19th-episode-of-trinayan-o-trinayan-by-sanatan-dinda। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এখনও ভয় হয়, আমার তৈরি দুর্গাপ্রতিমা মানুষ ভালোবাসবেন তো?

দুর্গার কাজ করতে করতে অন্য কোনও কাজই আমি করি না। বিশাল অঙ্কের কোনও কমিশন ওয়ার্ক হয়তো এল, কিন্তু আমি জানিয়ে দিই, এই সময় পারব না। আমি যখন যে কাজটা করি, সে কাজের জন্য আমি নিবেদিত প্রাণ। এটা আসলে সাদা ক্যানভাসের চ্যালেঞ্জ না, জনগণের চ্যালেঞ্জ। সাধারণ জনগণকে ভালোবাসাতে হবে, ভালো রূপ দিতে হবে। আমি কোন রূপে দেখলাম আমার মা-কে, মেয়েকে বা প্রেমিকাকে– তা জনগণকে দেখাতে হবে। এটাই আমার সাধনা। এই লড়াইটা সাদা ক্যানভাসে নেই। সেখানে আমি অনেক বেশি স্বাধীন।

শেষ আপডেট: আগস্ট ২৩, ২০২৪, ১১:৪০   
Facebook WhatsApp Messenger

২০.

শ্রাবণ মাস। দু’দিন অনর্গল বৃষ্টি পড়েছে। রোদ উঠবে আবার। তুলোমেঘ। সবার এই সময়টাতেই যেমন ঠাকুর আসছে ঠাকুর আসছে– এরকম একটা চিনচিনে মন তৈরি হয়, আমার সেরকম হয় না। জন্ম থেকেই হয় না। কারণ আমি তো জন্মেইছি কুমোরটুলিতে। তখন থেকেই দুর্গাপ্রতিমার নির্মাণ দেখছি, যখন থেকে হয়তো আমার স্মৃতিও তৈরি হয়নি। এমনকী, ঘোর ছোটবেলাতে আমি আমার মতো করে দুর্গা তৈরি করতাম।

আমার বাড়ির উল্টোদিকেই কুমোরটুলি সার্বজনীনের দুর্গাপুজো। যখন বাঁশ বাঁধা শুরু হত, তখন থেকেই একটু অন্যরকম আনন্দ হত। মনে হত, সময়মতো প্রতিমা তৈরি করতে পারব তো? রং করতে পারব তো? কুমোরটুলিতে একবার ঘুরে আসতাম। নানা প্রতিমা শিল্পীর সঙ্গে কথা বলতাম, কাজ দেখতাম। শিখে নেওয়ার জন্য। তারপর ফিরে এসে হয়তো আমার তৈরি প্রতিমায় খানিক নতুন করে কাজ করলাম। রঙের অদলবদল করলাম। ভাঙাগড়া চলত তখনও। খুব ছোটবেলা থেকেই।

zoom
প্রতিমার ঠিকঠিকানা

এখন বাঙালির অভিধানে নতুন একটা শব্দ যোগ হয়েছে: পুজোশিল্প। দু’চার বছর আগে থেকেই ঠিক করা হয়, কী হবে। শিল্পীদের বুকিং করে নেওয়া হয় ক্লাবের পক্ষ থেকে। অনেকটা ফুটবল ক্লাব কিংবা আইপিএল দলের মতো করে। জায়গা ও বাজেট নিয়েও কথা হয়ে যায়।

এ বছর পুজোয় তেমন বিরাট কোনও পরিকল্পনা নেই আমার। দুটো মাত্র ঠাকুর গড়ব। ভবানীপুর ও বাঘাযতীনে। শিবশঙ্কর দাস ও সোমনাথ মুখোপাধ্যায়– দু’জনের জন্যই কাজ করেছি। ওদেরই ঠাকুর দুটো আমি গড়ব। মনে মনে অস্থির হয়ে আছি সেই মুহূর্তটার জন্য যে, কখন খড়ের ওপরে মাটির প্রলেপটা লাগাব। উত্তেজিত হয়ে রয়েছি আমি। প্রচুর দামামা বাজছে, ঢাক বাজছে– মনে হচ্ছে এই পুজোয় বড় চ্যালেঞ্জ। এতরকম দুর্গাকে বিভিন্নরকম রূপে দেখালাম, এবার নতুন কী করব, এটাই আমাকে ভাবাচ্ছে। ইট-কাঠের শহরে তাঁকে কী রূপে হাজির করব আবারও?

zoom
পুরনো কুমোরটুলি। সূত্র: ইন্টারনেট

এখনও ঠাকুর গড়া ধরিনি। তবে সময় নিয়ে ভাবি না। দ্রুত কাজ করার চেষ্টা করি। সেপ্টেম্বরের এক-দু’ তারিখ থেকে কাজ শুরু করব। একমাসে দুটো ঠাকুর গড়া আমার জন্য যথেষ্টই। আমি এই সময়টায় সবথেকে ডিসিপ্লিনড থাকি। সকাল ৯-১০টা থেকে ওয়ার্কশপে ঢুকব। দুপুরবেলায় একঘণ্টা খাওয়া-দাওয়া তারপর রাত্রি ১০টা পর্যন্ত চলে কাজ। শেষের দিকে হয়তো সময় বেশি লাগে। রাত ১২টা-১টা বেজে যাবে। এর বেশি সময় লাগে না। কারণ দুটো– এক, আমি নিজের হাতে অনেকটা কাজ করি। দুই, আমার সহশিল্পী যাঁরা আছেন, তাঁরা এতটাই ট্রেনড্‌ যে সমস্যা হয় না একেবারেই। এতদিন ধরে কাজ করছেন আমার সঙ্গে যে, আমার চোখের ভাষাও বুঝতে পারে।

zoom
প্রতিমা নির্মাণ। শিল্পী: সনাতন দিন্দা

দুর্গার কাজ করতে করতে অন্য কোনও কাজই আমি করি না। বিশাল অঙ্কের কোনও কমিশন ওয়ার্ক হয়তো এল, কিন্তু আমি জানিয়ে দিই, এই সময় পারব না। আমি যখন যে কাজটা করি, সে কাজের জন্য আমি নিবেদিত প্রাণ। এটা আসলে সাদা ক্যানভাসের চ্যালেঞ্জ না, জনগণের চ্যালেঞ্জ। সাধারণ জনগণকে ভালোবাসাতে হবে, ভালো রূপ দিতে হবে। আমি কোন রূপে দেখলাম আমার মা-কে, মেয়েকে বা প্রেমিকাকে– তা জনগণকে দেখাতে হবে। এটাই আমার সাধনা। এই লড়াইটা সাদা ক্যানভাসে নেই। সেখানে আমি অনেক বেশি স্বাধীন।

তাহলে কি স্বাধীনতা কম ঠাকুর গড়তে গিয়ে? না, এমনটা ভেবে ফেলবেন না আপনারা। এখানে স্বাধীনতা আছে যেমন, ভয়টাও আছে। মানুষ যদি দেবীর রূপ প্রত্যাখ্যান করে? ২৬ বছর ধরে কাজ করে চলেছি এই ক্ষেত্রে, সাধারণ মানুষ আমাকে এত ভালোবেসেছেন, এখন এমন কিছু আমি করতে পারি না যা থেকে আমার বিচ্যুতি হয়। আমার হাজার শরীর খারাপেও আমি আমার কাজ থেকে সরে আসি না। এটা আমার বাবার শিক্ষা, আমার মাস্টারমশাইয়ের শিক্ষা। উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি এই মন।

ভেবে দেখুন, একই ত্রিনয়ন। কখনও অসুরকে বধ করছে, কখনও অভয়মুদ্রা দিয়ে সবাইকে শান্তির বাণী জানাচ্ছে। একজনই– অঙ্গরাগের প্রকারভেদে আলাদা আলাদা।

…আরও পড়ুন ত্রিনয়ন ও ত্রিনয়ন

পর্ব ১৭: পুজোসংখ্যার প্রচ্ছদে দুর্গা থাকতেই হবে, এটাও একধরনের ফ্যাসিজম

 পর্ব ১৬: সাধারণ মানুষের কাছেই শিল্পের পরশপাথর রয়েছে

পর্ব ১৫: রাষ্ট্র যদি রামের কথা বলে, শিল্পীর দায় সীতার কথাও বলা

পর্ব ১৪: মানচিত্র মোছার ইরেজার শিল্পীর কাছে আছে

পর্ব ১৩: তৃতীয় নয়নকে গুরুত্ব দিই, তৃতীয় লিঙ্গকেও

পর্ব ১২: লাখ লাখ টাকা কামানোর জন্য দুর্গাপুজো করিনি, করব না

পর্ব ১১: বাদল সরকারের থিয়েটার পথে নেমেছিল, আমার শিল্পও তাই

পর্ব ১০: যে কারণে এখন দুর্গাপুজো শিল্প করছি না

পর্ব ৯: এদেশে শিল্প সেক্যুলার হবে না

পর্ব ৮: শুধু শিল্প নিয়ে যারা বাঁচতে চায়, তারা যেন বাঁচতে পারে

পর্ব ৭: ক্যালেন্ডারের দেবদেবীর হুবহু নকল আমি করতে চাইনি কখনও

পর্ব ৬: সাধারণ মানুষকে অগ্রাহ্য করে শিল্প হয় না

পর্ব ৫: দেওয়ালে যামিনী রায়ের ছবি টাঙালে শিল্পের উন্নতি হয় না

পর্ব ৪: দেবীঘটও শিল্প, আমরা তা গুরুত্ব দিয়ে দেখি না

পর্ব ৩: জীবনের প্রথম ইনকাম শ্মশানের দেওয়ালে মৃত মানুষের নাম লিখে

পর্ব ২: আমার শরীরে যেদিন নক্ষত্র এসে পড়েছিল

পর্ব ১: ছোট থেকেই মাটি আমার আঙুলের কথা শুনত

Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on