

২৯ মার্চ, ২০২৬। প্রয়াত হয়েছিলেন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। রাহুল, শুধু একজন দক্ষ অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন চমৎকার লেখক, ভাবুক। বই ও সিনেমা– তাঁর অলিন্দ ও নিলয়। তাঁর লেখা নাটক ‘যে জানলাগুলোর আকাশ ছিল’ অভিনীত হয়ে চলেছে এখনও। রোববার.ইন আজ প্রকাশ করল বন্ধুকে বন্ধুর র্পণ। বিশ্বাস করুন, এরকম লেখা আমরা লেখাতে চাইনি কখনও…অগত্যা…
দিঘির কালো আঁধার
জল বিশ বাঁও
যে অতলে ডুবছি, সে তোমারও,
সাড়া দাও।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়
[সূত্র: যে জানলাগুলোর আকাশ ছিল]
ভয় হচ্ছে, লেখাটা হয়তো শেষ হবে না। অনন্ত আগামী অবধি চলতে থাকবে। জীবনে সামান্য কিছু বেদনা রয়েছে। তার মধ্যে বেশিরভাগের বেদনাবোধ এখন আর প্রায় ‘নেই’ বললেই চলে। জীবনে প্রায় কোনও বেদনাই স্থায়ী হয়ে থাকেনি; থাকতে দিইনি। ঘটনার অল্পদিন পরেই, রাহুলদাকে নিয়ে এক পত্রিকায় লেখার কথা হয়েছিল। আমার বাস্তববাদী বজ্রকঠিন মস্তিষ্ক নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিতে কিছু কথা লিখে ফেলবে ভেবেছিল। মন পারেনি লিখতে। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে নির্ঘুম রাতগুলো গলা টিপে ধরে বলেছিল, স্মৃতিচারণ তার হয়, যে চলে গিয়েছে। রাহুল কি চলে গিয়েছে? বারবার উত্তর পেয়েছি, না তো, যায়নি তো। তাহলে আর চিন্তা কী?

মাত্র এই ছয়টি মাস কাটল। সবাই কাজে ফিরল। প্রকাশ্যে একদিনের জন্যও কাঁদিনি। অস্থির হয়েছি। উথালপাথাল হয়েছে ভিতরে। কিন্তু নিজেকে কাঁদতে দিইনি। বারবার বলেছি আর ভেবেছি, এই তো, ‘যে জানালাগুলোর আকাশ ছিল’ নাটকটার পরের শো-তেই দেখা হবে দাদার সঙ্গে। এখন যেদিন যেদিন নাটকটার শো হয়, সেদিন ওর সঙ্গে দেখা হয়। রাহুলদা যে চরিত্রে অভিনয় করত, সেটা এখন প্রতীক করছে। প্রতীক দত্ত। রাহুলদার খুব খুব প্রিয় অভিনেতা। বোধ করি, রাহুলদাই ওকে চরিত্রটার দায়িত্ব দিয়েছে। হয়তো শুটিংয়ের মারাত্মক চাপ চলছে ওর। আমার ‘বাস্তববাদী’ ‘বজ্রকঠিন’ মন এইসব ‘যুক্তিসম্মত’ কারণ খুঁজে নেয়। প্রতীক আর আমার মাঝে ‘বাস্তবসম্মত যুক্তিগ্রাহ্যতায়’ রাহুলদা দাঁড়িয়ে থাকে রোজ। রোজ। প্রতীক জানে সেটা। প্রতীক মানে। আমিও জানি। মানি।

অরুণোদয়ের ‘দেশ’ বিজয়গড় কলোনি। ইশকুল: নাকতলা বয়েজ। আমার পাড়া গড়িয়া। ইশকুল: খানপুর গার্লস। নাকতলা বয়েজের সঙ্গে খানপুর গার্লসের আলাপ না হলে ইতিহাসে ভ্রান্তি ঘটে যেত। কমন ফ্রেন্ডদের সার্কেলে অরুণোদয় তখন লোকাল শাহরুখ খান। খানপুরের মেয়েদের ক্লাসরুমে ক্লাসরুমে তখন চাপা আলোচনা: ‘__-এর বয়ফ্রেন্ডটাকে দেখেছিস? কী দেখতে রে! নাটক-ফাটক করে না কি।’ বান্ধবীদের কানাঘুষোতে কান ঢুকিয়ে অকালপক্ব বুদ্ধিজীবী আমি বলে উঠলাম, ‘নাটক তো আমিও করি। কী এমন ব্যাপার?’ মেয়ের দল দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর আশায় বলে ওঠে, ‘তুইও নাটক-ফাটক করিস না কি? অরুণোদয়কে সামনে থেকে দেখেছিস কোনওদিন? চিনিস?’ খানিকক্ষণ নিঃশব্দ থাকতাম, তারপর ভাবগম্ভীর তন্ময়তা কাটিয়ে উত্তর দিতাম, ‘উমমম্… আমি চিনি না। কিন্তু ও আমাকে চেনে নিশ্চয়ই।’ অরুণোদয়ের স্টারডমের আলো নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যার-পর-নাই পুলকিত চিত্তে ক্লাসরুম ছাড়তাম।
অরুণোদয় ‘স্টার’ ছিল ওই ইশকুলবেলা থেকেই। ‘নাটক-ফাটক’, ‘সিনেমা-ফিনেমা’ করার জন্য নয়, মেয়েদের ক্লাসরুমে ওকে নিয়ে আলোচনার মূল বিষয়ই ছিল ওর রূপ। মধ্যবিত্ত পাড়া-কলোনির অলিগলিতে এমনভাবে ঘুরে বেড়ানো হাতের নাগালের রাজপুত্র আর কেউ ছিল না! দূর থেকে ওর দিকে তাকিয়ে থেকেও দিব্যি মন ভালো করা দিন কেটে যেত মেয়ের দলের।
হাতের আরও একটু নাগালে পেতে বেশি দেরি হয়নি। এক বান্ধবীর বাড়িতে ‘গ্রুপ-স্টাডি’ করতে গিয়ে শুনলাম, ‘পাশের ঘরে অরুণোদয় এসেছে।’ আমার বান্ধবীর ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। অতএব বইপত্র ছুড়ে ফেলে দরজা-জানলায় উঁকিঝুঁকি মারতে মারতে দিনের পড়া নষ্ট হল। মেয়ের দলের রেজাল্ট খারাপ হওয়ার দায় তো অরুণোদয় নিল না, বা অতীতের এ কাহিনি ইতিহাসে লেখাও থাকবে না। অন্যদিকে নিজের পড়াশোনাটা সময়মতো করে নেওয়া আমার মনে হয় অরুণোদয়ের ঘোরতর চক্রান্ত! বলেছি, বড় হয়ে এসব কথা ওর মুখের ওপর বলেছি! বলেছি ওর ছোটবেলার কীর্তিকলাপ। আমাদের রেজাল্ট খারাপ হওয়ার মূল কারণ হিসেবে অরুণোদয়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি। প্রতিবাদ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছি বারবার। ও পাত্তাই দিল না! ছোটবেলা থেকেই এরকমই ও। পাত্তাই দেয় না কিছু। সমুদ্রের চোরাবালিকেই পাত্তা দিল না। আমরা তো কোন ছাড়!

বড় হতে থাকলাম। ও এবার পাড়ার হিরোর গণ্ডি কাটিয়ে সত্যি সত্যি হিরো হতে থাকল। ইশকুল জীবনের অভ্যেস আমার রয়েই গেল। ‘অরুণোদয়’ থেকে ‘রাহুল’ হয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে ছোটবেলার মতোই উঁকিঝুঁকি মারতে মারতে দিন কাটতে লাগল। চোখের সামনে দেখলাম, আমার পাশের ঘরের প্রিন্স কেমন সবার হয়ে গেল। হাতের কাছে ঘুরে বেড়ানো ছেলেটা আরও অনেকের হয়ে গিয়ে কেমন হাতছাড়া হয়ে গেল। ও হিরো হল, ওর বিয়ে হল, ওর সংসার হল, তুমুল জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে খানিক বিপথগামী হওয়ার গল্প শুনে ক্ষণে ক্ষণে থমকে যেতাম। ওকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোনও অধিকার আমাদের ছিল না। তবু ওর জীবনের অদূরে দাঁড়িয়েই ওর দিকে আমরা তাকিয়ে থাকতাম। আমাদের কিশোরজীবনের রাজপুত্রকে নিয়ে খানিক দুশ্চিন্তাও করে ফেলতাম। পাড়ার প্রিন্সের বড়বেলার জীবনের নেশাসক্তির গল্প শুনে যেন গুমরে উঠত আমাদের কিশোরবেলা। ধীরে ধীরে উৎসাহ হারিয়ে নিজের কাজে ডুবে গেলাম। বড় অভিমানী হয়ে ভুলে যেতে চাইলাম আমাদের প্রিন্সকে।
জাম্প কাট। একটা বিরাআআআআআট জাম্প। এই সেদিন। তারিখটা কবে যেন?
[…এই লেখাটা লিখতে লিখতে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ ঘেঁটে খুঁজে পেলাম তারিখটা। আর একবার ওই চিরস্থায়ী বেদনাটা একটু মুচড়ে উঠল, এই আর কী!]
হ্যাঁ, যা বলছিলাম। তারিখটা হল ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। কয়েক দশক পরে আমিই যোগাযোগ করলাম।
‘রাহুলদা আমি তূর্ণা। একটু কথা বলা যাবে?’
এই প্রথম অরুণোদয়কে ‘রাহুল’ বলে ডাকলাম। ও তো এখন সবার। আমাদের অরুণোদয়কে ‘অরুণোদয়’ বলে ডাকলে কেমন যেন বেশি আত্মীয়তা ‘দেখানো’ হয়। ‘দেখানো’-র ব্যাপারে চির-অ্যালার্জিক্ষত আমি আমাদের প্রিন্সকে কয়েক দশক পর ‘রাহুল’ বলেই সম্মোধন করলাম। তিন মিনিটের মধ্যে ফোন এল। ওপারে আমার প্রিন্স। সহজ-সরল চিরনবীন কণ্ঠ আমাদের রাজপুত্র বলে উঠল, ‘বলো, কেমন আছ?’ চলল মিনিট দুয়েকের কেজো বাক্যালাপ। ফোন রাখার আগে সদ্য কিশোরের মতো আব্দারের সুরে রাজপুত্র বলে উঠল, ‘সৌরভকে (সৌরভ পালোধী) একটা নাটক করতে বলেছি। আমার ছোটবেলা, বিজয়গড় কলোনি এলাকায় আমার বড় হয়ে ওঠা-এসব নিয়ে একটা নাটক। প্লটটা আমারই লেখা। ওখানে সোমা চরিত্রটা আসলে আমার প্রথম ক্রাশ। নামটা পরে বলব। আমি চাই, চরিত্রটা তুমি করো।’ আর আমায় দেখে কে! ফোনের এপার থেকে কী উত্তর দিয়েছিলাম মনে নেই। মনে আছে শুধু ‘মধ্যবয়সি যুক্তিবাদী বজ্রকঠিন হাফ-বুদ্ধিজীবী হাফ-বামপন্থী সেজে ঘুরে বেড়ানো’ এই আমিটা সংগোপনে সেই কবেকার কৈশোরের দমকা হাওয়ায় আরেকবার ভেসে বেড়িয়েছিল পুরো দিনটা। কৈশোরের হাত ধরার সুযোগ পেয়ে গেলাম আরও একবার। গোটা একটা বছর! আর একটিমাত্র বছর! হাতে পেলাম কেবল একটি বছর! অনন্ত একটি বছর! ভয় হচ্ছে, হয়তো এই লেখা সত্যিই শেষ হবে না!

রিহার্সাল শুরু হল। প্রথম দিনেই রাহুলদা বলে দিল, বুদ্ধ মানে বুদ্ধদেব দাস এবং তূর্ণা বা বিমলদা মানে বিমল চক্রবর্তী দীর্ঘদিন থিয়েটার প্র্যাকটিসের মধ্যে আছে। রাহুলদা সেই অর্থে অনেক বছর পর থিয়েটার করতে এসেছে। তাই ওর নিজের রিহার্সাল কমপক্ষে একমাস বেশি হওয়া দরকার। তারপর প্রকৃতপক্ষে রাহুলদা প্রায় আমাদের থেকে দু’মাস বেশি
‘যে জানলাগুলোর আকাশ ছিল’ নাটকটার রিহার্সাল করেছিল। তৃতীয় মাসে আমরা যখন রিহার্সালে যুক্ত হলাম, তখন দেখলাম রাহুলদা নাটকটা মঞ্চস্থ হওয়ার জন্য ভীষণ রকম অপেক্ষা করে আছে। অত্যন্ত বেশি রকম উত্তেজিত আর মঞ্চের ওপর উঠে মঞ্চের উষ্ণতা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। চটপট নাটক তৈরি হল। ১০ মে, ২০২৫ প্রথম শো। সকাল থেকে রিহার্সাল হল। অবশেষে সেই বহু প্রতীক্ষিত সময় এল। অর্থাৎ হলভর্তি দর্শক। গমগম করছে অডিটোরিয়াম। দর্শক আসনে হইহই করছে মানুষ। সবাই দেখতে চাইছে রাহুলকে, দেখতে চাইছে তাদের প্রিয় নির্দেশক সৌরভ পালোধীর নতুন নাট্যসৃষ্টিকে। রীতিমতো ছটফট করছে তারা। প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ শুধু নয়, অত্যন্ত আবেগতাড়িত হয়ে রয়েছে। দর্শকের এই আবেগতাড়িত অবস্থা দেখে আমরা নাটক শুরুর আগেই ব্যাকস্টেজে একটা ছোট্ট আলোচনা করে নিলাম। ঠিক করা হল, দর্শকের এই হইহই এবং অত্যন্ত আবেগাপ্লুত অবস্থাকে নিজেদের বাগে আনা দরকার। দর্শকের আবেগকে নিজেদের আয়ত্তে আনা সম্ভব না হলে আগামী তিনঘণ্টা ধরে নাটক চালিয়ে যাওয়া মুশকিল হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া, দর্শকের আবেগের সঙ্গে আমরা তাল মিলিয়ে ফেললে, আমরা যে অভিনয় বা যে প্রযোজনা দর্শককে উপহার দিতে এসেছি, সেটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। তাই প্রথমেই ঠিক করা হল, প্রথম দৃশ্য শুরু হবে অতি ধীর লয়ে। ক্রমশ নাটকের গতি আমরা বাড়াতে থাকব অভিনেতাদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে। লাইভ আর্টফর্মের এই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে প্র্যাকটিস দীর্ঘদিনের থিয়েটার কর্মীদের রয়েছে, সেটা দেখে রাহুলদাও চটপট আমাদের সঙ্গে মানিয়ে নিল এবং মেনে নিল আমাদের সমবেত সিদ্ধান্তকে। নাটক চলতে চলতেই আমরা বুঝতে পারছিলাম, এই নাটক দর্শকের কাছে বহু বছর পর্যন্ত আদরণীয় হতে চলেছে। নাটক শেষ হওয়ার পর রীতিমতো আবেগে ভাসতে লাগল রাহুলদা। সঙ্গে আমরাও, তার সহ-অভিনেতারাও মেতে উঠলাম আনন্দে। আরও তিনটে শো ঠিকঠাক চলল। চার নম্বর শো-এর পর আবার অভিনেতারা মুখোমুখি বসলাম। আমাদের মনে হল, দর্শকের এই নাটককে গ্রহণ করা, তাদের ভালোবাসা, দর্শকাসনে তাদের উল্লাস প্রকাশ, হইহই করা– এই বিষয়গুলো কোথাও আমাদেরও বড্ড বেশি নাড়াচাড়া করছে এবং হয়তো তাদের এই উত্তেজনা আমাদের প্রযোজনাটিকে খানিকটা চালিত করে ফেলছে। তাই আবার ‘প্রকৃত ছন্দে’ ফিরে আসার সিদ্ধান্ত হল। নিজেদেরকে গুছিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হল এবং এরপর থেকে শো-গুলিতে আমরা নিজেদেরকে আরও বেশি সংহত রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদের টিমের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রাণপণে মেনে চলল রাহুলদা। নিজের স্টারডামকে একেবারে সরিয়ে দিয়ে, একজন সাধারণ নব্য নাট্যকর্মীর মতো করেই প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিয়ে রাহুলদার থিয়েটার চলতে থাকল। নাটকের সংলাপ নিয়ে, সংলাপের শব্দচয়ন নিয়ে বা নাটকের বিভিন্ন অন্যান্য উপকরণ নিয়ে বিভিন্ন সময় রাহুলদার সঙ্গে আমার বা দলের বিভিন্ন সদস্যদের তর্ক লেগেছে। আলোচনা হয়েছে। তারপর শেষ পর্যন্ত রাহুলদা প্রযোজনার স্বার্থে যেটা করা সঠিক হবে বলে মনে করেছে, সেটাকেই মান্যতা দিয়েছে। ধীরে ধীরে রাহুলদা একেবারে জয় করে ফেলল নাটকের দলের প্রতিটি মেম্বারদের। সবাই রাহুলদার আরও বেশি ভক্ত হয়ে পড়ল। তার মিষ্টি ব্যবহার, তার পাড়ার ছেলেসুলভ হাবভাব, তার আবেগচঞ্চল মন, তার ব্যক্তিত্ব, তার কাজের প্রতি নিষ্ঠা– সমস্তটা দেখে একেবারে তাজ্জব বনে গিয়েছিল দলের সদস্যরা।
ব্যক্তিগত পরিসরে আমিও আরও একবার রাহুলদার কাছাকাছি আসার সুযোগ পেলাম। মাঝেমাঝেই রাহুলদা ফোন করে বলত, অমুক বইটা পড়েছ বা অমুক সিনেমাটা দেখেছ? আমি বেশিরভাগ সময়েই বলতাম ‘না’। তখন রাহুলদা যে করেই হোক, সেই বইটা জোগাড় করে দিত। অথবা সেই সিনেমাটা কোথায় দেখতে পাব, তার হদিশ দিত। এখানেই শেষ হত না। দু’দিন পরে পরে আবার জিজ্ঞেস করত, ‘পড়া হল? সিনেমাটা দেখা হল?’ না হলে বারবার বলতে থাকত, ‘দেখে ফেলো। পরে সুযোগ হবে না। পড়ে ফেলো, পরে সুযোগ পাবে না।’ ‘পরে সুযোগ হবে না’, ‘জীবনে পরে সুযোগ বেশি থাকে না’– এই মোক্ষম শিক্ষাটা বারবার রাহুলদা দিতে চেয়েছিল আমাদের। কোনও কিছু যদি করার থাকে, দেখার থাকে, পড়ার থাকে, শোনার থাকে, শোনানোর থাকে বা অভিজ্ঞতা করার থাকে তাহলে এখনই করে নাও। ‘পরে সুযোগ হবে না’। পৃথিবীর সমস্ত সুন্দর, সমস্ত মনোরম, সমস্ত আস্বাদ নিংড়ে নেওয়ার যে তাড়া রাহুলদার ছিল, সেই তাড়া যেন তার আশপাশের মানুষদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়ার একটা উদগ্র বাসনা ছিল রাহুলদার। বয়সে ছোট অথবা সমবয়সিদের প্রতি তার যেন একটা নৈতিক দায়িত্ব ছিল এই ব্যাপারে। আমরা রাহুলদার কথা রাখতেই হোমওয়ার্ক করে ফেলতাম। যে বই পড়তে বলত, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পড়ে রাহুলদাকে সেই বই ফেরত দিতাম। বই পড়ার বদ অভ্যাসটা রাহুলদা অন্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারলে যেন একটা তৃপ্তি লাভ করত। জীবনে যত টাকা রোজগার করেছিল, তার বেশিরভাগটাই বোধহয় বই কিনে আর সেই বই অন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে খরচ করে ফেলেছিল। নাটকে যখন আসত ব্যাগে কোনও না কোনও বই থাকত। সম্প্রতি পড়ছিল অভিনেতা অ্যান্থনি হফকিন্সের জীবনী।

ইতিমধ্যে আমার জীবনেও একটা বড় রকম পটপরিবর্তন হল। আমার বাবা, যিনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সহায়, সবচেয়ে বড় বন্ধু, জীবনের সবটাই যে মানুষটাকে ঘিরে তৈরি করা– তিনি হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকলেন। আমার জীবনটা হঠাৎ বেশিরকম কঠিন হয়ে পড়ল। সেই সময় রাহুলদা থাকল একজন ভরসা হিসেবে। বলে বোঝানোর নয়, এই সময়টা রাহুলদার কী ভূমিকা! একজন মানুষ, সে স্টার। সে আমার সহ-অভিনেতা। আমার কৈশোরের এক ঝলমলে স্বপ্ন। তার নিজের কাজকর্ম, নিজের এত দায়িত্বের পরেও হয়তো এত দরদি মন নিয়ে আমার বাবার খোঁজখবর না নিলেও হত। এতটুকু বাড়িয়ে বলছি না, আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে প্রতিনিয়ত রাহুলদার পাশে থাকা মানুষটার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ করে তুলল। আমাকে সেসময় দেখতে বলেছিল অ্যান্থনি হফকিন্স অভিনীত ‘দা ফাদার’ সিনেমাটি। একজন মেয়ে এবং তার অতি-বয়স্ক বাবার গল্প। বাবার সব স্মৃতি গুলিয়ে গিয়েছে। নিজের মেয়েকেও ঠিক করে চিনতে পারছে না। কোনটা হাসপাতাল আর কোনটা বাড়ি– সব তার কাছে ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তের মুখোমুখি। তার মেয়ে অসহায়। শেষ বয়সের রোগভোগে জর্জরিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা আমার বাবাকে নিয়ে এভাবেই বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছিল রাহুলদা। এই শক্তি জোগানোর কাজে কোনওরকম হট্টগোল ছিল না। সে শুধু দরদি মন নিয়ে আমার ঠিক যা দরকার, সেসব জোগান দিয়ে যাচ্ছিল। জেন গুড অল-এর ‘লাস্ট ওয়ার্ডস’, উৎপলকুমার বসু কিংবা তারাপদ রায়ের কবিতা আর বিভিন্ন বিশ্বসিনেমাই একের পর এক ভরসা জোগাচ্ছিল রাহুলদার মাধ্যমে। জীবনে অনেক ক্রিটিক্যাল মানুষ আছে আমার। জীবনের প্রতিটি মোড়ে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, সেসব শলা দিতেই যারা আমার সঙ্গে আছে বলে আমার ধারণা। কিন্তু সত্যি বলতে, জীবনে সবচেয়ে দামি হল একজন সাপোর্টার পাওয়া। একজন বন্ধু পাওয়া– যে, আমার জীবনের কোনও সমালোচনা করবে না। কী করলে কী হতে পারত, কোনটা ঠিক কাজ, কোনটা ভুল– সেসবের বিচার করবে না। শুধু বলে যাবে, টিকে থাকো, বেঁচে থাকো। তুমি ঠিক। আমি বলছি, তুমি ঠিক। রাহুলদা কখনও এসব কথা আমায় বলেনি। কিন্তু আমার জীবনে তার উপস্থিতি এমনই একজন সাপোর্টারের মতো। আসলে রাহুলদা তার পাশের মানুষের থেকে অনেক আদর, অনেক সম্মান, অনেক ভরসা আদায় করে নিতে পারত। তাই কুণ্ঠাহীনভাবে নিজেও তাদেরকে সেই ভরসা ফিরিয়ে দিতে পারত। রাহুলদাকে হাতের খুব কাছে পেয়েছিলাম, বলা যায়, একেবারে বাগে এনে ফেলতে পেরেছিলাম শেষ একটি বছর। মনে হচ্ছে যা যা ঘটেছে, সব লিখে ফেলি। কোথাও তো লেখা থাক সব ঘটনা! মনে হচ্ছে সব কিছু নথিকৃত করে রাখি। তাহলে হয়তো সেই মুহূর্তরা অক্ষত হয়ে রয়ে যাবে। সব মনে আছে পুঙ্খানুপুঙ্খ। জ্যান্ত। রাহুলদার সঙ্গে কাটানো সবক’টি মুহূর্ত ভীষণরকম বিশেষ, বহুমূল্য। কোনও অতি সাধারণ, তুচ্ছ মুহূর্ত যেন নেই!

আমাদের নাটক যাবে দিল্লিতে। মাহিন্দ্রা এক্সেলেন্স ইন থিয়েটার অ্যাওয়ার্ডস, ২০২৬। সেখানে এই নাটকটি সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে প্রথম দশটি নাটকের মধ্যে নির্বাচিত হল। তার আগে কলকাতার শেষ শো। রোজকার মতো হাউজফুল শো। কিন্তু একটু স্পেশাল। অন্তত রাহুলদার জন্য তো বটেই। কারণ সেই শো-তে এসেছে রাহুলদার সেই ছোটবেলার ‘সোমাদি’। মানে সত্যিকারের সোমাদি। আমাদের অতিপ্রিয় অভিনেত্রী বিদীপ্তা চক্রবর্তী। বিদীপ্তাদি এত বছর নিজেও জানত না রাহুলদার ছোটবেলার এই গুপ্তকথা। নাটক শেষে যখন বিদীপ্তাদির সামনে আসল কথা ফাঁস হল, বিদীপ্তাদি অবাক হয়ে গেল। আর তখন নব্য কিশোর প্রেমিকের মতো রাহুলদার মুখে হাসি। এটাই কলকাতায় রাহুলদার শেষ শো। কিছুদিন পরেই আমরা পাড়ি দিলাম দিল্লি। যাওয়া-আসা মিলিয়ে তিনটে দিন পেলাম রাহুলদাকে। শেষ তিনটে দিন! স্মৃতির মহাফেজে যত্নে রাখা অবিনশ্বর তিনটে দিন!
২১ মার্চ, ২০২৬। আমরা পৌঁছে গিয়েছি কলকাতা বিমানবন্দরে। খানিকক্ষণ বাদেই ফ্লাইট। দিল্লি যাচ্ছি। আমার এক হাতে সামান্য কিছু ব্যাগপত্র। আর অন্য হাতে ধরা আমার মেয়ে। সকাল সকাল পৌঁছনোর পরে বসে থাকা, সিকিউরিটি চেক করা, বোর্ডিং পাস নেওয়া ইত্যাদির নিয়মকানুনের জাল পেরতে আড়াই ঘণ্টা কেটে গেল। কিন্তু রাহুলদার পাত্তা নেই। গ্রুপের সবাই খানিক উদ্বিগ্ন। ফোনে সকাল থেকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু সবার ভরসা আছে নিশ্চয়ই ঠিক সময়ে চলে আসবে। বারোটায় ফ্লাইট ছাড়বে। ১১:২৫ নাগাদ আমাদের ফ্লাইটে ওঠার লাইন পড়ে গেল। তখনও রাহুলদাকে দেখা যাচ্ছে না। ঘড়ির কাঁটা যখন প্রায় ১১টা ৪০-এ পৌঁছল তখন দেখা গেল রাহুলদা আসছে দূর থেকে। খুব নিশ্চিন্ত গতিতে। কাঁধে হালকা একটি ব্যাগ। কোনও তাড়া নেই। আর রাহুলদা যে পোশাক পড়ে এসেছে, তা দেখে আমরা রীতিমতো চমকে গেলাম! কালো কুচকুচে পাঞ্জাবি, সঙ্গে সাদা ধবধবে ধুতি। পায়ে সাধারণ একটি চটি। হাসতে হাসতে এসে বলে উঠল, ‘এবারের গরমকালে ধুতিই পড়ব। দারুন কম্ফোর্টেবল। আমায় ভালো দেখাচ্ছে?’
শেষ কয়েকমাস থিয়েটার করার সঙ্গে সঙ্গে রাহুলদা আরও একটি কাজ করেছিল। নেশা থেকে একেবারে দূরে চলে গিয়েছিল এবং কথায় কথায় বলত, ‘তোমরা আমাকে বাঁচিয়ে দিলে থিয়েটার করতে এসে আমি নেশা ছাড়াতে পারলাম।’ প্রতি রিহার্সালে এসে আমাদের হিসেব দিত, কত মাস সে নেশা থেকে দূরে আছে। ফলাফল আসছিল তার শরীরে, চোখ-মুখে। একটা আশ্চর্য দীপ্তি দেখা যেত। শেষের দিকে অসম্ভব গ্লো করছিল তার ত্বক। আমার কৈশোরের রাজপুত্র সত্যিই আবার কৈশোরবেলায় যেন ফিরে গিয়েছিল! কালো পাঞ্জাবি আর সাদা ধুতিতে রাহুলদাকে যে কী প্রচণ্ড ঝলমলে লাগছিল, তা বলে বোঝানোর নয়। আমরা প্রত্যেকে চমকে তাকিয়ে রইলাম রাহুলদার দিকে। হাসতে হাসতে রাহুলদা এগিয়ে এসে বাঁ-হাতে আমার দিকে প্রায় ছুড়েই দিল একটি বই; বাদামি মলাট। কানের কাছে এসে চুপি চুপি বলল, ‘‘শুভ জন্মদিন। তোমার এবারের জন্মদিন জানি না কতটা ‘শুভ’। তবুও জন্মদিন তো।’’ বোঝাতে চাইল বাবার ক্রিটিকাল অবস্থার কথা। বাবা তখন নার্সিংহোমে বন্দি রয়েছে প্রায় এক মাস। রোজ শো হত আর শো-চলাকালীন বারবার হসপিটাল থেকে ফোন আসত। বিভিন্ন ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশন বা ইনজেকশন অথবা চ্যানেল করার ব্যাপারে আমাকে ফোন করে কনসেন্ট নিত হসপিটাল থেকে। রাহুলদার চোখ থেকে চোখ নামিয়ে বইয়ের মলাটে রাখলাম। লেখা আছে ‘জেল ডায়েরি অফ ভগৎ সিং’। মলাট খুলে দেখলাম রাহুলদার হাতের লেখায় লেখা আছে, ‘আমার সোমাকে, এই গোলমেলে জন্মদিনে দিল্লিগামী উড়োজাহাজে লাহোর জেলের গপ্পো।– রাহুলদা একুশে মার্চ ২০২৬’। গলায় কান্না জমে এল। তাকালাম রাহুলদার দিকে। হাসতে হাসতে বলল, ‘বইটা আনতেই দেরি হয়ে গেল। চলো, চলো এগনো যাক।’

নিজের জন্মদিন নিয়ে কোনওদিন কোনও আবেগ আমার ছিল না। কোনওদিন কোনও উপহার পেয়ে আমি আনন্দবোধও করিনি। এমনকী উপহার দেওয়ার প্রথাকেও মন থেকে সমর্থন করি, তা নয়। কিন্তু জীবনের এমন একটা পরিস্থিতিতে যখন বাবা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে আর আমি দিল্লিতে এত বড় একটা শো করতে যাচ্ছি, সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে রাহুলদার দেওয়া এই বইটা আমাকে যেন মানুষটার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ করে দিল। আফসোস এই যে, সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ফুরসত পেলাম না। হাতে রইল মাত্র আর দু’টি দিন। দিল্লি পৌঁছলাম। সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, একটানা রিহার্সাল করা, শো করা, তারপর চটজলদি গভীর রাতে কলকাতার দিকে রওনা হওয়া। সব কিছুই ঘটে গেল খুব তাড়াতাড়ি। এই তিনদিনের যাত্রায় রাহুলদার সঙ্গে কত গল্প, কত আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হল, তার সব কথা আজ লিখে ফেলতে ইচ্ছে করছে। গ্রুপের সবার দিকে প্রতিনিয়ত নজর রাখা, কারও কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না, সেসব দিকে খেয়াল রাখা, ব্যাগপত্র আর মেয়েকে নিয়ে যাত্রা করতে খানিক বিব্রত হয়ে পড়া আমাকে প্রতিনিয়ত সহায়তা করার জন্য রাহুলদা সদাপ্রস্তুত। এমনকী, আমার মেয়ে জানলার ধারে সিট না পাওয়ায় আমার মেয়ের তুলনায় রাহুলদা যেন বেশি মুষড়ে পড়ল। তিনদিন সবাই মিলে খুব কাছাকাছি একসঙ্গে কাটালাম। আরও যেন পরস্পরের বন্ধু হয়ে উঠলাম।
কলকাতায় নেমে অদ্ভুত ছন্দপতন হল। আমাদের সঙ্গে এত সম্পৃক্ত হয়ে থাকা রাহুলদা কলকাতায় ফ্লাইট থেকে নামল। হাঁটা শুরু করল। এগিয়ে গেল আমাদের থেকে। আরও একটু গতি বাড়াল। দূরত্ব একটু একটু করে বাড়ছিল। আমরা তেমন খেয়াল করিনি। সবাই গল্পগুজব করতে করতে এগচ্ছি। আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে রাহুলদা হঠাৎ সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কোথায় গেল রাহুলদা? দলের সদস্য সম্বিতদা জানাল, ‘রাহুল বেরিয়ে গিয়েছে। আমাকে বলেছে তূর্ণাকে বলে দিও, আমি চলে গেলাম।’ কীসের যে এত তাড়া ছিল! কলকাতায় নেমে হঠাৎ কেন আমাদের থেকে এগিয়ে গেল আর কেনই বা অদৃশ্য হয়ে গেল। কেন যে না বলে চলে গেল, জানি না। অবাক হলাম। তারপর ভাবলাম রাহুলদা তো এমনই। সে অধরা নয় ঠিকই। কিন্তু তাকে তেমন করে ধরাও যায় না!

ক’দিন বাদে মাহিন্দ্রা এক্সেলেন্স ইন থিয়েটার অ্যাওয়ার্ডসের রেজাল্ট বেরনোর দিন। ২৬ মার্চ, ২০২৬। আমরা দিল্লি থেকে খবর পাচ্ছি সৌরভের কাছে। একটা করে অ্যাওয়ার্ডের খবর আসছে, আর রাহুলদা ইস্টবেঙ্গলের গোল করার মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে আমাদের গ্রুপে একটা করে মেসেজ পাঠিয়ে যাচ্ছে। দলের প্রতিটি অ্যাওয়ার্ড তার কাছে দামি ছিল। কিন্তু আমার বিপুল গৌরব যে আমার অ্যাওয়ার্ডটা রাহুলদার কাছে ‘ব্যক্তিগত’ ছিল। অন্তত সোশাল মিডিয়ায় তো সেটাই লিখেছিল। অ্যাওয়ার্ড-ফ্যাওয়ার্ড গুলি মেরে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম বাবাকে নিয়ে। ভুলে গেলাম বাকি সব কথা।
২৯ মার্চ, ২০২৬। বাবার অবস্থা খানিকটা পালটাল। হসপিটাল থেকে বলা হল, বাবাকে এবার বাড়িতে ছেড়ে দেওয়া হবে। বাবার জন্য নতুন বালিশ-বিছানা-পাঞ্জাবি কিনতে বেরিয়েছিলাম বাজারে। মনে মনে ভাবছিলাম, বাবাকে নিয়ে আসার পরে, বাড়িতে সেটল করে, তারপর রাহুলদাকে জানাব সুখবরটা। ঠিক তখনই ফোন এল। সৌরভ বলল, ‘খুব খারাপ খবর আছে।’ নেটওয়ার্ক ডিস্টার্ব করছিল। আমি ভালো শুনতে পেলাম না। ফোন রেখে সৌরভ মেসেজ করল। মেসেজটা পাওয়ার পর ঘণ্টা দুই আমার কোনও আবেগ কাজ করেনি। কাঁদিনি। কান্না আসেনি। বাড়ি ফিরে বাবার জন্য, কিনে আনা জিনিস দিয়ে ঘর সাজিয়েছি। কাল বাবা ফিরবে। মাকে কিছু বলিনি। মেয়েকে কিছু বলিনি। কাউকে কিছুই বলিনি। ঘটনাচক্রে মা টিভি খুলে ফেলেছিল। খবরটা দেখে প্রায় অচৈতন্য হয়ে পড়ল। মাকে সামলাতে সামলাতে টিভি স্ক্রিনে চোখ রাখলাম। ঝলমল করছে রাহুলদা। হলুদ টি-শার্ট পরে তাকে আরও চমৎকার দেখাচ্ছে। ঘুমিয়ে আছে। ওর ত্বক থেকে যেন সেই ছোটবেলার জ্যোতিটা বেরচ্ছে। চমৎকার দেখাচ্ছিল। চমৎকার লাগছে দেখতে ওকে। ঘুমিয়ে আছে রাহুলদা। একটু বিশ্রাম নিচ্ছে।
সেই দিনের পর থেকে আমার কৈশোর আর বুড়িয়ে যায়নি। সেইদিন থেকেই আমার কৈশোর অপূর্ব আদরে বেঁচে রয়েছে। সেই দিনের পর থেকে আমার জীবনে আর সাপোর্টারের অভাব হয়নি। সে রয়েছে, অক্ষয় হয়ে। সেই দিনের পর থেকে আমাদের প্রতিটা শো-তে সে ঠিক থেকেছে মাথায় হাত রেখে। অফুরন্ত প্রাণশক্তি, চিরনবীন উপস্থিতি, থিয়েটারের মানুষদের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিয়ে রয়ে গিয়েছে রাহুলদা। প্রতিনিয়ত জীবন থেকে শিখতে থাকা রাহুলদা, অভিনয়ের খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করা রাহুলদা, বিশ্বসাহিত্য-সিনেমা বা বিশ্বসংস্কৃতি নিয়ে মেতে থাকা রাহুলদা, বিচারবোধ অক্ষুণ্ণ রেখে প্রগতিশীল রাজনীতিতে ভরসা রাখা রাহুলদা রয়ে গিয়েছে। রয়ে গিয়েছে তার লেখায়। রয়ে গিয়েছে তার নাটকে। রয়ে গিয়েছে তার সিনেমায়-সিরিয়ালে। রয়ে গিয়েছে তার ‘সহজ কথা’-য়। জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল মুহূর্ত কাটিয়েছিল রাহুলদা এই থিয়েটার করার সূত্রে, এমনই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আর যে থিয়েটার তাকে আরও একবার বাঁচিয়ে তুলেছিল, জীবনে ফিরিয়ে এনেছিল– সেই থিয়েটারের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম, এই আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরব।

আমার কৈশোর, আমার মেয়ের দলে উঁকিঝুকি, আমার দক্ষিণ কলকাতার সরু গলির রাজপুত্র–
তুমি আছো। তুমি আছো।
ছুঁয়ে থাকো।
কাছে থাকো। ভয় করছে। মনে হচ্ছে
এ মুহূর্ত বুঝি সত্য নয়। ছুঁয়ে থাকো।
শ্মশানে যেমন থাকে দেহ ছুঁয়ে একান্ত
স্বজন। এই হাত, এই নাও হাত।
এই হাত ছুঁয়ে থাকো, যতক্ষণ
কাছাকাছি আছো, অস্পৃষ্ট রেখো না।
ভয় করে, মনে হয়, এ মুহূর্ত বুঝি সত্য নয়।
যেমন অসত্য ছিল দীর্ঘ গতকাল,
যেমন অসত্য হবে অনন্ত আগামী।
নবনীতা দেব সেন
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved