাল ফেসবুক-দেওয়ালে একটি মেসেজ সেঁটে দিয়েছে কেউ: ‘সুপ্রভাত। মনে রাখবেন, মানবতাই পরম ধর্ম।’ নিচে একপিস সাদা পায়রা। ব্যাকগ্রাউন্ডে লাল গোলাপ। শান্তি উড়ছে। এই আমাদের স্বনির্মিত বুদবুদ। যেখানে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র লিক হয় না। রাত নামলে, রেলস্টেশন থেকে হকার উচ্ছেদ হয় না। খেতমজুর খালিপেটে বিষ খায় না। সর্বক্ষণ, সর্বত্র মানবতার মস্ত ছাতা খোলা। পৃথিবীতে ‘অল ইজ ওয়েল’!
বুদবুদ যখন ফেটে যায়! কাতারে কাতারে আরশোলা আর টিকটিকি আর কাটা মুণ্ডু। কেউ মাটি আছড়ে লাট খায়। কাঁদে। কান্নার কষ চারিয়ে যায় ঘিলুতে। যেহেতু স্মার্টফোনের ক্যামেরা অন করে আমারই সহ-নাগরিক ভিডিও বানাতে উতলা, তাই দু’হাত এগিয়ে দেওয়া অসম্ভব। আহা রে মানবতা! কী অপূর্ব অশ্লীল! আদতে আমাদের মনগুলো অ্যালগোরিদম ছাড়া অসাড়। ভক্তি ছাড়া বাতিল। উচ্ছিষ্টের মতো পড়ে আছে শুধু একতাল রক্তমাংসপিণ্ড।
এভাবেই, একটা হড়পা বান এসেছিল। নেপালের উত্তর ও মধ্যভাগে। তিব্বত সীমানার মাটি, যেন ভয়ংকর গর্জনে ধ্বসে গিয়েছে পলকে। ঘুম, ঘর, রাইফেল, হাঁসমুরগী ও আট থেকে আশি– অকস্মাৎ খেয়ে নিয়েছে উদ্দাম আর দুর্ধর্ষ জলস্রোত। সেই খিদের ছবি বড় বিধ্বংসী। কতকটা হাড়হিম। আত্মজনের লাশ শুঁকে শুঁকে দিন কাটছে নেপালের। এলোপাথাড়ি ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘেঁটে একটিমাত্র প্রশ্ন, আদৌ বেঁচে আছে তো? সেই প্রশ্নের কোনও শ্রেণিভেদ নেই। ধর্ম নেই। ধ্বংসস্তূপ ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটি ভিডিও নিউজফিডে ভেসে উঠল।

দুই নেপালি যুবক দাঁড়িয়েছিল নিরাপদ উচ্চতায়। মদন গুরুং ও উমেশ চৌধুরী। তাদের নিচে নারায়ণী নদী বীভৎস। নদীতে বইছে ধংসস্রোত। ভেসে আসছিল, একটি মেয়ের মৃতদেহ। যুবক দু’টি প্রথমে মাটিতে বুক ঠেকিয়ে ঝুঁকে পড়ে। কাদা ঘেঁটে মৃতদেহের চুল ধরে টেনে আনে কাছে। তারপর ছিঁড়ে নেয় কানের দুল আর গলার হার। যে উচ্চতার কথা বলেছি শুরুয়াতে, সেটায় ফোকাস করি প্রথমে।
এই মুহূর্তে, নেপালে, যে বা যারা নিরাপদ, বেঁচে আছে, জলস্তর থেকে কয়েক পা উঁচুতে দাঁড়িয়ে, সে সুপিরিওর। ক্ষমতার রাজনীতি তেমনই বলে। পাশাপাশি পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, যে সুপিরিওর, সে উচ্চতর অবস্থান থেকে হাত বাড়িয়ে ভাত তুলে দেয়নি ইনফিরিওরের মুখে। কেবল লুঠ করেছে। ছিনিয়ে নিয়েছে। আর চেয়েছে, পৃথিবীর জলহাওয়া থেকে এহেন অবস্থানের বৈপরীত্য যেন ঘুচে না যায়! তাই মানবতার ছাতা থেকে মাথা বের করে, ‘আমাদের সব গেল গো’ চিলচিৎকারে বেসিক্যালি কোনও বিরাটত্ব নেই। বরং এমনই তো ঘটে মশাই। নিতান্তই একটা চুরি!

যেহেতু এখানে চুরির লক্ষ্যবস্তু কোনও জীবিত নয়! একজন মৃত। তাই চোখের মধ্যে একটু খোঁচা লাগে। মনে হয়, ভিজুয়ালি ডিসটর্টেড পৃথিবীতে বেঁচে আছি। এক এক করে মৃতদেহের গয়না ছিঁড়ে আসছে। স্রোতের মধ্যে, বাঁশ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা একটা দেহ। ঘিরে আছে একাধিক জীবিত মানুষ। লকলকে জিভ। চোখগুলো গয়নার আলোয় ঝিলমিলে। বুদবুদটা ফেটে যায় তখনই! কারণ সেই চোখগুলোয় স্বজন হারানোর শোক নেই কোনও।
খুলেআম দেখতে পাচ্ছি, দুই যুবকের মন। যা আড়েবহরে প্রায় এ-সভ্যতারই প্রতিবিম্ব। ত্রাণকার্যে যে হাত আড়ষ্ট হয়ে থাকে, যে হাত মওকা বুঝে লুটেপুটে নেয়, যে হাত আজীবন প্রাণের প্রতি নুলো; সেই হাত কি মৃতের অসহায়তাকে সম্মান জানাতে কখনও উদ্যত হতে পারে? যাদের কাছে জীবিত ও মৃতের ধারণা আসলে এক? পাশাপাশি মনে হয়, এমন কোনও হাতের হদিশ পাওয়া গেল না সেই ভিড়ে, যে নিষেধ করবে দৃঢ়? হাতগুলো সর্বক্ষণ ইনস্টাগ্রাম রিল স্ক্রোল করে যায়। অনুভূতিহীন। তারপর ভেসে ওঠে একটি আপাত-পরিসংখ্যান: নেপালের ধ্বসপ্রাপ্ত অঞ্চলে মৃতের সংখ্যা, ১২৫০। ৫০০০ মানুষ নিখোঁজ!

একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়। একটা ঘনঘোর দুর্যোগ। খড়োকুটো আঁকড়ে ধরার ফুরসত নেই যেখানে। মানুষের আশ্রয় থেকে মানুষকে উচ্ছেদ করে। মনুষ্যত্ব থেকে মানুষকে উচ্ছেদ করে। ভেজাল ভেজাল মুখোশের যত ফিকির, ভেস্তে যায়। তখন শুধু কাদা। কাদা পথে হাঁটতে হাঁটতেই দেখি আরও এক বিপর্যয়ের কাছে ধরা পড়ে গিয়েছি। সেই নৈতিক বিপর্যয়! মনুষ্যজাতিদেহের ঘুণপোকা। ভেতর ভেতর ফোঁপরা।
এই কি প্রথম? একেবারেই নয়। মানবতার ছাতা যে-ঘটনা ঢেকে রাখতে পারে না: ২০০৪ সাল। দানবিক সুনামিতে যে শিশুদের পরিবার ভেসে গিয়েছিল আর ঠাই পেয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার বহু উদ্বাস্তু শিবিরে! সেইসব উদ্বাস্তু শিবিরগুলোয় একটি বার্তাও পৌঁছেছিল কিছুদিন পরেই। জিজ্ঞেস করা হয়, একটি অনাথ শিশুর বিক্রয়মূল্য কত! অসহায়তার সুযোগ পেলে কেউ ছাড়তে চায় সহজে? নীতিবোধ সেখানে সভ্যতার আদি থেকেই– তুচ্ছ।

মানবতার ছাতাটা পুনরায় খুলে দিই। আড়চোখে দেখে নিই, আমার গায়ে কাদা লাগেনি তো? তারপর আবার ভিডিও করি। অনার কিলিং। ধর্ষণ। জন্মমুহূর্ত। অথবা বিরিয়ানির হাঁড়ি। ততই মনে হয়: মনুষ্যত্ব, মানবতা, সহমর্মিতা– আসলে মিমের মতো। হাহা রিয়্যাক্ট জুটে যাবে ভরপুর। ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদা পায়রা আর নিচে কাদা। হোয়ার হ্যাভ অল দ্য ফ্লাওয়ার্স গন?
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন রোদ্দুর মিত্র-র অন্যান্য লেখা
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved