

‘রাতজাগা’– সবসময় ইনসমনিয়া নয়। রাস্তাঘাটে, শহর-গ্রাম-মফসসলে, আজকের নারীরা কি জেগে থাকতে পারে? নির্বিঘ্ন তাঁদের চলাচল? লক্ষ্মীপুজোর রাত, লক্ষ্মী ও তাঁর বাহন পেঁচার আগমনের সময় ঘোর রাত্রি। বাঙালির চিরায়ত লক্ষ্মী যতটা স্বাধীন, তাঁর বাহন যতটা স্বাধীন, বাংলার মেয়েরা সেই রাতের স্বাধীনতা আর পাবেন কবে?
ব্যাপারটা ঘটল শেষ রাতে। পাড়ার গণেশজেঠুদের বাড়িতে।
জেঠুদের বাড়ির আড়াইতলায় চিলেকোঠার ঘর, পেঁচানো সিঁড়ি নেমে গেছে নিচে। দোতলায় ঝুলবারান্দা, রান্নাঘর, স্নানঘর, শোবার ঘর। একতলায় একফালি উঠোন, বারান্দা, আর বৈঠকখানা। নয়ের দশকের মধ্যবিত্ত বাঙালিবাড়ির পরিচিত ছিমছাম নকশা, চুরিচামারি করতে গেলে বিস্তর মাথা খাটানোর প্রয়োজন হয় না।
চোরবাবাজিও খাটালেন না; আর সত্যি বলতে কী, একেবারেই খাটালেন না। ফলে একাদশীর দিন গণেশজেঠু ছানাপোনা নিয়ে সস্ত্রীক শ্বশুরবাড়ি গেলে, তিনি চিলেকোঠার ঘর দিয়ে ঢুকে জিনিসপত্তর হাতিয়ে ফুলবাবুটির মতো সদর দরজা খুলে পালাতে গেলেন!
পাশের বাড়িটা ছিল জবাকাকিমাদের। ইনসমনিয়ায় ভোগা জবাকাকিমা দিনভর সবার ওপর বাজখাঁই গলায় চেঁচাতেন আর রাতভোরে লোকের বাড়ি ফুল চুরি করতে যেতেন। সেদিন তখন তিনি গণেশজেঠুদের পাঁচিল উপচে পড়া জুঁই ফুলে সব হাত লাগিয়েছেন, আর পাতাসুদ্ধু ডাল সরে যেতেই চোর একেবারে চোখের সামনে।
তারপর আর কী! জবাকাকিমার বাজখাঁই গলার ‘চোর-চোর’ শুনে ঘুময় কার সাধ্যি? আশপাশের বাড়িতে আলো জ্বলে উঠল, এবং চুরির সামগ্রী-সহ চোর একেবারে হাতেনাতে ধরা পড়ল। আর পুজোর রোশনাইয়ের মধ্যেও আমাদের উত্তর কলকাতার সাদামাটা, শান্তশিষ্ট পাড়ায় এমন চুরির ঘটনায় একটি পাহারাওলার দল তৈরি হল। ঠিক হল, দলের অন্তত দু’জন রোজ রাত জেগে পাড়া পাহারা দেবে।

এই রাত জেগে পাড়া পাহারা দেওয়ার গোটা দায়িত্বটাই পড়ল ছেলেদের কাঁধে। আর সমাজসেবার এমন গুরুদায়িত্ব পেয়ে অচিরেই তারা পাড়ার ‘সেলিব্রিটি’ হয়ে উঠল। তখন আমি বেশ ছোট; তাই লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন এবং সাংস্কৃতিক হেজেমনির ধারণা তখনও আমার কাছে স্পষ্ট হয়নি, আত্তীকৃতও নয়। ফলে রাত জেগে পাড়া পাহারা দেওয়ার সেলিব্রিটি গ্রুপে আমার সর্বগুণসম্পন্না মা-সহ কোনও মহিলারই জায়গা না-হওয়ার বিষয়টা আমায় ভারি অবাক করল। অবাক হওয়া দ্বিগুণ হল, যখন দেখলাম যে মাত্র দু’দিন আগে হাতেনাতে চোর ধরা জবাকাকিমাও সেই গ্রুপে স্থান পাননি।
আর সবচেয়ে বেশি অবাক হলাম এটা দেখে যে, এই গোটা অন্যায়-অবিচারটায় জবাকাকিমার কিছু যায় তো আসলই না, উল্টে পাড়ার বাকি মা-কাকিমাদের মতোই সকালবেলা তার গলাতেও পাহারাদার ছেলেপুলেদের জন্য যত্ন আর উদ্বেগ শোনা যেতে লাগল: ‘ওরে জগা, দুপুরবেলায় ঘুরে বেড়াস না বাপ, আজ তোর রাত জাগা আছে।’ কিংবা ‘বিপিন, আজ তোর জন্য লুচি মাংস করেছি, রাত জাগতে গায়ে জোর লাগবে তো…’
তো বলার কথা এই যে, আমাদের পাড়ার প্রথম এবং শেষ চোর ধরা, নিত্যদিন রাত জাগা বাজখাঁই গলার জবাকাকিমাও এভাবেই ‘স্বেচ্ছায়’, ‘বিপ্লবের সেবাদাসী’ হয়ে গিয়েছিলেন। আরও মজার কথা এই যে, সেদিন থেকে যতদিন কাকিমা বেঁচেছিলেন, চোর ধরার প্রসঙ্গে কথা উঠলেই সবাই বলত, ‘তোমার ইনসমনিয়া কিন্তু আমাদের কাজে এসেছিল জবা।’ অথবা, ‘সেদিন তুমি ভাগ্যিস ভয় না পেয়ে চিৎকারটা করেছিলে…’ ।
অবাক হয়ে দেখতাম যে, এসব শুনে জবাকাকিমাও মিষ্টি হেসে চুপ করে যেতেন। উত্তরে বলতেন না– যে না; আমি শুধু চিৎকার করিনি, সে-রাতে আপনারা সবাই যখন ঘুমচ্ছিলেন, তখন এই পাড়ার চোর আমি একা ধরেছিলাম। বলতেন না, যে আমি ভয় পাইনি, কারণ আমি ভয় পাই না। বলতেন না, যে আপনাদের মতন দল বেঁধে নয়; প্রতি ভোররাতে একা পাড়া ঘোরার দম আর সাহস আমার আছে।
কেন বলতেন না? কারণ আমাদের রাত জাগা মানা। আমাদের মানে মেয়েদের। আরও স্পষ্ট করে বললে ভদ্রবাড়ির মেয়েদের। অথচ সংসারে কেউ খবর না রাখলেও, আমরা কিন্তু রোজই রাত জাগি নিঃশব্দে। রাতের খাওয়া এঁটো বাসন তুলে রান্নাঘর পরিষ্কার করার জন্য, অসুস্থ স্বামী সন্তানের যত্নের জন্য, তাদের পরদিন সকালের জলখাবার আর টিফিনের জোগাড় এগিয়ে রাখার জন্য কিংবা স্বামীর শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য– আমরা প্রায় প্রতিরাত জাগি। সেবারের সেই ১৪ আগস্ট ছাড়া এ-জন্মে সম্ভবত আর কোনও বৃহত্তর উদ্দেশ্যে আমাদের রাত জাগা হয়নি, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা রাত জাগি না।

আমরা প্রতিদিন ঘরের অন্ধকারে জাগি, কারণ ‘লক্ষ্মী’ মেয়েরা ঘরের বাইরে রাত জাগে না, রাত কাটায় না। তবুও কি আশ্চর্য বৈপরীত্য দেখুন, আমাদের পরম আরাধ্য লক্ষ্মীঠাকুর প্রতি বছর ‘কো জাগর্তি’ (কে জাগে রে) বলে রাত জাগার প্রতীক বাহন পেঁচাকে সঙ্গে করে আশ্বিন মাসের শুক্লাপক্ষের পূর্ণিমা তিথির রাতে আমাদের ঘরে আসেন। আর আমরাও ঘরময় তার পাদপদ্মের আলপনা দিয়ে, সারারাত প্রদীপ জ্বালিয়ে সমৃদ্ধির আশায় তার রাত্রিকালীন আগমনের অপেক্ষা করি। অথচ সেই আমরাই কোনও একদিন ঘরের মেয়ে টিউশন থেকে দেরি করে বাড়ি ফিরলে প্রণয়ের গন্ধ শুঁকে হয় তাকে গৃহবন্দি করি, নতুবা বিয়ের ব্যবস্থা। কোনও একদিন বাড়ির বউ অফিস থেকে দেরি করে বাড়ি ফিরলে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলি, ধরেই নিই যে স্বামী-সংসারে তার মতি নেই মোটেই। এমনকী, পাশের বাড়ির বউ-মেয়েও কোনও একদিন দেরি করে বাড়ি ফিরলে আমাদের চিন্তার শেষ নেই। দশক কয়েক আগেও পাড়ায় পাড়ায় সে নিয়ে সালিশি সভা বসত, এখনও বসে শহরতলি, গ্রাম, এমনকী, বিশ্বের নানা দেশে। কলকাতার মতো শহরাঞ্চলে অবশ্য আমরা ঘুরিয়ে নাক দেখাই– ‘হেঁ হেঁ, বউদির অফিসে তো কাজের খুব চাপ, রোজই দেখি রাত হয় ফিরতে…’
অবাক কথা এই যে, ভারতীয় সমাজ মেয়েদের শুধু ‘লক্ষ্মী’ নামে নয়, লক্ষ্মী বিশেষণেও অভিহিত করে। অথচ কোনও নামকে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করার নেপথ্যে যে স্বাভাবিক ‘সিম্বলিক অ্যাসোসিয়েশন’ কাজ করে, যা বলে যে সিম্বল বা প্রতীকের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যও যেন উত্তরাধিকারীর মধ্যেও প্রদর্শিত হয়, তাকে আমরা স্বীকার করি না। করলে কিন্তু লক্ষ্মী– এই নামভূমিকাতেই এদেশের মেয়েদের চঞ্চলা-চপলা এবং নিশাচর, অর্থাৎ রাত্রিকালে চালাফেরা করার অবাধ স্বাধীনতা থাকার কথা। এমনকী, সেমিওটিক্স বা চিহ্নবিজ্ঞান সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকলেও বোঝা যায় যে লক্ষ্মীদেবীর পায়ের কাছে নিশাচর পেঁচার উপস্থিতিও সেই একই তত্ত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে। কিন্তু ‘চারিত্র্যপূজা’ গ্রন্থে কবিগুরু যেমন বলে গেছেন, “…যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না…”– সেই সত্য থেকে আমাদের মুক্তি নেই বলে এসবের কিছুই বাস্তব হয় না।
তাই যে মানবজাতি সুবিধে আর ইচ্ছেমতো ‘লক্ষ্মী’-র সংজ্ঞা রিডিফাইন করে, স্বয়ং ঈশ্বরকেও অনুশাসনে বন্দি করে, খোদার ওপর খোদকারি করে চঞ্চলা লক্ষীর পায়ে বেড়ি বাঁধতে চায়, কেড়ে নিতে চায় তার স্বাভাবিক রাত্রিযাপনের অধিকার; লক্ষ্মীপূজার ছলে লক্ষ্মীকেই ভুলে থাকতে থাকতে আশা করে যে এত কিছুর পরেও তিনি আমাদের ঘরে আসবেন, অধিষ্ঠিত হবেন, সমৃদ্ধি বিলোবেন এবং কখনও রুষ্ট হয়ে ত্যাগ করবেন না, তাদের থেকে স্বার্থপর, সুবিধেবাদী তদুপরি অসভ্য প্রাণী এ-সংসারে আর কে-ই বা আছে!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved