

ঋতু। ঋতুস্রাব। নারী শরীরের সঙ্গে যুক্ত অতি স্বাভাবিক দু’টি বিষয়। তবু এ নিয়ে কত বছর ধরে কত অশুচিতা বহন করে চলেছে সমাজ। অন্যদিকে ‘ইউলিসিস’ থেকে ‘দ্য রেড টেন্ট’, ‘ব্রেস্টস অ্যান্ড এগ’ থেকে ‘দ্য ভ্যাজাইনা মোনোলগস’… কত সাহিত্য ধরে রেখেছে ঋতুকালীন নারীত্বকে। লাল কালির আঁচড়ে রচনা করেছে নারীশরীরের অল্টারনেটিভ পাঠ।
১
এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার স্বদেশ। এই নারীশরীর– এই ‘ভ্যালি অফ ডেথ’ আমার স্বদেশ। নিজের দেহ– যে দেহ আমিত্বের সহস্র স্রোতকে দেয় এক ত্রিমাত্রিক, স্পর্শযোগ্য অবয়ব, যে শরীর নতুন করে শ্বাস দেয় মনুষ্য-অস্তিত্বকে, জন্ম দেয় অন্তহীন সম্ভাবনার ভ্রূণ– সেই উর্বর, প্রজননক্ষম নারীশরীরকে ‘মৃত্যু উপত্যকা’ বলা যায় কেমন করে, এই প্রশ্ন উঠবেই। এই শরীরকে কীভাবেই বা বলা যায় ‘ভ্যালি অফ ডেথ’?
বলা যায়। একেবারে যথার্থভাবেই বলা যায়। কারণ নারীশরীরের মৃত্যু একবার হয় না। একজন নারীর শরীর প্রতি মাসে জন্ম দেয় একটি করে মৃত্যুর। প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের শরীরে জননতন্ত্র এমন প্রক্রিয়ায় কাজ করে যে প্রতি মাসে নারীদেহের জরায়ুর ভিতরের দেওয়ালে এক মাস ধরে রক্ত এবং পুষ্টিবাহী টিস্যু দিয়ে তৈরি হওয়া পুরু আস্তরণ ভেঙে যায়। এই আস্তরণ স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়, যাতে ডিম্বাশয় থেকে নিষ্কৃত হওয়া ডিম্বাণু, পুরুষদেহ থেকে নির্গত শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হলে তা ফ্যালোপিয়ান টিউব দ্বারা বাহিত হয়ে ব্লাস্টোসিস্ট অবস্থায় নিরাপদে জরায়ুর অভ্যন্তরীণ দেওয়ালে অর্থাৎ এন্ডোমেট্রিয়ামে প্রোথিত হতে পারে। এই রক্ত ও টিস্যুর আস্তরণ গর্ভধারণের পর প্রাথমিক অবস্থায় ভ্রূণকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেয় যাতে মায়ের গর্ভে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে শিশু।

কিন্তু একজন নারী তার গোটা জীবনে কতবার গর্ভবতী হন? বর্তমান সময়ের নিরিখে বলা যায় খুব বেশি হলে জীবনে দুই থেকে তিনবার। অনেক নারী সারা জীবনে একবারও গর্ভবতী হন না। দু’ প্রজন্ম আগে কিছু কিছু দেশে যেখানে সন্তান প্রজননের হার বেশি ছিল, সেখানে কোনও কোনও নারীকে ১২ থেকে ১৫ জন সন্তানের জন্ম দিতেও দেখা গিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে প্রৌঢ়া অবস্থায় পৌঁছনো পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে, গর্ভধারণকালীন অবস্থা বাদ দিলে, বাকি মাসগুলি তো জরায়ুর ওই পুরু আস্তরণ কোনও কাজে লাগে না। সুতরাং জরায়ুর মধ্যে ভ্রুণ প্রতিস্থাপন না ঘটলে ওই আস্তরণ প্রতিমাসে ভেঙে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় দূষিত রক্ত এবং টিস্যু যোনিপথ দিয়ে বেরিয়ে যায়, যাকে আমরা বলি মাসিক বা ঋতুস্রাব।
এই ভাঙন, এই প্রতি মাসে নিয়ম করে শুরু হওয়া রক্তপ্লাবন কী তাহলে একটি মৃত্যুর ইঙ্গিত নয়? প্রতিটি নারীর প্রতি মাসের ঋতুস্রাব কী তাহলে একটি সম্ভাব্য জন্মের মৃত্যু নয়? মৃত্যু বলেই তো এত রক্তপাত! এই অসহ্য যন্ত্রণা-প্রদাহ। এবার প্রশ্ন, ঋতুস্রাবকালীন এই ভাঙন কি শুধুমাত্র শারীরিক? শারীরিক যন্ত্রণা এবং কষ্টের মধ্যেই এই মাসিক রক্তক্ষয়ের প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকতে পারত হয়তো, কিন্তু দুঃখের বিষয় নারীশরীর কবেই বা নারীর নিজের ছিল? তাই নারীশরীর এবং সেই শরীরের প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার উপর নিশ্ছিদ্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে– এই রক্তস্রাবকে নানান ধর্মীয় মতবাদে ‘অশুভ’ বলে চিহ্নিত করা হল। বিভিন্ন ধর্মে এমন কথা বলা হয়েছে যে, মাসিকের ৫ থেকে ৭ দিন ঋতুমতী মেয়েদের স্বাভাবিক পারিবারিক এবং সামাজিক জীবন থেকে নিজেদের অপসারিত করতে হবে; কারণ ওই সময় তাদের শরীর হয়ে ওঠে ‘অশুচি’। সেই শরীর যা-ই স্পর্শ করবে তা-ই হয়ে যাবে অশুচি। কেন এই অশুচিতা– তা আবার জিজ্ঞেস করে বসবেন না যেন! কারণ এর পিছনে কোনও বৈজ্ঞানিক যুক্তি আপনি পাবেন না। নির্দেশ দেওয়া হল ঋতুস্রাব চলাকালীন কোনও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে বা নারী যোগ দিতে পারবে না কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, কোনও সামাজিক শুভ উৎসবে, প্রবেশ করতে পারবে না কোনও মন্দির-মসজিদ-গীর্জায়।

“And if a woman have an issue, and her issue be blood, she shall be put apart seven days: and whosoever toucheth her shall be unclean until the even.” (Leviticus 15:19)
“And every thing that she lieth upon in her separation shall be unclean: every thing also that she sitteth upon shall be unclean.” (Leviticus 15:20)
“And if it be on her bed, or on any thing whereon she sitteth, when he toucheth it, he shall be unclean until the even.”. (Leviticus 15:23)
“And if any man lie with her at all, and her flowers be upon him, he shall be unclean seven days…” (Leviticus 15:24)
ওল্ড টেস্টামেন্টের তৃতীয় বই ‘বুক অফ লেভিটিকাস’-এ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কোনও নারীর ঋতুস্রাব চলাকালীন ৭ দিন তাকে সকলের চোখের আড়ালে, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের থেকে দূরে রাখতে হবে; কারণ অন্য কেউ তাকে স্পর্শ করলে সেই ব্যক্তির শরীরেও অশুচিতা সঞ্চারিত হবে। সেই নারী যে আসনে বসবে, বা যে শয্যায় বিশ্রাম করবে সেই আসন, বিছানা-বালিশ-চাদর সবই তার স্পর্শে হয়ে উঠবে অপরিষ্কার, অপবিত্র। কোনও পুরুষ যদি সেই নারীর সঙ্গে তার মাসিক চলার সময় যৌন মিলনে লিপ্ত হন, তবে সেই পুরুষের শরীরও হয়ে উঠবে অপবিত্র; এবং তাকেও সেই নারীর সঙ্গে সাতদিন সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কোনও পৃথক জায়গায় থাকতে হবে। ইসলামিক ধর্মগ্রন্থ কোরানেও নারীদের ঋতুস্রাব-সংক্রান্ত বিষয়ে একইরকম নির্দেশ পাওয়া যায়–
‘এটি কষ্টের/ অপবিত্রতার অবস্থা; অতএব ঋতুস্রাবের সময় নারীদের থেকে দূরে থাকো এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না।
…
অতঃপর যখন তারা নিজেদের পবিত্র করে, তখন তোমরা তাদের কাছে যাও, যেভাবে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন।’
(কুরআন সূরা আল-বাকারা ২:২২২)

হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে আবার ঋতুস্রাব সম্পর্কে দ্বৈত মতামত পাওয়া যায়। একদিকে যেমন বশিষ্ঠ ধর্মসূত্রে, মনুস্মৃতি বা বৌধায়ন ধর্মসূত্রে বলা হচ্ছে–
‘ঋতুমতী নারী তিন দিন ও তিন রাত অশুচি থাকে।’ (বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র ৫.৪-৫.৫)
‘যখন ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়, তখন স্নানের মাধ্যমে ঋতুমতী নারী শুদ্ধ হয়।’ (মনুস্মৃতি ৫.৬৬)
‘যে ব্যক্তি তার ঋতুকালীন অশুচিতা শেষ করে স্নান করা স্ত্রীকে গ্রহণ করে না, তার পূর্বপুরুষেরা সেই মাসে স্ত্রীর ঋতুস্রাবের স্রাবের মধ্যে অবস্থান করেন।’ (বৌধায়ন ধর্মসূত্র ৪.১.১৮)
তেমনি আবার সেই একই গ্রন্থে এর বিপরীত মতামতও পাওয়া যায়–
‘নারীর শুদ্ধিকরণের একটি অতুলনীয় উপায় রয়েছে; তারা কখনও সম্পূর্ণভাবে কলুষিত হয় না। প্রতি মাসে তাদের সাময়িক অশুচিতা তাদের পাপসমূহ দূর করে।’ (বৌধায়ন ধর্মসূত্র ২.২.৪.৪)
‘সোম তাদের শুচিতা দিয়েছেন, গন্ধর্ব দিয়েছেন মধুর কণ্ঠস্বর এবং অগ্নি দিয়েছেন অঙ্গসমূহের পবিত্রতা; অতএব নারীরা কলুষমুক্ত।’ (বৌধায়ন ধর্মসূত্র ২.২.৪.৫)

তবে এই বিষয়ে হতাশা থেকেই যায় যে, মাসিকের মাধ্যমে নারীদেহের শুদ্ধিকরণের তত্ত্ব পরবর্তীকালে ধোপে টেকেনি। ঋতুমতী নারীদেহ হয়ে উঠেছে ঘোর অশুচি। এই অশুচিতার প্রচার এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল যে, কয়েক সহস্রাব্দ সময়ের মধ্যে কিছু চিকিৎসাশাস্ত্রের বই ছাড়া অন্য কোনও সাহিত্যে ঋতুস্রাবের কোনওরকম উল্লেখ করা হল না। ১৯২২ সালে প্রকাশিত জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’-এ সহস্র বছরের এই দীর্ঘ স্তব্ধতা ভেঙে নারীদেহের ঋতুস্রাবের কথা স্পষ্ট ভাষায় মূলধারার সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লেখক নারী শরীর, বয়ঃসন্ধি, তাদের শারীরিক চাহিদার দমন, গর্ভধারণ ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করলেও, ঋতুস্রাবের বিষয়টি কখনওই সুস্পষ্টভাবে উত্থাপন করেননি। ‘ইউলিসিস’ বইটির একেবারে শেষে মলি ব্লুমের একটানা স্বগতোক্তির মধ্যে পাঠক প্রথমবার একজন নারীর বয়ানে তার মাসিক চলার অভিজ্ঞতা শুনতে পান। মলির মুখে আমরা শুনতে পাই–
‘O that awful deepdown torrent O and the sea the sea crimson sometimes like fire and the glorious sunsets’
একদিকে যেমন সে ক্রমাগত যোনিপথ থেকে নিসৃত রক্তস্রোতকে বলছে ‘awful’ অর্থাৎ বিশ্রী এবং অসহ্য, ঠিক তেমনই সেই রক্তের উজ্জ্বল লাল রং তার চোখে ধরা পড়ছে সমুদ্রে, সূর্যাস্তের সময়কার রক্তিম-সোনালি আকাশের অপূর্ব প্রতিফলন রূপে। এই উপন্যাসের একেবারে শেষ অধ্যায়ে মলি ব্লুমের নিজের মনে একটানা বলে চলা কথাস্রোত যেন সেই নারীর যোনিপথ দিয়ে অবিরাম নিঃসৃত হওয়া শোণিতধারারই রূপান্তর। এই আত্মোক্তি যেন যুগ যুগ ধরে শরীরের উপর আঁট হয়ে বসা শেকল ভেঙে স্বাধীন করতে চাইছে এক নারীর শারীরিক চাহিদাগুলিকে। নিশ্চিন্তে এবং অকপটে মলি প্রকাশ করে চলেছে তার সমস্ত শারীরবৃত্তীয় অভিজ্ঞতা, স্পর্শ-ইচ্ছা, যৌনসুখপ্রাপ্তির প্রতি আকর্ষণ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাধা বা নিষেধের কোনওরকম তোয়াক্কা না করে মলি প্রকাশ করে চলেছে তার আত্মার অন্তঃস্থলের অবরুদ্ধ সব কথা।

ধর্মীয় মৌলবাদের চোখে ঋতুস্রাবের প্রক্রিয়াটি বা ঋতুমতী মেয়েরা কতখানি অশুচি এবং অসহ্য তার এক মুখোশবিহীন ছবি দেখিয়েছেন স্টিফেন কিং তাঁর ‘ক্যারি’ উপন্যাসে। এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালের ৫ এপ্রিল। এই গল্পে পাঠক দেখতে পান মার্গারেট হোয়াইট নামের এক মহিলাকে, যিনি একজন গোঁড়া প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্ট-ধর্মাবলম্বী নারী এবং তিনি বিশ্বাস করেন মেয়েদের যৌন চাহিদা থাকা এক ক্ষমা-অযোগ্য পাপ। ঋতুস্রাব তাঁর কাছে এক অতি ঘৃণ্য বিষয় এবং যেহেতু ঋতুস্রাব শুরু হওয়া আসলে কিশোরীদের প্রাপ্তবয়স্ক নারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবার প্রাথমিক ধাপ, তাই এই প্রক্রিয়াটি বিষয়ে এক অদ্ভুত আতঙ্ক এবং অরুচি তিনি সবসময় অনুভব করেন। এই বিষয়টি তার কাছে এতখানি কুরুচিকর যে, তিনি তার কিশোরী মেয়ে ‘ক্যারি’-কে মাসিকের ব্যাপারে কোনওরকম পূর্ব সতর্কতা দেন না। ফলে স্কুলে যখন ক্যারির প্রথমবার মাসিক শুরু হয়, স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায় তার সহপাঠীরা তার দিকে স্যানিটারি ট্যাম্পন ছুড়ে দিচ্ছে অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে। সহপাঠীরা প্রকাশ্যে ক্যারিকে অপমান করে এবং ক্যারিকে গ্রাস করে এক অপরিসীম লজ্জাবোধ।
‘A tampon suddenly struck her in the chest and fell with a plop at her feet. A red flower stained the absorbent cotton and spread.’
এই দৃশ্য থেকে স্পষ্ট আন্দাজ করা যায় যে ক্যারিকে তার মা ইচ্ছে করেই মাসিকের মতো একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার কথা জানাননি। এই উপন্যাসেই কিন্তু ক্যারির স্কুলশিক্ষিকার একেবারে বিপরীত প্রতিক্রিয়াও আমরা দেখতে পাই। ক্যারি রক্তপাত দেখে ঘাবড়ে গিয়ে যখন মৃত্যুভয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছে, তখন মিস দেজার্দিন কিন্তু ক্যারিকে শান্তভাবে ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এই কিশোরী এমন চরমপন্থী ধর্মীয় চিন্তাধারার ছত্রছায়ায়, বাড়িতে এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরাধীন পরিবেশে বেড়ে উঠেছে যে, সে কিছুতেই তার শিক্ষিকার কোনও ব্যাখ্যা শুনতে রাজি নয়।

‘(Miss Desjardin) tried twice to explain the commonplace reality of menstruation, but Carrie clapped her hands over her ears and continued to cry.’
এই প্রসঙ্গে মিস দেজার্দিনের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষিত, মুক্তমনা অন্ধসংস্কারবিহীন নারী হিসেবে তাঁর চিন্তাভাবনার গভীরতা আধুনিক পাঠকের চেতনাকে স্পর্শ করে–
“I’m living in a glass house, see. I understand how those girls felt. The whole thing just made me want to take [Carrie] and shake her. Maybe there’s some kind of instinct about menstruation that makes women want to snarl, I don’t know.”
স্টিফেন কিং এই গল্পে ঋতুস্রাবকেই কিন্তু ক্যারির মধ্যে জন্ম নেওয়া এক অলৌকিক শক্তির উৎসস্থল হিসাবে দেখিয়েছেন এবং ঋতুরক্ত বিষয়ে তার মনের মধ্যে জমে থাকা সমস্ত অপরাধবোধ এবং লজ্জা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় ক্যারির শক্তিতে। ক্যারির মা একসময় নিজের মেয়েকে অপশক্তির বাহক হিসেবে সন্দেহ করেন এবং মনে করতে থাকেন যে ক্যারিকে জন্ম দিয়ে তিনি যে পাপ পৃথিবীতে ডেকে এনেছেন, একমাত্র তাকে হত্যা করলেই সেই পাপ থেকে তিনি মুক্ত হতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটে উল্টো ঘটনা। মায়ের মৃত্যু হয় সন্তানের হাতে। কিন্তু ক্যারির হাতে মার্গারেটের বিনাশ আসলে প্রকৃত নারীসত্তা এবং নারীত্বের স্বাধীনতার কাছে গোঁড়া ধর্মীয় কুসংস্কারের পরাজয়। যে নারী তার নিজের শরীর এবং সেই শরীরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত শারীরিক প্রবৃত্তি এবং প্রক্রিয়াকে গ্রহণ করতে অক্ষম, সে তো প্রকৃতপক্ষে সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে একজন নারীবিদ্বেষী। নারী শরীরকে তার সমস্তরকম অবস্থায় স্বীকৃতি দেওয়ার ভাষা তো তার কাছে হায়ারোগ্লিফিক্সেরই সমান!

এই সূত্র ধরেই মনে পড়তে পারে ২০১৯ সালে প্রকাশিত মিকো কাওয়াকামি রচিত ‘ব্রেস্টস অ্যান্ড এগ’ উপন্যাসের প্রসঙ্গ। মিদোরিকো নামের এক কিশোরীর শরীরে আসা বিভিন্ন পরিবর্তন কীভাবে তাকে এক গভীর একাকিত্ব এবং উদ্বেগের মধ্যে নিয়ে যায়– তা এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় বুঝতে পারেন পাঠক। ঋতুস্রাব এই কিশোরীর কাছে এক অতি দুর্বোধ্য ব্যাপার। মিদোরিকো নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় তার মন এবং শরীরের মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়তে থাকে। তার অনুমতি না নিয়েই তার শরীর যেন নিজেকে চালনা করে এবং এই নিজেকে চিনতে না পারার বিষয়টি মিদোরিকোর হৃদয়ে তৈরি করে এক গভীর উৎকণ্ঠা। মিদোরিকো বলে–
“It feels like I’m trapped inside my body.”
নিজের শরীর থেকে দূরে এক একাকী দ্বীপে বসত গড়ে তার মন। সে নিজেকে প্রশ্ন করে যে, যেহেতু তার শরীর আপনাআপনিই জানান দিচ্ছে যে সে প্রজননে সক্ষম, তার অর্থ কী এই যে তাকে সন্তান জন্ম দিতেই হবে? সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে তার নিজের সিদ্ধান্ত কতখানি গ্রহণযোগ্য? না কি সমাজ তার এই সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করবে?

নারীশরীরের এই মৃত্যুভূমিকে এক কোমল পরিচর্যার পথে নিয়ে গিয়েছে ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত আনীতা ডায়াম্যান্ট রচিত উপন্যাস ‘দ্য রেড টেন্ট’৷ এই উপন্যাসে তিনি ‘বুক অফ জেনেসিস’-এ উল্লিখিত জেকব এবং লেয়ার কন্যা দিনাহকে মূল চরিত্র হিসেবে স্থাপন করেছেন৷ বাইবেলে দিনাহ-র কথা প্রায় পাওয়াই যায় না। এই উপন্যাসে, ডায়াম্যান্ট, দিনাহ-র চরিত্রটির পুনর্নির্মাণ ঘটিয়েছেন। বাইবেলে বলা হয় যে ঋতুস্রাব চলাকালীন মহিলারা থাকতেন একটি লাল তাঁবু অর্থাৎ ‘রেড টেন্ট’-এ, যেহেতু ওই সময় তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে লিপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ ছিল। ডায়াম্যান্ট এই রেড টেন্টকে দেখিয়েছেন নারীদের নিজস্ব, পৃথক একটি জগৎ হিসাবে। এই কাহিনিতে জেকবের জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত নারীরা অর্থাৎ লেয়া, বিলহা, র্যাচেল, দিনাহ, জিলপা বিভিন্ন কারণে একত্রিত হন এই রেড টেন্টে। কখনও ঋতুস্রাবের কারণে, কখনও গর্ভধারণজনিত অসুস্থতার জন্য, সন্তান প্রসবের সময়ে, বিভিন্ন নারীকেন্দ্রিক আচরণ-অনুষ্ঠান পালনের জন্য তাঁরা এই লাল তাঁবুতে জড়ো হন। এই লাল তাঁবু আসলে হয়ে ওঠে নারী শরীরেরই এক প্রতীকী রূপ। পুরুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এই লাল তাঁবু হয়ে ওঠে মহিলাদের এক ‘অল্টারনেটিভ স্পেস’– তাঁদের স্বাধীনতার উন্মুক্ত উঠোন। এই নিরাপদ সুরক্ষিত তাঁবুর ভেতর নারীরা নির্দ্বিধায় একে অপরকে নিজেদের মনের কথা জানান, নারীশরীর সংক্রান্ত জ্ঞানবন্টনের মাধ্যমে তাঁদের অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায় ধীরে ধীরে। পুরুষশাসিত সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও, ‘রেড টেন্ট’ নারীদের মধ্যে তৈরি করে এক সংহতি এবং সহাবস্থানের ধারণা। এই উপন্যাসে, ডায়াম্যান্ট ঋতুস্রাবকে দেখিয়েছেন দেবী ইনান্নার দান হিসেবে, যা নারীশরীরকে প্রতি মাসে শোধন করে এবং পরবর্তী জন্ম-সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে নতুন করে প্রস্তুত করে।
“In the red tent, the truth is known. In the red tent, where days pass like a gentle stream, as the gift of Innana courses through us, cleansing the body of last month’s death, preparing the body to receive the new month’s life, women give thanks– for repose and restoration, for the knowledge that life comes from between our legs, and that life costs blood.”

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে ভারতীয় সাহিত্যিক শশী দেশপান্ডের ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ডার্ক হোল্ডস নো টেররস’ উপন্যাসের কথা– যেখানে গল্পের মূল চরিত্র সারু (সরিতা)-কে তার মাসিক চলাকালীন রান্নাঘরে বা পুজোর ঘরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এই গল্প একা সারুর নয়, এই ঘটনা ভারতের প্রায় প্রতি ঘরে, প্রতিটি ঋতুমতী মেয়ের গল্প। এখানেও রয়েছে সেই বিচ্ছিন্নতার কথা, কিন্তু তা ডায়াম্যান্টের উপন্যাসের বিচ্ছিন্ন লাল তাঁবুর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডায়াম্যান্টের এই বিচ্ছিন্ন তাঁবু যেখানে হয়ে উঠেছে নারীদের স্বাধীন কথা এবং চিন্তা বিনিময়ের জায়গা– ঠিক তার বিপরীতে সারুর বিচ্ছিন্নতা তাকে দিয়েছে কেবলই অপমান এবং একাকিত্বের যন্ত্রণা। অন্যদিকে শাহিনা কে. রফিকের ছোটগল্প ‘দ্য মেনস্ট্রুয়াল কুউ’-তে পাঠক দেখবেন কীভাবে একটি ট্রেনের কামরা হয়ে উঠছে সেই জেকব ও দিনাহ-র সময়কার ‘রেড টেন্ট’ অর্থাৎ একটি নারী-নিয়ন্ত্রিত স্থান, যেখানে কামরায় উপস্থিত সব নারীরা তাদের মাসিক-সংক্রান্ত যন্ত্রণা, অস্বস্তি, তাদের নারীসত্তার বহির্জগৎ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার গ্লানি একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে। সকলেই একে একে নিজেদের ঋতুস্রাব-বিষয়ক অভিজ্ঞতা জানাচ্ছে। কেউ জানাচ্ছে– ‘I began to believe menstruation was a monster which would take away my freedom.’ আবার কেউ বলছে– ‘I had to hide my feminine growth.’ এভাবে তৈরি হচ্ছে নারীদের নিজস্ব কথা আদানপ্রদানের এক স্বাধীন ক্ষেত্র। এখানে লক্ষ করার মতো বিষয় হল– ট্রেনের কামরা চলমান, স্থির নয়। ট্রেনটি এই সমস্ত মহিলা যাত্রীদের কথা বহন করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, ঠিক যেমন এই মহিলারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাসিক-সংক্রান্ত যন্ত্রণা-অপমান-বিচ্ছিন্নতা-উদ্বেগ-গোপনীয়তা বহন করে নিয়ে চলেছে।

একথা ভাবতে অবাক লাগে যে ট্রেনের ওই কামরা সচল হয়েও অচল। কারণ ট্রেন যেখানেই যাক না কেন নারীদের অবস্থান একই থেকে যায়। অথচ এই রক্তস্রোতে মিশে আছে কত কাহিনি, যা নারীর একান্ত নিজের, কত বঞ্চনা যা তার প্রাপ্য ছিল না, কত নির্বাসন, কত ইচ্ছে-সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অকালমৃত্যু, কত আত্মত্যাগ। তাই সত্যিই, এই প্রতি মাসে রক্তবন্যায় ভেসে যাওয়া নারী-যোনি আসলে এক একটি হৃদয়। এমন হৃদয়, যা সভ্যতার অগ্রগতির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে সদাপ্রস্তুত থেকেছে। যে রক্তধারায় সদা প্রবাহিত নারীদের আত্মনিবেদন, স্বার্থত্যাগ এবং যুগ-যুগান্তরের সামাজিক সমঝোতা। তাই ইভ এন্সলার তাঁর ‘দ্য ভ্যাজাইনা মোনোলগস’-এ একেবারে যথার্থ লিখেছেন–
“The heart is capable of sacrifice. So is the vagina. The heart is able to forgive and repair. It can change it’s shape to let us in. It can expand to let us out. So can the vagina. It can ache for us and stretch for us, die for us and bleed and bleed us into this difficult, wondrous world. So can the vagina. I was there in the room. I remember.”
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved