অজিতেশ বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের কাছে পেশাদারিত্ব ছিল কমিটমেন্ট বা দায়বদ্ধতার চূড়ান্ত রূপ। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে মানুষটি থিয়েটার থেকে নিজের এবং পরিবারের অন্নসংস্থান করেন, থিয়েটার বাঁচলে তিনি বাঁচেন আর থিয়েটার ডুবলে তিনি অনাহারে মরেন– তাঁর কাছে শিল্পের যে গাম্ভীর্য থাকবে, একজন শখের উইকএন্ড-অভিনেতার কাছে তা কোনওদিনই থাকতে পারে না। থিয়েটারকে যদি একটি সম্পূর্ণ, স্বনির্ভর শিল্প হিসেবে দাঁড়াতে হয়, তবে তাকে এই শৌখিনতার আবরণ ছুড়ে ফেলতে হবে।
মঞ্চের আলোগুলি একে একে নিভে আসছে। প্রেক্ষাগৃহ ফেটে পড়ছে হাততালিতে। হয়তো পিরানদেল্লোর ‘এনরিকো ফোর’ ভেঙে তৈরি হওয়া ‘শের আফগান’, অথবা ব্রেখটের ‘থ্রি পেনি অপেরা’-র বঙ্গীকরণ ‘তিন পয়সার পালা’। মিড-স্টেজের স্পটে দাঁড়িয়ে আছেন দীর্ঘদেহী অভিনেতা, যাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর আর পেশির সামান্যতম চলন এইমাত্র কয়েকশো দর্শককে বেঁধে রেখেছিল ‘মঞ্চমায়া’-য়। তিনি অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু মঞ্চের পর্দা নেমে যাওয়ার পর, গ্রিনরুমের নিভৃতে যখন সেই মানুষটি মেকআপ মুছতে মুছতে নিজের জোড়াতালি গ্রুপ-থিয়েটারি পরিকাঠামোর দিকে তাকাতেন, তাঁর চোখে কোনও মায়া থাকত না। থাকত এক নির্মম, শল্যবিদের মতো তীক্ষ্ণ এবং নির্মোহ দৃষ্টি।

ছয় ও সাতের দশকের বাংলা থিয়েটারকে আমরা সাধারণত এক প্রবল আদর্শবাদী, আত্মত্যাগী এবং অ-বাণিজ্যিক শিল্প-আন্দোলন হিসেবেই স্মরণ করতে ভালোবাসি। আমাদের সাধারণ ধারণা হল, সেকালের নাট্যকর্মীরা কেবলই খাঁটি শিল্পের জন্য, গণচেতনার জন্য খেয়ে-না-খেয়ে রক্তজল করা পরিশ্রম করতেন। কিন্তু অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি নিজে এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারিগর এবং ‘নান্দীকার’ ও পরে ‘নান্দীমুখ’-এর প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে এসেছিল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন বয়ান। মূলত ‘নট’ অজিতেশকে মনে রাখতে গিয়ে আমরা ‘প্রাবন্ধিক’ অজিতেশ-এর বিষয়ে ‘স্পিকটি নট’ হয়ে থাকি। একজন প্রাবন্ধিক ও নাট্য-তাত্ত্বিক হিসেবে তিনি বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের এই ‘পবিত্র’ মিথটিকে মিথ্যা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর চোখে, তৎকালীন গ্রুপ থিয়েটারের এই বিপ্লবী খোলসের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর মধ্যবিত্ত আত্মপ্রবঞ্চনা, পেশাদারিত্বের অভাব এবং এক অদ্ভুত সুবিধাবাদ।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে, আইপিটিএ (IPTA) বা গণনাট্য সংঘের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক থিয়েটারের ধারা যখন নানা কারণে স্তিমিত ও খণ্ডিত হতে শুরু করে, তখন তার জায়গা নেয় এই ‘গ্রুপ থিয়েটার’। বাণিজ্যিক থিয়েটারের তথাকথিত সস্তা বিনোদনের বিপরীতে এরা নিজেদের ‘শুদ্ধ শিল্প’-এর পূজারি হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু অজিতেশ প্রশ্ন তুলেছিলেন এই শুদ্ধতার শিকড় নিয়ে। তাঁর মতে, এই আন্দোলন কোনও বৃহত্তর গণসংগ্রাম ছিল না, এটি ছিল শহুরে মধ্যবিত্তের অবসরের বিনোদন ও আত্মতুষ্টির এক নিরাপদ আস্তানা। অত্যন্ত শ্লেষের সঙ্গে তিনি ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ সংগ্রহ’-এর ‘দল ভাঙাভাঙি বিষয়ে’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন: ‘এই আর্ট থিয়েটার, আমরা যার চর্চা করতুম নিউ এম্পায়ারে, এখন অভাবে অ্যাকাডেমিতে– এ হল এই শ্রেণিবিভক্ত সমাজে মধ্যবিত্তদের খেলনা। এই থিয়েটার মধ্যবিত্তরাই করেন, তাঁরাই দেখেন, তাঁরাই সমালোচনা করেন, তাঁরাই আনন্দিত অথবা পুলকিত হন, তাঁরাই দল ভাঙেন এবং অবশেষে রিটায়ার করেন।’
এই কথাগুলির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ সমাজতাত্ত্বিক সত্য। থিয়েটার যখন কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির বৃত্তের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে, তখন তার বৈপ্লবিক দাবিগুলি যে আসলে ফাঁপা আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই নয়, অজিতেশ তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। গ্রুপ থিয়েটারের কর্মীরা প্রায় প্রত্য়েকেই ছিলেন স্কুল-কলেজের শিক্ষক, করণিক বা সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবী। মাসের শেষে বাঁধা মাইনের নিরাপত্তাটুকু পকেটে রেখে, ছুটির দিনে বা সন্ধেবেলায় তাঁরা থিয়েটার করতে আসতেন। ফলে শিল্পের জন্য জীবন বা জীবিকা বাজি রাখার মতো যে বেপরোয়া সাহস ও দায়বদ্ধতা একজন প্রকৃত পেশাদারের থাকা প্রয়োজন, এই শৌখিন বিপ্লবীদের তা ছিল না।

অজিতেশ এই ‘নিরাপদ বিপ্লব’-এর মানসিকতাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন। তাঁর কলমে কোনও রাখঢাক ছিল না: চাকরে-বাকরে লোকদের সংগঠন। বেশি বাড়লে চাকরি যাবে এই ভয়ে তটস্থ হয়ে শুদ্ধ শিল্পচর্চার কথা বলে বাইরে শহীদ শহীদ ভাবটা বজায় রাখেন। এর মধ্যে সিনেমায় নেমে ডাঙ্গার কাছাকাছি অল্প জলে খেলে জীবন ধারণ করেন, এঁরা Art Film এ নামলে খুব খুশি। তাতে জাতও যায় না, পেটও ভরে।’ (উৎস প্রবন্ধ– চলচ্চিত্র ও গ্রুপ থিয়েটার)
নিরাপদ চাকরির খোলসের ভেতর বসে খাঁটি শিল্পের বড়াই করা যায়, কিন্তু শিল্পের জন্য রক্তপাত করা যায় না। শখের বিপ্লবের চেয়ে পেশাদারের ঘাম অনেক বেশি সৎ, কারণ সেখানে জীবিকার সঙ্গে শিল্পের এক নাড়ির টান জড়িয়ে থাকে।
এই ‘শহিদ শহিদ ভাব’ শব্দবন্ধটি তৎকালীন সাংস্কৃতিক কর্মীদের মনস্তত্ত্বের এক অসামান্য দলিল। মুখে বাণিজ্যিক সিনেমার তীব্র সমালোচনা করা এবং আর্ট ফিল্মের পরিচালকদের স্তুতি করা গ্রুপ থিয়েটারের একটি অলিখিত নিয়ম ছিল। কিন্তু অজিতেশ দেখিয়েছিলেন, এই আদর্শবাদের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক তীব্র সুবিধাবাদ। থিয়েটারকে তাঁরা ব্যবহার করেন একটি ‘ওয়েটিং রুম’ হিসেবে, যেখান থেকে সুযোগ পেলেই সিনেমার জগতে (এখন সিরিয়াল, ওয়েব সিরিজ!) প্রবেশ করা যায়। অথচ মুখে তাঁরা প্রচার করেন যে, থিয়েটারই তাঁদের পরম আরাধ্য। এই দ্বিচারিতাকেই অজিতেশ তাঁর তীক্ষ্ণ ভাষায় বিদ্ধ করেছিলেন।

তিনি বারবার জোর দিয়েছিলেন ‘পেশাদারিত্ব’-এর ওপর। তাঁর কাছে ‘পেশাদার’ শব্দটির অর্থ কেবল টিকিট বিক্রি করে মুনাফা লোটা বা বাণিজ্যিক থিয়েটারের আপসকামিতা ছিল না। তাঁর কাছে পেশাদারিত্ব ছিল কমিটমেন্ট বা দায়বদ্ধতার চূড়ান্ত রূপ। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে মানুষটি থিয়েটার থেকে নিজের এবং পরিবারের অন্নসংস্থান করেন, থিয়েটার বাঁচলে তিনি বাঁচেন আর থিয়েটার ডুবলে তিনি অনাহারে মরেন– তাঁর কাছে শিল্পের যে গাম্ভীর্য থাকবে, একজন শখের উইকএন্ড-অভিনেতার কাছে তা কোনওদিনই থাকতে পারে না। থিয়েটারকে যদি একটি সম্পূর্ণ, স্বনির্ভর শিল্প হিসেবে দাঁড়াতে হয়, তবে তাকে এই শৌখিনতার আবরণ ছুড়ে ফেলতে হবে। নাট্যকর্মীদের প্রতি ‘নাট্যচিন্তা’ প্রবন্ধে তাঁর অকপট আহ্বান ছিল: ‘… সমস্ত সময়টা এতে দিন, রোজগার করুন এবং যাকে ভালবাসেন সেই পেশা থেকে পবিত্র অন্ন গ্রহণ করুন।… আমরা যে অবস্থায় আছি এই শৌখিনতা ভেঙ্গে ফেলুন। এতে শখ মেটানো হয়, আর কিছুই হয় না। অভিনেতা হওয়ার শখ, বুদ্ধিজীবী হওয়ার শখ এবং সর্বোপরি খানিকটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার শখ।’

এই ‘পবিত্র অন্ন’ কথাটির মধ্যে দিয়ে তিনি থিয়েটারকে নিছক বিনোদন বা বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডার স্তর থেকে তুলে এনে শ্রম ও ঘামের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন, অপেশাদারিত্বের এই সংস্কৃতি আদতে থিয়েটারের কোনও দীর্ঘমেয়াদি ভালো করতে পারে না। ভবেশ দাস সম্পাদিত ‘অগ্রন্থিত অজিতেশ’-এর ‘নতুন থিয়েটার কর্মীদের প্রতি একটি সাবধানী’ তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখেছিলেন: ‘আমি কখনো বলি না গ্রুপ থিয়েটারের উপযোগিতা নেই। কিন্তু চাল আটা বাদ দিয়ে সুজিই প্রধান খাদ্য বললে যা দাঁড়ায়, পেশাদার শিল্পী ও শিল্পের চেয়ে অ্যামেচারের মূল্য অধিক এ বললেও তাই দাঁড়ায়।’
দল ভাঙার সমাজতত্ত্ব নিয়েও প্রাবন্ধিক অজিতেশের পর্যবেক্ষণ ছিল অসামান্য। আদর্শগত দ্বন্দ্ব বা নন্দনতাত্ত্বিক মতবিরোধের কারণে বাংলা থিয়েটারে দল ভাঙে– এই বহুল প্রচলিত তত্ত্বকে তিনি ফুৎকারে উড়িয়ে দেন। তাঁর মতে, দল ভাঙার সবচেয়ে বড় কারণ হল দলের ভেতরে থাকা অবদমিত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিগত ইগো। যখন কোনও দলনেতা নিজেই নিজের নাটকের আদর্শ ভুলে হঠাৎ করে সিনেমায় নামতে শুরু করেন, অথবা দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক পরিসর নষ্ট করে ফেলেন, তখনই ভাঙন শুরু হয়। আদর্শের কথাগুলি কেবল সেই ব্যক্তিগত স্বার্থপরতাকে ঢাকার জন্যই ব্যবহৃত হয়। তাঁর অব্যর্থ বিশ্লেষণ: ‘দল ভাঙার সবথেকে বড়ো কারণ দলনেতা। তিনি মধ্যবিত্ত লোক। বড়ো উচ্চাকাঙ্ক্ষী। দিনের পর দিন উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাড়তে থাকে। অন্যরা সিনেমায় চান্স পেলে দলের ক্ষতি হবে বিধায় আপত্তি করেন, নিজে ড্যাং ড্যাং করে যা-তা সিনেমায় নেমে পড়েন।… তখনই দল ভাঙে।’ (উৎস প্রবন্ধ– দল ভাঙাভাঙি বিষয়ে)

কিন্তু এখানেই একটি অত্যন্ত জরুরি ঐতিহাসিক প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। যে মানুষটি তাঁর চারপাশের থিয়েটার-জগৎকে এমন আতশকাচের নিচে রেখে বিচার করেছিলেন, তিনি নিজে কি এই মধ্যবিত্ত স্ববিরোধের সম্পূর্ণ বাইরে ছিলেন? ইতিহাস বলে, না। অজিতেশ কোনও নৈতিক উচ্চাসন থেকে এই কথাগুলি বলছিলেন না; তিনি নিজেও ছিলেন এই একই কাঠামোর অংশ। যে আইপিটিএ-র হাত ধরে তাঁর থিয়েটারে আসা, পার্টির যান্ত্রিক প্রোপাগান্ডার চাপে তিনি সেই সংগঠন ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন ‘নান্দীকার’। কিন্তু কালের নিয়মে সেই নান্দীকারেও ভাঙন ধরে। তাঁর নিজের বড় মাপের সিনেমায় অভিনয় (‘হাটে বাজারে’, ‘গণদেবতা’), প্রাতিষ্ঠানিক থিয়েটারের জটিল অর্থনীতি এবং সহকর্মীদের সঙ্গে পেশাদারিত্ব নিয়ে মতপার্থক্য– সব মিলিয়ে যে দলটিকে তিনি নিজের হাতে তিল তিল করে গড়েছিলেন, তাকেই একদিন বিদায় জানাতে হয়।

এমনকী, অর্থনৈতিক বাস্তবতার চাপে জীবনের শেষ পর্বে তাঁকে যাত্রামঞ্চেও নামতে হয়েছিল (‘রাবণ’, ‘দিনবদল’)। সেখানেও তাঁকে গ্রামীণ দর্শকের কাছে প্রত্যাখ্যানের তেতো স্বাদ পেতে হয়েছিল। অর্থাৎ, যে অসুখ এবং আত্মপ্রবঞ্চনার কথা তিনি তাঁর প্রবন্ধগুলিতে লিখেছিলেন, নিজের জীবনেও তিনি সেই যন্ত্রণার শিকার হয়েছিলেন। তাঁর এই সমালোচনাগুলি তাই কেবল অন্যের প্রতি নিক্ষিপ্ত তির নয়; তা যেন এক নিঃসঙ্গ, আহত নটের নিজেরই যন্ত্রণার স্বীকারোক্তি। তিনি একটি উত্তরণের পথ খুঁজছিলেন, কিন্তু সমকালীন আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার বেড়ি ভেঙে পুরোপুরি বেরিয়ে আসা তাঁর পক্ষেও সম্ভব হয়নি।
সরকারি অনুদান বা গ্রান্টের ওপরে নির্ভরতা নিয়েও তাঁর প্রশ্নগুলো ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। সাতের দশকেই তিনি বুঝেছিলেন যে, সরকারি টাকা নিয়ে বৈপ্লবিক থিয়েটার করার মধ্যে এক চরম হাস্যকর স্ববিরোধ লুকিয়ে আছে। আজকের দিনে যখন বাংলা থিয়েটার সরকারি অনুদান এবং কর্পোরেট স্পনসরশিপের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল, তখন তাঁর সেই কথাগুলি এক আশ্চর্য প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ফিরে আসে:
‘কারো কারো চলে সরকারি ডোলে। যত ভোল, ভেলকি, প্রগতিশীলতা, স্বদেশী নাটক, বিদেশী কাহিনি সপ্তাহে তিনবার নাট্যাভিনয়, সব চলে সরকারি অনুদানে। লজিকটা কী? সরকারি টাকা তো আমাদেরই ট্যাক্স দেওয়া টাকা। নেব না কেন?’ (উৎস প্রবন্ধ– নতুন থিয়েটার কর্মীদের প্রতি একটি সাবধানী)
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলা থিয়েটারের দিকে তাকালে অজিতেশের এই শ্লেষাত্মক কথাগুলি আমাদের নতুন করে ভাবায়। আধুনিক আলো, অত্যাধুনিক শব্দযন্ত্র আর চকচকে ব্রোশিওরের আড়ালে থিয়েটারের সেই পুরনো ‘নিরাপদ শখ’ যেন আজ কেবল এক নতুন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। আজও অধিকাংশ থিয়েটার-কর্মী জীবনধারণের জন্য অন্য পেশার ওপর নির্ভরশীল। আজও থিয়েটার করে সংসার চালানো এই বাংলায় এক দুঃস্বপ্ন!

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো কোনও চূড়ান্ত ‘বুলডোজার সমাধান’ দিয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু তিনি আমাদের থিয়েটারের আরামদায়ক অন্ধকার ঘরে এমন একটি আয়না ঝুলিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, যাতে নিজেদের মুখ দেখতে আজও আমাদের ভয় করে। তিনি দেখিয়েছিলেন, শিল্পের প্রতি সততা কেবল ভালো অভিনয়, আলোকসম্পাত বা ভালো পরিচালনায় থাকে না; তা নির্ভর করে সেই শিল্পের প্রতি নিঃশর্ত আত্মনিবেদনে এবং তাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার বুকের পাটায়। যতদিন না বাংলা থিয়েটার এই শখের বিপ্লব আর অনুদানের ক্রাচ ছেড়ে প্রকৃত পেশাদারের ঘামে আর রক্তে নিজের মাটি তৈরি করতে পারছে, ততদিন প্রাবন্ধিক অজিতেশের সেই রূঢ় প্রশ্নগুলো প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারে আমাদের ক্রমাগত তাড়া করে ফিরবে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved