Sanjib Chattopadhyay Remembers Shankar। Robbar
Robbar
  • ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ১০ অক্টোবর ২০২৬

লেখা মাঝে মাঝে বন্ধ রেখো

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। শংকরের প্রয়াণদিন। তাঁকে বলা হত প্রকাশকদের লক্ষ্মী। এতই জনপ্রিয়, এতই বিক্রিবাট্টা তাঁর বইয়ের। তাঁর উপন্যাস থেকে ফিল্ম শুধু সত্যজিৎ রায়ই তৈরি করেননি, বাসু চ্যাটার্জি এবং পিনাকীভূষণ মুখোপাধ্যায়ও তৈরি করেছিলেন চমৎকার ছবি। তাঁকে দীর্ঘকাল ধরে দেখেছেন, আরেক লেখক, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। আলাদা ঘরানা হলেও, রইল শংকরের প্রতি সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের তর্পণ।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ১০, ২০২৬, ০৮:৫৬   
Facebook WhatsApp Messenger

শংকর, মণিশংকর মুখোপাধ্যায় যখন লিখতে শুরু করেছেন, তখনও আমি লেখালিখি শুরু করিনি। বয়সের খানিক তফাত তো ছিলই। আমি ছিলাম ওঁর নিবিষ্ট পাঠক। মনে পড়ে, সেসময় শংকরের ‘কত অজানারে’ পাঠকদের মধ্যে একরকম বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলেছে! ক্রমে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখেছেন। ধরনও বদলেছেন। দূর থেকে আমি ছিলাম তাঁর মুগ্ধ পাঠক।

কর্মসূত্রে এক পত্রিকার অফিসে কাজ করতে এলাম যখন তখনই আমার সঙ্গে তো ওঁর খানিক ঘনিষ্ঠতা হল। সে পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সাগরময় ঘোষ। সাগরদাই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৭৫-’৭৬ সাল। সে সময়ই শংকরকে প্রথম চোখে দেখলাম। তখন উনি বড় চাকরি করেন। পাশাপাশি বড় লেখক তো বটেই! দেখতাম মাঝেমাঝেই তিনি সাগরবাবুর কাছে হাজির।

zoom
যুবক শংকর

পত্রিকার লম্বা ঘরে বসে থাকতেন সব তাবড় তাবড় সাহিত্যিক। বিমলদা (বিমল কর), রমাদার (রমাপদ চৌধুরী) মতো মানুষ। না, এঁদের সঙ্গে যে খুব আড্ডা দিতেন শংকর, তা নয়। ওই শুভেচ্ছা-জ্ঞাপন, হালকা আলাপচারিতাতেই সীমিত থাকত কথাবার্তা। ওঁর সঙ্গে যাঁর সবচেয়ে বেশি খাতির ছিল, তাঁর নাম জ্যোতিষবাবু। কারণ জ্যোতিষবাবুই ওঁর লেখা কম্পোজ, প্রুফ দেখা– ইত্যাদি কাজকম্মো করতেন। তখন তো ছাপাখানা আজকের মতো না। লাইনো টাইপে কাজ। তিন কিস্তি প্রুফ দেখা হবে, তারপরে ফাইনাল! সেই কারণেই শংকর সাগরবাবুর ঘর থেকে বেরিয়েই জ্যোতিষবাবুর কাছে চলে আসতেন। দু’জনের কথাবার্তা চলত। জ্যোতিষবাবু নস্যি নিতেন। আর শংকর কৌটো থেকে একটিপ নস্যি নিয়ে নাকে দেব-দেব এরকম একটা ভাব করতেন। কিন্তু নিতেন না, সাঁ করে বেরিয়ে চলে যেতেন! মার্জিত কৌতুক আর কী…

zoom
ছবি: শুভঙ্কর দে

শংকর তখন ডানলপে রয়েছেন। ঠিক করলেন– সাহিত্যিকদের নিয়ে একটা সমাবেশ করবেন। তখনকার সব প্রতিষ্ঠিত লেখকই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। কোনও রহস্যময় কারণে উনি আমাকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। গাড়ি করে ওঁর ওখানে গিয়েছিলাম, মনে পড়ে। খুবই হইহই রইরই হল সারাদিন জুড়ে। বস্তুত সেইদিনই ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম বাক্যালাপ! শংকর আমাকে লেখা সম্পর্কে কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, লেখা হল খেজুর রসের মতো, মাঝেমাঝে কাটা বন্ধ করতে হয়। তাকেই তো ‘জিরেন কাটি’ বলে। বললেন যে, এই জিরেন কাটির রস খুব উপকারি। খেতে সুস্বাদু। অতএব হুড়মুড় করে লিখো না– মাঝেমাঝে লেখা স্তব্ধ করে দিও।

zoom

পরে, উনি ‘ক্যালকাটা সিইএসসি’তে চলে আসেন। এদিকে সাগরদাও রিটায়ার করেছেন। অমিতাভ চৌধুরী, যিনি ‘শ্রীনিরপেক্ষ’ ছদ্মনামে বহু লিখেছেন– তিনি দায়িত্ব পেয়ে বেশ হুটপাট করলেন ক’দিন। বললেন যে, পত্রিকায় দুটো সম্পাদকীয় থাকবে, একটা নয়! আবার কখনও বলছেন– বাংলা লেখা শেখাব! এবং একদিন সত্যি সত্যিই সুনীলদা, শীর্ষেন্দুদাকে নিয়ে অফিসের ছাদে একটা মিটিং হল। সেখানে অমিতাভ চৌধুরী আমাদের বাংলা লেখা শেখালেন।

এই সময়টায়, প্রায়শই, সকাল ১১টা নাগাদ, অফিসে আমার কাছে একটা টেলিফোন আসত। ফোন ধরতেই শোনা যেত: ‘আমি কি মাননীয় সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলছি?’ আমি বলতাম, ‘হ্যাঁ, বলছি, বলুন।’ তখন উনি এটা-ওটা নানান কথা বলতেন। আমি ঠিক বুঝতে পারতাম না ঠিক কেন ফোন করছেন! পরে মনে হয়েছে ওঁর কৌতূহল ছিল যে, অমিতাভবাবু পত্রিকাটার কী হাল করছেন, তা উনি জানতে চাইছেন আমার মাধ্যমে। পরে দেখেছি, ঠিক তাই। কারণ যেই-না অমিতাভবাবু চলে গেলেন, ওঁর ফোন করাও বন্ধ হয়ে গেল।

zoom

ওঁর চরিত্রের মধ্যে এই রহস্যময়তা ছিল। ঠিক ধরা যেত না, যে, কী ধরনের মানুষ উনি। কতটা যে বন্ধুত্বপূর্ণ– আঁচ করা যেত না তাও। তিনি কাকে যে আপন ভাবেন, তিনিই জানেন একমাত্র। তিনি বন্ধুশূন্য অবস্থায় থাকতে চাইতেন, না কি নির্বাচিত বন্ধুদল ভালোবাসতেন– সে ব্যাপারে কেউ আন্দাজ করতে পারত না বোধহয়। তবে মনে হয়, উনি বড় একা ছিলেন। একা একা নিজের জগতে নিজের বিষয় নিয়ে নানা ধরনের লেখা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এমনকী, ঠাকুরমা-স্বামীজিকে নিয়েও লেখার চেষ্টা করেছেন।

২০২৫ সালের বইমেলায় ওঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। সেই বইমেলায় আমার পাশেই বসলেন। বসে, আমার দিকে মৃদু তাকালেন। খুব মনখারাপ হল। সেই তাকানোয় আমি একরকম অসহায়তা দেখতে পেয়েছিলাম। লেখার জগতে যিনি অতুল ধারার সৃষ্টি করেছেন, এত খ্যাতিলাভ করেছেন– তিনি আজ এমন একাকী, অসহায়? ওঁর শরীর পারমিট করছিল না। স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে, সে খবরও পেয়েছি। বিশাল এক প্রাণী অরণ্যে একা হয়ে গেলে যেরকম অবস্থায় পড়ে, ওঁকে দেখেও সেইরকমই মনে হয়েছিল আমার।

zoom

জীবনের শেষদিকটায় বোধহয় এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলেন শংকর। মনের দিক থেকে, লেখার দিক থেকে নয়। ওঁর প্রকাশক সুধাংশুশেখর দে সর্বক্ষণ ওঁর পাশে ছিলেন। কিন্তু এই যে প্রথমদিকের শংকর, তাঁর যে পোশাক-পরিচ্ছদ, চালচলন– সেটা ধীরে ধীরে বদলে যেতে দেখেছি। অস্ত সূর্যের তেজ যেভাবে কমে যায়। ওঁকে সেদিন বইমেলায় দেখে মনে হয়েছিল একজন মানুষের উদয় এবং অস্ত– আমি দুটোই দেখলাম। তা আমার সৌভাগ্য না কি দুর্ভাগ্য, আপনারাই বিচার করুন।

Manishankar Mukhopadhyay Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shankar

Share this article on