

‘নাইটওয়াচম্যান’ শব্দটি ক্রিকেটে কোন সময় থেকে চালু হয়েছিল, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কিন্তু এমন চমৎকার আক্ষরিক অর্থযুক্ত অথচ ঘোরতর ক্রিকেটীয় শব্দটি বড় ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠে এমন ভরা পূর্ণিমার রাতে। কে যে কোথায় নিয়ে চলে যায় স্মৃতি– কাজ চালানোর জন্য অকিঞ্চিৎ যা কিছু, অনাদর-অযত্ন যাদের গায়ে গায়ে, সেইসব মানুষেই কখনও লক্ষ্মীলাভের মূল কারিগর হয়ে ওঠেন। ক্রিকেটের নাইটওয়াচম্যান হিসেবে মাঠে নামানো বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই আউট হয়ে ফিরেছেন। ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু কেউ কেউ সফল হয়েছেন। সে-সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য। কিন্তু, উদাহরণ হিসেবে তাঁরা থাকবেন, কারণ, লক্ষ্মীর ঘটে ফেলা খুচরো এইসব ইনিংস জমে জমে একদিন আরও মায়াবী করে তুলবে ‘নাইটওয়াচম্যান’ শব্দবন্ধটিকে।
যা কিছু অকিঞ্চিৎকর, তাদেরই ডাক পড়ে মাসের পঁচিশ পেরলে। টুথপেস্টের টিউবের ওপর আঙুলের রোলার চালালেও নতুন পেস্টটিকে মাসের এক তারিখের আগে বের না করার মধ্যবিত্ততা আমাদের জহরমানি, যেমনটা হয় মুড়ির কৌটোর অবধারিত খালি হয়ে যাওয়ায়; চিঁড়ে এসে খেলে দেয় সেই চার-পাঁচদিন, যদ্দিন না মাসপয়লায় ঘরে ঢুকছে মাসকাবারি মুদিখানার ব্যাগ, যাতে থাকবে একটা আস্ত ঝকঝকে লাক্স সাবান, ব্যাগ থেকে বেরিয়ে সে দখল নেবে সাবানদানির, মিশে যাবে গত পাঁচদিন কায়ক্লেশে কাজ চালানো রোগা-পাতলা নাইটওয়াচম্যানের সঙ্গে, শুরু হবে নতুন পার্টনারশিপ।
রাতজাগা এইসব পেঁচা, বকলমে প্রহরী আসলে যা আড়াল করে মহামূল্যবান সম্পদ, টেনেটুনে চালিয়ে দেওয়ার নায়ক– তার পোশাকে আভিজাত্য নেই, তার আগমনে রাজকীয়তা নেই, এমনকী, তার মৃত্যুও যেন প্রত্যাশিত। অপেক্ষা কেবলই আসল নায়কের। কিন্তু যদি এই স্টপগ্যাপ নাইটওয়াচম্যানরাই দখল নেয় মঞ্চের? পার্শ্বচরিত্র হয়ে নায়কের লাইমলাইট কেড়ে নেয় নিজের দিকে? এমন উদাহরণ জীবন কিংবা ক্রিকেটের মাঠ– কোথাও-ই কম নেই।
জেসন গিলেসপিকে রিকি পন্টিং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নামিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান আভিজাত্যের বিপ্রতীপে গিয়ে। ম্যাথু হেডেনের উইকেট পড়ে গেলে পন্টিং বাকি ব্যাটারদের আড়াল করতে, সেদিনের মতো মাঠে নামান গিলেসপিকে। ‘ক্রিকেট মান্থলি’ নাইটওয়াচম্যান আসলে কী, এ প্রশ্নের উত্তরে একটা কথা খুব সোজাভাবে জানিয়েছে, মশাই, কেরিয়ার টু ডেট অ্যাভারেজ, অর্থাৎ তাঁর নিজের পজিশনে ব্যাটিং গড় ২০-এর বেশি হলে তাঁকে আর পেঁচা থুড়ি ‘নাইটওয়াচম্যান’ বলা যাবে না, এমনকী, এক নম্বর থেকে সাত নম্বর অবধি পজিশনে ধারাবাহিকভাবে ব্যাট করা ব্যাটারকেও নাইটওয়াচম্যান বলা যাবে না। সোজা কথায় বলতে গেলে, কাশীর ক্যালকাটা লজে বিশ্বশ্রী গুণময় বাগচীদের সাড়ে ১৭ বাইসেপের সামনে ভেতো জটায়ু হয়ে থেকেও মোক্ষম সময়ে ফেলুদাকে ক্লু সাপ্লাই করে কেল্লাফতে করে দিতে পারলে তবেই সে নাইটওয়াচম্যান– তাঁর কাজ দিনের শেষে জটিল পিচ, কম আলো কিংবা ক্লান্তিকে গিলে খেয়ে সময় কাটিয়ে বাকি ব্যাটারদের আড়াল করা। গিলেসপি করেছিলেন। যাঁকে নামানো হল, কিছু বল কোনও মতে খেলে দিয়ে পরদিন ফ্রেশ ব্যাটারকে ক্রিজে আনার জন্য, সে-ই কি না আড়াই দিন ব্যাট করে হাঁকিয়ে দিল ডবল সেঞ্চুরি!

চট্টগ্রামের দর্শকের ক্লান্তি এল। বাংলাদেশের নটেগাছটিও মুড়োল। সাড়ে ন’ঘণ্টা ক্রিজে পড়ে থেকে ইতিহাস গড়ে দিলেন গিলেসপি। মাইক হাসিকে সঙ্গে নিয়ে একটা ৩০০ রানের পার্টনারশিপ!
নাইটওয়াচম্যানের ক্রিকেটীয় ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ইনিংস হিসেবে জেসন গিলেসপির ইনিংসটিকে ধরা হলেও উপমহাদেশের জলহাওয়ায় এমন পেঁচাদের দেখা গিয়েছে, তা দিয়ে দলের লক্ষ্মীলাভও হয়েছে প্রচুর। ২০১১ সালে অমিত মিশ্রর কথা ধরা যাক। ব্রিটিশ মুলুকে, দ্য ওভালের মতো মাঠে অমিত মিশ্র, বেঁটেখাটো চেহারার স্পিনার অমিত মিশ্র, ব্যাট হাতে মাঠে নেমে একটা ৮৪ রানের ইনিংস খেলে গেলেন। শচীন তেণ্ডুলকরকে সঙ্গে নিয়ে একটা দীর্ঘ পার্টনারশিপ। ভারতের ভাগ্যাকাশে মেঘ কেটে রোদও উঠল। এই অমিত মিশ্রর ‘নাইটওয়াচম্যান’ হয়ে নেমে নায়ক হওয়ার চিত্রনাট্য কিন্তু লেখা হচ্ছিল বছরখানেক আগে থেকেই। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে তিন নম্বরে নেমে ভদ্রলোক খেলে দিয়েছিলেন একটা ৫০ রানের ইনিংস। এক বছরের মধ্যে ৮৪ রানের ওভাল ইনিংসের আলোয় চাপা পড়ে গেলেও এই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ৫০ রানের ইনিংসটিই কিন্তু প্রথম দক্ষ নাইটওয়াচম্যান হিসেবে অমিত মিশ্রকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেটে। অমিত মিশ্রর একযুগ পর ভারতীয় ক্রিকেটে ফের একটি সফল নাইটওয়াচম্যান ইনিংস খেলে ফেলবেন আকাশদীপ সিং।

বিশ্বজুড়েই যখন এই রাতপ্রহরী ব্যাটারদের নিয়ে সন্দেহ, তাবড় বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই নাইটওয়াচম্যানের ধারণা ক্রমেই ফিকে হচ্ছে, তখন গত বছর বিলেতে ফের আকাশদীপ একটি ৬৬ রানের ইনিংস খেলে জানান দিলেন এই রাতপ্রহরীদের গুরুত্ব। অমিত মিশ্রর ৮৪ রানের ইনিংসের পর এটিই সবচেয়ে জমকালো নাইটওয়াচম্যান ইনিংস ভারতীয় ক্রিকেটে।
অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটেও গিলেসপির আগে ছিলেন আরেকজন জনপ্রিয় নাইটওয়াচম্যান। অ্যান্টনি লংফোর্ড মান বা সংক্ষেপে টনি মান। ১৯৭৭-’৭৮ ভারত-অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নবাগত ক্রিকেটার হিসেবে আসেন ও দ্বিতীয় ইনিংসে যখন অস্ট্রেলিয়ার জেতার জন্য দরকার প্রায় ৩৫০ রান এবং চতুর্থ দিনের খেলার শেষলগ্নে একজন ওপেনার আউট হন, তাঁকে নামানো হয় ‘নাইটওয়াচম্যান’ হিসেবে। কেবল সেদিন বাকি ব্যাটারদের আড়াল করাই নয়, একেবারে ভারতীয় বোলারদের নিক্তিতে মেপে তাবড় ব্যাটারদের মতো সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে দেন টনি মান। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ জিতে যায় তাঁর ইনিংসের সৌজন্যে। অথচ, অবাক করা বিষয় হয়, এই সিরিজের পর ব্রুস ইয়ার্ডলি অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলে এসে যাওয়ায় আর কোনও দিন টেস্ট ক্যাপ পরার সুযোগ হয়নি টনি মানের। কিন্তু ওই যে, লক্ষ্মীপেঁচার দ্বারা মোক্ষম সময়ে লক্ষ্মীলাভটি হয়েছিল ক্যাঙারু শিবিরে।

‘নাইটওয়াচম্যান’ শব্দটি ক্রিকেটে কোন সময় থেকে চালু হয়েছিল, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কিন্তু এমন চমৎকার আক্ষরিক অর্থযুক্ত অথচ ঘোরতর ক্রিকেটীয় শব্দটি বড় ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠে এমন ভরা পূর্ণিমার রাতে। কে যে কোথায় নিয়ে চলে যায় স্মৃতি– কাজ চালানোর জন্য অকিঞ্চিৎ যা কিছু, অনাদর-অযত্ন যাদের গায়ে গায়ে, সেইসব মানুষেই কখনও লক্ষ্মীলাভের মূল কারিগর হয়ে ওঠেন। ক্রিকেটের নাইটওয়াচম্যান হিসেবে মাঠে নামানো বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই আউট হয়ে ফিরেছেন। ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু কেউ কেউ সফল হয়েছেন। সে-সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য। কিন্তু, উদাহরণ হিসেবে তাঁরা থাকবেন, কারণ, লক্ষ্মীর ঘটে ফেলা খুচরো এইসব ইনিংস জমে জমে একদিন আরও মায়াবী করে তুলবে ‘নাইটওয়াচম্যান’ শব্দবন্ধটিকে। হেডেন-পন্টিং-শচীন-দ্রাবিড়দের সেঞ্চুরি ডবল সেঞ্চুরির একঘেয়েমির পাশে এক আধটা জেসন গিলেসপি-টনি মান কিংবা অমিত মিশ্রা-আকাশদীপের ইনিংসই তো ক্রিকেটের প্রাণ!
…………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন অর্পণ গুপ্ত-র অন্যান্য লেখা
…………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved