

কয়েক বছর আগে একটা বই পড়েছিলাম। বইটার বিষয় ড্রাঙ্কেননেস। লেখক এক পাক্কা ইংরেজ। সাংবাদিক। নাম, যতদূর মনে আছে, মার্ক। মার্ক ফরসাইট। মাতলামো নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি প্রথম বাক্যটি লিখছেন: I am afraid that I don’t really know what drunkenness is! তার কারণ, মদের কথা যত লেখা হয়েছে, মাতলামির কথা তো তত লেখা হয়নি।
ফড়িঙের উড়ানের মতো হালকা মদ খাওয়া কবে ঢুকে পড়েছিল আমার জীবনে, বলতে পারব না। কিন্তু নিত্য ব্রতপালনের নিয়মানুবর্তিতা ও বিশুদ্ধি নিয়ে আমি আমার যাপনে ধ্রুপদি মহিমায় আসব-আসক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম স্কটিশ চার্চ কলেজে অধ্যাপনা শুরু করার পরে, ১৯৬৫ সালটাল হবে। সুতরাং, ১৯৮৫-র কোনও একদিন আমার এই সিরিয়াস সংসক্তির বিশ বছরের জন্মদিন উদ্যাপিত হয়েছিল, কলকাতার কোনও শুঁড়িখানায়, হয়তো কিছু সতীর্থদের মশগুলে কিংবা কোনও বন্ধুনির আচ্ছন্ন নিভৃতে। শুধু এই তথ্যটি আমার কাছে জ্ঞাত ছিল না যে, সেইদিন আমার প্রাত্যহিক মদ খাওয়ার বিশ বছর পূর্ণ হল। কেননা আমি তরুণ মাইকেল মধুসূদনের মতো আমার সুরাপানের প্রথম দিনটিকে একটি পত্রের মধ্যে অপূর্ব প্রকাশে চিরায়ত করিনি।
১৮৪১-এর ১৩ অক্টোবর। বছর ষোলোর মধুসূদন প্রিয় বন্ধু গৌরদাসকে লিখলেন ইংরেজিতে, গৌর, কাল আমি গঙ্গাবক্ষে নৌকায় পাল তুলে জীবনে প্রথম ব্যাখাস-এর আরাত্রিক করতে চলেছি। বুঝতেই পারছ বন্ধু, এই প্রথম আমি স্বাদ গ্রহণ করতে চলেছি স্বর্গীয় সুরার। আমি চাই, তুমি গঙ্গার বুকে আমার পানবান্ধব হও। গৌর, তুমি সঙ্গে আনতে পারো নিশ্চয় কিছু বন্ধু। কিন্তু তারা যেন হয় আমার মনের মানুষ। মদ সম্বন্ধে তাদের মনে যেন কোনও অপরাধবোধ না থাকে।

গৌর একাই পৌঁছেছিলেন মধুর কাছে, গঙ্গায় সুরাবিহারে। মধু মহার্ঘ ফরাসি ব্র্যান্ডির সঙ্গে একটি চপ ধরিয়ে দিলেন পরম বৈষ্ণব বন্ধু গৌরের হাতে। গৌর কামড় বসিয়ে অনুভব করলেন স্বাদ গন্ধের নতুন মোহ। ব্র্যান্ডিতে চুমুক দিয়ে জানতে চাইলেন, কীসের চপ মধু? মধু বললেন, ফরবিডন ফ্লেশ, নিষিদ্ধ মাংস।
মাইকেল মধুসূদনের গঙ্গাবক্ষে ব্র্যান্ডি পানের কথা যখন বললাম, তখন পদ্মাবক্ষে রবীন্দ্রনাথের পানবিলাশের কথা একটু না-বললে অন্যায় হবে।
রবীন্দ্রনাথ যখন একা ভেসে বেড়াচ্ছেন ১৮৮৯ থেকে ১৯০১-এর মধ্যে শিলাইদহ থেকে সাজাদপুরে, পদ্মার পথে, তখন ১৮৯৪ জুলাই মাসে গগনেন্দ্রনাথকে লেখা একটি চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘আমার অতিথিরা দুদিন ধরে বিস্তর মুরগি, টিনের মাছ, সসেজ, শ্যাম্পেন, ক্ল্যারেট এবং হুইস্কি সমাপ্ত করে গেছেন।’ ১৮৯৯ সালে কুষ্ঠিয়া যাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। সঙ্গে অলেক্সটি হুইস্কি এক বোতল, ভারমুথ ছটা, সোডাওয়াটার দু’ডজন, লেমনেড এক ডজন, জিনজারেড তিন ডজন। (তথ্য: প্রশান্তকুমার পাল। রবিজীবনী)

কেমন ছিল রবীন্দ্রনাথের ব্যবহার পানের আসরে? জানাচ্ছেন দেশপ্রেমিক, ‘পলাশীর যুদ্ধ’ কাব্যগ্রন্থের বিখ্যাত লেখক, রবীন্দ্রনাথের থেকে ১৪ বছরের বড় নবীনচন্দ্র সেন: ‘টেবিলে পানাহার বড় আনন্দের সহিত চলিতে লাগিল। রবিবাবুর মার্জিত সোনার চশমা, মার্জিত রুচি, মার্জিত ঈষৎ হাসি। সমস্ত দিন ঠাকুরবাড়ির ওজন মাপা চাপা কথা, চাপা হাসি, ও চাপা শিষ্টাচারে আমার নিশ্বাস বন্ধ হইয়া আসিয়াছিল। আমি আর পারছিলাম না। সুরাদেবীও পরিমিত শিষ্টাচারের বন্ধন কিছু শিথিল করিয়াছিলেন। আমি বলিলাম, রবিবাবু! সমস্ত দিন আপনার চাপা কথা ও চাপা হাসিতে বড়ো জ্বালাতন হয়েছি। আমি আর আমার ওজন ঠিক রাখতে পাচ্ছি না। দোহাই আপনার। আপনি একবার আমাদের মতো প্রাণ খুলিয়া হাসিয়া কথা বলুন।’
ভুলে যাই কী করে এই রবীন্দ্রনাথ ছোটদের মজার বই ‘খাপছাড়া’য় লিখলেন, ‘গাড়িতে মদের পিপে ছিল তের চোদ্দো/ এঞ্জিনে জল দিতে ভুলে দিল মদ্য।’ কিংবা লিখতে পারলেন এই অনবদ্য সাহসী উপদেশ দেশবাসীর প্রতি: ‘ধরো হুইস্কি-সোডা আর মুর্গি-মটন’।

১৯৮০ দশকের কথা বলতে গিয়ে একটু প্রাচীন পানচর্চার প্রসঙ্গ না টেনে পারলাম না, আমার রক্তের টানের কথা বোঝাতে। এই যে মদ খেতে আমার খুব ভালো লাগে, শিবের মাথায় জল ঢাললে শিব যত খুশি হন, আমার আহ্লাদ তার চেয়ে অনেক বেশি হয় আমার মুখে মদ ঢাললে। বলেই রেখেছি, চিরদিনের জন্য যে মুহূর্তে বিদায় নিচ্ছি, মুখে দূষিত গঙ্গাজল না-দিয়ে, দু’-ফোঁটা বিশুদ্ধ স্কচ দিও। তবে ব্লেনডেড। সিঙ্গেল মল্ট নয়। ওটা সয় না। কুকুরের পেটে ঘিয়ের মতো।
১৯৬৭ থেকে ১৯৭৭, আমার মনে মদের স্বাদ একরকম। আবার ১৯৭৮ থাকে ২০১০ আর একরকম। এবং তারপর থেকে মদের স্বাদ একেবারে বদলে যাচ্ছে। কিন্তু একবারে তরুণ বয়সে, যখন প্রথম ধরেছে কলি আমার মদের মল্লিকাবনে– আমি দুপুরে খেতাম জিন, জিন অ্যান্ড টনিক, আর সন্ধে থেকে রাত হুইস্কি। এখন হুইস্কি ছাড়া কিছুই তেমন সাড়া ফেলে না জিভে, শরীরে, মনে। তবে ১৯৮০-র দশক থেকে একটা নতুন ডাইমেনশন এসেছে। বেশি বাঙালি মেয়েকে পেয়েছি গেলাস-বন্ধুনি। মেয়েরা এমনিই সুন্দর। পান করলে আরও সুন্দর। তাদের কথায়, তাদের নীরবতায়, তাদের হাসিতে, তাদের বেদনায় একটা অন্য খোলতাই আসে। আঁচলখসা বাহারের মতো। আমার এইরকম টিপসি-সঙ্গিনী ভালো লাগে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল: কয়েক বছর আগে একটা বই পড়েছিলাম। বইটার বিষয় ড্রাঙ্কেননেস। লেখক এক পাক্কা ইংরেজ। সাংবাদিক। নাম, যতদূর মনে আছে, মার্ক। মার্ক ফরসাইট। মাতলামো নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি প্রথম বাক্যটি লিখছেন: I am afraid that I don’t really know what drunkenness is! তার কারণ, মদের কথা যত লেখা হয়েছে, মাতলামির কথা তো তত লেখা হয়নি। আর মেয়েদের মদ খাওয়া আর মাতলামি তো আমরা কার্পেটের তলায় রেখে দিই। যেমন ধরুন, ব্রিটিশ প্রাইম-মিনিস্টার মার্গারেট থ্যাচারের মাতাল অবস্থা। উইনস্টন চার্চিল মদ খেয়ে মাতাল, এমন মুহূর্ত জেগে আছে ইতিহাসে। কিন্তু মার্গারেট থ্যাচার মাতাল! অসম্ভব! মার্গারেট থ্যাচারের কবরের পাশে তো একটা আস্ত মদের দোকান রাখা উচিত ছিল। কিন্তু তা কি রাখা হয়েছিল?

আমার যৌবনে টিপসি মেয়েদের সঙ্গ ততটা পাইনি, যতটা পেয়েছি অনেক পরে, ৫০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। ঈষৎ মাতাল, চলনসই শিক্ষিত, নরম সুন্দরী এবং রবীন্দ্রসংগীত জানা কোনও মহিলা পানসঙ্গিনী হলে, মনে হত তা ঈশ্বরের দান। কিন্তু আজকাল আর সেটা হয় না। বা তেমন সঙ্গিনী নেই, তাও হতে পারে। ইদানীং আমার হুইস্কির সঙ্গী নস্টালজিয়া। মনকেমন। প্রতি সন্ধেয় হুইস্কি আমাকে বোঝায় বিষাদের স্বাদ। প্রতি রাত্রে হুইস্কি আমাকে জানায় একাকিত্বের মূল্য। হুইস্কি আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমার সব অন্যায়, অপরাধ, ভ্রান্তি। হুইস্কি আমাকে ভালোবাসতে শেখায় তাদের, যাদের আমি ফেলে এসেছিলাম অপ্রেমে। আর হুইস্কি আমাকে হঠাৎ দিয়ে যায় অনুভব, উপলব্ধি, বোধের ঝলক, যা আমার নয়, অন্য কোনও স্তর থেকে ছিটকে আসা। কোনও কোনও গভীর রাতে হুইস্কি আমাকে নিয়ে যায় অকল্পনীয় শব্দের নিধুবনে। যাকে সকালবেলা আর পাই না। এমন কি সবার হয়?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved