

বড় প্রযোজনা সংস্থা, কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা এবং শক্তিশালী বিপণনের ছাতা পাওয়া অনেক তথাকথিত নারীকেন্দ্রিক সিনেমার মধ্যে এই পরিচিত ছকটি দেখা যায়। সেখানে নারী লড়াই করেন ঠিকই, কিন্তু তাঁকে পথ দেখাতে, বৈধতা দিতে অথবা উদ্ধার করতে শেষ পর্যন্ত একজন সহৃদয় পুরুষ এসে উপস্থিত হন। নারীকে গল্পের কেন্দ্রে রাখা হয়, কিন্তু তাঁর বিজয়ের চাবিটি থেকে যায় পুরুষের হাতে। এই ধরনের নারীকেন্দ্রিকতা আসলে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুমোদিত এই যে নারীবাদ, সেখানে নারী স্বাধীন হতে পারেন, কিন্তু তাঁর স্বাধীনতা পুরুষতন্ত্রের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠার অনুমতি পায় না।
সম্প্রতি অভিনেত্রী রসিকা দুগ্গল সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন। তাঁর কাছে নিয়মিত এমন অনেক চিত্রনাট্য আসে, যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছে নারী। চরিত্রগুলো আকর্ষণীয়, গল্পগুলোর মধ্যেও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে– অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই ছবিগুলোর পিছনে কোনও প্রযোজক থাকেন না।

আলোচনার সুবিধার জন্য অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমাকে নিজের লিঙ্গপরিচয় উল্লেখ করতে হচ্ছে– আমি একজন মহিলা চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং চিত্রনাট্যকার। যদিও আমার কাছে ‘পরিচালক’ এবং ‘চিত্রনাট্যকার’– পরিচয় দু’টিই যথেষ্ট। শিল্পীর মেধা, পরিশ্রম কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির আলাদা কোনও লিঙ্গ হয় না। তবু কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার লিঙ্গপরিচয় যখন মহিলা, তখন কেবল মেধা, পরিশ্রম এবং পেশাগত সততাকে সম্বল করে বড় পরিসরে কাজ করতে গেলে তাঁকে এমন কিছু বাধার মুখোমুখি হতে হয়, যা তাঁর পুরুষ সহকর্মীদের ক্ষেত্রে একই মাত্রায় কাজ করে না। এই অসুবিধা কোনও একটি ব্যক্তির তৈরি নয়, এর শিকড় আমাদের শিল্পের পিতৃতান্ত্রিক পরিকাঠামোর গভীরে।
একইসঙ্গে এটাও স্পষ্ট করে বলা জরুরি যে, ‘নারীকেন্দ্রিক’ চলচ্চিত্র মানেই তার পরিচালক অথবা চিত্রনাট্যকার মহিলা হবেন, এমন কোনও কথা নেই। অসংখ্য পুরুষ পরিচালক ও লেখক অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে নারীর অভিজ্ঞতা, যন্ত্রণা, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মমর্যাদার গল্প বলেছেন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এমন অনেক পুরুষকে দেখেছি, যাঁরা বহু নারীর থেকেও বেশি নারীবাদী। কারণ নারীবাদ কোনও জৈবিক পরিচয় নয়, এটি একটি মানবিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান। একজন মহিলা জন্মসূত্রে নারী হয়েও পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রতিনিধি হতে পারেন, আবার একজন পুরুষ নিজের অর্জিত সামাজিক সুবিধাগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়ে নারীর স্বাধীনতার আন্তরিক সহযোদ্ধা হতে পারেন।
নারীবাদের লড়াই কখনওই পুরুষের বিরুদ্ধে নয়। তার বিরোধ পুরুষতান্ত্রিকতা, পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার এবং নারীর স্বাধীন সত্তাকে অস্বীকার করার বিরুদ্ধে। একজন নারীর লড়াইয়ে একজন পুরুষ বন্ধু, প্রেমিক, সহকর্মী কিংবা সহযোদ্ধা হতেই পারেন। আপত্তি সেখানে নয়। প্রশ্ন ওঠে তখনই, যখন নারীর জীবন সংগ্রামের পরিণতি ঘটাতে পুরুষকে ‘সেভিয়ার’ হিসেবে অনিবার্য করে তোলা হয়। যেন পুরুষের স্বীকৃতি অথবা সক্রিয় উদ্ধার ছাড়া নারীর উত্তরণ এবং যুদ্ধজয় সম্পূর্ণ হতে পারে না।

বড় প্রযোজনা সংস্থা, কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা এবং শক্তিশালী বিপণনের ছাতা পাওয়া অনেক তথাকথিত নারীকেন্দ্রিক সিনেমার মধ্যে এই পরিচিত ছকটি দেখা যায়। সেখানে নারী লড়াই করেন ঠিকই, কিন্তু তাঁকে পথ দেখাতে, বৈধতা দিতে অথবা উদ্ধার করতে শেষ পর্যন্ত একজন সহৃদয় পুরুষ এসে উপস্থিত হন। নারীকে গল্পের কেন্দ্রে রাখা হয়, কিন্তু তাঁর বিজয়ের চাবিটি থেকে যায় পুরুষের হাতে। এই ধরনের নারীকেন্দ্রিকতা আসলে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুমোদিত এই যে নারীবাদ, সেখানে নারী স্বাধীন হতে পারেন, কিন্তু তাঁর স্বাধীনতা পুরুষতন্ত্রের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠার অনুমতি পায় না।
কিন্তু একজন নারী যদি নিজেই নিজের লড়াইয়ের চালিকাশক্তি হন? যদি নিজের সিদ্ধান্ত, ভুল, বুদ্ধি, জেদ ও পরিশ্রম দিয়ে তিনি নিজের পথ তৈরি করেন? তখনই যেন প্রযোজকের অঙ্ক বদলে যায়। চরিত্রটিকে বলা হয় ‘অতিরিক্ত স্বাধীন’, গল্পটিকে বলা হয় ‘নিশ’, ‘ফেস্টিভ্যালধর্মী’, ‘শহুরে’ অথবা ‘বাণিজ্যিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ’। অথচ একই মাত্রার জটিলতা, ক্রোধ, অন্ধকার কিংবা আত্মকেন্দ্রিকতা কোনও পুরুষ চরিত্রের মধ্যে থাকলে তাকেই আমরা অনায়াসে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ বলে গ্রহণ করি।
বাংলা ওটিটি-র কথা বলি। বাংলা প্ল্যাটফর্মগুলোতে বেশ কিছু নারীকেন্দ্রিক অথবা তথাকথিত ‘ফেমিনিস্ট’ কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে। তার মধ্যে অবশ্যই কয়েকটি ব্যতিক্রমী ও প্রশংসনীয় কাজ রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে দর্শক হিসেবে আমার মনে হয়, আমরা একই গল্পের চর্বিতচর্বণ দেখছি।

স্বামীর পরকীয়া আবিষ্কার করাই যেন নারীর আত্ম-অন্বেষণের একমাত্র সূচনা। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে একই ‘স্বামী প্রতারণা করল… নারী নিজেকে খুঁজে পেল’ সূত্রকে নতুন ‘নারীবাদী কনটেন্ট’ বলে পরিবেশন করা যথেষ্ট নয়। পুরুষের পরকীয়ার প্রতিক্রিয়ায় যদি নারীর সমস্ত আত্মসচেতনতা জন্মায়, তা হলে তাঁর জীবনকাহিনির কেন্দ্রেও শেষ পর্যন্ত পুরুষই থেকে গেলেন। নারীকে প্রধান চরিত্র করা হল, কিন্তু ন্যারেটিভের সূর্য রয়ে গেল পুরুষ। নারী শুধু সেই সূর্যের চারপাশে একটু নতুন কক্ষপথে ঘুরলেন… এই যদি উওম্যান-সেন্ট্রিক ফিল্মের রোল মডেল স্টোরি হয়, তাহলে বলতে হয় আমাদের সমাজে জেন্ডার ইকোয়ালিটি বা লিঙ্গ সাম্যবাদ আসলে কাঁঠালের আমসত্ত্ব।
বিশ্বের সাম্প্রতিক সিনেমা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। কোরালি ফারজার ‘দ্য সাবস্ট্যান্স’ নারীদেহ, বয়স, সৌন্দর্য, শিল্প এবং পুরুষ দৃষ্টির নির্মম বাজারকে বডি-হররের ভাষায় ভেঙেছে। ওয়াল্টার সালেস পরিচালিত ব্রাজিলীয় ছবি ‘‘আ’য়াম স্টিল হিয়ার” সামরিক স্বৈরাচারের মধ্যে এক নারী ও মায়ের রাজনৈতিক প্রতিরোধকে কেন্দ্রে এনে ২০২৫ সালে শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের অস্কার জিতেছে। পরিচালক পুরুষ হলেও ছবির রাজনৈতিক ও মানসিক কেন্দ্র একজন নারী। শন বেকারের ‘অ্যানোরা’ একজন যৌনকর্মীকে রূপকথার নিষ্ক্রিয় রাজকন্যা হিসেবে নয়, শ্রেণিবৈষম্য ও ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়তে থাকা জটিল মানুষ হিসেবে দেখেছে। অর্থাৎ আবারও একজন পুরুষ পরিচালক নারীর অভিজ্ঞতাকে তাঁর সিনেমার কেন্দ্রে এনেছেন।
ভারতীয় ছবির মধ্যেই পায়েল কাপাডিয়ার ‘অল উই ইমাজিন ইজ লাইট’ মুম্বইয়ের তিন নারীর শ্রম, নিঃসঙ্গতা, বন্ধুত্ব ও আকাঙ্ক্ষাকে এমন এক সূক্ষ্ম চলচ্চিত্রভাষায় ধরেছে, যেখানে কোনও পুরুষ তাঁদের জীবনের একমাত্র সংজ্ঞা হয়ে ওঠেন না। ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে গ্র্যান্ড পিক্স পেয়েছে, গোল্ডেন গ্লোব ও বিএএফটিএ-তে মনোনীত হয়েছে এবং সাইট অ্যান্ড সাউন্ড-এর ২০২৪ সালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়েছে। ছবিটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, নারীর নীরব, দৈনন্দিন এবং তথাকথিত ‘ছোট’ অভিজ্ঞতাও বিশ্বসিনেমার কেন্দ্রীয় শিল্প হয়ে উঠতে পারে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে চিত্রনাট্যকার বা পরিচালক হিসেবে চিহ্নিত করি না, নিজেকে নারীকেন্দ্রিক অথবা পুরুষকেন্দ্রিক সিনেমার নির্মাতা হিসেবেও চিহ্নিত করি না। আমার সিনেমার মূল প্রতিপাদ্য ভালোবাসা। কারণ আমি বিশ্বাস করি… শেষ পর্যন্ত সব কবিতা, সব গান, সব ছবি এবং সব সিনেমাই কোনও না কোনওভাবে ভালোবাসার কথা বলে।
আমার দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘আমি যখন হেমা মালিনী’ করতে গিয়েই বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের পরিকাঠামোকে আরও নির্মমভাবে বুঝতে পারি। ছবিটি ভালোবাসার গল্প হলেও একইসঙ্গে নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়নের গল্প। মালিনীর জীবনে ভালোবাসা নিজের পথ খুঁজে নেয়, কিন্তু নিজের উত্থানের পথটি সে নিজেই তৈরি করে। কোনও পুরুষ এসে তার হয়ে যুদ্ধটি জিতে দেয় না।
ছবিটির ধারণা ও প্রস্তাব নিয়ে কয়েকটি প্রযোজনা সংস্থার কাছে গিয়েছিলাম। তারা আগ্রহ দেখায়নি। হতে পারে, তাদের ছবি নির্বাচনের প্যারামিটারের সঙ্গে আমার প্রস্তাবটি মেলেনি। শিল্পে প্রত্যাখ্যান থাকবেই এবং প্রত্যেক প্রযোজকের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও রয়েছে। কিন্তু একজন নারী যখন নিজের গল্পে বিশ্বাস রেখে প্রযোজনার আর্থিক ঝুঁকিটিও নিজের কাঁধে তুলে নেন, তখনও তাঁর পথ সহজাত হয় না। ছবি তৈরি হয়ে পড়ে রইল, অথচ দর্শকের কাছে পৌঁছনোর নির্দিষ্ট রাস্তা নেই। রসিকা দুগ্গল যে বাস্তবতার কথা বলেছেন, আমি তখন তার একেবারে ভিতরে দাঁড়িয়ে। মহিলা পরিচালকের ফিল্ম বা মহিলা কেন্দ্রিক ফিল্ম বলেই কি এমন গা-ছাড়া ক্যাজুয়াল এপ্রোচ?

একটি সংগঠিত চলচ্চিত্র-আন্দোলন দরকার। মুম্বইয়ে উওম্যান ইন ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্ডিয়া-র মতো সংগঠন গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক স্তরেও ‘WIFT’-র একাধিক শাখা চলচ্চিত্র শিল্পে নারীর সমান সুযোগ, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও পেশাগত সংযোগ তৈরির কাজ করে। বাংলায়ও তেমন একটি কার্যকর সংগঠন তৈরি হওয়া দরকার– শুধু মহিলা পরিচালক নয়, নারীকেন্দ্রিক সিনেমার সম্ভাবনাময় পরিচালক, লেখক, অভিনেতা, সম্পাদক, চিত্রগ্রাহক, প্রযোজক এবং পরিবেশকদের নিয়ে।
ভারতে আজ বহু সফল মহিলা প্রযোজক রয়েছেন– গুনীত মোঙ্গা কাপুর, একতা কাপুর, রিয়া কাপুর, কিরণ রাও, জোয়া আখতার, রীমা কাগতি, আলিয়া ভাট, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাস, জ্যোতিকা প্রমুখ। তাঁরা বিভিন্ন সময়ে নারীকে কেন্দ্রে রাখা, স্বাধীন অথবা ব্যতিক্রমী বিষয়ের ছবিতে বিনিয়োগ করেছেন। তাঁদের পাশাপাশি এমন পুরুষ প্রযোজকও রয়েছেন, যাঁরা নারীর গল্পকে ‘মহিলাদের ছোট বাজার’ হিসেবে না দেখে সার্বিক মানবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করেন।
নারীর গল্পের সমস্যা দর্শক নয়। বহুবার দর্শকই শিল্পের তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের ভুল প্রমাণ করেছেন। মূল সমস্যা হলো ‘ঝুঁকি’ শব্দটির লিঙ্গভিত্তিক ব্যবহার। পুরুষকেন্দ্রিক বড় বাজেটের ছবি ব্যর্থ হলে বলা হয়, ছবিটি চলেনি। কিন্তু একটি নারীকেন্দ্রিক ছবি ব্যর্থ হলে বলা হয়, নারীকেন্দ্রিক ছবি চলে না। একজন পুরুষ তারকার একাধিক ব্যর্থতার পরেও পরবর্তী ছবি পান। একজন নারীকে একটি ছবির আয় দিয়েই নিজের এবং প্রায় সমগ্র নারী জাতির বাজারমূল্য প্রমাণ করতে হয়।

আসলে নারীর গল্প বিক্রি হয় না, একথা সত্য নয়। সত্য হল, আমরা এখনও নারীর গল্পকে বিক্রি করার সমান চেষ্টা করি না। আমরা নারীর স্বাধীনতা দেখতে চাই, কিন্তু তার উপরে পুরুষতান্ত্রিক অনুমোদনের একটি অদৃশ্য শিলমোহরও খুঁজি। এই শিলমোহরের প্রয়োজন যত দিন থাকবে, তত দিন নারীকেন্দ্রিক সিনেমার সংখ্যা বাড়লেও সিনেমার ভিতরের নারী সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হবেন না।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved