বড় কাগজের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন সন্দীপন, বুঝেছিলেন এই বাণিজ্য-সাহিত্যে দীর্ঘকাল সাপ্লাই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। একজন গদ্যকার হিসেবে এ-অসন্তোষেই তিনি দিন কাটিয়েছেন যে, তাঁর নিজের মনের মতো উপন্যাস লেখার কোনও জায়গা নেই। নিজেকে এক অসুস্থ সমাজের রুগ্ণ বাসিন্দা বলে আবিষ্কার করেও নির্দ্বিধায় নিজের দ্বিতীয় উপন্যাসের নাম রাখলেন, ‘এখন আমার কোনো অসুখ নেই’। সন্দীপন বলেই সম্ভব।
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সেভাবে আমার কোনও যোগাযোগ ছিল না। তাঁকে বরাবর দূর থেকেই দেখেছি। কফিহাউসে পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল যে টেবিলে বসতেন, সেখানেই আমি ৮ (১৯৮৩-’৯১) বছর বসে আড্ডা দিয়েছি। ওই টেবিলে উৎপলকুমার বসু, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, রণজিৎ দাশ– এঁরা নিয়মিত আসতেন। আরও অনেকেই আসতেন। ওই টেবিলেই সন্দীপন মাঝে মাঝে এসে বসতেন। কর্পোরেশনের চাকরি সেরে ‘আজকাল’ পত্রিকার অফিস-ফেরত। ওখানে উনি চিঠিপত্র বিভাগের অতিথি সম্পাদক ছিলেন সম্ভবত। ওই আড্ডাটা ৭টা নাগাদ প্রেসিডেন্সি কলেজের পোর্টিকোতে স্থানান্তরিত হত। চলত প্রায় ৯টা অবধি। সন্দীপনও আসতেন। উনি বরাবরই স্মার্ট কথা বলে আড্ডা জমিয়ে তুলতেন। এরকমই এক সন্ধের আড্ডায় বলেছিলেন, ‘আমি ঈর্ষাকাতর নই, তবে অবশ্যই যৌনকাতর।’

এক সন্ধেয় কফিহাউস থেকে নেমে নিচের দোকান থেকে সিগারেট কিনছেন, নিজের সিগারেটটি নিয়ে পাশের সঙ্গী ছেলেটিকে বললেন, ‘তোমার কী ব্র্যান্ড ভাই?’ ছেলেটি সন্দীপন খাওয়াবে ভেবে বলে বসল, ‘ফিল্টার উইলস।’ উনি দোকানির কাছ থেকে সিগারেট নিয়ে ছেলেটির হাতে দিয়ে বললেন, ‘দামটা দিয়ে দাও ভাই।’
আরেকবার ধর্মতলায় ‘প্রতিক্ষণ’ অফিস-ফেরত সোমক দাস ও আরও কয়েকজন সঙ্গে ওই পাড়াতেই দুপুরবেলা ছোটা ব্রিস্টলে মদ্যপানের জন্য ঢুকছি, হঠাৎ পিছন ফিরে দেখি সন্দীপন, বলা বাহুল্য, উনিও প্রতিক্ষণ-ফেরত। আমাদের মদ্যপানের মাঝে এক ব্যক্তি আমাদের টেবিলে এসে বসলেন, তিনি সন্দীপনের পূর্বপরিচিত, জানা গেল উনি উৎপলকুমার বসুর সম্পর্কে শ্যালক হন, নাম অরুণ, ঠিকাদারির বিরাট ব্যবসা! এসেই তিনি সবার জন্য মদ ও খাবারের অর্ডার দিলেন। উৎপলকুমার বসুর নামে নিন্দা করতে লাগলেন, বললেন যে, কবি হিসেবে ও কিছুই করতে পারেনি। আরও জানালেন যে, এই বারে ওঁর ধারের খাতা আছে। একটু পরে উনি অন্য টেবিলে কারওর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছেন। সেই ফাঁকে সন্দীপন আমাদের জানালেন, ‘ও একটু উৎপলের নামে নিন্দেমন্দ করবে, তোমরা কিছু বোলো না, কারণ আমাদের সবার মদের এবং খাবারের দাম ও দেবে। ওর এখানে খাতা আছে আর আমাদের হাতে শুধুই পেনসিল।’ একটু পরে উনি ফিরে এলেন, আবার আড্ডা চলল মদ ও উৎপল-নিন্দা সহকারে। হঠাৎ সন্দীপন, ‘এই আমাকে যেতে হবে, আজ আমার মেয়ের জন্মদিন’ বলে চলে গেলেন। ব্যাপারটা সত্যি কি মিথ্যা জানি না, ততক্ষণে সবার ৪-৫ পেগ করে হয়ে গিয়েছে। যাই হোক, সে যাত্রায় অরুণবাবুই সব বিল দিয়েছিলেন না কি খাতায় লিখতে বলেছিলেন, তা-ও জানা হয়নি। তবে সন্দীপনের দীর্ঘদিনের বন্ধু, তাঁর পাশের পাড়ার বাসিন্দা অনিরুদ্ধ লাহিড়ী। তাঁর কাছে শুনেছি, সন্দীপন এই ‘মেয়ের জন্মদিন’ ব্যাপারটা মাঝে মাঝেই মদের আড্ডায় মদ শেষ হওয়ার মুখে বা কোনও পানশালায় বিল আসার মাহেন্দ্রক্ষণে বলে উঠে চলে যেতেন।

২.
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ছিলেন আমাদের সময়ের মডার্ন ক্লাসিক, যা ইউরোপিয়ান এনলাইটমেন্টের আলো আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ছিন্নভিন্ন মানবিক মূল্যবোধ– এই দু’য়ে মিলে তৈরি। সন্দীপন হলেন সেই গদ্যকার, যিনি আধুনিক বাংলা গদ্যের শেষ মাইলফলক। উনি লিটল ম্যাগাজিনে লিখে বিখ্যাত হওয়ার পর বিগ ম্যাগাজিনে সুযোগ পেয়ে লিখেছেন (এখন আমার কোনও অসুখ নেই। আনন্দবাজার পত্রিকা)৷ তারপর আবার লিটল ম্যাগাজিনে দীর্ঘদিন লিখেছেন। দ্বিতীয় দফায় আবার বিগ ম্যাগাজিনে (প্রতিক্ষণ বা আজকাল) সুযোগ পেয়ে লিখেছেন। উনি আমাদের এক ধরনের প্রাপ্তমনস্ক বাংলা গদ্যর সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন। চারের দশকের বাংলা গদ্য নিয়ে ওঁর বক্তব্য ছিল এই–
‘চল্লিশের লেখকদের ছলাকলার আশ্রয় নিতে হচ্ছিল, বোকা পাঠকদের সঙ্গে চালাকি করতে হয়েছিল তাঁদেরই, এখনো করতে হয়। কলকারখানার অক্ষরপরিচয়সম্পন্ন শ্রমিক ও মালিক, প্রফেসর, বড়বাবু, প্রণয়প্রার্থী কিশোরী বা নিদ্রাতুরা গৃহিণীর হাতে এঁদের বই বা সিনেমাসাহিত্য পত্রিকাগুলি দেখে আমি তাঁদের মুখের দিকে চেয়ে দেখেছি। বড় অসহায় ও নির্বোধ সেইসব মুখ।’ [শক্তির ‘কুয়োতলা’ ও অন্যান্য কথা]

তবে সন্দীপনের সাহিত্য বড় ইউরোপ-নির্ভর বা বলা যায় আলবেয়ার কামু-নির্ভর। পরবর্তীতে সন্দীপন নিজেকে ‘কামু-কাতর’ বলে স্বীকার করেন। তাঁর চরিত্রদের মধ্যে এক ধরনের নির্লিপ্ততা ও জীবনের অর্থহীনতাকে মেনে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
ওই ঔপনিবেশিক জামা ছাড়া উনি নিজেকে লেখক ভাবতেই পারতেন না। কারণ কামু ছিলেন সেই সময়ের ইউরোপিয়ান আধুনিক গদ্য সাহিত্যের শেষ মাইলফলক। এমনকী, লরেন্স স্টার্নের ‘ট্রিস্ট্র্যাম স্যান্ডি’র মতো উপন্যাসের গদ্যের স্টাইলও বাংলায়, একমাত্র সন্দীপনই সাহস করে কিছুটা ব্যবহার করেছিলেন, ‘সমবেত প্রতিদ্বন্দী ও অন্যান্য’তে।
সন্দীপনের যুক্তি, উপন্যাসের ফর্মটিই এসেছে ইউরোপ থেকে, তাই তিনি সঁপে দিয়েছিলেন নিজেকে ইউরোপীয় সাহিত্যের পায়ে। সন্দীপন ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদের নির্যাসটুকু নিজের মতো করে আত্মস্থ করেছিলেন এবং বাংলা চত্বরের নিজস্ব বাস্তবতায় (যেমন কলকাতার পটভূমি ও মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্বে) তা প্রয়োগ করে এক নতুন ঘরানার জন্ম দিয়েছিলেন।
কিন্তু আমাদের মহাভারত, রামায়ণ বা পুরাণের গল্পগুলো কি উপন্যাস নয়? তখন কোথায় ইউরোপ আর কোথায় তার উপন্যাস!

সন্দীপন হাংরিদের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন (সম্ভবত সুনীলের ভয়ে) আবার একইসঙ্গে মলয়ের আইনি লড়াইকে বাহবা দিয়ে তাঁকে চিঠি লিখে বিপ্লবী চেতনার হাততালি কুড়িয়েছিলেন। পাঁচের দশকের কৃত্তিবাসী লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী গদ্যকার হিসেবে সন্দীপন ছিলেন কনফিউজড রোম্যান্টিক এক আধা বিপ্লবী। যিনি আইনি চৌহদ্দির মধ্যে যাবতীয় বিপ্লব করতে চান। যাতে সাপও মরে, আবার লাঠিও না ভাঙে। নমুনা: কৃষ্ণগোপালের ‘অধুনা’র সঙ্গে উনি যা করেছিলেন। (সন্দীপনের কথা অনুযায়ী ওঁর বই ‘সমবেত…’-র নেগেটিভ পাবলিসিটি করতে চেয়েছিলেন, যা ব্যর্থ হয়) যিনি ওঁর দ্বিতীয় গদ্য সংকলন ‘সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী ও অন্যান্য’ প্রকাশ করেন।
যেসব কবি বিগ ম্যাগের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি, তাঁদের একটা সুবিধে– তাঁরা বিগ ম্যাগেও লিখেছেন আবার লিটল ম্যাগেও লিখেছেন। তাতে তাঁদের লিটল ম্যাগের গ্ল্যামার পেতে অসুবিধে হয়নি। যেমন উৎপলকুমার বসু।
কিন্তু সন্দীপন মুখ খুলেছিলেন। উনি বুঝেছিলেন ওই বাণিজ্য-সাহিত্যে মাল সাপ্লাই করে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু তাহলে ওঁর হাতে রইল পড়ে শুধু লিটল ম্যাগ এবং যারা তাঁর গদ্য ৩-৪ পাতার বেশি ছাপতে পারবে না, অর্থনৈতিক কারণে। যদিও কয়েকটি লিটল ম্যাগ সন্দীপনের বড় গদ্যও ছেপেছে। একজন গদ্যকার এই অসন্তোষ নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন, যে, তাঁর নিজের মনের মতো উপন্যাস লেখার কোনও জায়গা নেই। সেদিক থেকে ‘প্রতিক্ষণ’ বা ‘আজকাল’ ওঁকে জায়গা দিয়েছিল– এটা বেশ বড় ব্যাপার। যদিও ওখানে বছরের পর বছর উনি যা লিখেছেন, কয়েকটি বাদে তা আমার খুব একটা পাঠযোগ্য মনে হয়নি। তবু সন্দীপন জায়গা তো পেয়েছিলেন।

৩.
১৯৬৯ সালে প্রকাশিত সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ‘সমবেত প্রতিদ্বন্দী ও অন্যান্য’কে আমি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শেষ মাইলফলক বলে মনে করি, যদিও সেই বইয়ের ব্যাক কভারে সুনীলের সার্টিফিকেট ছিল, আমার যেটা খুব হাস্যকর মনে হয়েছে। কলেজে পড়ার সময় বইটি এতবার পড়েছি যে, তার অনেকটাই তখন আমার মুখস্থ ছিল। ওঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ক্রীতদাস ক্রীতদাসী’ (১৯৬১) অনেক পরে পড়েছি। তার আগে ‘একক প্রদর্শনী’ (১৯৭১) ও ‘এখন আমার কোনো অসুখ নেই’ (১৯৭৭) এই দু’টি উপন্যাস পড়ে মুগ্ধ হয়েছি।
লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের গল্প বা উপন্যাসের প্রটাগনিস্টরা মোটামুটি সবাই একই রকম– আত্মসর্বস্ব, ভীরু মধ্যবিত্ত, মেল-ইগোইস্ট, বিদ্রোহী, ভাবুক। আমার ধারণা যে, সন্দীপন নিজেও খানিকটা তাই ছিলেন।
‘একক প্রদর্শনী’ (১৯৭১) বলতে মনে পড়ল, ‘একক প্রদর্শনী’র ভূমিকার মতো একটি লাইনে, “আপনাদের যাঁদের গল্পটা ভালো লাগল তাঁরা অনুগ্রহ ক’রে আমাকেও ভালবাসুন, কেননা, আমি ও আমার গল্প একই। নমস্কার।” এই বাক্যটি লেখা ছিল। শঙ্খ ঘোষ একটি লেখায় জানিয়েছেন, ওই বই তাঁকে উপহার দেওয়ার সময় (১৮.৬.৭১) সন্দীপন, ‘আমি ও আমার গল্প একই’ বাক্যাংশে তাঁর স্পষ্ট ও খরতাময় অক্ষরের হাতের লেখায় ‘একই’ শব্দের আগে লিখেছিলেন ‘কতকটা’। এইসব আর্বান স্মার্টনেস একমাত্র সন্দীপনেরই ছিল, পঞ্চাশের কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর কবি-লেখককুলের মধ্যে।

সন্দীপনের কথা এলেই, অনিরুদ্ধ লাহিড়ীর (চাঁদ) কথা না-এসে পারে না। না, তিনি বিখ্যাত কেউ না হলেও বুদ্ধিজীবী মহলে ‘বিদগ্ধ পড়ুয়া’ বলে তাঁর খ্যাতি ছিল। আর ছিল তাঁর বাড়ি জুড়ে শ’য়ে শ’য়ে বই। শুধু বইয়ের র্যাক বা আলমারি নয়, বাড়ির আনাচ-কানাচে সর্বত্র বই ছড়িয়ে, বেশিরভাগ ইংরেজি, বাকিটা বাংলা, বলা বাহুল্য মদ নয়, সাহিত্য।
এহেন অনিরুদ্ধ লাহিড়ীর (সম্প্রতি প্রয়াত) সঙ্গে আমার সামান্য আলাপ ছিল। ওঁর বাড়িতে অনেকবার গিয়েছি, তার মধ্যে বেশ কয়েকবার আসব সহযোগে। এরকমই এক আড্ডায়, উনি বলেছিলেন, ‘একবার সন্দীপনদা সান্ধ্য আড্ডায় এসে বললেন যে, চাঁদ, পুজোসংখ্যার উপন্যাসের বরাত এসেছে। কী লিখব বুঝতে পারছি না। একটা কিছু ইংরেজি বই-টই দাও, সেটা পড়ে যদি কিছু লিখতে পারি।’ তো উনি একটি গতরজব্দ পেপারব্যাক উপন্যাস দেন, সন্দীপনকে (নাম বলেছিলেন, ভুলে গিয়েছি)। সপ্তাহখানেক পর এক সান্ধ্য আসবআড্ডায় সন্দীপন বইটা ফেরত দিতে এলে, বিস্মিত অনিরুদ্ধ বলেন, যে, এর মধ্যে পড়ে ফেললেন! সহাস্য সন্দীপনের উত্তর, ‘আরে, না, না, ব্লার্ব পড়েই কাজ মিটে গেল, বুঝলে চাঁদ, আসলে কাজ হওয়া নিয়ে কথা।’

“আমি প্রায় সবকিছুকেই মিথ্যে ও ভুল বলে ধরে নিয়েছি। সবচেয়ে বড় ভুল ও বেশী সন্দেহজনক মনে করেছি আমার আন্তরিকতাকে। কোনো ভোর ভালো লাগলে, কোথাও বা গড়ের পিছনে সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ হলে কোনোদিন, কাঁধে হাত রেখেছি নিজের, ‘সত্যি তো, নাকি বই পড়ে শিখেছ?’ জানতে চেয়েছি, ‘বা, এইরকম প্রচলিত বলে ভালো লাগছে।”
উপরিউক্ত কথাগুলি উনি ওঁর কোনও একটি বইয়ের ব্লার্বে লিখেছিলেন। এই হল সন্দীপন। নিজের হিপোক্রেসিকে নিজেই সেলিব্রেট করেছেন। বাংলা ভাষায় খুব কম সাহিত্যিক এই জিনিস পেরেছেন। উনি নিজের ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘লেখক কোন অভিজ্ঞতার ভিতরে থেকে লিখতে পারে না। সে বেরিয়ে আসে অভিজ্ঞতা থেকে বা অভিজ্ঞতাই তাকে অভিজ্ঞতার বাইরে ঠেলে দেয়।’ তাই তিনি তাঁর অভিজ্ঞতাকে নির্মোহভাবে লিখতে পেরেছিলেন। তাঁর ডায়েরি পড়ে মনে হয়েছে এও তাঁর একধরনের গদ্য, যা তাঁর গল্প-উপন্যাসের ভেতর ছড়িয়ে আছে। উনি নিজেই সেই ডায়েরিতে উল্লেখ করেছেন, এগুলো তাঁর গল্প-উপন্যাসের আঁতুড়। এভাবেই তিনি জীবনের বাস্তব আর সাহিত্যের আখ্যানকে মিলিয়েছেন।

৪.
তাঁর লিখনশৈলীর বড় একটি ‘ট্রেডমার্ক’ ছিল যতিচিহ্নের চমকপ্রদ ব্যবহার। তিনি বাক্যের চিরাচরিত গঠন ভেঙে কমা, সেমিকোলন, বা ফুলস্টপের এমন বিন্যাস করতেন যা পাঠককে অভ্যস্ত গতিতে পড়তে দিত না– বরং প্রতিটি লাইনে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করত। তাঁর লেখার মধ্যে এক ধরনের শুকনো রসিকতা বা অন্তর্নিহিত কৌতুকবোধ ও তীব্র আইরনি থাকত, যা দিয়ে তিনি নির্মম বাস্তবকে উপহাস করতেন। মনে পড়ছে ‘সমবেত প্রতিদ্বন্দী ও অন্যান্য’ বইটির প্রথম পাতায় লেখা ছিল:
‘বাংলা কবিতা ও ছোট গল্প নাকি কাছাকাছি চলে আসছে! আমি স্টেটসম্যান পড়া ছেড়ে দিয়েছি।’
যেমন ছোটগল্পকে গদ্যকবিতা করে তোলার এক আন্তরিক প্রয়াস তাঁর ছিল, তেমন কবিতায় গল্প বলার ধরনটিকে সাবোটাজ করার এক উগ্র বাসনা তিনি পোষণ করতেন।

‘বড় হবার পর প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে পরের দেওয়া নাম গ্রহন অথবা বর্জন করে নিজে নাম রাখার। এ তার মৌলিক অধিকার।’ একথা তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন। কারণ তিনি নিজের পিতৃদত্ত নাম ‘পশুপতি’ চট্টোপাধ্যায় পালটে ‘সন্দীপন’ রেখেছিলেন। ইউরোপীয় মননের উপন্যাসিক নিজের দিশি হিন্দু সাবঅলটার্ন দেবতার নামটি বরদাস্ত করতে পারেননি। নামটি যে তাঁর কাছে ‘এম্ব্যারাসিং’, সেটা উনি ডায়েরিতে স্বীকার করেছেন। আমাদের ঔপনিবেশিক শিক্ষা তাঁকে শিখিয়েছে, ইংল্যান্ডের ছুতোর কবি উইলিয়াম ব্লেকের কবিতা পড়া তাঁর কাছে গর্বের বিষয়, কিন্তু উনিশ শতকের বাংলার কবিয়াল গোঁজলা গুঁই বা কেষ্টা চামারের কবিতা পড়ার কথা তিনি ভাবতে পারেন না, বিষয়টিকে অশিক্ষিতের ব্যাপার বলেই মনে করেন। এই হলেন সন্দীপন, নিজেকে একটি অসুস্থ সমাজের রুগণ বাসিন্দা বলে আবিষ্কার করে যিনি নির্দ্বিধায় নিজের দ্বিতীয় উপন্যাসের নাম রাখতে পারেন, ‘এখন আমার কোনো অসুখ নেই’।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved