কলাভবনের ভার নন্দলালের হাতে পুরোপুরি দিয়ে কবির মনে কি কোনও সংশয় দেখা দিচ্ছিল? আমরা জানি, প্রায়ই তিনি কলাভবনে এসে ছাত্রসহ শিক্ষকের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছিলেন! তাঁর প্রাণের শিল্পনিকেতন কিভাবে এগিয়ে চলেছে, সেদিকে ছিল সজাগ দৃষ্টি। তার যথেষ্ট কারণ ছিল। তবে কি সেই পর্বের ছবির রবীন্দ্রনাথ কলাভবনের শিক্ষক নন্দলালের থেকে বহুযোজন দূরে অবস্থান করছিলেন?
১৪.
কলাভবনে ছাত্র ভর্তির ব্যাপারে নন্দলাল অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন, এমনটা আমরা জানি। ছাত্র হিসেবে চিত্তপ্রসাদকে গ্রহণ করেননি, বলেছিলেন তুমি তো প্রায় সব শিখেই এসেছ। এমনকী, রামকিঙ্কর বেইজকেও প্রায় বাতিলের দলে ফেলেছিলেন। কেন এমনটা করতেন নন্দলাল. তা বলা সহজ নয়। তবে কথাবার্তায় মনে হয়– প্রথমত, কলাভবনকে তিনি শিল্পশিক্ষার কারখানা বানিয়ে তুলতে চাননি। যেখানে একই ছাঁচে ঢালাও প্রোডাকশন তৈরি হবে আর সবটুকু মুড়িমিছরির মতো একাকার হয়ে যাবে– এমনটা তিনি কোনও দিনই চাননি। এ বিষয়ে আজীবন সজাগ দৃষ্টি ছিল তাঁর। সেই সঙ্গে তিনি এ-ও মনে করতেন যে, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কম থাকলে গুরুশিষ্যের সম্পর্ক অনেক সহজতর হয়ে ওঠে, প্রত্যেকের প্রতি আলাদা করে দৃষ্টি দেওয়া যায়। নানা কথাবার্তায় একথা বলেছেন নন্দলাল। আবার এমনটাও হতে পারে, কলাভবনে যারা শিক্ষার্থী হিসেবে যোগ দেবে, নন্দলাল তাদের নিজের মতো করে গড়ে নিতে চেয়েছিলেন। তাই ছবি আঁকায় ব্যাপারে যারা খানিকটা শিখে এসেছে, নতুন করে তাদের নিতে চাইতেন না– পাছে সেই শেখায় কোনও ফাঁক থাকলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়। চিত্তপ্রসাদ বা রামকিঙ্করের ক্ষেত্রে হয়তো এটাই অন্যতম কারণ। অবশ্য খেয়াল করলে দেখব, প্রথমদিকে তিনি বিনোদবিহারীকেও তেমন আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করেননি। নন্দলাল অনেকটা দূর থেকে তাঁর প্রতি লক্ষ রাখতেন, কাছে এগিয়ে এসে কাজ দেখাতেন না। অবশ্য এর একটা বিশেষ কারণ ছিল। শিশুকাল থেকে বিনোদবিহারীর দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা তাঁর ছবি আঁকার পথে অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে, এমন আশঙ্কা নন্দলালের মনে বাসা বেঁধেছিল।

বিনোদবিহারীকে ব্রহ্মবিদ্যালয়ে স্থান দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। সে-ও এক বিশেষ গল্প। ক্ষীণদৃষ্টি বিনোদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বাড়ির সকলেই যখন উদ্বিগ্ন, সেই পর্বে তিনি এসে পৌঁছলেন রবিঠাকুরের শান্তিনিকেতনে। উঠলেন গাবগাছের তলায় টিনের ছাদওয়ালা অতিথিশালায়। পরের দিন সকালে দেখা করার কথা থাকলেও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হল না। তবে বিকেলে দেখা হল কবির সঙ্গে। শালবীথি পেরিয়ে রবীন্দ্রনাথ তখন থাকেন দেহলী বাড়িতে। হাফ প্যান্ট পরিহিত ১৩ বছরের শীর্ণ বালক বিনোদকে সেখানে নিয়ে গিয়ে কালীমোহন ঘোষ বললেন, সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যেতে। বলে দিলেন, ‘তাঁকে প্রণাম করবে এবং তিনি যা জিজ্ঞাসা করেন জবাব দেবে।’ বিনোদবিহারী কবির কাছে গিয়ে প্রণাম করতে গেলে তাঁর হাত টেবিল-চেয়ারের ফাঁক দিয়ে কবির চরণ ভালো করে স্পর্শ করতে পারল না। রবীন্দ্রনাথ স্থিরদৃষ্টিতে শীর্ণ বালকের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন তাঁর চোখের চিকিৎসা ঠিকমতো হয়েছে কি না। তারপর বললেন, আশ্রমে সব কাজ নিজেকে করতে হয়– বিনোদ সেসব পারবে কিনা! বিনোদ সম্মতি জানাতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার লেখা পড়েছ?’ বিনোদ ‘হ্যাঁ’ বলে আর কার কার লেখা পড়েছেন, তা জানালেন। সেই তালিকায় ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ আছে জেনে বিস্মিত হলেন আচার্য। তারপর আর কিছু জানার ছিল না। ইন্টারভিউ শেষ করে নিচে নেমে এলেন বিনোদবিহারী। এবারে কালীমোহন ঘোষ উপরে গিয়ে সব খবরাখবর জেনে এসে বললেন, ‘গুরুদেব খুব খুশি হয়েই অনুমতি দিলেন’। বিনোদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের স্নেহ জন্মেছিল বুঝি সেই প্রথম দিন থেকেই।

বিনোদবিহারী যখন ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মার সঙ্গে সদ্য তৈরি হওয়া কলাভবনে যোগ দিলেন তখন আর কোনও পরীক্ষা দিতে হয়নি। ওঁরা কেবল এক বিভাগ থেকে এসে অন্য বিভাগে যুক্ত হলেন মাত্র। কলাভবনের ক্লাস শুরু হওয়ার পরে বিনোদবিহারীর কথায় জানতে পারি, নন্দলাল প্রথমদিকে বিনোদকে ‘সুনজরে’ দেখেননি। নন্দলালের মনে হয়েছে দৃশ্যশিল্পের জগতে এই ক্ষীণদৃষ্টি ছাত্রটি অনাহূত, খানিকটা জোর করে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে কলাভবনে ঠাঁই দিয়েছেন। বিনোদবিহারীর ভাষায়– ‘তাঁর (নন্দলাল) মনে হয়েছিল, গুরুদেব জোর করে এমন একজনকে তাঁর ঘাড়ে চাপালেন যে শিল্পজগতে প্রবেশের অনধিকারী। যার চোখ নেই, সে ছবি আঁকবে কী ক’রে?’ এমনকী রবীন্দ্রনাথের কাছে এ বিষয়ে তাঁর আপত্তিও জানিয়েছেন। আপত্তির ব্যাপারটা ঘটেছে সামনাসামনি। রবীন্দ্রনাথ একদিন সকালে কলাভবনে এলে নন্দলাল তাঁকে বিনোদের প্রসঙ্গে আপত্তি জানিয়েছেন। যদিও আপত্তি সত্ত্বেও আশ্রম আচার্যের প্রতিক্রিয়া আমাদের চমকে দেয়। নন্দলালের কথার উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেন– ‘নন্দলাল, ও কি নিজের কাজ করে?’। নন্দলালের উত্তর– ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, মনোযোগী ছাত্র। কিন্তু এই লাইনে…’। হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন নন্দলাল, কিন্তু তাঁকে থামিয়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলে ওঠেন– ‘যদি ও নিয়মিত আসনে বসে এবং মনোযোগ দিয়ে কাজ করে তবে ওকে স্থানচ্যুত কোরো না।’ আরও স্পষ্ট করে বলেন– ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা কোরো না। সকলকে নিজের নিজের পথ খুঁজে নিতে দাও।’ রবীন্দ্রনাথের এই উত্তরের সামনে শিক্ষক নন্দলালও যেন ছাত্রে পরিণত হয়েছেন।

ভেবে দেখলে, নিজের মতো করে পথ খুঁজে নেওয়া, নিতে পারা আমাদের জীবনেও কি মন্ত্র হয়ে ওঠে না? স্কুলের তথাকথিত সিলেবাসের বাইরে এসে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও কি নিজের মতো পথ খুঁজে নেননি? নন্দলাল তাঁর কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এখানে বুঝি কলাভবনকেও একই ছাঁচে ঢেলে দিতে চাইছিলেন। অন্তত গোড়ার দিকে তো বটেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দাগা-বুলনো পথের বাইরে চলার সন্ধান দিলেন। তবুও প্রশ্ন জাগে, প্রথাগত রাস্তায় হাঁটা নন্দলাল, কলকাতা শহরের টানাপোড়েনে বিদ্ধ নন্দলাল কি শুরুতে আচার্যের এই উদার ভাবনার সহমর্মী হতে পেরেছিলেন? মনেপ্রাণে তা গ্রহণ করতে পেরেছিলেন? সে কথা বলা সহজ নয়। তবে বিনোদবিহারীর সাক্ষ্য থেকে মনে হয়, বরফ গলতে আরও কিছুটা সময় লেগেছিল। বিনোদ জানিয়েছেন– ‘নন্দলাল আমাকে মাদুর ডেস্ক, জলের পাত্র ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত করেননি, কিন্তু আশপাশের সবাইকে তিনি দেখাতেন, কেবল আমাকে ছাড়া।’ তবে কি নন্দলাল তাঁর ক্ষীণদৃষ্টি ছাত্রটিকে আরেকটু যাচাই করে নিচ্ছিলেন? পরখ করে নিতে চাইছিলেন, সে একা একা কতটা এগতে পারে– এটা দেখার? না কি, বিনোদকে বুঝতে না দিয়ে দূর থেকে তাঁর প্রতি খেয়াল রাখছিলেন নন্দলাল? তবে আমরা দেখতে পাব, অচিরেই নন্দলাল বিনোদবিহারীর একটি স্ক্রোলধর্মী ছবিতে তাঁর বিন্যাসের প্রশংসা করবেন।

কিছু কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে মনে হয়, কলাভবনের প্রথম অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথ কি নন্দলালের ওপরে পুরোপুরি ভরসা করতে পেরেছিলেন? কলাভবনের ভার নন্দলালের হাতে পুরোপুরি দিয়ে কবির মনে কি কোনও সংশয় দেখা দিচ্ছিল? আমরা জানি, প্রায়ই তিনি কলাভবনে এসে ছাত্রসহ শিক্ষকের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছিলেন! তাঁর প্রাণের শিল্পনিকেতন কিভাবে এগিয়ে চলেছে, সেদিকে ছিল সজাগ দৃষ্টি। তার যথেষ্ট কারণ ছিল। তার মধ্যে অন্যতম হল, প্রবল স্বদেশীয়ানায় নিমজ্জিত নন্দলালের মন পাছে কেবল ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্পের দিকেই ধাবিত হয়, ছাত্রদের তিনি কেবল সেদিকে ঠেলে দেন– এমন আশঙ্কা রবীন্দ্রনাথের ছিল। কলাভবন কেবলমাত্র স্বদেশী আর্টের আখড়া হয়ে ওঠে– এ একেবারেই রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছা নয়। তিনি কলাভবনের মাটিতে পূর্ব আর পশ্চিমের দৃঢ় সেতু নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন।

হয়তো সেই কারণে মাঝে মাঝে নন্দলালের ক্লাসে এসে হানা দিতেন, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মুখে মুখে শিল্পের আধুনিকতা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন। এমন এক কৌতূহলী ঘটনার উল্লেখ সেই সময়ের ছাত্র সুধীর খাস্তগীরের স্মৃতিকথায় ফুটে উঠেছে। সুধীর লিখেছেন– ‘যতদূর স্মরণ হয়, ১৯২৬ সালে একদিন গুরুদেব কলাভবনে এলেন সকালে। আমরা সকলে তাঁকে ঘিরে বসেছিলাম। মাষ্টারমশাই-এর (নন্দলাল বসুর) সঙ্গে তাঁর শিল্পালোচনা হচ্ছিল। আমরাও যে দুয়েকটা প্রশ্ন করেছিলাম না তা নয়। কিন্তু আলোচনার বিশেষ কিছু তখন আমাদের (অন্তত আমার) বোধগম্য হয়নি। Abstract art-এর কথা তখনই আমি প্রথম শুনি’। ১৯২৬ সাল বলতে সুধীর তখন কলাভবনের দ্বিতীয় বর্ষে। অর্থাৎ নতুন ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসে এসেও রবীন্দ্রনাথ শিল্পকলার আধুনিক দিক নিয়ে আলোচনা করতেন। এ প্রসঙ্গে সুধীর আরও জানিয়েছেন– ‘‘মনে আছে কয়েকটি কথা। গুরুদেব বলেছিলেন, বড় করে বাহুর জোরে মনের জোরে কল্পনার জোরে ছবি আঁকতে– ছোট সরু তুলী তুলে রাখতে বলেছিলেন। ‘মোটা তুলীতে নির্ভয়ে আঁকতে শেখ’ বলেছিলেন।’’ নন্দলালের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের শিল্পচিন্তার ফারাক এই সামান্য কয়েকটি শব্দে স্পষ্ট হয়ে যায়। ছাত্রদের ‘সরু তুলী’ তুলে রাখার পিছনে সেই সময়ের বেঙ্গল স্কুল ঘরানার ছবির প্রতি তাঁর ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। সূক্ষ্ম কারুকাজের দৃষ্টিনন্দন শৌখিন ছবির চেয়ে ‘মোটা তুলীতে নির্ভয়ে’ আঁকতে শেখার বরাভয় মন্ত্র রবীন্দ্রনাথ ছোটদের মনেও সঞ্চারিত করতে চেয়েছিলেন।

আমাদেরও মনে রাখতে হয়, সেই সময় তিনি ‘পূরবী’র কাটাকুটি পর্ব পেরিয়ে প্রায় পুরোপুরি ‘চিত্রলেখা দেবী’র আরাধনায় নিজেকে মগ্ন রেখেছেন। দেখে এসেছেন ইউরোপের বিভিন্ন আর্ট গ্যালারি। সেইসঙ্গে, আধুনিক বিশ্বশিল্পের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় প্লাবিত রবীন্দ্রনাথ কলাভবনেও নতুন আলোক ভরিয়ে দিতে চেয়েছেন। এহেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে স্বদেশী ভাবধারায় অবগাহিত নন্দলাল কি সবসময়ে তাল মেলাতে পারছিলেন? এ প্রশ্ন আমাদের মনে দেখা দেয়। তবে কি সেই পর্বের ছবির রবীন্দ্রনাথ কলাভবনের শিক্ষক নন্দলালের থেকে বহুযোজন দূরে অবস্থান করছিলেন? অন্যদিকে নন্দলাল নিজেও কি সেই মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথের কাছে তিল তিল করে শিল্পের পাঠ আত্মস্থ করছিলেন না?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved