Robbar

ফেরার বইয়ের ফেরার গল্প

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 18, 2026 9:03 pm
  • Updated:July 18, 2026 9:23 pm  

ত্বকের যত্ন অনেক হল, এবার তাকের যত্ন নিন। তাক, আমাদের বইয়ের তাক, হাঁটকালেই টের পাওয়া যায়, কিছু-না-কিছু উধাও। কখন কোন মহূর্তে, কোন অবেলায় অবসরে যে বই ধার দেওয়া গিয়েছিল, তা আর ফেরত পাওয়া যায়নি। নবারুণ ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, কিছু কিছু বইয়ের ভবিষ্যৎই হাতফেরতা হয়ে থাকে। কেবল ব্যক্তিগত বইয়ের সংগ্রহ যে উবে যায়, তা নয়, বহু লাইব্রেরির বইয়ের একই হাল। কিন্তু সেসব না। আজ উলটপুরাণ। বই ধার নয়। বই ফেরত দেওয়ার বিশ্বজোড়া আশ্চর্য গপ্প!

রবীনা মিত্র

একটি ছোট শহরের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিরাট, প্রাচীন ‘কার্নেগি লাইব্রেরি’ আধুনিক নাগরিকরা এই গ্রন্থাগার আর ব্যবহার করেন না বহুদিন। সাতজন প্রবীণ মহিলা-গ্রন্থাগারিক এই পাঠাগারের দেখাশোনার ভার স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেন এবং এই প্রাচীন বইঘরই হয়ে ওঠে তাঁদের স্থায়ী আস্তানা। একদিন, হঠাৎ তাঁরা দেখেন, গ্রন্থাগারের দরজায় একটি ঝুড়িতে গুটিসুটি শুয়ে রয়েছে এক শিশুকন্যা। পাশে রাখা একটি চিরকুটে লেখা রয়েছে, এই শিশুকন্যা পিতৃ-মাতৃহীন কোনও অনাথ শিশু নয়। বহু বছর পূর্বে এই পাঠাগার থেকে ধার নেওয়া একটি রূপকথার বই সময়মতো ফেরত দিতে না-পারার জন্য এই শিশুকন্যাকে জরিমানাস্বরূপ গ্রন্থাগারকে দেওয়া হল!

“This is overdue. Quite a bit, I’m afraid. I apologize. We moved to Topeka when I was very small, and Mother accidentally packed it up with the linens. I have traveled a long way to return it, and I know the fine must be large, but I have no money. As it is a book of fairy tales, I thought payment of a first-born child would be acceptable. I always loved the library. I’m sure she’ll be happy there.”

এই শিশুর অভিভাবক, এমনকী, একথাও বিশ্বাস করেন যে, যেহেতু এই গ্রন্থাগার তাঁর মনে এক বিশেষ জায়গা দখল করে রয়েছে, তাই এই শিশুকন্যা এখানে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গেই বেড়ে উঠবে বইপত্রের সান্নিধ্যে। 

চমক লাগল? একটি রূপকথার বইয়ের পরিবর্তে একটি সদ্যোজাত শিশু? একটি জড়বস্তুর পরিবর্তে একটি নব-প্রস্ফুটিত প্রাণ? একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না কি? মার্কিন কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসি-কাহিনিকার এলেন ক্লেগেস (Ellen Klages) তাঁর ‘পোর্টেবল চাইল্ডহুড’ গল্পসংগ্রহে সংকলিত ‘ইন দ্যা হাউজ অফ সেভেন লাইব্রেরিয়ানস’ ছোটগল্পে আসলে যা দেখাতে চেয়েছেন, তাকে আমরা বিশ্লেষণ করতে পারি মার্কিন দার্শনিক গ্রাহাম হারমান (Graham Harman) প্রবর্তিত ‘অবজেক্ট-ওরিয়েন্টেড-অন্টোলজি’ (O-O-O)-র সাহায্যে। তাঁর মতে পৃথিবীতে সমস্ত কিছুই ‘অবজেক্ট’ বা বস্তু-মাত্র। অর্থাৎ একটি পাথর, টেবিল, বই যেমন এক একটি বস্তু ঠিক তেমনই মানুষও ‘বস্তু’ ছাড়া কিছু নয়  সেই সূত্র ধরে বলা যায়, একটি বইয়ের যা অস্তিত্বমূল্য একটি মানুষেরও তাই হবে না কেন? তাহলে একটি ফেরত না-দিতে-পারা বইয়ের বদলে এক সদ্যোজাত শিশুকে গ্রন্থাগারে ফেরত দেওয়া কি আর প্রবলভাবে অসঙ্গত মনে হচ্ছে?

হ্যাঁ, হচ্ছে। কারণ এই সব তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তব জীবনের খুব একটা সম্পর্ক নেই। একটি বইয়ের বদলে বাস্তবে কোনও অভিভাবক তাঁর সন্তানকে গ্রন্থাগারে দিয়ে আসবেন না। কিন্তু যদি সেই অভিভাবকের কাছে ওই বই হয়ে থাকে এমনই এক শিশুকন্যার মতোই মূল্যবান? যদি তাঁর এমন মনে হয়ে থাকে এই শিশু বইয়ের সান্নিধ্যে বেড়ে উঠলে সে হয়ে উঠবে একজন প্রকৃত মানুষ, যে বইয়ের যত্ন নেবে, বই পড়বে এবং ওই পাঠাগারে বসবাসকারী সাতজন প্রবীণ গ্রন্থাগারিক পাবেন তাঁদের যোগ্য উত্তরসূরি। এই শিশু তাঁর সাতজন দীক্ষাগুরুর মতো যত্ন করবে এই ভুলে-যাওয়া বইঘর এবং তার গ্রন্থ-আবাসিকদের? তাহলে আর ব্যাপারটি অতখানি অসংগত মনে হয় না এই প্রসঙ্গেই মনে পড়তে পারে শিশুসাহিত্যিক, কার্টুনিস্ট এবং সুরকার শেল সিলভারস্টিন-এর ‘আ লাইট ইন দি অ্যাটিক’ কাব্যগ্রন্থের কথা। এই বইয়ের একটি কবিতা, ‘ওভারডডিউস’-এ রয়েছে এক ব্যক্তির কথা, যে নিজের চিলেকোঠার ঘরে খুঁজে পায় ৪২ বছর আগে লাইব্রেরি থেকে আনা একটি বই। এই বইটি নিজের বইয়ের তাকে খুঁজে পাওয়ার পর থেকেই সে আতঙ্কিত হয়! এক গভীর অপরাধবোধ তাকে ঘিরে ধরে। নিজেই নিজেকে সে প্রশ্ন করতে থাকে যে, দীর্ঘ চার দশক পর কি বইটি গ্রন্থাগারে আবার ফেরত দেওয়া উচিত, না কি বইটিকে আবার লুকিয়ে রাখাই ন্যায্য? এই কবিতার সঙ্গে রয়েছে সিলভারস্টিন-এর হাতে আঁকা একটি স্কেচ– যেখানে একজন আতঙ্কিত টাক-মাথা বৃদ্ধ একটি বইকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছে। এই প্রতিকৃতি দেখে সহজেই আন্দাজ করা যায় যে, লাইব্রেরির বই সময়মতো ফেরত না-দেওয়ার জন্য যেসব শাস্তি দেওয়া হত, সেই বাল্যস্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে এই বৃদ্ধ মানুষটির। খুবই সম্ভব যে, এই ৪২ বছর ধরে এই শাস্তির ভয়েই তিনি বইটি ফেরত দিতে পারেননি। 

সংগ্রহের বই ধার দেওয়ার ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত। কোনও বই সংগ্রাহক মনে করেন বই অন্য কোনও উৎসাহী পাঠককে পড়তে দিলে অধিকাংশ সময়ই সেই বইয়ের আর হদিশ পাওয়া যায় না, কারণ কেউ বই ফেরত দেন না ফরাসি নোবেলজয়ী কবি আনাতোল ফ্রাঁস (Anatole France) কৌতুক করেছেন–

‘Never lend books, for no one ever returns them; the only books I have in my library are books that other folks have lent me.’

এই কথার মাধ্যমে তিনি নিজেকেও বিদ্রুপের তীরে বিদ্ধ করতে ছাড়েননি। চার্লস ল্যাম্ব (Charles Lam) বই ধার যাঁরা নেন তাঁদেরকে এই বলে তীব্র তিরস্কার করেছেন যে, তাঁরা বইয়ের তাকের সজ্জা নষ্ট করে দেন, এবং ধারাবাহিকভাবে সাজানো ভলিউমগুলির সংগ্রহে শূন্যতা এবং অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করেন। অন্যদিকে আবার এই বই ধার দেওয়া নিয়ে একেবারে বিপরীত মতপ্রকাশ করে থাকেন অনেকেই। তাঁদের মনে হয় প্রিয় বই অন্য পাঠককে পড়তে দেওয়ার মধ্যে রয়েছে সম্পর্কের সেতুবন্ধনের এক সূত্র। বই নিজে যেমন বন্ধু তেমনই বই প্রকৃত বন্ধু তৈরিও করে। হেনরি মিলার (Henry Miller) যেমন মনে করতেন–

‘A book is not only a friend, it makes friends for you. When you have possessed a book with mind and spirit, you are enriched. But when you pass it on you are enriched threefold.’ 

সারায়েভো হাগাদা। ইহুদি বই। জন্ম: ১৩৫০ সাল

পুরনো বই যে এক আশ্চর্য ঐশ্বর্য– একথা অনস্বীকার্য! কোনও কোনও বইয়ের জীবন হতে পারে একজন মানুষের জীবনের থেকেও বেশি রহস্যময় ও রোমাঞ্চকর!  যেমন ‘সারায়েভো হাগাদা’– এই ইহুদি বইটির আত্মকথা, ভূপর্যটক মার্কোপোলোর জীবনকাহিনির তুলনায় কিছুমাত্র কম রোমাঞ্চকর বলে মনে হবে না। বইটির জন্ম ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে বার্সেলোনা এলাকায়। ১৪৯২ সালে যখন স্পেইন থেকে ইহুদিদের বিতাড়িত করা হচ্ছিল তখন এটিকে চুপিসারে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে আবার বইটিকে দেখা যায়। ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে বইটি বিক্রি করে দেওয়া হয় সারায়েভো জাতীয় সগ্রহশালায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বইটি অলৌকিক উপায়ে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। একজন নাৎসি জেনারেল বইটিকে বাজেয়াপ্ত করার জন্য জাদুঘরে হাজির হলে ওখানকার প্রধান গ্রন্থাগারিক দেরভিস কোরকুত নামের একজন মুসলিম উলেমা, ওই জেনারেলকে বলেন যে, কিছুক্ষণ আগেই অন্য একজন জার্মান অফিসারকে তিনি বইটি দিয়ে দিয়েছেন। এরপর সঙ্গে সঙ্গে কোরকুত বইটিকে শহরের বাইরে পাচার করে দেন এবং একটি প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামের একটি ক্ষুদ্র মসজিদে আশ্রয় পায় এই মহামূল্যবান ইহুদি টেক্সট। এমনকী নয়ের দশকেও সারায়েভো অবরোধের সময় বইটিকে উদ্ধার করা হয় জাদুঘরের জলমগ্ন বেসমেন্টের ঘর থেকে। 

অমূল্য বই হারিয়ে যাওয়া এবং ফেরত পাওয়ার আরেকটি মজার গল্প বলা যাক। চার্লস ডারউইনের দু’টি চামড়া দিয়ে বাঁধানো নোটবুক ২০০০ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের একটি বিশেষ ভল্ট থেকে বের করা হয় জেরক্স করার জন্য। এই দু’টি নোটবইয়ের মধ্যে ছিল ডারউইনের বিখ্যাত ‘নোটবুক বি’।

ট্রি অফ লাইফ। চার্লস ডারউইনের নোটবুক থেকে

যেটির মধ্যে প্রথমবার তিনি ‘ট্রি অফ লাইফ’ এঁকেছিলেন। সেই সময় নোটবুক দু’টি হারিয়ে যায়। ধরে নেওয়া হয় যে নোটবুকগুলি কেউ চুরি করে কালোবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। এরপর ২০২২ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাকারিকের অফিসের সামনের একটি খোলা জায়গায় একজন লাইব্রেরিয়ান দেখতে পান একটি উজ্জ্বল গোলাপি রঙের গিফট ব্যাগ। ব্যাগটি খুলতেই তার মধ্যে একেবারে অক্ষত অবস্থায়, বাদামি খামে মোড়ানো ডারউইনের হারিয়ে যাওয়া নোটবুক দু’টি পাওয়া যায়। ওই ব্যাগটিতে পাওয়া যায় একটি চিরকুটও, যার উপর ছাপার অক্ষরে লেখা ছিল: ‘Librarian, Happy Easter X!’ 

গ্রন্থাগার থেকে বই ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে সব পাঠকের মনেই বই ফেরত দেওয়ার সময়সীমা নিয়ে একরকম উদ্বেগ থাকে। সব গ্রন্থাগারের তরফ থেকেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বই ফেরত না-দিলে জরিমানা নেওয়া হয়। কিন্তু এরকম অনেক ঘটনা দেখা গিয়েছে যেখানে কোনও গ্রন্থাগার থেকে ধার নেওয়া বই ফেরত দেওয়া হয়েছে কয়েক দশক এমনকী, কয়েক শতাব্দী পরে। কোনও ক্ষেত্রে যিনি বই ধার নিয়েছিলেন তাঁর প্রয়াণ হওয়ায় সেই বই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে পারিবারিক জিনিসপত্র বা বইয়ের সংগ্রহে। বহু গ্রন্থাগার অবশ্য এই শতাব্দী-প্রাচীন বইগুলি ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সামান্য কিছু জরিমানা ধার্য করে অথবা জরিমানা একেবারেই মাফ করে দেয়– যাতে আরও বেশি মানুষ মোটা অঙ্ক জরিমানা দিতে হবে এই ভয়ে কয়েক দশক বা কয়েক শতক পুরনো বই ফেরত দেওয়া থেকে পিছপা না হন। দীর্ঘ সময় পর গ্রন্থাগারে বই ফেরত দেওয়ার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা না-বললেই নয়! 

সবচেয়ে দীর্ঘ সময় পর লাইব্রেরির বই ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড’-এ নথিভুক্ত হয়েছে কর্নেল রবার্ট ওয়ালপোলের নাম। তিনি ছিলেন প্রথম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পিতা এবং ১৬৬৭ সালে তিনি সিডনি সাসেক্স কলেজের গ্রন্থাগার থেকে ধার নিয়েছিলেন জার্মানির ব্রেমেনের আর্চবিশপের একটি জীবনী। এই জীবনীটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে। বইটি ওয়ালপোলের ব্যক্তিগত সংগ্রহে দীর্ঘদিন থাকার পর প্রোফেসর জন এইচ প্লাম্ব নরফোকের হাউটন হলে সেটি পুনরাবিষ্কার করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি বইটি কেমব্রিজে ফিরিয়ে দেন। এরকমই আরেকটি ঘটনা ঘটে ব্রিটেনের হেয়ারফোর্ড ক্যাথিড্রাল স্কুলের গ্রন্থাগারে আর্থার বয়কট নামের এক তরুণ এই গ্রন্থাগার থেকে ১৮৮৬ থেকে ১৮৯৪ সালের মধ্যে ‘দ্যা মাইক্রোস্কোপ অ্যান্ড ইটস রিভিলেশনস’ বইটি ধার নিয়েছিলেন পরবর্তীকালে আর্থার বয়কট একজন বিশিষ্ট প্রকৃতিবিদ এবং প্যাথোলজিস্ট হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন কিন্তু গ্রন্থাগার থেকে ধার নেওয়া বইটি তিনি ফেরত দেননিআর্থার বয়কটের নাতনি অ্যালিস জিলেট ২০১৬ সালে বয়কটের জিনিসপত্রের মধ্যে বইটি খুঁজে পান এবং গ্রন্থাগারে ফেরত দেন 

২৬টি আর্টপ্লেট-সহ বই দ্য মাইক্রোস্কোপ অ্যান্ড ইটস রিভিলেশনস। অন্তর্ভাগের ছবি

১৯১১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের কাম্ব্রিয়ার সেন্ট বিস স্কুল থেকে লিওনার্ড ইওব্যাঙ্ক নামের এক মেধাবী ছাত্র ‘পোয়েট্রি অফ বায়রন’ বইটি ধার নিয়েছিলেন এরপর ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইওব্যাঙ্কের কাছে যুদ্ধে যাওয়ার ডাক আসে ১৯১৬ সালে ইমপ্রেসের যুদ্ধে তিনি নিহত হন গ্রন্থাগার থেকে ধার নেওয়া বইটি বহুদিন তার পরিবারের সংগ্রহের মধ্যে সংরক্ষিত ছিল ২০২৪ সালে দক্ষিণ ওয়েলসের একজন বাসিন্দা বইটি খুঁজে পান যদিও তাঁর সঙ্গে ইওব্যাঙ্কের পরিবারের কোনও যোগসাজশ ছিল না তিনি বইটি খুলে সেন্ট বিস স্কুলের সিল দেখতে পান এবং বইটি সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন 

পোয়েট্রি অফ বায়রন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভাগ

৯৩৯ সালে ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি সিটি লাইব্রেরি থেকে আর্থার কোনান ডয়েলের ‘দ্য রিফিউজিস’ বইটির একটি ফিনিশ অনুবাদের কপি ধার করেন একজন পাঠক বইটি ধার করা হয় চূড়ান্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সেই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিনল্যান্ডের ওপর চূড়ান্ত আগ্রাসন নীতি কার্যকর করে এবং শীতকালীন যুদ্ধের সূচনা করে বইটি ফেরত দেওয়ার তারিখ ছিল এই যুদ্ধ সূচনার মাত্র এক মাস পর সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে সেই বই ফেরত দেওয়ার ব্যাপারটি গুরুত্ব পায়নি বলাই বাহুল্য দীর্ঘ ৮৪ বছর পর হেলসিঙ্কির ‘সেন্ট্রাল লাইব্রেরি ওডি-র ফ্রন্ট ডেস্কে বইটি জমা দেন এক ব্যক্তি বইটি এত বছর পরেও প্রায় অক্ষত রয়েছে এবং গ্রন্থাগারের পক্ষ থেকে কোনও জরিমানাও দাবি করা হয়নি, যেহেতু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বই ফেরত দেওয়া সত্যিই সম্ভব ছিল নাতবে বইটির বাঁধাই এবং পৃষ্ঠাগুলির অবস্থা দেখে বোঝা যায় যে, যাদের কাছে বইটি ছিল তাঁরা ভারি যত্নে সেটিকে সংরক্ষণ করেছিলেন। 

ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি সিটি লাইব্রেরির বইপকেটে কার্ড

১৯১৭ সালে ফিবি ওয়েব নামের এক নারী ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকো পাবলিক লাইব্রেরি থেকে এফ. হপকিনস স্মিথ লিখিত ‘ফরটি মিনিটস লেট’ নামের একটি বই ধার নিয়েছিলেন এরপর ফ্রিবির মৃত্যু হয় এবং বইটি পারিবারিক সংগ্রহে দীর্ঘদিন ধরে রয়ে যায় ঠিক ১০০ বছর পর অর্থাৎ ২০১৭ সালে ফিবির প্রপৌত্র বইটি খুঁজে পান এবং গ্রন্থাগারে জমা দেন কৌতুকের ব্যাপার হল ৪০ মিনিটের দেরি, দীর্ঘায়িত হয়ে ১০০ বছর অর্থাৎ ৫ কোটি ২৫ লক্ষেরও বেশি মিনিটের দেরিতে পরিণত হয়! জন ম্যাকর্মিক নামের এক ব্যক্তি ক্যালিফর্নিয়ার সেইন্ট হেলেনা পাবলিক লাইব্রেরি থেকে ১৯২৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বেনসন লসিং রচিত ‘এ হিস্ট্রি অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’ বইটি ধার নিয়েছিলেন জিম পেরি নামে এক বয়স্ক ব্যক্তি ২০২৩ সালের মে মাসে বইটি ওই গ্রন্থাগারের ফ্রন্ট ডেস্কে জমা দেন জানা যায়, জিম, বইটি যিনি ধার নিয়েছিলেন তার নাতজামাই জিম তার স্ত্রীর পারিবারিক জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে একটি বাক্সের মধ্যে এই বইটি খুঁজে পান

এরকম আরও বহু ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতেই পারে কিন্তু তাতে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তাই ঘটনা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি আপাতত বন্ধ করে দেখা যাক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গ্রন্থাগারের বই ফেরত আনার জন্য সময়ের ফেরে কত রকমের অভিনব কৌশল উদ্ভাবিত হয়েছে

ম্যাক্যালেন পাবলিক লাইব্রেরি। টেক্সাস। অন্দরমহল

টেক্সাসের ম্যাক্যালেন পাবলিক লাইব্রেরি একটি ‘অ্যামনেস্টি মান্থ’ (amnesty month) উদযাপন করেছিল, যেখানে ঘোষণা করা হয়– যাঁরা পুরনো বই, ডিভিডি বা সিডি ফেরত দেবেন তাঁদের জরিমানা সম্পূর্ণভাবে মাফ করা হবে এবং তাঁদের নাম একটি লটারির জন্য নথিভুক্ত করা হবে, যার মাধ্যমে তাঁরা পুরস্কার জিতে নিতে পারেন স্কটল্যান্ডের কোটব্রিজ হাই স্কুলের গ্রন্থাগারের তরফ থেকেও এরকমই একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কিছু কিছু গ্রন্থাগারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয় আরও কল্যাণকর উদ্যোগমিশিগানের র’সান মেমোরিয়াল লাইব্রেরি ঘোষণা করে যে, পাঠকরা তাঁদের জরিমানা শোধ করতে পারেন স্থানীয় একটি পশু সংরক্ষণকারী এবং পোষ্য উদ্ধারকারী সংস্থায় অর্থদানের মাধ্যমে ওয়েস্ট ফ্লোরিডা পাবলিক লাইব্রেরির তরফ থেকে বলা হয় পাঠকদের ৫০ ডলার পর্যন্ত জরিমানা মাফ করা হবে, যদি তারা ওই লাইব্রেরি-আয়োজিত রক্তদান শিবিরে রক্তদান করেন বিশ্বের নানা প্রান্তে বিভিন্ন লাইব্রেরি বিভিন্ন সময়ে পাঠকদের ধার করা বইয়ের উপর জরিমানা মাফ করেছে দুঃস্থদের খাদ্যসামগ্রী দান করার মতো কল্যাণমূলক কাজের পরিবর্তে অনেক সময় শিশু এবং কিশোর পাঠকদের জরিমানা মাপ করা হয় এক অভিনব উপায়ে তাদের লাইব্রেরির কার্ড ব্লক করা হলে এই খুদে পাঠকদের উৎসাহিত করা হয় লাইব্রেরির হলে বসে বেশি সংখ্যক বই পড়ে শেষ করতে এক-একটি বই পড়া শেষ হলে জরিমানার অঙ্ক ধাপে ধাপে কমানো হয় সাম্প্রতিক সময়ে অনেক লাইব্রেরি, যেমন ভারতীয় সংস্থা ‘লাইব্রেরিওয়ালা’, বই ফেরত দিলে এবং নিজেদের সংগ্রহের পুরনো বই সংস্থায় দান করলে গ্রাহকদের রিওয়ার্ড পয়েন্ট দেয়, যা জমা হতে থাকে এবং নির্দিষ্ট সময় পর সদস্যপদ পুনরায় রিনিউ করার সময় ওই জমানো পয়েন্ট থেকে সাবস্ক্রিপশান ফি কেটে নেওয়া হয় 

ছবিটি প্রতীকী

জাপানি লোককথায় ‘সুকুমোগামি’ নামে এক বিশেষ ধরনের আত্মার উপস্থিতির কথা বলা হয় যাদের সৃষ্টিকাহিনির সঙ্গে সংযোগ রয়েছে মানুষের নিত্য-ব্যবহারের সাধারণ জিনিসপত্রেরজাপানিরা মনে করেন, কোনও বস্তুর বয়স যখন ১০০ বছরের বেশি হয়ে যায় তখন সেই বস্তুর অন্তরে জন্ম নেয় এক আত্মা এবং সেই বস্তুটি হয়ে ওঠে জীবন্তএই সূত্র ধরে ভাবলে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত গ্রন্থাগারে শতক শতক পুরনো যত বই রয়েছে সবই আসলে জীবন্তজাপানি লোককথায় পুরনো চিঠিপত্র, বই থেকে জন্ম নেওয়া আত্মাদের বলা হয় ‘ফুকুরুমা ইয়োহেইবই বা চিঠিপত্রে লিখিত কথা থেকে যে সমস্ত অনুভূতির উদ্রেক ঘটে, জানা যায়, এই ফুকুরুমা ইয়োহেই-রা সেই সব অনুভূতিকেই জীবন্ত করে তোলেতবে এই ইয়োহেই-দের অস্তিত্ব থাক আর না-ই থাক, একথা কি অস্বীকার করা যায় যে, প্রতিটি বই তাঁর পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় বহন করে নিয়ে চলে এক জীবন্ত ইতিহাস– সেই সূত্রে এক আত্মা? বইয়ের প্রচ্ছদ, প্রকাশ-তারিখ, সংস্করণ সংক্রান্ত তথ্য, মুদ্রিত মূল্য, বইয়ের উৎসর্গ পৃষ্ঠা, ভূমিকা, বাঁধাইয়ের ধরন, পৃষ্ঠার ঘনত্ব, আকার, অলংকরণ– এই সমস্ত কিছুই শুধুমাত্র একটি বই নয়, বরং সেই বইটির জন্ম-ইতিহাস এবং সমসাময়িক সময়ের ধারণা দেয়সংগ্রাহক অনেক সময় বইয়ের ভিতরে প্রথম পাতায় নিজের নাম সই করেন, উপহারের বইতে লেখা থাকে নানা বার্তাবহু পাঠক বই পড়ার সময় প্রিয় লাইন কলমের রেখায় চিহ্নিত করেন, কেউ পাশে লিখে রাখেন নোট বা সেই লাইনের বিশ্লেষণএই সমস্ত কিছু একটি বইয়ের মধ্যে কি সত্যি সত্যিই প্রাণসঞ্চার করে না? তা করে বলেই বই হয়ে ওঠে পাঠকের কাছে মহামূল্যবান রত্নভাণ্ডার।  

জাপানি লোককথার লণ্ঠন ভূত! সময়কাল: ১৮২৬/১৮৩৭

দুঃখের বিষয় হল, বই এমন এক সম্পদ যাঁর কদর আবার সকলে করতে পারেন নাএকমাত্র তাঁরাই বইয়ের কদর করেন এবং যত্ন নেন যাঁরা বইকে সোনা-রূপো-হিরে-জহরতের থেকেও মূল্যবান বলে মনে করেনপৃথিবীর মোট জনসংখ্যার নিরিখে এমন মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম, তাই মাঝেমধ্যেই দেখা যায় বহু দুষ্প্রাপ্য বই দেশ বদল, বাসস্থান বদলের সময় বা শুধুমাত্র বই রাখার স্থান সংকুলান না-হওয়ায় পরিবারের তরফ থেকে অত্যন্ত সামান্য মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া হয় পুরনো বই-বিক্রেতাদের কাছেএবার সেই বই হয় দোকানে পড়ে পড়ে ধুলো খেতে পারে, অথবা কোনও আগ্রহী পাঠক সেই বই কিনে নিয়ে গিয়ে মহানন্দে তার রসাস্বাদন করতে পারেনএকটি বইয়ের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা আমরা বলতে পারি না, তবে ভালো বই যাতে যত্নে সংরক্ষণ করা যায় এবং উৎসাহী পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়া যায় সেই চেষ্টায় কিন্তু ব্রতী হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন দেশের বইপ্রেমী মানুষেরা; যাঁরা নিজেদের উদ্যোগে অনেক দুষ্প্রাপ্য বই সংগ্রহ করে গড়ে তুলেছেন তাঁদের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারসেই বইয়ের সংগ্রহ পরবর্তীকালে তাঁদের অনেকেই উন্মুক্ত করেছেন সাধারণ পাঠকদের কাছেনিউ ইয়র্কে জে. পিয়ারপন্ট মরগ্যান নামের এক ব্যাঙ্ককর্মী ১৯০২ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে দুষ্প্রাপ্য বই এবং চিঠিপত্রের একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহ তৈরি করেন পরে, ১৯২৪ সালে তাঁর পুত্র পিতার এই বিপুল বইয়ের সম্ভারকে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করেন এই ‘মরগ্যান লাইব্রেরি’ দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বর্তমানে এই লাইব্রেরি ‘মরগ্যান লাইব্রেরি অ্যান্ড মিউজিয়াম’ নামে পরিচিত এই সংগ্রহশালায় জেন অস্টিন, চার্লস ডিকেন্স প্রমুখ বিখ্যাত সাহিত্যিকের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি রয়েছে এমনকী, রয়েছে মোৎজার্ট, বিটোফেন-সৃষ্ট সুরের হাতে লেখা স্বরলিপিওভারতের কেরালার বই সংগ্রাহক ই. কে. মুরলী মোহনান তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে সংরক্ষণ করেছেন ২৫ হাজার দুষ্প্রাপ্য বইদক্ষিণ ভারতের বহু তরুণ গবেষক গবেষণার কাজে তাঁর এই বইয়ের সংগ্রহ ব্যবহার করেন মুরলী চান ভবিষ্যতে তাঁর এই ব্যক্তিগত সংগ্রহকে সাধারণ পাঠকের কাছে উন্মুক্ত করে দিতে বাঙালি সাহিত্যিক, অনুবাদক ও প্রকাশক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের ৪০ হাজার বই ‘বই বৈভব’ নামের একটি সংস্থাকে দিয়েছেন এমন একটি গ্রন্থাগার তৈরি করার উদ্দেশ্যে, যেখানে পাঠক পাবেন সাহিত্য এবং ইতিহাসের এক অতিসমৃদ্ধ বই-সম্ভার শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে, এই বইয়ের সংগ্রহ গড়ে ওঠে তাঁর বাবার বইয়ের সঙ্গে নিজের সংগৃহীত বই যোগ করে এই সংগ্রহে রয়েছে ‘রক্তকরবী’-র ১৯২৪ সালে প্রকাশিত বাংলা সংস্করণ এবং রবীন্দ্রনাথের নিজের অনুবাদ ‘রেড অলিয়েন্ডারস’-এর কপি, যা ‘বিশ্ব ভারতী কোয়ার্টারলি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বাংলা সংস্করণটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই কবি শঙ্খ ঘোষের ব্যক্তিগত সংগ্রহের সব বইপত্রও তাঁর প্রয়াণের পর সাধারণ পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে যদিও তাঁর সংগ্রহের বহু দুষ্প্রাপ্য বই উইপোকার আক্রমণে নষ্ট হয়ে যায় বলে জানা গিয়েছে, তবে সেগুলি বাদ দিয়ে অন্যান্য আরও দেশ-বিদেশের বই, যা আর এখন ছাপা হয় না, সেসব হিরে-মানিক যাতে পাঠক হাতে নিয়ে দেখতে পারেন– শঙ্খ ঘোষের পরিবারের সদস্যরা সে ব্যবস্থা করেছেন 

মরগ্যান লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম। নিউ ইয়র্ক

বই এক জাদুময় পৃথিবীর প্রবেশদ্বার বইয়ের দু’মলাটের ভিতর সযত্নে সংরক্ষিত থাকে শব্দ-বাক্য-মায়ামন্ত্র বই ইতিহাসের ধারক, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সংলাপনির্ধারক গ্রন্থাগার এই মহামূল্যবান অক্ষরসম্পদের স্থায়ী-অস্থায়ী বাসস্থান তাই শুধুমাত্র বই নয়, বইয়ের বাসস্থানগুলিকেও সংরক্ষণের বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে বই ছাড়া যেমন বইপ্রেমী মানুষ অসহায়, তেমনই গ্রন্থাগার ছাড়া মানুষের থাকবে না কোনও অতীত, কোনও ভবিষ্যৎ। যেমনটা বলেছিলেন রে ব্র্যাডবুরি:

‘Without libraries what have we? We have no past and no future.’