Fish in Bengali Culture: Food, Rituals and Heritage | Robbar
Robbar
  • ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৫ অক্টোবর ২০২৬

বারো মাছে তেরো পার্বণ

ইহজগতে বাঙালি জীবনের কাজ ফুরলে সেই মানুষের পারলৌকিক কাজকর্মেও সেই গোটা একটা কাতলা মাছ ঠিক উপস্থিত থাকবে। শ্রাদ্ধের দিন পর্যন্ত নিরামিষ খাওয়া হয়ে থাকে আর তার একদিন পর হয় নিয়মভঙ্গ বা মৎস্যমুখী। মৎস্যমুখীর মতো অনুষ্ঠান সময়ের সঙ্গে শোককে মানিয়ে নিয়ে জীবনকে ‘মাছের দিকে মুখ করে’ পুনরায় স্বাভাবিক ছন্দে ফেরানোর ইঙ্গিত। ওই দিন প্রয়াত ব্যক্তির পছন্দের মাছ খাওয়ানোর নিয়ম আছে।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ৫, ২০২৬, ১৬:০৬   
Facebook WhatsApp Messenger

যুগ যুগ ধরে মাছেদের এই জীবন্ত মহাফেজখানায় কেবলই কি বঙ্গপ্রদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক জীবন যত্ন করে রাখা আছে? মোটেই তা নয়। আসলে যাঁদের জীবনযাত্রায় জলের প্রভাব আছে, জলে বসবাসকারী এই আদিম প্রাণের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কও যেন একই সুতোয় গাঁথা। গত বছর মুম্বই শহরের দক্ষিণে ব্যস্ততম পাইকারি মাছের বাজার ‘সাসুন ডক’-এ হানা দিয়েছিলাম। সেই কবে থেকেই আরব সাগরের পাড়ে সামুদ্রিক মাছের বিকিকিনির সাক্ষী এই সাসুন ডক। তখন বর্ষাকাল, তাই ট্রলার সমুদ্রের গভীরে প্রবেশ করে না। সোনার অলংকার পরে মারাঠি মেছুনিরা মাথায় গামলা নিয়ে পেল্লায় আকারের সব সামুদ্রিক মাছ বাজারের দিকে নিয়ে আসছে। খেয়াল করলে দেখতে পাবেন এই মেছুনিদের পরনের গয়না, মাছ বা সামুদ্রিক কোনও প্রতীক বহন করছে। এই মেছুনিরা কোলি সম্প্রদায়ের মানুষ। যারা মুম্বই শহরের আদি বাসিন্দা। শহরের অত্যাধুনিক বেপরোয়া উন্নয়নের ঠেলায় যারা নিজেরাই নিজেদের শহরে ঘরছাড়া, উদ্বাস্তু। কোলি সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে সমুদ্রের আত্মিক যোগাযোগ আছে। সমুদ্রের প্রাচীন বাসিন্দাদের সঙ্গেও তেমন নিবিড় সম্পর্ক। তাই বোধহয় ‘মাসোলি’ বা স্থানীয় ভাষায় ‘গাথে’ বা ‘পেরে’ তাদের খুব পুরনো এক ধরনের কানের দুলের নকশা। দুটো মাছ বিশিষ্ট গোলাকৃতি এক প্রকার কানের দুলই হল এই ‘মাসোলি’। মেয়ের বিয়ের সময় তার বাবা-মা সোনার মাসোলি পরিয়ে আশীর্বাদ করে। জীবনের অন্তিম সময় অবধি এই আশীর্বাদ তাদের মেয়েকে রক্ষা করবে– এমনই প্রাচীন এক বিশ্বাস, এই রীতির কেন্দ্রে রয়েছে। এই বিশ্বাসের ভিত বুঝিয়ে দেয় যে, মাছ তাদের জীবনের কতখানি সামাজিক মর্যাদা দখল করে আছে। যদিও বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে এই রীতি অনেকখানি আবছা হয়ে এসেছে, তবুও এই মৎস্য অলংকার মাছের এই বিপুল চলমান সংগ্রহশালার অংশ হয়ে থাকবে।

zoom
ঐতিহ্যবাহী মৎস্যজীবী কোলি সম্প্রদায়, আলোকচিত্র: শৌভিক রায়

আসামে ‘মাঘ বিহু’-র সময় আমার বাবার অভিজ্ঞতার কথা শুনেছিলাম। পেল্লায় আকারের চিতল মাছ মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে। আমার কাকা প্রায় ৪০ বছরের ওপর গৌহাটিতে আছেন। ভোগালী বিহুতে উজান বাজারের ঘাটে চিতল মাছ ওঠে। ব্রহ্মপুত্রের চিতল ভারি মিষ্টি। বিহুর পরবে মাছ কিনে পাড়া, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে মাছ বিলি করা আসামের মানুষদের খুব পুরনো লোকাচার। আমাদের বঙ্গজীবনে মৎস্যের প্রভাব কতখানি, তা বলতে গেলে অবিভক্ত বাংলার ভূপ্রকৃতি ও নদনদীর কথা আপনিই চলে আসে। পাতার জালিকাকার শিরাবিন্যাসের মতনই বাংলার মানচিত্রে নদী-নালা–খাল–বিল, জালের মতো ছড়িয়ে আছে। এই বিপুল জলাভূমিতেই বাস করে ছোট বড় শত শত প্রজাতির মাছ। তাই বাংলার মানুষদের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে মাছের অস্তিত্ব খুব স্বাভাবিক আর সহজাত। বাঙালির জন্ম–মৃত্যু–বিয়ে এই তিন অধ্যায়ের সঙ্গে মাছ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। কাঁসার বাটিতে সদ্যকোটা হলুদ নিয়ে বরপক্ষের বাড়ির লোকেরা নতুন কনের বাড়ি যাচ্ছে। বাড়ির প্রত্যেকটি লোকের হাতে সুসজ্জিত তত্ত্বের থালা। তার মধ্যে লাল চেলি, নাকে নোলক পরানো, হলুদ আর সিঁদুরের টিপ দেওয়া আস্ত একটা কাতলা মাছ কারওর চোখ এড়িয়ে যাবে না। মাছ শুভ। বংশবৃদ্ধির প্রতীক।

zoom
বাঙালি বিয়ের তত্ত্বের মাছ

নতুন সংসারে সুখ, সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক এই বিশ্বাসকে আপন করে নিয়ে বিয়ের তত্ত্বে মাছ পাঠানো সেই কোনকাল থেকে বাঙালি বিয়ের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল হয়ে থেকে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বদ্যিবাড়ির বিয়েতে নতুন বউ তার শ্বশুরবাড়িতে হাতে মাছ ঝুলিয়ে যাওয়ার একটা নিয়মের উল্লেখ আছে রাধাপ্রসাদ গুপ্তের ‘মাছ আর বাঙালি’ বইয়ে। পরে সে মাছ পুকুরে ছেড়ে দেওয়া হত। আরও একটা নিয়ম বউ নতুন বউকে ল্যাটামাছ ধরতে দেওয়া। নতুন বউ কত তাড়াতাড়ি সংসারের হাল ধরতে পারবে, এই খেলা তার মাপকাঠি। আবারও সেই পিতৃতান্ত্রিকতার বেড়াজাল। নকশিকাঁথা অবিভক্ত বাংলার মেয়েদের জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা বলে আমার মনে হয়। হিন্দু-মুসলিম কাঁথার ফোঁড়, মোটিফ, পাড় সব আলাদা আলাদা। তবে দুই ধর্মের নকশিকাঁথায় মাছের নকশা বোনার চল বরাবর ছিল বা আছে। শীলা বসাক, কাঁথা নিয়ে তার গবেষণামূলক বই ‘বাংলার নকশিকাঁথা’-য় কাঁথায় মাছের মোটিফের কথা প্রসঙ্গে লিখেছিলেন–

‘বিবাহযোগ্যা মেয়েদের জন্য যে কাঁথা সেলাই করা হয় তাতে মাছের প্রতীক চিত্রিত হয়। মাছ জীবন সংরক্ষণ এবং জীবনের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত অর্থাৎ জীবনের প্রতীক। বাংলার কাঁথায় মাছের মোটিফ দেওয়া হয় বিবাহিত কন্যার উর্বরতার প্রতীক হিসেবে।‘

zoom

কাঁথাশিল্পী সারা খাতুন বলেছিলেন মুসলিম কাঁথায় ফুল, পাতা, গাছ, নদীর মোটিফের সঙ্গে মাছের মোটিফ দেখা যায় অর্থাৎ মাছ যেন জীবনের এক স্বাভাবিক অধ্যায়। মাছকাটা সেলাই এক বিশেষ এমব্রয়ডারি বা সেলাইয়ের পদ্ধতি, দেখতে ঠিক যেন মাছের কাঁটার মতন। গর্ভবতী মহিলাদের পায়েস আর কাতল মাছের ল্যাজা দিয়ে সাধ খাওয়ানো হয়। শিশুর জন্মের ছ’মাস পর তার অন্নপ্রাশন বা মুখেভাত অনুষ্ঠান হয়। নবজাতক মামা বা দাদুর হাতে প্রথম ভাত খাবে। মুখেভাতের থালায় পায়েস, পাঁচরকম ভাজার সঙ্গে মাছের পদ বা মাছভাজাও সাজিয়ে দেওয়া আবশ্যিক। মাছের গল্প যেন ফুরয়ই না। 

‘ইলশে গুঁড়ি! ইলশে গুঁড়ি!
ইলিশ মাছের ডিম।
ইলশে গুঁড়ি ইলশে গুঁড়ি
দিনের বেলায় হিম।’ 

বর্ষার প্রথম ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সময় খুব ভালো কাঁচা ইলিশ ওঠে। মাছের নামের সঙ্গে মিলিয়ে আষাঢ়ের আলতো স্প্রে–পেইন্টিংয়ের মতো বৃষ্টির নাম রাখার মিষ্টত্ব বোধহয় বাংলা ভাষাতেই সম্ভব। তবে মাছের নামের ব্যবহার ছড়িয়ে আছে বাংলার গ্রামগঞ্জের আনাচেকানাচে। ফরিদপুরে আমার দিদিমার গ্রাম ইলিশকোল থেকে বোয়ালমারী উপজেলা তারপর কলকাতার তোপসিয়া, ট্যাংরা, হয়ে উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রাম ইচ্ছাপুর, চেংটামারি, শৌলমারি… চলতেই থাকবে। 

zoom

বাংলার বুননে মাছের মোটিফ নিয়ে আমার টেক্সটাইল-গবেষক বন্ধু অর্চি ব্যানার্জির সঙ্গে কথা হয়েছিল। অর্চি বলেছিলেন শান্তিপুর বা টাঙ্গাইল যে সব শাড়ির সৌন্দর্যের পরিচয়, তাদের পাড়ের নকশা সেইসব শাড়িতে ‘আঁশ পাড়’ বা ‘আঁইশ পাড়’ এক ধরনের পুরনো মোটিফ। অর্থাৎ মাছের আঁশের মতন ঢেউ খেলানো সুতোর নকশা। ধনেখালি তাঁতের অনেক শাড়িতেই আঁচলে আর পাড়ে লাইন দিয়ে মাছের নকশার বুনন থাকে। টেক্সটাইল-শিল্পী বন্ধু শ্যাম বিশ্বাস আলপনায় মাছের কথা বলেছেন। পুব বাংলা থেকে চলে আসা অনেক পরিবারেই পৌষ সংক্রান্তির দিন বাস্তুপুজো হয়। বাস্তুপুজোর আলপনায় জোড়া মাছের মোটিফ থাকে, মাছের আঁশের চিহ্ন থাকে। সেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গল্প। বিয়ের পিঁড়ির আলপনাতেও জোড়া মাছ খুব চেনা আলপনার ধরন। অর্চি বলেছিলেন, সবসময়ই যে সশরীরে শাড়িতে মাছ বোনা থাকবে এমনটা না–ও হতে পারে, তবে আঁশের মতন মাছের অন্য কোনও উল্লেখ থাকতে পারে। 

ইহজগতে বাঙালি জীবনের কাজ ফুরলে সেই মানুষের পারলৌকিক কাজকর্মেও সেই গোটা একটা কাতলামাছ ঠিক উপস্থিত থাকবে। শ্রাদ্ধের দিন পর্যন্ত নিরামিষ খাওয়া হয়ে থাকে, আর তার একদিন পর হয় নিয়মভঙ্গ বা মৎস্যমুখী। মৎস্যমুখীর মতো অনুষ্ঠান সময়ের সঙ্গে শোককে মানিয়ে নিয়ে জীবনকে ‘মাছের দিকে মুখ করে’ পুনরায় স্বাভাবিক ছন্দে ফেরানোর ইঙ্গিত। ওই দিন প্রয়াত ব্যক্তির পছন্দের মাছ খাওয়ানোর নিয়ম আছে। বাবার কাছে শুনেছি, আমার ঠাকুরদার মৃত্যুর পর ওঁর মৎস্যমুখীতে পাবদা মাছ খাওয়ানো হয়েছিল। তখন পাবদা মাছ ছিল মহার্ঘ। সে যাই হোক, বাড়ির লোকেরা সেদিন একসঙ্গে বসে প্রয়াত প্রিয়জনের পছন্দের মাছ খায়। 

zoom
বাংলার তাঁতের শাড়িতে মাছের মোটিফ

বাঙালির মাছের প্রতি টান বোঝাতেই বোধহয় ‘মেছোপেত্নি’ নামে কাল্পনিক ভূতের সৃষ্টি হয়েছে। মেছো ভূত বা পেত্নি পুকুরপাড়ের তেঁতুলগাছে থাকে। সন্ধের পর বাজারের থলিতে মাছ নিয়ে তেঁতুলতলা দিয়ে গেলেই সব্বোনাশ! সময়ের সঙ্গে বেড়ে চলা মাছের এই জীবন্ত আর্কাইভে বিভিন্ন দেবদেবীর পুজোয় মাছ ভোগ দেওয়ার প্রচলনের কথা ভুললে তো চলবে না। শাক্ত দেবদেবীর পুজোয় মহিষ, পাঁঠা, পায়রা, হাঁস বলি দেওয়ার পাশাপাশি শোলমাছ বলি দেওয়ার একটা প্রচলন রয়েছে। তারাপীঠ থেকে শুরু করে শ্মশানকালী-সহ বিভিন্ন তান্ত্রিক দেবদেবীর পুজোয় শোলমাছ ভোগ দেওয়া হয়। তমলুকের বর্গভীমার পুজোয় শোলমাছের টক এক প্রধান ভোগ। খাদ্য-গবেষক পৃথা সেন খুলনার দাশগুপ্ত পরিবারের ৫০০ বছরের ওপর পুরনো পুজোতে মৎস্যভোগের কথা লিখেছেন। তিনি লিখছেন, ‘এক বছর পর সধবা মেয়ে তার বাপের বাড়ি এসেছে, তাই তাকে থালা ভরে মাছ খেতে দেওয়া হয়।’ তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ প্রতিমাকে মাছের মাথা দিয়ে মাষকলাইয়ের ডাল, ঝোলের ব্যান্নন যা রান্না হয় কুমড়ো, থোড়, কাঁচকলা, পেঁপে, চালকুমড়ো সঙ্গে মাছের কাঁটা আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে রান্না করা হয়, সঙ্গে চিংড়ি মাছও দেওয়া হয়। নবমীতে পান্তাভাতের সঙ্গে ইলিশ, কই আর চিংড়ি ভাজা দেওয়া হয়। আমার পিসি কুহেলি বসুকরের কাছে শুনেছি দীপান্বিতা কালীপুজোর দিন তাদের শোলমাছ খাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। তারপর শীতকাল জুড়েই শোল মুলো, কিংবা শোল পোড়া খাওয়া হত।

zoom
দেবতার উদ্দেশে শোলমাছ পোড়া ভোগ

আসলে আমাদের মাছ খাওয়া খুবই ঋতুভিত্তিক ছিল। আমার মায়ের দিদিমা বলতেন ‘চৈত্র মাসে মাগুর মাছের মাথায় পোকা হয়।’ আসলে সেই সময় জিয়ল মাছেদের প্রজনন ঋতু, তাই কই, মাগুর, শিঙ্গি ফাল্গুন মাসের পর থেকেই খাওয়া বন্ধ থাকত। এখনকার মতো সব মাছ সবসময় বাজারেও তখন পাওয়া যেত না। আষাঢ়–শ্রাবণের নতুন জলে স্থানীয় পুকুর, ডোবায় আবার জিয়নো মাছ উঠত, বাজারে আসত। আমার বাবা বলেন, আগে শীতকাল না পড়লে কইমাছ বাড়িতে আসতই না। শীতের নতুন ফুলকপি আর নতুন কই– এই ছিল বাঙালি বাড়ির খাবার টেবিলে শীত আসার সংকেত।

একইভাবে ইলিশের ক্ষেত্রেও সেই নিয়ম প্রযোজ্য। আমাদের বাড়িতে দশমীর দিন আর সরস্বতী পুজোর দিন জোড়া ইলিশ খাওয়ার চল ছিল। বাজার থেকে প্রায় দু’কিলো ওজনের দুটো মাছ আসত। আমার ঠাকুমা যেহেতু বাড়ির বড়বউ ছিলেন, তাই জোড়া ইলিশের আচার সব উনিই পালন করতেন। কুলোর ওপর দুটো মাছ রেখে সিঁদুর পরিয়ে, শঙ্খ বাজিয়ে উলু দিয়ে জোড়া ইলিশ বরণ করে ঘরে তুলতেন। মাছ কেটে মাছের আঁশ জমিতে পুঁতে দেওয়ার পর চাকা চাকা কাটা বেগুন দিয়ে ইলিশের ঝোল রাঁধতেন। ইলিশ মাছের আঁশ পুঁতে দেওয়ার রীতি সংসারে আর্থিক শ্রীবৃদ্ধির নির্দেশ দেয়। জোড়া ইলিশ দিয়ে ঝোল রাঁধার অনেক নিয়ম আছে– যেমন মাছ ভেজে তুলে রাখা যাবে না, পাতিলে একবারই তেল দিতে হবে, সব মাছ একসঙ্গে ছেড়ে দিতে হবে– এমন অনেক কিছু। বছরের শেষ ইলিশ খাওয়া। তারপর আবার বসন্ত পঞ্চমী অর্থাৎ সরস্বতী পুজোর দিন খাওয়া হবে। শীতকাল জুড়ে ইলিশ মাছের ডিম পাড়ার সময়, তাই সেই সময় আর ইলিশ মাছ খাওয়া নয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশ খুব কড়া করে এই নিয়ম মেনে আসছে। আসলে আগেকার দিনের মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। সেই সম্পর্কের দাবি থেকেই মানুষের খাদ্যাভাস তৈরি হয়ে এসেছে।

zoom
কাটা বেগুন দিয়ে ইলিশের ঝোল

মাছ যেমন আমাদের অন্যতম প্রধান খাদ্য, তেমন আমাদের সংস্কৃতিরও খুব উজ্জ্বল এক চিহ্ন। বিয়ের মঙ্গল অনুষ্ঠান, পুজোপার্বণ, মৃত্যুর শোক, আত্মীয়তার বন্ধন থেকে সামাজিক মর্যাদা, জীবনের নানা মুহূর্তে মাছ উপস্থিত থাকে। আমাদের বাঙালবাড়িতে একটা কথা আছে– ‘তোমাদের ব্যাপার বাড়িতে আজ কী কী রান্না হল গো?’ অর্থাৎ নেমন্তন্ন বাড়ির মেনু কী? সেই তালিকা জুড়ে থাকবে মাছের নাম। অনেক বাড়িতেই যে কোনও শুভ অনুষ্ঠানে মাংস খাওয়ানো হয় না। তার বদলে খাওয়ানো হয় নানারকম মাছ। সেইভাবে দেখতে গেলে, মৎস্যের জাদুঘর কেবলই রান্নাঘর আর খাবার টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই গণ্ডি পার করে মানুষের ইতিহাসে সে কখন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সেসব ইতিহাস মানুষের স্মৃতির সম্ভারে, কিংবা মৌখিক ঐতিহ্য হয়ে থেকে যায়। ইতিহাস, লোককথা, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব সেই জাদুঘরকে সময়ের সঙ্গে আরও সমৃদ্ধ করে তুলছে প্রতিদিন। মাছের ভেতর লেখা আছে আস্ত একখান দ্যাশের গল্প। সেই গল্প না হয় পরের পর্বের জন্য তোলা থাক।

Animal Bengal Fish Bengali Culture cooking fish culinary triangle CulturalStories Fish Fish story Funeral GhostStories hilsa Maharashtara Mumbai Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar textile

Share this article on