Joy Goswami: The Helplessness of Knowing। Robbar
Robbar
  • ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ক্ষমতার কবি, শাপশাপান্তের কবি

‘কী ভয়ংকর সেই জ্ঞান, যে জ্ঞানে মানুষ কেবল দেখতে পায় কিন্তু প্রতিরোধ করতে পারে না।’ এ লেখকদের বলা চিরকালের কথা যেন। যে কবিতা লেখে, তার পক্ষে তো সমাজ পাল্টানো সত্যিই অসম্ভব! অন্ধ তাইরেসিয়াসের আছে সেই জ্ঞান, যাতে সব দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু ক্ষমতাকে অভিশাপ দেওয়া ছাড়া, স্পষ্ট উচ্চারণের সময় তখনও আসেনি বলে মনে করছে সে। আর অয়দিপাউস, যে বলে সত্য কী, তা আমাকে জানতে হবে– সে-ও ক্রোধান্ধ হয়ে তার যুক্তি হারিয়ে ফেলেছে! একই নাটকে পরস্পরকে আঘাতরত দুই চরিত্র– তাইরেসিয়াস ও অয়দিপাউস, যেন আজকের দিনের কবির দু’টি টুকরো হয়ে একই মঞ্চের দুই পাশে দাঁড়ায়, একই সমাজের দুই পাশে।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ১৩:৪৭   
Facebook WhatsApp Messenger

৭.

এই কলামের যাঁরা পাঠক, তাঁরা নিশ্চয়ই এতদিনে ভুলে গিয়েছেন কোথায় ফুরিয়েছিল আমাদের কথাবার্তা। নিজেকেই ধরিয়ে নিই, আপনাদেরও ধরিয়ে দিই। রবীন্দ্রনাথের গানের ‘হায় পথবাসী, হায় গতিহীন, হায় গৃহহারা’– এই তিন জায়গায় ছিলাম। স্বরের সংস্থান এবং তার অর্থ, উত্থানপতন, এসব নিয়েই চলেছিল কথা। তারপর আমরা নাটকের দেশে পৌঁছই। ‘রাজা অয়দিপাউস’ নাটকের রানির সংলাপে: ‘তোমাকে আমি একটি কথাই বলতে পারি অয়দিপাউস– হায়!’ কোরাস চরিত্র তিনটি, অয়দিপাউস নিজেকে অন্ধ করে দিয়েছে দেখার পর, ওই ‘হায়’ আবার ফিরে এসেছিল মঞ্চে, নাটকের মধ্যপর্বে। আরও আগে, অয়দিপাউস যখন জানতে পারছে, তার পিতার হত্যা-বিবরণ, তখন সে চমকে চমকে উঠছে! এবং তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল ‘হায় জিউস!’ এই তিন হায়-ধ্বনি কতটা আলাদা, কীভাবে তরঙ্গের মতো এই ‘হায়’ শব্দ কোন কোন স্বর ছুঁয়ে যাচ্ছে, তা শৈবাল বসু আমাকে বলেছিলেন তাঁর বিশ্লেষণে।

zoom
‘রাজা অয়দিপাউস’ নাটকের দৃশ্য

কেন এই নাটকে প্রায় সাংগীতিক পথে চলেছে কণ্ঠের উত্থানপতন? এমনকী, মনে পড়ে, অয়দিপাউসের যে অঙ্গসঞ্চালন, তার মধ্যেও একরকম নৃত্যভঙ্গি রয়েছে। ১৯৫৯ সালে ‘বহুরূপী’ নাট্যদল একটি নাট্যশিবিরের আয়োজন করেছিল বলে জানতে পারি। তখন আজকের মতো ঘন ঘন নাট্যপ্রশিক্ষণ শিবির বা কর্মশালা ছিল না। সেই কর্মশালার জন্য আবেদন করেন হিমাংশু চট্টোপাধ্যায় নামের এক যুবক। তিনি নির্বাচিতও হন। টানা এক বছর ছিলেন, বহুরূপীর সেই শিবিরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের কাজে। আরও একজন অভিনেতা, অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন এই শিবিরে। পরবর্তী সময়ে যিনি চলে আসেন ‘নান্দীকার’-এ। ‘তিন পয়সার পালা’য় গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি।

কিন্তু, এ-সমস্ত আমি জানতে পারছি কী করে? বহুরূপীর যে সমস্ত নাটক, কলামন্দির, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস, নিউ এম্পায়ার বা অন্যত্র হচ্ছে– সেখানে তাদের নাট্যপত্রিকা ও কিছু বইপত্র পাওয়া যেত প্রত্যেক শো-র আগে। ছোটখাটো চেহারা, বলিষ্ঠ গড়ন এক তরুণ সেখানে বইপত্রিকা বিক্রির দায়িত্বে। ১৯৬৭ সাল থেকে, আমি কলকাতায় এসে নাটক দেখছি। বহুরূপী ‘পাগলা ঘোড়া’ থেকে নাটক মঞ্চস্থ করতে লাগল অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে। প্রায় প্রতিটি নাটক শেষেই ঘেঁটে দেখতাম ‘বহুরূপী’ পত্রিকার সাম্প্রতিকতম সংখ্যা, পুরনো কয়েকটি সংখ্যাও, যা তখনও পর্যন্ত আমার আয়ত্তাধীন নয়। ‘রাজা অয়দিপাউস’– যা বই হয়ে প্রথমবার বেরিয়েছিল, এখন যেমন পাওয়া যায় রচনাবলিতে, তা কিনেছিলাম সেই তরুণের কাছ থেকে। তার আগে শ্যামল ঘোষের ‘নক্ষত্র প্রকাশ’ থেকে বেরিয়েছিল আলাদা পেপারব্যাক বই হিসেবে। এই শ্যামল ঘোষ, নির্দেশক ও অভিনেতা– তাঁর কথাও পরে ঘুরে-ফিরে আসবে।


পেপারব্যাক সেই বইয়ের প্রচ্ছদ ছিল মঞ্চের ওপর থামে, রাজা হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজা অয়দিপাউস নাটকেরই দৃশ্য। ওই ছেলেটি, যে বিক্রি করছে ‘বহুরূপী’ পত্রিকা ও নাটকের নানা বই, কত আর বয়স হবে তার– ১৬ কি ১৭। কিন্তু ছেলেটির মুখে কখনও আমি হাসি দেখিনি। আমারই বয়সি, কিন্তু কী গম্ভীর! দাম নেওয়া, দূরত্বময় তাকানো, বইপত্রিকা হস্তান্তর। অতিরিক্ত কোনও কথা নেই। হয়তো জিজ্ঞেস করলাম, ‘আগের সংখ্যাটা?’ উত্তর: ‘ওটা শেষ হয়ে গেছে।’ ব্যস। আর কোনও কথা নয়। কখনও-বা, ‘তারও আগের সংখ্যাটা?’ ‘‘চাই? আছে দু’-এক কপি।’’ আমি হাতে চাঁদ পেতাম।

১৯৫৯ সালের সেই প্রশিক্ষণ শিবিরে ফিরে আসি। হিমাংশু চট্টোপাধ্যায় বহুরূপীতে ছিলেন ৯ বছর। ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত। আর অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যস্ত চাকরির জন্যই দলে থাকতে পারেননি বেশিদিন। এইসব, বলা বাহুল্য, বহুরূপী পত্রিকাতেই পড়েছি। ’৭২ সালে বহুরূপীর ২৫ বছর উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেই সংখ্যায় হিমাংশু চট্টোপাধ্যায় ও অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়– দু’জনের লেখাই ছিল। আরও অনেকের লেখা ছিল, কিন্তু খ্যাতনামাদের কথা বাদ দিচ্ছি।

zoom
দেবতোষ ঘোষ

দেবতোষ ঘোষ নামের এক অভিনেতা ছিলেন বহুরূপীতে। অনেকেই চিনবেন তাঁকে। রোনাল্ড জফ-এর ‘সিটি অফ জয়’, মৃণাল সেনের ‘খারিজ’-এর মতো ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। ‘খারিজ’-এ গৃহপরিচালক বালকটির পিতার ভূমিকায় ছিলেন তিনিই। ছেলেকে নিতে এসে, না-পেয়ে, তিনি দরজার কাছে চুপ করে বসে পড়েছিলেন। এই স্তব্ধ হয়ে থাকা আমি আবার অনেক পরে খুঁজে পাই।

zoom
মৃণাল সেনের ‘খারিজ’-এ দেবতোষ ঘোষ

‘পঞ্চম বৈদিক’ প্রযোজিত ‘পশুখামার’ নাটক। সেখানে দেবতোষ ঘোষ অভিনয় করছেন ‘বেঞ্জামিন’ নামের এক গাধার চরিত্রে। অত্যন্ত অল্প সংলাপ, কিন্তু এমনই উচ্চাঙ্গের অভিনয় যে, শঙ্খ ঘোষ পর্যন্ত লিখেছিলেন: ‘অভিনয়ের যদি ক্ষমতা থাকে, তাহলে যৎসামান্য অবকাশেই যে সেটা বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব, তার একটা সাম্প্রতিক উদাহরণ এটা।’ নাটকের শেষদৃশ্যে, আলো বদল হয় যখন, তিনি এঁকে-বেঁকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ওঠেন। যবনিকা পড়তে থাকে, সেই দাঁড়িয়ে থাকা নিশ্চুপ, অপলক। বলে নেওয়া ভালো, দেবতোষ ঘোষের উচ্চতা ৬ ফুট ১ ইঞ্চি। সারাজীবনে এতটুকুও মেদসঞ্চার হয়নি তাঁর শরীরে। বিরতির আগে যখন এ নাটকের পর্দা পড়ছে, তখনও ওই  দর্শকদের দিকে তাকিয়ে থাকার দৃশ্য ছিল। সঙ্গে একটি সংলাপ: ‘গাধারা বড্ড বেশিদিন বাঁচে।’ ছয়-সাতের দশকে ‘বহুরূপী’ পত্রিকার জন্য এই দেবতোষ ঘোষই কিন্তু লেখা সংগ্রহ, প্রুফ দেখা, প্রুফ নিয়ে লেখকের কাছে যাওয়া, প্রেসের কাজ– সবটা করতেন। পাশাপাশি দলের অন্যতম প্রধান অভিনেতা তো ছিলেনই।

zoom
‘বহুরূপী’ নাট্যদলের লোগো

হিমাংশু চট্টোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে, কেন দেবতোষ ঘোষ? বহুরূপীর ওই ২৫ বছরের লেখায় হিমাংশু চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন ১১-এ নাসিরুদ্দিন স্ট্রিটে, যে-বাড়িতে মহড়া চলত– সেখানে দরজা ঠকঠক করায় যিনি খুলেছিলেন, তিনি ‘ক্ষীণকায় সিক্সফুটার’। দরজা খুলে গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, ‘কী চাই?’ হিমাংশুর উত্তর ছিল, ‘জানতে চাই। মানে শিক্ষার্থী হতে চেয়ে আবেদন করেছিলাম, তার ফলাফল জানতে চাই।’ উত্তর এসেছিল: ‘যথাসময়ে জানতে পারবেন। চিঠি দিয়ে জানানো হবে।’ বলাই বাহুল্য, যে, এই ‘ক্ষীণকায় সিক্সফুটার’ই হলেন দেবতোষ ঘোষ! দেবতোষ ঘোষের জীবনের শেষ ২৫ বছর আমি তাঁর সান্নিধ্য পাই। যেহেতু তখন আমি কলকাতাবাসী। পরবর্তীকালে দেবতোষ ঘোষের থেকে অভিনয় বিষয়ে বহু কিছু শেখেন। এবং একটা স্নেহপূর্ণ বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল তাঁদের।

zoom
১১-এ নাসিরুদ্দিন রোড। বহুরূপী-র ভাড়াবাড়ি। শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র থাকতেন এই বাড়িতেই। নাটকের মহড়াও হত এখানেই। চিত্রঋণ: অংশুমান ভৌমিক

’৬৮ সালের পর হিমাংশু চট্টোপাধ্যায় নান্দীকার-এ চলে যান। বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেছিলেন। এইখানে লক্ষ করার মতো বিষয় হল, সে সময়ের নাটকের নামগুলো কী ধরনের হচ্ছে! মোহিত চট্টোপাধ্যায় লিখছেন ‘গন্ধরাজের হাততালি’, ‘কণ্ঠনালিতে সূর্য’, ‘মৃত্যুসংবাদ’, ‘ক্যাপ্টেন হুররা’, ‘চন্দ্রলোকে অগ্নিকাণ্ড’।  ‘নক্ষত্র’ নাট্যগোষ্ঠীর নির্দেশক ও অভিনেতা শ্যামল ঘোষ এর কোনও কোনওটি মঞ্চস্থ করছেন। এই শ্যামল ঘোষই কিন্তু ‘নক্ষত্র প্রকাশ’ থেকে ‘রাজা অয়দিপাউস’ পেপারব্যাক হিসেবে বের করেছেন। তখনকার দৈনিক কাগজে প্রায় এমন একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়েছিল–

নক্ষত্র প্রজ্জ্বলিত
চাণক্য সেনের অ্যান্টি প্লে

তারারা শোনে না
প্রয়োগপ্রধান
শ্যামল ঘোষ
তারারা শোনে না
নাটক

zoom
শ্যামল ঘোষ। চিত্রঋণ: রজত মল্লিক

নিজের নাম ‘নির্দেশক’ হিসেবে বিজ্ঞাপনে দিতেন না শ্যামল ঘোষ। ছাপা হত: প্রয়োগপ্রধান শ্যামল ঘোষ। কিন্তু কেন?  বাংলা নাটকে ‘নির্দেশক’ হিসেবে তখন প্রধানত শম্ভু মিত্রর নাম ছাপা হত। ছাপা হত উৎপল দত্তর নামও। নির্দেশক হিসেবে শম্ভু মিত্রকে ট্রিবিউট জানাতেই এই শব্দটা শ্যামল ঘোষ ব্যবহার করেননি। এই চাণক্য সেনের ‘অ্যান্টি-প্লে’র বিজ্ঞাপনের পর পরই আমি পড়ব ‘অ্যান্টি পোয়েট্রি’ কথাটাও। সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত সম্পাদিত ‘কালপুরুষ’ পত্রিকায়, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে।

zoom
‘কালপুরুষ’ পত্রিকার একটি সংখ্যা

১৯৭৩ সালে, ‌‘মাই সিক্রেট গার্ডেন’ নামে একটি বই বেরল। যিনি লিখছেন, তাঁর প্রথম বই। কয়েক মিলিয়ন কপি বিক্রি হল। অতিরিক্ত যৌনতার প্রবল অভিযোগ সত্ত্বেও বইটির পাঠকগ্রাহ্যতা রইল অব্যাহত। বইটি লিখেছিলেন এক নারী, তাঁর নাম ন্যানসি ফ্রাইডে। আমরা অরুন্ধতী রায়ের কথা জানি, তিনি প্রথম বইয়ের অবিশ্বাস্য সাফল্যের পর দীর্ঘদিন চুপ করে ছিলেন। ন্যান্সি ফ্রাইডে চলে গিয়েছেন আড়ালে। তাঁর কাছে অনেক প্রকাশক আসা সত্ত্বেও তিনি দ্বিতীয় বইটি বের করার আগে ১৮ বছর সময় নেন। ’৯১ সালে বেরয় ‘ওম্যান অন টপ’। এই ন্যান্সি ফ্রাইডের ধারা কি লুপ্ত হয়ে গিয়েছে? না। ২০১৩ সালে এমিলি ডুবারলে-র ‘গার্ডেন অফ ডিজায়ার’ প্রকাশিত হয়। এমিলি তাঁর গুরু ন্যান্সির প্রতি ট্রিবিউট হিসেবে বইয়ের এইরকম নামকরণ করলেন। সেরকমই শ্যামল ঘোষ। নির্দেশক না-বলে– ‘প্রয়োগপ্রধান’। নতুন একটি শব্দ নিয়ে এলেন তিনি নির্দেশকের পরিবর্তে। মনে পড়ে, ‘মৃত্যুসংবাদ’ নাটকটি আলাদা করে রেডিওতেও অভিনীত হয়েছিল। একজনের গলায় সূর্য চলে গিয়েছে তারপর কী হচ্ছে– এই ছিল ‘কণ্ঠনালীতে সূর্য’ নাটকের বিষয়বস্তু কিংবা ‘মৃত্যুসংবাদ’-এ একজন হারিয়ে ফেলেছেন নিজেরই নাম– এই উদ্ভটত্ব তখনকার নাটকে এসে পড়ছে সরাসরি। এই নাটকগুলোই আমার নাটক দেখার এবং আমার মনের ভূ-ত্বক ধীরে ধীরে নির্মাণ করেছে, যেভাবে গড়ে ওঠে এক প্রবালদ্বীপ।

‘অগ্নিবিষয়ক সতর্কতা ও গৌতম’ নাটকের এই নামটাই আমাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করেছিল। সে-নাটক দেখতে গিয়ে দেখলাম, হিমাংশু চট্টোপাধ্যায়, যাঁকে আমি ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করতে দেখেছি এতদিন, এই নাটকে তিনি প্রধান চরিত্রে! এই নাটকের রূপান্তর ও নির্দেশনা রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর। মূল নাটক কার লেখা, ভুলে গিয়েছি। নগরের কেন্দ্রে স্থাপিত এ নাটক। এক ধনী মানুষের বাড়ি আর তার গাড়িবারান্দাটুকু দেখা যায়। সদ্য সন্ধের দিকে একজন ক্লান্ত ভবঘুরে মানুষ এসে আশ্রয় চায় সেই বাড়িতে। গাড়িবারান্দার কোণে তাকে থাকতে দেওয়া হয়। রাত একটু বাড়লে, সন্ধে উত্তীর্ণ হচ্ছে যখন, তখন আরও এক ভবঘুরে আসে ও আশ্রয় চায়। তাকেও থাকতে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে রাত গভীর হয়। তৃতীয় ভবঘুরে আসে। তার আর আশ্রয় চাওয়ার দরকার হয় না, সে গাড়িবারান্দায় সহজেই স্থান পায়। শেষরাত্রে আসে চতুর্থ ভবঘুরে। পরের দিন সকালে, সবাই দ্যাখে, পুরো বাড়িটাই ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছে! এই নাটকের কিছু দিন আগেই নকশাল আন্দোলন থেমে গিয়েছে। গোপন পথ ধরে গেরিলা নাকশতা এঁকেবেঁকে জড়িয়ে আছে এই নাটকটিকে। পরে এই হিমাংশু চট্টোপাধ্যায় ‘নান্দীকার’ ছেড়ে দিয়ে ‘নাটুয়া’ নামের একটি দলও গড়েছিলেন। তারপর নাটক-অভিনয়-কলকাতা– সব কিছু থেকে একেবারে সরে গিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন তাঁর আর কোনও খোঁজ পাই না। নাটক দেখি। যেমন আগেও দেখতাম। যেমন হারিয়ে যায় সবাই, সেরকমই হারিয়ে গিয়েছেন হিমাংশু চট্টোপাধ্যায়, ধরে নিয়েছিলাম এমনটাই।

zoom
হিমাংশু চট্টোপাধ্যায়

আমাদের রাণাঘাটে, আমার চেয়ে বছর তিনেকের বড় এক কবি আসতেন। তাঁর নাম তপন ভট্টাচার্য। থাকতেন ফুলিয়ায়। তিনিই কথায় কথায় একদিন বললেন, ‘আমাদের ওখানেই হিমাংশুদা থাকেন এখন। কলকাতায় নাটক করতেন। এখন, সকাল-সন্ধে ছাত্র পড়ান। বাকি সময় একাই থাকেন। বইপত্র পড়েন।’ ‘আমায় নিয়ে যাবেন?’ তপনদা সত্যি সত্যিই আমাকে নিয়ে গেলেন একদিন।

অ্যাসবেসটসের চাল। বেড়া ঠেলে খানিক হেঁটে তাঁর কাছে পৌঁছনো। হিমাংশু চট্টোপাধ্যায়, প্রথমটায়, বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। তখন আমি লিখি মূলত লিট্‌ল ম্যাগাজিনেই। আমার লেখা তিনি পড়েছেন, তা নয়। তিনি আশ্চর্য হয়েছিলেন এই ভেবে যে, বহুরূপীতে অভিনয় করেছেন, তা জানি, তাঁর লেখাও পড়েছি এবং নান্দীকার-এ ‘অগ্নিবিষয়ক সতর্কতা ও গৌতম’-এ প্রধান চরিত্র করেছেন, তাও পর্যন্ত জানি! ফুলিয়া বেলেমাঠের মতো নির্জন জায়গায়, স্ব-উদ্যোগে এই বিচ্ছিন্ন জীবনে, এমন কেউ এসে পড়বে তাঁর খোঁজ নিতে কোনওদিন, তিনি ভাবেননি। উত্তেজিত হয়ে আলমারির দিকে এগলেন। হাত বাড়িয়ে বের করলেন এক বোতল রাম। ভর দুপুরবেলা। রাম খেতে থাকলেন। তপনদা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বটে, সেসবে পাত্তা না-দিয়ে বললেন, ‘তপনবাবু, আপনি কবিতা শোনান।’ তপনদা একটু সংকুচিত মানুষ। আমি বলে উঠলাম, ‘হ্যাঁ, আমরা শোনাব তো বটেই, আচ্ছা, আপনার ওই সময়টা…’

বসে-যাওয়া খেলোয়াড়, বসে-যাওয়া রাজনীতিবিদ, বসে-যাওয়া সংগীতজ্ঞ, বসে-যাওয়া অভিনেতা– আমি দেখেছি জীবনভর। ওঁরা কিন্তু অপেক্ষা করে থাকেন অজান্তে, কখন ওঁদের উৎস থেকে পাথরটা সরিয়ে দেবে কেউ– তারপর অনর্গল ঝরনা! ওঁকে যখন ওই পুরনো সময়ের টুকিটাকি কথা জিজ্ঞেস করছি, উনি আমাকে বলে চলেছেন এ-ক-টা-না তাঁর সময়, তাঁর দেখা অভিনেতা-নির্দেশক, এমনকী, নিজেরও অভিনয়ের কথা।

‘আপনি কি কবিতা লেখেন? তপনবাবু তো লেখেন।’
‘ওই, একটু লিখি আর কী…’
‘কই, পড়ুন, পড়ুন!’
‘আজকে তো আনিনি। আচ্ছা, আপনার…’

আমি ফের ওঁর নাটকের জীবনে ঢুকে গেলাম। হিমাংশুবাবু, সেদিন যে-গল্প বলেছিলেন, তা যে সত্যি, তা মাত্র বছর দুই আগে, সম্ভবত ‘বহুরূপী’ পত্রিকায় লিখিত আকারে প্রকাশ পেয়েছে। পত্রিকার সংখ্যাটি আমি দেখেছি চিত্রপরিচালক শৈবাল মিত্রের বাড়িতে। এক উজ্জ্বীবিত তরুণ সে পত্রিকার সম্পাদক এখন– অংশুমান ভৌমিক। কী সেই গল্প? তা হল, কী করে ‘রাজা অয়দিপাউস’ অনুবাদ হয়েছিল। শম্ভু মিত্র, ভূমিকায় লিখেছিলেন যে, অনুবাদ করা হয়েছিল ইয়েটস-কৃত ইংরেজি সংস্করণ থেকে, সরাসরি মূল গ্রিক নাটক থেকে নয়। শিশিরকুমার দাশের যে বই, তা গ্রিক থেকে অনুবাদ। সেখানে মূল নাটকের সবটাই পাওয়া সম্ভব। অনুবাদের সময় শেষদিক কয়েকটা লাইন বাদও দিয়েছিলেন শম্ভু মিত্র। তার জন্য তাঁকে মৃত্যুর ১৬ বছর পরেও অভিযুক্ত হতে হয় ছাপার অক্ষরে। তিনি এ নাটকের অনুবাদক, প্রধান অভিনেতা, নির্দেশকও। বাকি সকলকে কী করে গলা তুলতে হবে, নামাতে হবে– তিনিই বলেছেন। এই স্বরাভিনয়ের অংশটুকু আমি শুনেছি যদিও দেবতোষ ঘোষের কাছে, বিশদভাবে, কিন্তু প্রথম জানতে পারি এক অপরাহ্নবেলায় আধোমত্ত অভিনেতা হিমাংশু চট্টোপাধ্যায়ের কাছে।

zoom
‘রাজা অয়দিপাউস’ নাটকের একটি দৃশ্যে শম্ভু মিত্র ও কোরাস– শান্তি দাস, কুমার রায় ও দেবতোষ ঘোষ

দেবতোষ ঘোষ তিনজন কোরাসের একজন ছিলেন– বাকি দু’জন: শান্তি দাস ও কুমার রায়। রাজা অয়দিপাউস যতক্ষণ মঞ্চে, তার আগে থেকেই তাঁরা মঞ্চে ছিলেন। এবং রাজা অয়দিপাউস যখন চলে যাচ্ছে, তার পরেও তাঁরা থাকছেন। একদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ চলেছিল বিশেষ একটা সংলাপের। শেষ মুহূর্তে, নাটক থেকে বাদ পড়েছিল সেই সংলাপ। তখন তৃপ্তি মিত্র না কি বলেছিলেন, ‘ছেলেগুলোকে দিয়ে এত পরিশ্রম করালে! যাও, তোমরা বাড়ি যাও তো!’ এই পরিশ্রম যিনি করাচ্ছেন, তিনি কীভাবে অনুবাদ করছেন?

পিয়ানো নিয়ে বসেছেন। মেঝেতে বসে আছেন দু’জন। একজন বহুরূপীরই কোনও সদস্য, আরেকজন হিমাংশু চট্টোপাধ্যায়। হাতে খাতা-কলম। পিয়ানোর ওপর আঙুল রাখছেন, বাজাচ্ছেন, আর পিয়ানোর স্বরগ্রামের সঙ্গে নিজের কণ্ঠ তুলে লাইনগুলো বলছেন। কখনও-সখনও বলার পর সংশোধনও করছেন। ‘এটা লেখো।’ ‘ওটা বাদ দাও।’ ‘এইবার এই-টে লেখো।’ অর্থাৎ, তিনি অনুবাদ ও অভিনয়– একইসঙ্গে করছেন! অভিনয় করতে করতেই অনুবাদ। স্বরগ্রামের কী কী কাজ হবে, কোথায় কী স্বর লাগবে– তা নাটকের এই প্রাথমিকতম স্তরেই অনুবাদক শম্ভু মিত্র দেখে নিচ্ছেন। কাগজ-কলম নিয়ে নয়– পিয়ানো নিয়ে, সংগীতে ভর করে। লিখিয়ে নিচ্ছেন ঘরে উপস্থিত বাকি দু’জনকে দিয়ে।

zoom
শম্ভু মিত্র। ঋণ: পঞ্চম বৈদিক

হিমাংশু চট্টোপাধ্যায়কে একদিন, তাঁর ফুলিয়ার ঘরে, মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যুরও অনেকদিন পর, এই সত্যিকারের ঘটনার লিখিত রূপ প্রকাশ পেল পত্রিকায়। এবং শৈবাল বসু স্বরের যে ওঠানামার কথা বলেছিলেন ‘হায়’ প্রসঙ্গে, বুঝতেই পারছেন, তার একটি বাস্তব যুক্তিগ্রাহ্য প্রমাণ রয়েছে।

যাঁরা ‘রাজা অয়দিপাউস’ নাটকটি দেখেছেন– তাঁরা খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই যে, একটা সময় অয়দিপাউস খুব ক্রুদ্ধ হয়ে যায়। অকারণেই সন্দেহ করতে থাকে এক অন্ধ দৈবজ্ঞকে। তার নাম: তাইরেসিয়াস। রাজার নির্দেশে তাকে ডেকে আনা হয়, বলা হয়– তুমিই এই ষড়যন্ত্র আমার বিরুদ্ধে রচনা করেছ। যা তাইরেসিয়াস আদৌ করেনি। এই সময়ই, নাটকে, একটি সংলাপ তাইরেসিয়াসের: ‘কী ভয়ংকর সেই জ্ঞান, যে জ্ঞানে মানুষ কেবল দেখতে পায় কিন্তু প্রতিরোধ করতে পারে না।’ এ লেখকের বলা চিরকালের কথা যেন। যে কবিতা লেখে, তার পক্ষে তো সমাজ পাল্টানো সত্যিই অসম্ভব! অয়দিপাউস বারবার করেই বলছে, এত কিছু তুমি দেখতে পাচ্ছ, করতে পারছ না তো কিছু! বলছে, কী পাপ হচ্ছে, কে করছে দেখো, তাকে শাস্তি দেব, নগর থেকে নির্বাসিত করব। জবাবে তাইরেসিয়াসের সংলাপ চলে যাচ্ছে কখনও এদিকে, কখনও ওদিকে। মূল পাপী কে, তা একবারও উচ্চারণ করছে না তাইরেসিয়াস।

zoom
বহুরূপী পত্রিকার কয়েকটি প্রচ্ছদ

একই নাটকে পরস্পরকে আঘাতরত দুই চরিত্র– তাইরেসিয়াস ও অয়দিপাউস, যেন আজকের দিনের কবির দু’টি টুকরো হয়ে একই মঞ্চের দুই পাশে দাঁড়ায়, একই সমাজের দুই পাশে। অন্ধ তাইরেসিয়াসের আছে সেই জ্ঞান, যাতে সব দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু ক্ষমতাকে অভিশাপ দেওয়া ছাড়া, স্পষ্ট উচ্চারণের সময় তখনও আসেনি বলে মনে করছে সে। আলোক সরকার তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন, ‘উচ্চারণসাধ্য নয় সব কিছু’। আর অয়দিপাউস, যে বলে সত্য কী, তা আমাকে জানতে হবে– সে-ও ক্রোধান্ধ হয়ে তার যুক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ক্রোধের ধর্মই হল যুক্তি থেকে মানুষকে সরিয়ে দেওয়া। এবং অতিরিক্ত ক্রোধ যুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে দেয় মানুষের পায়ের তলার মাটি। মানুষ তখন শাসক। অয়দিপাউসের শাসক-রূপ এখানে। কিন্তু অয়দিপাউস শেষ পর্যন্ত শাসক হয়েও নিজের বিরুদ্ধে এগতে এগতে নিজেরই সব প্রতিষ্ঠা ধ্বংস করে ফেলে। এখানেই অয়দিপাউস ‘প্রতিষ্ঠা’ তথা ‘প্রতিষ্ঠান’-এর বিরুদ্ধে চলে যায় নিজের বিরুদ্ধে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। যদিও কোনও শাসক আজ নিজের বিরুদ্ধে যেতে প্রস্তুত নয়– তবু অয়দিপাউস নিজের বিরুদ্ধে গিয়ে, নিজের চরম কলঙ্কজনক সত্য খুঁড়ে বের করে নিজের সমস্ত প্রতিষ্ঠা থেকে নিজেকে বিচ্যুত করে হয়ে ওঠে কবিরই প্রতিরূপ। অন্যদিকে, অন্ধ তাইরেসিয়াসের সঙ্গে সে-ও একই ভূমিতে দাঁড়িয়ে, কারণ নিজেকে শাস্তি দিতে নিজেকে অন্ধ করেছে সে। কবিকে বাইরে অন্ধ মনে হলেও, জগতের কবি কখনও অন্ধ নন। তাই এই নাটক ৪২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে আজ পর্যন্ত চলে আসছে।

zoom
বহুরূপীর প্রথম নাট্যোৎসবের বিজ্ঞাপন। ১৯৫০

১৯৭২ সালে, বহুরূপীর এক নাট্যোৎসব হয়েছিল কলামন্দিরে, চারটি নাটক ছিল সেখানে। তার মধ্যে, ‘রাজা অয়দিপাউস’ও ছিল। এই উপলক্ষে বহুরূপী কর্তৃক প্রকাশিত ব্রোশিওরে প্রত্যেক নাটক সম্বন্ধে এক পাতার একটি গদ্যরচনা প্রকাশ পায়, যার উল্টোদিকে ছিল ভূমিকালিপি। গদ্যরচনাগুলি সবই অস্বাক্ষরিত। অয়দিপাউস বিষয়ক গদ্যরচনাটিতে একটি বাক্য ছিল অবিকল এইরকম: ‘অয়দিপাউস আজও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটে।’ সেদিন এর অর্থ বুঝিনি। আজ একটু একটু অনুমান হয়, সংগীতজ্ঞরা যাকে বলে ‘অন‌্দাজ’। দেবতোষ ঘোষের কাছে অনেক পরে জানতে পারি, এই চারটি গদ্যরচনারই লেখক ছিলেন শম্ভু মিত্র।

zoom
বহুরূপী পত্রিকার কয়েকটি প্রচ্ছদ

মঞ্চটিতে ছিল তিন ধাপ সিঁড়ি, খানিকটা গিয়ে অন্ধকারে মিশে গিয়েছে– যা প্রাসাদে প্রবেশের আভাস। শেষ দৃশ্যে হামাগুড়ি দিতে দিতে প্রায় জন্তুর মতো অয়দিপাউস সেই অন্ধকারে ঢুকে যায়। তার আগে ওই সিঁড়িতেই তার দাপট। তিনধাপ উঠছে, দু’ধাপ নামছে। বাঁদিকে-ডানদিকে ঘুরছে। তাইরেসিয়াসের প্রতি নিক্ষেপ করছে গর্জন!

ট্রেনে যত ভিক্ষুক, বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, অন্তত যেত, তাঁদের হাত ধরে আছে একটি বালক। অন্ধ তাইরেসিয়াসকে এই যে নিয়ে আসা হল দর্শকদের সামনে, তার সঙ্গে সঙ্গে এসেছে এক বালক। খালি গা, বল্কল জাতীয় পোশাক পরা। তাইরেসিয়াস দাঁড়িয়ে প্রথম সিঁড়িতে, বাঁদিকে। অয়দিপাউস বলে উঠছেন: ‘নী-চ্‌-এর অধিক নী-চ্‌!’ এই ‘নী-চ্‌’ কথাটা, এমনই চাপা স্বরে, আর শেষে শোনা যাবে একটি হসন্তপ্রয়োগ। সূচের মতো বিঁধছে তা। মনে হবে এই দুই ‘নীচ্‌’ দিয়ে ভূগর্ভে ফেলে দিলেন এই উচ্চারণ। তাইরেসিয়াসকেও ভূগর্ভের মধ্যেই ফেলে দেওয়া হচ্ছে এভাবে। ‘নী’ এবং তারপরে ‘চ’– এই বর্ণটির মাঝখানে সামান্য এক বিরতি নিয়ে নীচ কথাটি ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘ-ই-এর এমন তীব্র প্রয়োগ আমি এর পূর্বে-পরে দেখিনি। এই সংলাপে এসে মিশছে রাজার ক্রোধ। প্রভুত্বকামিতা ও শাসকের ভঙ্গি। তা দেখা যেত রাজার চোখের দিকে তাকালে। ঘন কাজলের প্রলেপ সেই চোখে। আর তাইরেসিয়াসের অভিনেতা যিনি, তাঁর চোখ কালোবর্ণ দিয়ে ঢাকা। দর্শকাসন থেকে দেখলে মনে হত, ওইখানটা গর্ত হয়ে আছে। দেবতোষ ঘোষের কাছে শুনেছি, এমনভাবেই মেকআপ হত যে মনে হয় যেন চোখের কোটরে কিচ্ছু নেই! ফলে তাইরেসিয়াস চোখের কোনও অভিব্যক্তি দেখাতে পারছেন না ওই মুহূর্তে। কণ্ঠস্বর দিয়ে বলছেন, যা বলার।

zoom
বহুরূপী পত্রিকার কয়েকটি প্রচ্ছদ

ওই যে বালকটি, সে তার প্রভুকে সবথেকে বেশি শ্রদ্ধা করে। সে-ই তো তার প্রভুকে হাত ধরে ধরে এই মঞ্চে নিয়ে এল। এখন সেই প্রভুর যে অপমান হচ্ছে, সে বুঝতে পারছে। প্রচণ্ড অপমানের উত্তরে, তাইরেসিয়াসের অভিনেতা কণ্ঠ আর শারীরিক কম্পন ছাড়া আর কোনও উপায়েই অভিব্যক্তি প্রকাশ পারছেন না। তাহলে একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে। সেই ফাঁক পূরণ করছে কে? ওই বালকটি। যতবার আক্রমণ আসছে অয়দিপাউসের থেকে, তখন এই বালকটি তার তীক্ষ্ণ, জ্বলজ্বলে, মণিময় চোখ দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকছে রাজার দিকে। তার সংলাপ নেই কোনও। অয়দিপাউসের প্রভুত্ব, অয়দিপাউসের ক্রোধ, সুঠাম শরীর– কিছুকেই ভয় পাচ্ছে না সে বালক। তিরস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র তাকিয়ে থাকা তার। সে-দৃষ্টিও সমান অগ্নিবর্ষী। হতে পারে তার ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, হতে পারে তার পোশাক বল্কলের, হতে পারে খালি পা– কিন্তু তার তেজ সর্বশক্তিময় রাজার বিরুদ্ধে– অকারণ এক জ্ঞানী মানুষকে অপমান করার জন্য।

zoom
শিল্পী: দীপঙ্কর ভৌমিক

এই ছেলেটি আমার পূর্ব-পরিচিত। এই লেখা পড়তে পড়তে আপনাদেরও পূর্ব-পরিচয় হয়ে গিয়েছে। এর কাছ থেকেই তো বহুরূপী পত্রিকা কিনি, বই কিনি। দলের নানা জিনিস নিয়ে এই ছেলেটিই তো বসে থাকে বইপত্র আগলে। ‘রাজা অয়দিপাউস’-এ সে-ই তাইরেসিয়াসের হাত-ধরা বালক! তাইরেসিয়াসের অভিশাপ এসে পড়ে: ‘যদিও এখনো তার দৃষ্টিশক্তি আছে তবু তাকে অন্ধের মতো– যদিও এখনো তার প্রচুর ঐশ্বর্য আছে তবু তাকে ভিক্ষুকের মতো– লাঠি দিয়ে মাটি ঠুকে কোনো এক দূর অপরিচিত দেশে আশ্রয় নিতে হবে।’

বৃদ্ধ তাইরেসিয়াস এই ভবিষ্যৎবাণী উচ্চারণ করতে করতেই মাটিতে পড়ে যায়। বালকটি তাকে তুলে ধরে। হাতে লাঠি ধরিয়ে দেয়। মঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার আগে, শেষবার রাজার দিকে ঘুরে তাকায়। সেই বালকের দৃষ্টি তেমনই অগ্নিবর্ষী।

এই বালক, পরে, খুবই বিখ্যাত হয়েছিলেন, অভিনেতা ও নির্দেশক হিসেবে। তাঁর নাম রমাপ্রসাদ বণিক।

…………………………………
অনুলিখন: সম্বিত বসু
ঋণ: দেবাদিত্য মুখোপাধ্যায়

bengali poet Bohurupi Debatosh Ghosh Joy Goswami Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar sankha ghosh Shambhu Mitra shymol ghosh Theatre triptri mitra বহুরূপী বাংলা নাটক

Share this article on