Robbar

আমৃত্যু যৌবন-যাপন করে গিয়েছেন যে লেখক

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 17, 2026 4:01 pm
  • Updated:May 17, 2026 4:01 pm  

চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়া তাঁর বাড়িতে সন্ধে সাতটা নাগাদ যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। আমরা পড়লাম মহা আতান্তরে! কোনও জায়গায় পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে রাতের প্রথম প্রহর বেশ জমিয়ে কাটে, কিন্তু চন্দ্রপ্রসাদ হচ্ছেন গান্ধিবাদী। ফলে কপালে যে বিশুদ্ধ মিনারেল ওয়াটার লেখা হয়ে গেল, তা মুহূর্তে বুঝে গেলাম। সে-সঙ্গে আলোচনার বিষয় হবে দেশের অবক্ষয়। চন্দ্রপ্রসাদ তখন বিপত্নীক, আর ছেলে শান্তনু তাঁর স্ত্রী ও দু’টি ছেলেকে নিয়ে মুম্বইয়ে থাকেন। মেয়ে মৈত্রেয়ীর বিয়ে হয়েছে গুয়াহাটিতে এবং নিজের সংসার করছেন। ফলে খাওয়াদাওয়া বিশেষ জমবে বলেও মনে হল না। 

রামকুমার মুখোপাধ্যায়

৩.

উজনি বা উপর অসমের শিবসাগর জেলার আমগুড়ির কাছে জালুকগাঁওয়ে ১৯২৭ সালে চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়ার জন্ম হয়। ‘জালুক’ শব্দের অর্থ জ্বালা ধরানো সবজি বা লঙ্কা গাছ। ঝাল লঙ্কা চাষের গুণে গাঁয়ের নাম জালুকগাঁও। সেই গাঁয়ের ছেলে চন্দ্রপ্রসাদ স্কুলজীবনেই সাহেবদের গায়ে জ্বালা ধরালেন! ১৫ বছর বয়সে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে অংশ নিলেন। কিশোরের গলার ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি ভুলিয়ে দিতে পুলিশের লাঠি পড়ল পিঠে। কিছুদিন জেলের ঘানি টানলে শুধরে যাবে ভেবে পুলিশ চারমাস জেলে রেখে দিল। জেলের বাইরে এসে চন্দ্রপ্রসাদ আবার আন্দোলনে যোগ দিলেন। এবার ন’ মাসের জেল! সামনেই ছেলেটির স্কুলের শেষ ধাপের পরীক্ষা। দু’জন জেলবন্দি মানুষ তাঁকে বইপত্র নিয়ে পড়াতে বসালেন। এঁদের একজন হলেন ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ আর অন্যজন বিমলাপ্রসাদ চালিহা। চন্দ্রপ্রসাদ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হলেন। জেলের দুই শিক্ষকের মধ্যে একজন পরে দেশের রাষ্ট্রপতি আর অন্যজন অসমের মুখ‍্যমন্ত্রী হন।

চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়া

চন্দ্রপ্রসাদ কটন কলেজে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে ভর্তি হলেন। সেখানের পড়া শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়তে এলেন। থাকতেন কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের হার্ডিঞ্জ হস্টেলে। মাঝেমধ্যে কফি হাউসে যেতেন, তবে তাঁকে বেশি টানত ধর্মতলার সিনেমাহলগুলো। সময় পেলেই হেঁটে গিয়ে কোনও একটা ইংরেজি ছবি দেখে, হস্টেলে ফিরে যেতেন।

চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়াকে আমি প্রথম দেখি নয়ের দশকে। ওই সময়েই মহাভারতের কর্ণকে নিয়ে লেখা তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘মহারথী’ সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পায়, আর তিনি অকাদেমির জেনারেল কাউন্সিল এবং অসমিয়া পরামর্শদাতা সমিতির সদস্য হন। দেখা হওয়ার আগে ভেবেছিলাম, অনেক গান্ধিবাদীর মতো তিনি নিশ্চয়ই খুব গুরুগম্ভীর মানুষ হবেন। প্রথম সাক্ষাতেই দেখি হাসিখুশি আর ব‍্যবহার খুব আন্তরিক। লম্বা মানুষ আর গায়ের রং বেশ ফর্সা। ধুতি ও পাঞ্জাবিও ধপধপে সাদা। চশমার কাচ বেশ খানিক পুরু। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে হার্ডিঞ্জ হস্টেল নিয়ে বেশ একটা স্মৃতিমেদুরতা ছিল। বলেছিলেন, ইংরেজি সাহিত্যের ডিকেন্সের উপন্যাসের পাশাপাশি টলস্টয়ের উপন্যাস পড়ছেন, আর সে-সঙ্গে তারাশঙ্করের উপন্যাসও। পাঠক চন্দ্রপ্রসাদের মনে হচ্ছে, তাঁরও কিছু লেখার আছে।

হার্ডিঞ্জ হস্টেলে বসে লিখে ফেললেন একটি উপন্যাস। নাম ‘এদিন’, বাংলাতে যার অর্থ– একদিন। তাঁর স্মৃতিতে তখন শিবসাগর ও যোরহাট জেল আর ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক আন্দোলন। উপন্যাসটিতে জেল থেকে বেরিয়ে একজন মানুষ তার একটি দিনের কথা লিখছে। সাহস করে লেখাটি পাঠিয়ে দিলেন ‘রামধনু’ পত্রিকার সম্পাদক বীরেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য‍্যের কাছে। পরে এই বীরেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য‍্যের ‘ইয়ারুইঙ্গম’ (গণরাজ‍্য) এবং ‘মৃত‍্যঞ্জয়’ উপন্যাস দু’টি বেশ বিখ্যাত হয় এবং তিনি জ্ঞানপীঠ পুরস্কারে সম্মানিতও হন। চন্দ্রপ্রসাদকে ‘রামধনু’ সম্পাদক একটি পোস্টকার্ড লিখে জানান যে, উপন্যাসটি তাঁরা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করবেন। চন্দ্রপ্রসাদের আনন্দের সীমা রইল না। সন্ধেয় ধর্মতলার কার্জন পার্কে গিয়ে বসলেন। মাথা তুলে উপরের দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হল, ‘কী মহিমামণ্ডিত মহাসুন্দর ওই বিশাল আকাশ!’ আজকের তুলনায় সে-সময়ের কলকাতার আকাশ সত্যিই বড় ছিল, কারণ কারখানার চিমনির মতো ঢেঙা বহুতলগুলো গজিয়ে ওঠেনি। মহিমার আরেক কারণ– লেখক হিসেবে চন্দ্রপ্রসাদের প্রথম স্বীকৃতি। নতুন লেখকের শুরুর পর্বে কেউ একজন যাত্রার সবুজ সংকেত দিলে মাটি, জল, আকাশের সব পথ খুলে যায়।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে চন্দ্রপ্রসাদ ১৯৫৫ সালে ‘অসম ট্রিবিউন’-এ সাব-এডিটর পদে যোগ দিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের পর্বে অনেক নতুন সংবাদপত্র জন্ম নেয় পরাধীনতার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে। ফলে স্বাধীনতার পরে অনেকে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন, দেশের কথা জনগণকে জানাতে আর জনগণের কথা দেশের নেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে। ‘অসম ট্রিবিউন’ উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রথম ইংরেজি সংবাদপত্র, যেটি ১৯৩৯ সালে চা-বাগান মালিক রাধাগোবিন্দ বরুয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সম্পাদক হন কলকাতার জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র ‘হিন্দুস্তান স্ট‍্যাডার্ড’-এর সহকারী সম্পাদক লক্ষ্মীনাথ ফুকন। নতুন এই সংবাদপত্রটির প্রথম থেকেই কংগ্রেসের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল, কিন্তু অন্ধ আনুগত্য ছিল না। চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়া ‘অসম ট্রিবিউন’-এ আট বছর কাজ করার পর ‘অসম বাতরি’র সম্পাদক হন। অসমিয়া ভাষায় ‘বাতরি’ শব্দের অর্থ হল সংবাদ। ওই পর্বেই ‘মণিদীপ’ সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করেন।

ছয়ের দশকের মাঝামাঝি মার্কিন সরকারের আমন্ত্রণে ছ’মাস আমেরিকা ভ্রমণে যান এবং সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ১৯৬৭ সালে ‘আমেরিকার চিঠি’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ কাউন্সিলের আমন্ত্রণে ওই একই দশকে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। এই সাংবাদিক জীবনের পাশাপাশি ছয়ের দশকে ‘মেঘমল্লার’-সহ তাঁর তিনটি উপন্যাস ও দু’টি গল্প-সংকলন প্রকাশিত হয়। ১৯৬৭ সালে অসম প্রকাশন পরিষদের সচিব পদে যোগ দেন এবং ২০ বছরের প্রচেষ্টায় সেটিকে অসমের একটি অন্যতম সারস্বত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলেন। প্রাচ‍্য শাসনাবলি, হস্তিবিদ‍্যা, সত্রীয় নৃত্য ইত্যাদি বইয়ের পাশাপাশি বিশিষ্ট লেখকদের রচনাবলি প্রকাশ করেন। ১৮৪৬ ব‍্যাপ্টিস্ট মিশনের উদ্যোগে এবং ড. নাথান ব্রাউনের সম্পাদনায় প্রকাশিত প্রথম অসমিয়া পত্রিকা ‘অরুণোদয়’-এর প্রায় চার দশকের রচনা সংকলন করে প্রকাশ করেন। প্রকাশন পরিষদের প্রচ্ছদ, অলংকরণ ইত্যাদি কাজে গুণীশিল্পীদের যুক্ত করেন। গড়ে তোলেন নতুন ভবন, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, শুরু করেন গুয়াহাটি গ্রন্থাগার এবং লেখকদের জন্যে প্রকাশন পরিষদের পুরস্কার চালু করেন।

১৯৯৩ সালে নতুন মাসিক সাহিত্য-পত্রিকা ‘গরীয়সী’র সূচনা হয়। তাঁকে সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। অনেক নতুন লেখককে তিনি পত্রিকায় জায়গা দিয়েছিলেন। ২০০২-এ উত্তর-পূর্বের লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে সাহিত্য অকাদেমি দু’দিনের একটি আলোচনাসভার আয়োজন করে। আমাদের অনুরোধে উদ্বোধন পর্বে তিনি তাঁর প্রায় পাঁচ দশকের সম্পাদনা জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছিলেন। বড় মূল্যবান ছিল সে বক্তৃতা।

নয়ের দশকে চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়া দু’টি অসামান্য উপন্যাস লিখলেন। একটি হল বিখ্যাত অসমিয়া নাট‍্যকার, চিত্রপরিচালক ও গীতিকার জ‍্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালাকে নিয়ে জীবনীমূলক উপন্যাস ‘তোরে মোরে আলোকরে যাত্রা’ এবং অন‍্যটি কর্ণকে নিয়ে ‘মহারথী’। দুটো উপন্যাসই বেশ জনপ্রিয় হল এবং ‘মহারথী’ সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হল। ‘মহারথী’ উপন্যাসে চন্দ্রপ্রসাদ দেখিয়েছেন– জন্মের মুহূর্ত থেকে যে-শিশু মা-বাবার আশ্রয় ও স্নেহ থেকে বঞ্চিত, সেই কর্ণ কেমনভাবে নিরন্তর সাধনা, প্রবল যুদ্ধবল ও অসীম উদারতায় নিজেকে মহাভারতের চিরস্মরণীয় চরিত্র করে তুলেছিল। তবে এর বাইরে যেখানে কর্ণ নিজের ভিতরে রক্তাক্ত হয়, তার আবেদন অন‍্যরকম। উপন্যাসের এক জায়গায় কর্ণ বলছে, ‘সত‍্যের খাতিরে বলা যায় আমার জীবনটাই নিরন্তর অনুসন্ধান ও অন্বেষণের কাহিনী। আমার জীবনের উৎস, আমার জীবনের প্রকৃত ইতিবৃত্ত, আমার জীবনকে বিচিত্রভাবে আবৃত করে রাখা সত্যের স্বরূপ আবিষ্কারই ছিল আমার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। এই সত‍্য উদ্‌ঘাটনের জন্য, অনুসন্ধানের অক্লান্ত যাত্রাপথে আমি যা চেয়েছিলাম তা ছুঁতে পারিনি, যা দেখেছিলাম তা আমি দেখতে চাইনি।’ (অনুবাদ: তড়িৎ চৌধুরী)

একুশ শতকের গোড়ার দিকের কথা। একটি সাহিত্যসভার কারণে গুয়াহাটিতে গিয়েছি। সে-সভার অন‍্যতম বক্তা ছিলেন চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়া। দিল্লি থেকে সাহিত্য অকাদেমির নির্মলকান্তি ভট্টাচার্যও এসেছিলেন সেই সভায় যোগ দিতে। আমাদের অসমিয়া বন্ধু ও কটন কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক প্রদীপ আচার্যও সভায় এসেছিলেন। অকাদেমির কলকাতা দপ্তরের সহকর্মী শান্তনু গঙ্গোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন। চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়া তাঁর বাড়িতে সন্ধে সাতটা নাগাদ যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। আমরা পড়লাম মহা আতান্তরে! কোনও জায়গায় পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে রাতের প্রথম প্রহর বেশ জমিয়ে কাটে, কিন্তু চন্দ্রপ্রসাদ হচ্ছেন গান্ধিবাদী। ফলে কপালে যে বিশুদ্ধ মিনারেল ওয়াটার লেখা হয়ে গেল, তা মুহূর্তে বুঝে গেলাম। সে-সঙ্গে আলোচনার বিষয় হবে দেশের অবক্ষয়। চন্দ্রপ্রসাদ তখন বিপত্নীক, আর ছেলে শান্তনু তাঁর স্ত্রী ও দু’টি ছেলেকে নিয়ে মুম্বইয়ে থাকেন। মেয়ে মৈত্রেয়ীর বিয়ে হয়েছে গুয়াহাটিতে এবং নিজের সংসার করছেন। ফলে খাওয়াদাওয়া বিশেষ জমবে বলেও মনে হল না। আমরা ঠিক করলাম ঘণ্টাখানেক চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়ার বাড়িতে কাটিয়ে হোটেলে ফিরে আমরা নিজেদের মতো বসব।

সমতল ছেড়ে আমাদের গাড়ি উপরে উঠতে লাগল। পাহাড়ের গায়ে কিছু বাড়িঘর। জায়গাটা উত্তর অসমে আর ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণে। গাছপালায় বেশ সবুজ জায়গাটা। নাম খারঘুলি। এলাকাটা আমার চেনা কারণ, এখানে বীরেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্যের বাড়িতে একবার এসেছিলাম। তবে দিনের বেলাতে। রাতে গাড়ি থেকে নেমে দেখি দূরে চাঁদের আলোয় ব্রহ্মপুত্রের জল গলানো রুপোর মতো মনে হচ্ছে। চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়ার বাড়ির সামনে ফুলের একটা ছোট বাগান। কিছু ফুল ফুটে আছে। গাড়ির শব্দ শুনে চন্দ্রপ্রসাদ দরজায় এসে ভিতরে সাদরে নিয়ে গেলেন। মেয়ে মৈত্রেয়ীকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বাবার কাছে আমরা আসব জেনে, মেয়ে চলে এসেছেন। বাড়িতে কাজের মেয়ে আছে, তবু ঘরের মেয়ে এসে দেখভাল করছে।

একটু পরে অসমের চা ও গরম শিঙাড়া এল। পারিবারিক খোঁজখবরের পর কলকাতা, দিল্লি ও গুয়াহাটির নতুন ও পুরনো কথা হল। তারপর দেখি মিনারেল ওয়াটার আর সেই সঙ্গে বরফের টুকরো এল। তারপর পানীয়ের সুন্দর কাচের গ্লাস। চার-পাঁচ রকমের পানীয়ের বড় বোতলও এল। গৃহস্থের স্বাস্থ্য কামনা করে পান শুরু হল। যে পা রাত বাড়ার সঙ্গে ওঠার জন‍্যে নিশপিশ করছিল, তা ধীরে ধীরে থিতু হল। চন্দ্রপ্রসাদ একফোঁটাও মদ খেলেন না, কিন্তু আমাদের আনন্দ পুরো উপভোগ করতে লাগলেন। শোনালেন কিছু মজার গল্পও। দু’-চার বছর আগে খারঘুলির প্রায় সমবয়স্ক এক নারী-লেখক চারপাশের লোকজনকে বলে বেড়িয়েছেন যে, চন্দ্রপ্রসাদ লুকিয়ে দরজা-জানলার ফাঁক দিয়ে তাঁর রূপদর্শন করেন। সে-গল্প শোনাতে গিয়ে প্রায় ৭৫ বছরের চন্দ্রপ্রসাদের সে কী উদাত্ত হাসি! প্রচলিত কথা হল, সত্যিকারের একজন লেখক আমৃত্যু যৌবন-যাপন করেন। চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়াকে দেখে সেটাই মনে হল।

পান ও রাতের খাওয়া সেরে ফিরছি। ততক্ষণে রাতের প্রথম প্রহর পেরিয়েছি। কোথায় যেন শুনেছিলাম, মহাত্মা গান্ধী একবার জরুরি দরকারে রাত আটটা নাগাদ মোহাম্মদ আলি জিন্নাকে বাড়িতে যেতে অনুরোধ করেছিলেন। জিন্না গিয়েছিলেন এবং অবাক হয়েছিলেন, গান্ধীজি তাঁর জন্য পানীয়ের ব্যবস্থা করে রেখেছেন দেখে। গান্ধীজি বলেছিলেন, তিনি নিজে মদ্যপান করেন না ঠিকই, কিন্তু জিন্নাকে তাঁর নিজস্ব সময়ে বাড়িতে ডেকেছেন। কাজেই জিন্নাকে তাঁর অভ‍্যেস বা আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে চান না। আমাদের বর্তমান ছুঁচিবাই সময় ও সমাজে এসব ভাবাই যায় না।

২০০৬ সালে আগস্ট মাসে চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়া চলে যান। তার কয়েক মাস পরে খবরের কাগজে দেখি তাঁকে মরণোত্তর পদ্মভূষণ দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বেঁচে থাকতে দিলে ভালো হত, তবু আমাদের আনন্দ কম হয়নি। তিনি তো সত্যিই দেশের ভূষণ ছিলেন।

…………… মুখুজ্জের লিটফেস্ট-এর অন্যান্য পর্ব ……………

পর্ব ২। মাজুলি দ্বীপ ও তার তিন বাসিন্দা

পর্ব ১। রাজা নয়, টুনটুনির গল্প