হারিয়ে যাওয়া সময়ের ধুলোমাখা স্মৃতিকে মাকড়সার জাল থেকে মুক্ত করার কাজ করেছেন লেখক। রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগরের মতো পরিচিত মুখের পাশাপাশি তিনি আমাদের সামনে হাজির করেছেন সেই সব হারিয়ে যাওয়া মানুষদেরও, যাঁদের স্মৃতিচারণায় চোখের সামনে ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া বই, তারই সঙ্গে ঝিলিক দিয়ে ওঠে হারানো সময়ও। মূলত বাংলা শিশুসাহিত্যের কথাই তিনি লিখেছেন। আলোচ্য বইগুলিও সেই সংক্রান্ত। পরতে পরতে হারানো সময় এমনভাবে এসে হাজির হয়েছে যে, লেখাগুলি হয়ে উঠেছে পুরনো সময়ের সাহিত্য ও মননচর্চার এক সরণির মানচিত্র।
একটা প্রশ্ন শুরুতেই ঝালিয়ে নেওয়া যাক। কোনও বই পড়ার সময় তার সবচেয়ে অবহেলিত অংশ কি ‘ভূমিকা’ নয়? পাঠক ‘ব্লার্ব’ পড়ে একটা ধরতাই পেতে। এমনকী আড়চোখে ‘লেখক পরিচিতি’তেও চোখ বুলয়। কিন্তু ভূমিকা পড়ে সময় নষ্ট করতে সাধারণ পাঠকের যেন বয়েই গিয়েছে! অবশ্য ব্যতিক্রম রয়েছেই। কোনও বিশেষ বই তার নিজের গুরুত্বের জায়গা থেকেই ভূমিকাকে আলাদা করে ভাসিয়ে তোলে। আবার বহু মনস্বী পাঠক হয়তো ভূমিকাকেও সমান গুরুত্ব দেন। এতে বুঝি বইটির সর্বাঙ্গীণ চরিত্র বুঝতে সুবিধা হয়। কিন্তু গড়পড়তা পাঠক, বোধহয় ভূমিকা নিয়ে ততটা ভাবেন না। পড়েন হয়তো, তবে অন্যমনস্ক হয়ে।
এতটা কথা বলতেই হল একটি বইয়ের পাতা ওলটাতে ওলটাতে। কেননা এই বইয়ে কেবলই ভূমিকা, আর কিছু নেই! হেঁয়ালি সরিয়ে খুলে বলা যেতে পারে, এ আসলে একটা ভূমিকাসমগ্র! লেখক পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করানোর কিছু নেই। অসংখ্য বই লেখার পাশাপাশি সম্পাদনাও তিনি করেছেন বহু বইয়েরই। সেই সমস্ত বইয়ে যে ভূমিকা তিনি লিখেছেন, সেগুলি একত্রিত করেই এই বই– ‘শিশুসাহিত্যের ভূমিকা’। এমন বই কি এর আগে প্রকাশিত হয়েছে? নিজের অক্ষমতা স্বীকার করে নেওয়া ভালো, আমাদের অন্তত জানা নেই।

কিন্তু কেন স্রেফ ভূমিকাগুলিকে দুই মলাটে ধরে রেখে একটি বইয়ের পরিকল্পনা? সূচিতে চোখ বোলালেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়। বিদ্যাসাগর থেকে উপেন্দ্রকিশোর, অবনীন্দ্রনাথ থেকে ‘সখা’ পত্রিকার সম্পাদক অধুনাবিস্মৃত প্রমদাচরণ সেন– এমনই নানা মানুষের ছবি আঁকা আছে এই সব ভূমিকায়। ঠাকুরবাড়ির আশ্চর্য গল্প থেকে নানা শিশুদের পত্রিকার ইতিহাস– এই বইয়ের পাতায় পাতায়। অর্থাৎ, লেখাগুলিকে স্রেফ ভূমিকা হিসেবে না দেখে প্রবন্ধ হিসেবে ভেবে নেওয়াই ভালো। হয়তো তা লেখা হয়েছে নির্দিষ্ট কোনও গ্রন্থের ধরতাই হিসেবে, কিন্তু আদতে তা হয়ে উঠেছে একেকটি বিশেষ প্রবন্ধ।
ধরা যেতেই পারে, বইয়ের একেবারে প্রথম লেখাটির কথা। ‘কেন ভুলে যাব প্রমদাচরণকে’। বাংলায় ছোটদের পত্রিকার কথা বলতে বসলেই আমরা ‘সন্দেশ’ থেকে শুরু করি। বড়জোর ফুটনোটের মতো উল্লেখ করি ‘সখা’ কিংবা ‘মুকুল’-এর কথা। কিন্তু বাস্তবটা হল, এই বাংলার ছেলেমেয়েদের কথা ভেবে প্রমদাচরণ সেন ‘সখা’ পত্রিকা শুরু না করলে কি আমরা ‘সন্দেশ’ পেতাম? লেখক লিখছেন– “ ‘সখা’-র দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে প্রায় নিয়মিত লিখতেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। তখন অবশ্য তিনি ‘রায়চৌধুরী’ লিখতেন না, লিখতেন শুধুই ‘রায়’। উপেন্দ্রকিশোর প্রমদাচরণেরই আবিষ্কার।… পরবর্তীকালে ‘সন্দেশ’ সম্পাদনায় তাঁর সাফল্যের আড়ালে প্রমদাচরণের সান্নিধ্য ও ‘সখা’ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা এক বড়ো ভূমিকা নিয়েছিল।”

প্রমদাচরণ নিজে ভরপেট না খেয়েও অর্থ জমিয়ে এই পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। যার জেরে শরীর ভেঙে মাত্র ২৭ বছরেই তাঁর মৃত্যু হয়। এমন আশ্চর্য মানুষকে শেষ সময়ে সেবা করেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর ও তাঁর বন্ধুরা। শিবনাথ শাস্ত্রী কেবল তাঁর শিক্ষকই ছিলেন না। ছিলেন প্রকৃত প্রস্তাবেই পিতৃসম এক আশ্রয়। এইসব গুণীজনরা যাঁকে এমন ভালোবেসেছিলেন, তাঁকে আমরা ভুলেই গিয়েছি! এমন মানুষকে নতুন করে চেনালেন পার্থজিৎ। ‘শিশুসাহিত্যে নিবেদিত প্রমদাচরণ’ গ্রন্থের এই ভূমিকাটি আসলে এক অসামান্য প্রবন্ধ। হারিয়ে যাওয়া সময়ের ধুলোমাখা স্মৃতিকে মাকড়সার জাল থেকে মুক্ত করার কাজ করেছেন তিনি।

রায় পরিবারের কিংবদন্তির আড়ালে কোথাও হারিয়ে গিয়েছেন সুবিনয় রায়ও। সেই মানুষটিকেও নতুন করে আলো ফেলে চিনিয়েছেন লেখক– “রাশি রাশি লেখেননি তিনি, যা লিখেছেন, যেটুকু লিখেছেন, তা কখনোই হারানোর মতো নয়। সুবিনয়ের ডাকনাম ছিল ‘মণি’। মণিমুক্তোর মতোই উজ্জ্বল তাঁর রচনাসমূহ। এত বছর পরও তেমনই উজ্জ্বল, একটুও ফিকে হয়নি।”
একইভাবে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি আলোকিত নাম, যেমন উপেন্দ্রকিশোর সম্পর্কেও তিনি চমৎকার সব কথা লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ ও উপেন্দ্রকিশোরের বন্ধুত্বের কথা কমবেশি আমরা জানি। তবু তিনি যখন বিস্তারে লেখেন– “উপেন্দ্রকিশোরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গভীর সখ্য ছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘নদী’ বইয়ের ছবি এঁকে দিয়েছিলেন তিনি। নিজের সন্তান-সন্ততিদের নামকরণের সময়ও রবীন্দ্র-উপন্যাসের সাহায্য নিয়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। সুখলতার ডাকনাম ‘হাসি’ ও সুকুমারের ডাকনাম ‘তাতা’ যে রবীন্দ্রনাথের ‘রাজর্ষি’ থেকে গৃহীত, তা আমাদের অজানা নয়। মুদ্রণ-বিদ্যায় উপেন্দ্রকিশোরের সাফল্য, সাগরপারের স্বীকৃতি-সংবাদে রবীন্দ্রনাথ শুধু নিজে অভিনন্দিত করেননি, সে-সংবাদ বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছেও জ্ঞাপন করেছিলেন। তখন রবীন্দ্রনাথ ‘ভারতী’-র সম্পাদক, ছাপা হয়েছিল উপেন্দ্রকিশোরের সাফল্য-সংবাদ। উপেন্দ্রকিশোরকে সাফল্যের জন্য সমকালের আর কেউ এভাবে প্রকাশ্যে অভিনন্দিত করেননি।”… তখন পাঠক হিসেবে কি ঋদ্ধ হই না আমরা?

আবার আরেক লেখায় পাচ্ছি, মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে দাদু অবন ঠাকুরের কথাবার্তা– “‘মোহনলালেরও লেখক হওয়ার ইচ্ছে জাগে। সে ইচ্ছের কথা একদিন জানালেন অবনীন্দ্রনাথকে। কীভাবে গল্প লেখা যায়, প্লটই বা পাবেন কোথায়… দাদামশায় সঙ্গে সঙ্গে পথ বাতলে দিলেন। বললেন, ‘এর জন্য ভাবছিস? কেন স্বপ্ন দেখিস না? স্বপ্নগুলো লিখে ফেল, দেখবি গল্প আপনি এসে যাবে।’” এরপর কেবল মোহনলাল নয়, বাড়ির সব ছোটরাই লিখে ফেলল স্বপ্নের কথা। যা থেকে তৈরি হল ‘স্বপ্নের মোড়ক’ নামের এক আশ্চর্য খাতা। আর সেই স্বপ্ন লিখতে লিখতে মোহনলালও হয়ে উঠলেন লেখক। শত ব্যস্ততাতেও তিনি লিখে গিয়েছেন। ‘দক্ষিণের বারান্দা’র মতো স্মৃতিকথা ছাড়াও ছোটদের বহু লেখা তিনি লিখেছেন। একেবারে আজকের ছোটরা তাঁকে কতটা চেনে জানি না, দু’-একটা প্রজন্ম আগেও কিন্তু তাঁর লেখা পঠিত হয়েছে। সেই মানুষটির জীবনকে আমরা ছুঁয়ে যেতে পারি এই বই পড়তে পড়তে।

এভাবেই কত জীবনের কথাই যে বলেছেন লেখক! আগেই বলেছি রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগররা তো আছেনই। সেই সঙ্গেই তিনি আমাদের সামনে এনে হাজির করেছেন এই সব হারিয়ে যাওয়া মানুষদেরও। আবার ‘বাংলা ভাষার প্রথম বার্ষিকী’র মতো লেখা পড়তে পড়তে যেমন চোখের সামনে ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া বই, তারই সঙ্গে ঝিলিক দিয়ে ওঠে হারানো সময়ও। মূলত বাংলা শিশুসাহিত্যের কথাই তিনি লিখেছেন। কারণ বইগুলি সেই সংক্রান্তই। তবু পরতে পরতে হারানো সময় যেভাবে এসে হাজির হয়, তাতে লেখাগুলি সেই সীমারেখা অতিক্রম করে সামগ্রিকভাবে পুরনো সময়ের সাহিত্য ও মননচর্চার এক সরণির মানচিত্র হয়ে উঠতে থাকে।
কাজেই, আর যাই হোক, একে স্রেফ ভূমিকার গণ্ডিতে যে আটকানো যায় না, তা আগেই বলা হয়েছে। বরং এটা এক চমৎকার সুখপাঠ্য প্রবন্ধ সংকলনই। কোন কোন বইয়ের ভূমিকা কোন কোন রচনা, তার হালহদিশ বইয়ে অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে (অবশ্য এই সুবাদে বেশ কিছু সুন্দর বইয়ের খবরও মেলে) লেখাগুলি পড়ে গেলেও চলবে। পাঠকের পরিতৃপ্তি তাতেই পূর্ণতা পাবে।
‘এবং অধ্যায়’ এই বইয়ের প্রকাশক। সুন্দর প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিবশংকর ভট্টাচার্য। ভালো কাগজে ঝকঝকে ছাপা এই বই হাতে নিলেই কিনতে, পড়তে ইচ্ছে হবে। তবু… পাঠক হিসেবে খুঁতখুঁতে যাঁরা, তাঁদের হয়তো মনে হতে পারে ছোটদের লেখালেখি নিয়ে এমন একটা বইয়ে কোনও ছবি নেই কেন? কোনও গুণীজন কিংবা পুরনো বই-পত্রিকার প্রচ্ছদ বইটিকে আরও আকর্ষণীয় যে করত, তা বলাই যায়।
শিশুসাহিত্যের ভূমিকা
পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়
এবং অধ্যায়
৪৫০ টাকা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved