

শান্তিনিকেতনের আকাশে পুজোর গন্ধ না-থাকলেও তার চারপাশে শ্যামবাটি, ভুবনডাঙা, জামবনি, বোলপুর, এমনকী, শ্রীনিকেতনের গা-ঘেঁষে সুরুল গ্রামও সেই গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। পুজোর ক’টা দিন চারপাশের কোলাহলের মধ্যে শান্তিনিকেতন নিরবচ্ছিন্ন এক দ্বীপের মতো পড়ে থাকে। আরতি নেই, কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজ নেই, কোলাহল নেই– ছাতিম ফুলের গন্ধে বুঁদ হয়ে, শান্ত স্তব্ধ আলস্যে সে গড়িয়ে নেয়।
সোনালি রোদ্দুর আর নীল আকাশের গায়ে যখন আপামর বাঙালি পুজো-পুজো গন্ধ পায়, তখন সেই আকাশের গায়ে ‘সাদা মেঘের ভেলা’ দেখে শান্তিনিকেতন ভাবে– ‘দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী বাওয়া’।
শান্তিনিকেতনের আকাশে পুজোর গন্ধ না-থাকলেও তার চারপাশে শ্যামবাটি, ভুবনডাঙা, জামবনি, বোলপুর, এমনকী, শ্রীনিকেতনের গা-ঘেঁষে সুরুল গ্রামও সেই গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। পুজোর ক’টা দিন চারপাশের কোলাহলের মধ্যে শান্তিনিকেতন নিরবচ্ছিন্ন এক দ্বীপের মতো পড়ে থাকে। আরতি নেই, কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজ নেই, কোলাহল নেই– ছাতিম ফুলের গন্ধে বুঁদ হয়ে, শান্ত স্তব্ধ আলস্যে সে গড়িয়ে নেয়।

শহরে, যখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে বারোয়ারি পুজোর ব্যানার ঝুলতে শুরু করে, তখন এখানে কলাভবনের সামনে মালঞ্চ বাড়ির পর থেকে ইলেকট্রিক পোলের তার ধরে সবুজ ঘন লতার নির্ভীক আলপনা এগিয়ে চলে যায় সেই কালীসায়রের মোড় পর্যন্ত। লতাপাতায় মোড়া এক একটি লাইটপোস্ট যেন হয়ে ওঠে প্রতিমা আর তার গা থেকে সবুজ পাতার স্রোত ডাকের সাজের আঁচলের মতো মাটিতে নেমে আসে। দেবদেবীরা কবির নাটকে, নৃত্যনাট্যে এসেছেন কাহিনির প্রয়োজনে। তাঁরা বর দেন অথবা প্রত্যাখ্যাতও হন, কিন্তু বাংলার ব্রতকথার মতো জনমানসে আদৃত হন না। পুজোর বাদ্যি শান্তিনিকেতনে নেই বা ছিলও না, কিন্তু শরতের উৎসব তো ইচ্ছে করলেই রচনা করে নেওয়া যায়। মন যদি নেচে ওঠে, তাহলে উপলক্ষের অভাব হয় না।
তখন ১৯০৮ সাল। শান্তিনিকেতনে সবেমাত্র ‘বর্ষা উৎসব’ পালিত হয়েছে। ক্ষিতিমোহন সেন লিখেছেন, ‘বর্ষা গেল, খুব ভালো করিয়া শারদোৎসব করিবার জন্য কবি উৎসুক হইলেন। আমাদিগকে বলিলেন, বেদ হইতে ভালো শারদশোভার বর্ণনা খুঁজিয়া বাহির করিতে। একে একে অনেকগুলি গান রচিত হইল। ক্রমে তাঁহার মনে হইল গানগুলিকে একটি নাট্যসূত্রে বাঁধিতে পারিলে ভালো হয়। তাহার পর তৈয়ারি হইয়া উঠিল শারদোৎসব নাটক।’
ব্রহ্মচর্য সাধনার ক্ষেত্র এই আশ্রমে ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ ঈশ্বরের সাধনায় কোনও দেব-দেবীর মূর্তিভাবনা ছিল না। উপাসনাগৃহের রঙিন কাচের মধ্য দিয়ে আলপনার ওপরে আলোর যে মায়া, সে সূর্যদেবের ক্ষণিকের ছলনা হলেও তাতে আকারের আবাহন আছে। নেই দেবমূর্তি। ‘নিরাকার’ শুধু সেইটুকুই। শান্তিনিকেতনে প্রকৃতির কোলে কবির সাধনা ছিল ‘আকার’ নিয়ে। জগৎ জুড়ে ‘আকারের মহাযাত্রা’ দেখে তাঁর বিস্ময়ের অন্ত ছিল না। তাই প্রকৃতি ও বিভিন্ন ঋতু নিয়েই বছর জুড়ে গড়ে তুললেন নানা উৎসব। ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা এখানে চিরকালই এসেছেন বাইরে থেকে। তাঁরা তাঁদের পুজো, প্যান্ডেল, আলোকসজ্জার দুঃখ ভুলতেন বসন্তোৎসব, বর্ষামঙ্গল, শারদোৎসবের আনন্দে। উপলক্ষ ঘিরে উৎসব-অনুষ্ঠান, আর তাকে কেন্দ্র করে যত আয়োজন, সাজসজ্জা, আঁকাজোকা, আলপনা, শোভাযাত্রা নিয়ে– সেই আনন্দযজ্ঞ আর বাইরের পূজামণ্ডপের মধ্যে বাহ্যিক চেহারায় পার্থক্য থাকলেও– উভয় ক্ষেত্রেই শিল্পসৃষ্টির মাধ্যমে নান্দনিকতার প্রতি আগ্রহের দিকটাই প্রকাশ পায়। দুর্গাপুজোর এক পক্ষকাল আগেই শান্তিনিকেতনে নাট্যঘরে শুরু হয়ে যায় শারদোৎসব।

নাট্যোৎসবের এক জমজমাট আয়োজন! আর আছে গৌরপ্রাঙ্গণে আনন্দবাজারে রন্ধনশিল্প ও হস্তশিল্পের বিকিকিনি। এ-বাজার হয়ে ওঠে আনন্দময় এক মিলনক্ষেত্র। সিংহবাহিনী দশপ্রহরণধারিণীর মূর্তি না-দেখা গেলেও, আছে বিশালাকার সব মহীরুহ– এক-একটি বৃক্ষদেবতা। এক সময় কোনও এক সূর্যাস্তের ক্ষণে শান্তিনিকেতনে সন্ধ্যাকাশের আলো-আঁধারিতে তাদের দেখে ‘মাস্টারমশাই’ বলে উঠেছিলেন– ‘পূর্বে দেবত্ব দেবতার রূপেই দেখতাম, এখন দেখতে যত্ন করি– মানুষে, গাছে, পাহাড়ে।’ তিনি তাঁর গুরুমশাইয়ের কাছে পুরাণ-কাব্য পড়ে দেবদেবীর ছবি আঁকতেন– ভালোবাসতেন মসজিদের স্থাপত্য, অজন্তা ও ভারতীয় ভাস্কর্যের অনুগামী এই শিল্পী শান্তিনিকেতনের গাছপালার মধ্যে খুঁজে পেলেন কালী, দুর্গার আকৃতি।
শারদোৎসবে রবীন্দ্রনাথের ‘শাপমোচন’, অবন ঠাকুরের ‘ক্ষীরের পুতুল’-এর পাশাপাশি অন্য নাট্যকারের ‘বর্ধমানের বর বরিশালের কনে’ও সমান দাপটে অভিনীত হয়। দর্শকদের হাতে চিনেবাদামের খোসা ছাড়ানোর আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে হাসির হররা বয়ে চলে নাট্যঘরে শারদোৎসবের প্রতিটি সন্ধ্যা। সেখানে এই ক’দিন সকাল ন’টা থেকে মঞ্চসজ্জা ও নাটকের চূড়ান্ত মহড়া চলে। মঞ্চসজ্জার উপকরণ বলতে হোস্টেলের কয়েকটি চৌকি, টুল, গাছের ভাঙা ডালপাতা, রঙিন কাগজ ও ছুরি-কাঁচি। কখনও একটি চৌকি কাপড় দিয়ে ঢেকে, তার গায়ে রঙিন কাগজের নকশা কেটে, লাগিয়ে মুহূর্তে হয়ে ওঠে দেবরাজ ইন্দ্রের সিংহাসন। ‘সোনাই-মাধব’ নাটকে চৌকি পরপর সাজিয়ে এলোমেলো করে ত্রিপল ঢেকে কামিনীগাছের ডাল বসিয়ে তা পুকুরপাড় হয়ে ওঠে নিমেষে। মঞ্চ সাজানোর সঙ্গে সঙ্গে চলত দেদার হাসি, আড্ডা, ঘন ঘন ফোটানো চা আর কপাল ভালো হলে কারও বদান্যতায় কখনও একটা করে শিঙাড়া। সন্ধ্যায় নাটকশেষে আশ্রমসংগীতের পর একদল হাঁটা দেয় শান্তিনিকেতনের মধ্যে, তো আর একদল শ্রীনিকেতনের দিকে। ওদিকে সুরুলের জমিদারবাড়িতে তখন প্রতিমার গায়ে দোমেটের প্রলেপ চলেছে। সদ্য দেখে আসা ‘বাল্মিকীপ্রতিভা’র লক্ষ্মী-সরস্বতীকে আর ক’দিন পরেই দেখতে পাব চালচিত্রে গায়ে মায়ের দু’-পাশে।

শেষ নাটকের পরের দিন ভোরেই ‘মহালয়া’, আর তার মানেই ‘আনন্দবাজার’। কিন্তু এ ‘মানে’-র কী কোনও মানে হয়? হয় বইকি। সেই ভোরবেলায় শান্তিনিকেতনের আকাশে-বাতাসে যখন ধ্বনিত হচ্ছে ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’, ততক্ষণে ছাত্রদল চলে গিয়েছে বাঁশঝাড়ে বাঁশ কাটতে। উদ্দেশ্য– আনন্দবাজারে তোরণ সাজানো। এর আগে নাট্যঘরে ‘শারদোৎসব’-এর দিনগুলির ফাঁকে ফাঁকে ভবনে ভবনে চলে হাতের কাজ তৈরি। ‘তোরণ’ সাজানোর জন্য চলে বড় বড় কাগজ জুড়ে আঁকা ও লেখার কাজ। একবার আমাদের সদনের অধ্যক্ষ বললেন, ‘এবার কিছু মজার মজার মুখোশ বানালে কেমন হয়?’ পরদিন থেকেই মাউন্ট বোর্ড আর রং-তুলি নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে বসে পড়া। সেসব মুখোশ ছিল রাজা, রাক্ষস, কানে জবাফুল গোঁজা ডাকাত, ছিঁচকাঁদুনে মেয়ে, বোকা ছেলে, আরও কত কী! শান্তিনিকেতনে দুর্গাপুজো নেই বলে কি টানা টানা বাঁশপাতার মতো চোখ নিয়ে সেই আলো-করা মুখ থাকতে নেই? অতএব মায়ের মুখ ফুটে উঠল মুখোশে। বোলপুরের বারোয়ারি প্যান্ডেলে প্রতিমার চোখে তুলির টান না পড়তেই তা প্রাণ পেল ছাত্রছাত্রীদের হাতের মুখোশে।

আনন্দবাজারের বিকেলে সিংহ সদনের পাশে কামিনীগাছের ডালে সেইসব মুখোশ হাওয়ায় দুলতে দুলতে সন্ধের আগেই হাওয়া হয়ে গেল ক্রেতাদের হাতে হাতে। দুর্গার মুখ বেশিরভাগই ততক্ষণে আশ্রমিকদের ঘরের দেওয়ালে পৌঁছে গিয়েছে। সন্ধের মুখে ক্রমশ ভিড় বাড়তে লাগল। পঞ্চদশী, ষোড়শীরা এলোচুলে ফুলপাতা গুঁজে আরও ঝলমলে করে তুলছে গৌরপ্রাঙ্গণের মাঠ। এমন সচল দেবীপ্রতিমা আর কোথায় দেখতে পাওয়া যাবে? শিশুদের তৈরি পিজবোর্ডের বাড়ি, জাহাজ আর রং করা বোতলে মানিপ্ল্যান্ট বেশ ভালো দামেই কিনছেন তাঁদেরই অভিভাবকরা। শিশুর মুখে হাসি ফুটেছে দেখে ক্রেতা ঠকতেও রাজি। সন্ধে যতই রাতের দিকে গড়াচ্ছে শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের বানানো চপ, পেরাকি, নারকেল নাড়ু, নিমকি দ্রুত শেষ হয়ে আসছে স্টলে স্টলে। খুচরো টাকা পয়সায় ভরে উঠছে প্লাস্টিকের বাটির তহবিল। তহবিলের বিক্রয়লব্ধ অর্থ পরের দিন পৌঁছে যাবে ছাত্রকল্যাণমূলক সেবাবিভাগে।

পরদিন সকালে দশমীর শূন্যতা। গৌরপ্রাঙ্গণের মাঠে পড়ে আছে লোহার রেলিং আর খোলা বাঁশের স্তূপ। হোস্টেলের ছেলেমেয়েরা ব্যাগ গুছিয়ে বোলপুর স্টেশনের পথে। শারদ-লক্ষ্মীর পুজো সেরে তাদের গন্তব্য তখন পুজো প্যান্ডেলের দিকে। শান্তিনিকেতনে এক অখণ্ড নীরবতা নেমে আসে। শুনশান রাস্তা। ছাতিমতলা থেকে আম্রকুঞ্জে যতদূর চোখ যায় দু’-একজন হাঁটছে বা দূরে সাইকেলে করে কেউ মিলিয়ে যাচ্ছে। গাছ থেকে ঝুলে থাকা সেই লতাগুল্মের আলপনা হিমেল হাওয়ায় ম্লান হতে শুরু করেছে।

সন্ধেবেলায় একদিকে পুজো প্যান্ডেলের উজ্জ্বলতা, আর অন্যদিকে শান্তিনিকেতনের লাইটপোস্টের নিভু নিভু আলোয় নির্জন রাস্তা আরও যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন। দূরে লালবাঁধের পাশের গ্রাম, শ্যামবাটি আর ভুবনডাঙা থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে এসে বিরহিনী শান্তিনিকেতনের নিসঙ্গতা আরও বাড়িয়ে চলেছে। কালীসায়রের পুকুর ভরে আছে কানায় কানায়। আরও কিছু দূরে ভরা অজয়ের চরে কাশবনের আনন্দমেলা জমে উঠেছে। এরই ফাঁকে উপনন্দ বসে একমনে লিখে চলেছে পাতার পর পাতা। ওদিকে অজয়ের অন্য পাড়ে তখন বিসর্জনের বাজনা।
…….
পড়ুন শারদ সংখ্যা-র অন্যান্য লেখা
…….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved