Rice: Vegetarian, Non-Vegetarian, or Neutral। Robbar
Robbar
  • ২২ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভাত নিরপেক্ষ থাকতে চেয়েছিল

নিরামিষপন্থীরা একদিন দাবি করল, ‘ভাত আমাদের।’ আমিষপন্থীরাও একই কথা বলল, খানিক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে। ভাত, প্রথমে ভেবেছিল, কিছুই বলবে না, সাধারণত সে চুপচাপ, শান্ত, কথা কম বলিয়ের দলেই পড়ে। কিন্তু এত পিনিকের চোটে সে মুখ খোলাই শ্রেয় বোধ করল। ইনিয়ে-বিনিয়ে বলল, ‘ইয়ে, মানে, আমি তো সবার!’

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬, ২১:৪৫   
Facebook WhatsApp Messenger

কত ধানে কত চাল, লোকে কম জানলেও– বাঙালির দুলকি চাল বলে দেয় তারা আগাগোড়া ভাতের ফ্যান। তাড়াহুড়োয় ফ্যান-ভাত। আলস্যে পান্তা। পাতে পাতে কত বেলা কেটে গেল, তবু এ নিয়ে কূটচাল কিছু কমল না। বলা চলে, চালের পাতে চালাকি কিছু কম নয়! যুগে যুগে, কালে কালে, ডালে ডালে, হাতায় হাতায়।

zoom
‘অপরাজিত’ সিনেমার দৃশ্য

যদিও ভাত– ডাকনাম ‘ভেতো’, কোনওকালেই রাজনীতিটীতি করতে চায়নি। সে আদ্যন্ত সেকুলার। অতএব এ-মার্কেটে সে ডাহা ফেল! এক্কেবারে গোল্লা। এদিকে বাঙালি ভাতকে কার্বোহাইড্রেট-দোষে দোষারোপ করে, যে রেটে ওট্‌স-ডালিয়া-স্যালাড শুরু করেছে, আগামী বছর পঁচিশে ভাত খাদ্যসংসদে জায়গা পাবে না বলেই মনে হচ্ছে। অথচ ভেবে দেখুন, চরম অর্থাভাবের দিনে, শুধু নুনের সঙ্গে মেলামেশা করতেও কসুর করে না। আর মাসমাহিনা খানিক পকেটস্থ হলে: যে-ই আসুক, পাশে বসো। মাছ এল, ভাত পাশে। ডাল এল, ভাত পাশে। শুক্তো এল, ভাত পাশে। মাংস এল, ভাত পাশে। এমন নিরুপদ্রব বস্তু আর আছে!

zoom
‘গল্প হলেও সত্যি’ সিনেমার দৃশ্য

কিন্তু কী আর করণীয়। এই ঔদার্যের জন্যই মহাবিপদ! সে ব্যাটা ফোঁস করে না। শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে গল্প পড়েনি। ফলে নাও ঠেলা! ডাঁটো নিরামিষপন্থীরা একদিন দাবি করল, ‘ভাত আমাদের।’ আমিষপন্থীরাও একই কথা বলল, খানিক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে। ভাত, প্রথমে ভেবেছিল, কিছুই বলবে না, সাধারণত সে চুপচাপ, শান্ত, কথা কম বলিয়ের দলেই পড়ে। কিন্তু এত পিনিকের চোটে সে মুখ খোলাই শ্রেয় বোধ করল। ইনিয়ে-বিনিয়ে বলল, ‘ইয়ে, মানে, আমি তো সবার!’

সবার– অ্যাঁহ! সবার আবার কী! বলে কী এই ভেতো! এই কথাটাই তো বেজায় গন্ডগোলের! গাছেরও খাবে, তলারও কুড়োবে, শিকড়েও টান মারবে! সকলেই রক্তচক্ষু। সেদিন থেকে ভাতকে বেজায় সন্দেহের চোখে, আতশকাচের তলায় দেখা শুরু। ভাত যদিও নিজের চরিত্র বদলায়নি। সিসিটিভি বসালে বসাক! আমি ভেতো, আমি তো অপরাধ করছি না রে বাবা! আর পাতের একটা গণতন্ত্র নেই?

zoom
‘পথের পাঁচালী’র দৃশ্য

‘সবার? খুবই সুবিধাবাদী কথা।’ বলল আমিষ। নিরামিষ বলল, ‘সবার সঙ্গে থাকাটা নিরপেক্ষতা নয়, চরিত্রদোষ।’ ভাত ফের মুখ বুজে রইল। বুঝল যে, এই রাজ্যে নিরপেক্ষ থাকাটাই বড় বিপজ্জনক! ভাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল: সে নাকি মাছের সঙ্গে গোপন আঁতাঁত করেছে। প্রমাণ? ইলিশের ঝোল ভাতে মিশে গিয়েছে। ভাত বলল, ‘মিশেছে তো কী হয়েছে?’ তদন্তকারী বললেন, ‘‘এই ‘কী হয়েছে’ কথাটাই সন্দেহজনক!” প্রমাণ এল আরও। কাতলার কালিয়া। চিংড়ির মালাইকারি। মাংসের ঝোল। ভাতের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়!

zoom
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘নিম অন্নপূর্ণা’ সিনেমার দৃশ্য

শেষ পর্যন্ত, যা হয়, না না, বিচারালয় নয়– একটি সাংবাদিক সম্মেলন। ভাতের মাথা নিচু। ‘আমি কারও নই। আমি শুধু ভাত।’ দাঁত থেকে কড়ে আঙুলের নখে কমলি শাক খুঁটে প্রশ্ন এল: ‘আপনি কি নিরামিষকে সমর্থন করেন?’ ‘না।’ ‘তালে আমিষকে?’ ‘না।’

এমতাবস্থায় সাংবাদিক সম্মেলন ফের গেল ঘেঁটে! এই ব্যাটাই তো বলেছিল সে সব্বার। এখন বলছে কারও নয়। কারও নয়? এক্কেবারে শিওর? তালে শেষ প্রশ্নটা করা যাক!

‘তাহলে আপনি কাকে সমর্থন করেন?’
ভাত, একটুও না-ভেবে বলল, ‘খিদেকে।’

zoom
জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের ছবি

হলঘরে নীরবতা। এ উত্তর আরও  বিপজ্জনক! খিদে কোনও দলের নয়। খিদে চায় না ভোট। বোঝে না মতাদর্শ। ধর্ম দেখে না খিদে। শুধু হা-ক্লান্ত তাকিয়ে থাকে, খালি, শূন্য চোখে।

এর পরদিন ভাতকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী ঘোষণা করার দাবি উঠল। কেউ কেউ তো এমনও বললেন, ‘ভাত মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।’ কেউ বললেন, ‘ভাতের মধ্যে আপসের রাজনীতি আছে।’ কেউ বললেন, ‘ভাত আসলে মাংসের দালাল।’ আবার কেউ বললেন, ‘না, ভাত আসলে শাকের এজেন্ট।’ দেওয়ালে দেওয়ালে ভাতবিরোধী স্লোগান। কিছু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ভাত খেত বলে, তারাও রইল নজরে!

zoom
‘অপুর সংসার’-এর দৃশ্য

এদিকে ভাত চুপচাপ থালার এককোণে বসে। তার সামনে মাছ। পাশে ডাল। অল্প দূরে আলুভাজা। কোণে শুক্তো। সবাই তার দিকে তাকিয়ে। ভাত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে হাত বাড়াল। কারণ রাজনীতি যতই উত্তপ্ত হোক, ভাত ঠান্ডা হয়ে গেলে আর খাওয়া যায় না।

…………………….

পড়ুন রোববার ডিজিটাল ডেস্ক-এর অন্যান্য লেখা

…………………….

Hunger hungry Identity Crisis Non Vegetarian Food Rice Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar ভাত

Share this article on