Robbar

জীবনের মাস্তুলহীন নাবিক

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 20, 2026 9:28 pm
  • Updated:July 21, 2026 1:50 am  

হেমিংওয়ে বেছে নিয়েছিলেন ভাবনার একাকিত্ব। বেছে নিয়েছিলেন মদের সর্বগ্রাসী আগুন। তাঁর লিভারটা দেখা যেত শার্টের তলা থেকে। ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’র মতো উপন্যাস যিনি লিখতে পারেন, তাঁর কি আর কিছু লেখার দরকার আছে? এমন মাস্টারপিস পৃথিবীতে ক’টা লেখা হয়েছে? ১৯৫৪ সালে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিনি। তাঁর গদ্য ইংরেজি ভাষাকে নতুন পথ দেখিয়েছে।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

১০৩.

তাঁর জীবনের সবথেকে বড় দু’টি ঘটনা এই জুলাই মাসেই। ১২৭ বছর আগে, ২১ জুলাই ১৮৯৯ সালে তাঁর জন্ম। ৬৫ বছর আগে ১৯৬১ সালের ২ জুলাই, ৬২ বছর বয়সে তাঁর আত্মহত্যা! তিনি ১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী আমেরিকান সাহিত্যিক আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে।

আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে

কয়েকটি শব্দ। একটি বাক্য। তাঁর চাই। তিনি অপেক্ষা করছেন। কিছুতেই ধরা দিচ্ছে না সেই কয়েকটি শব্দ। সেই একটি বাক্য। তিনি চাইছেন সহজ কয়েকটি শব্দ, যার কোনও বিকল্প নেই। সরল একটি বাক্য, যার কোনও বিকল্প হতে পারে না। শীতকাল। তিনি ফায়ার প্লেসের সামনে। কমলালেবুর খোসা ছাড়াচ্ছেন। খোসার টুকরো একটা একটা করে ছুড়ে দিচ্ছেন তিনি, অগ্নিকুণ্ডে। তিনিও দগ্ধ হতে চান কমলার নরম খোসার মতো। কয়েকটি সৎ শব্দ। একটি সত্য বাক্যের জন্য। দগ্ধ না হলে কি পাওয়া যায় ভিতর থেকে উঠে আসা একটি নিটোল সত্য বাক্য?

তিনি পেলেন অবশেষে। জীবনের একেবারে শেষে এসে তিনি ভাবছেন ২২ বছরের নিজেকে। তিনি প্যারিসে। তিনি ফরাসি ভাষাটা জানেন প্রায় ফরাসিদের মতোই। তিনি থাকতে চান প্যারিসে। কেননা তিনি হতে চান ইংরেজি ভাষায় লেখক। যদিও তিনি এখন আমেরিকান সাংবাদিক, প্যারিসে থাকেন। এই সময়টা নিয়ে তিনি লিখছেন, মানে এই সময়ে তাঁর জীবনটা নিয়ে তিনি লিখছেন, প্যারিসও তাঁর বিষয়, তিনি তাঁর যৌবনের প্যারিসের জন্য মনকেমন থেকে লিখছেন, ‘আ মুভেবল ফিস্ট’!

তিনি বারবার লিখবেন এই বই। কোনওদিন শেষ করতে পারবেন না। তার আগেই তো তিনি মুখের মধ্যে বন্দুক পুরে ট্রিগার টেনে দেবেন! মুহূর্তে ব্রেনটা ফেটে ছিটকে বেরিয়ে যাবে খুলি উড়িয়ে। এইসব তিনি কিছুই জানেন না। তিনি অপেক্ষা করছেন ‘আ মুভেবল ফিস্ট’-এর প্রথম ছ’টি শব্দের জন্য, যে ছ’টি অমোঘ শব্দ সম্পূর্ণ করবে ‘আ মুভেবল ফিস্ট’-এর ওপেনিং সেনটেন্স।

এই সেই প্রথম বাক্য, এইভাবে পৃথিবীর আর কোনও বই কখনও শুরু হয়নি, বস্তাপচা ব্যাকরণকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে: Then there was the bad weather.

প্যারিসের পানশালায় হেমিংওয়ে

১৯২১ সাল। হেমিংওয়ে ২২। তিনি প্যারিসে। খুঁজে পেয়েছেন একটা জুতসই লেখার টেবিল। একটা শুঁড়িখানায়। বৃষ্টির সকাল। ঝাপ্টা ঠান্ডা বাতাসের স্যাঁতসেঁতে সকাল। রেনকোট গায়ে সকালবেলাতেই বেরিয়ে পড়েছেন হেমিংওয়ে, সস্তার বাসা থেকে কাছেই একটা পছন্দের শুঁড়িখানায় টেবিল নিয়ে, রাম খেতে খেতে, ছোটগল্প লেখার জন্য। কী করে ছোটগল্প লেখা পানশালায় টেবিল বাগিয়ে, মদ নিয়ে শুরু করতে হয়, কীভাবে এক সময় গল্পটা নিজে নিজেই নিজেকে লেখে, লেখকের হাত থেকে বেরিয়ে যায় এবং কীভাবে সামনের টেবিলে বসে থাকা এক নিঃসঙ্গ তরুণী সেই গল্পে ঢুকে পড়ে– এইসব বরং শোনা যাক হেমিংওয়ের কাছ থেকেই, তাঁর অনন্য ইংরেজিতে:

All of the sadness of the city came suddenly with the first cold rains of winter. It was a pleasant cafe, warm and clean and friendly, and I hung up my old waterproof on the coat rack to dry and put my worn and weathered felt hat on the rack above the bench and ordered a cafe au lait. The waiter brought it and I took out a notebook from the pocket of the coat and a pencil and started to write, and since it was a wild, cold, blowing day it was that sort of day in the story. In the story the boys were drinking and this made me thirsty and I ordered a rum St. James. This tasted wonderful on the cold day and I kept on writing, feeling very well and feeling the good Martinique rum warm me all through my body and my spirit.

প্যারিসের হেমিংওয়ে

এর পরেই পানশালায় ওই তরুণীর আবির্ভাব। যার কথা আগেই বলেছি। তরুণী এসে বসল সামনে, জানলার ধারে। ভারি সুন্দর দেখতে! মুখটা এত তাজা, যেন সদ্য তৈরি ঝকঝকে মুদ্রা। যদি অবশ্য ওরা, কয়েন মিন্ট করে যারা, তারা যদি কোনওদিন বৃষ্টিমাজা নরম শরীরের মুদ্রা তৈরি করত!
‘A girl came in the cafe and sat by herself at a table near the window. She was very pretty with a face fresh as a newly minted coin if they minted coins in smooth flesh with rain freshened skin.’

এবার এই মেয়েটির চুলের স্টাইল বর্ণনায় যে-কথা লিখেছেন হেমিংওয়ে সেটা তাঁর ভাষায় উদ্ধৃত করছি। কেননা ব্যাপারটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। এই সেই বর্ণনা:
“and her hair black as a crow’s wing and cut sharply and diagonally across her cheek.”

বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে ওঠে আমার। এই মেয়ে তো সিলভিয়া বিচ, হেমিংওয়ের বন্ধু, প্যারিসে একমাত্র শুধু ইংরেজি বইয়ের দোকান ‘শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি’র মালকিন, তাকে কল্পনা করছেন হেমিংওয়ে, সে যেন ২২ বছরের হেমিংওয়ের সামনে এসে বসেছে পানশালায়। সামনে যে মেয়েটি এসে বসেছে বা বসেনি, প্রায় ৪০ বছর পরে, ৬০ বছর বয়সের কাছাকাছি এসে, অনির্ণেয় মেদুরতায় তাকে সিলভিয়া ভাবতে ভালো লাগছে হেমিংওয়ের। কিন্তু কেন আমি বলছি এ-কথা, কেউ যা বলেনি? তার কারণ সিলভিয়া বিচের রূপ তাঁর বর্ণনায় হুবহু এই ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন হেমিংওয়ে:
Sylvia had a lively, sharply sculptured face, brown eyes that were as alive as animal’s and as gay as a young girl’s, and wavy brown hair that was brushed back from her fine forehead and cut thick below her ears and at the line of the collar of the brown velvet jacket she wore. She has pretty legs and she was kind, cheerful, interested and loved to make jokes and gossip. No one that I ever knew was nicer to me.

সিলভিয়া বিচের সঙ্গে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (ডানদিকে)

যে মেয়েটি তরুণ হেমিংওয়ের সামনে বসে আছে, আর নস্টালজিয়া থেকে যে সিলভিয়ার বর্ণনা করছেন হেমিংওয়ে, তাদের একজনের চুল কালো, অন্যজনের বাদামি, কিন্তু এই পার্থক্য সত্ত্বেও, সাদৃশ্যের অন্তরস্রোত চোখে পড়ার মতো। এরপর আকস্মিক এক রোম্যান্টিক বিষাদের স্বীকারোক্তিতে হেমিংওয়ে, যার মধ্যে কোনও মিথ্যে নেই:
I looked at her and she disturbed me and made me very excited. I wished I could put her in the story, or anywhere, but she has placed herself so she could watch the street as and the entry and I knew she was watching for someone. So I went on writing.

এই তরুণী একলা নয়। সে আর একজনের। তার জন্য পানশালার জানলার ধারে পথ চেয়ে অপেক্ষা করছে। হেমিংওয়ে কি ঈর্ষান্বিত? হেমিংওয়ে যেন নিজের সঙ্গে কথা বলছেন, কোথাও ঠোক্কর নেই এতটুকু। একেবারে ফ্রি ফ্লো স্টাইলে লেখা, না কি স্বগতোক্তি? লেখাটা নিজেই নিজেকে লিখে চলেছে: আমি তার সঙ্গে দৌড়ে পাল্লা দিতে পারছি না। হাল ছেড়ে দিয়ে আর একটা সেন্ট জেমস রাম অর্ডার দিয়েছি। মাঝে মাঝে চোখ তুলে তরুণীকে দেখছি।

পেনসিলটাকে এবার পেনসিল-কাটা যন্ত্রে ঢোকাতে হবে। তাই করলাম। পেনসিলের ছাল তার গা থেকে কুঁকড়ে বেরিয়ে আমার ড্রিংকের তলায় রাখা প্লেটের ওপর জড়ো হতে লাগল।

The story was writing itself and I was having a hard time keeping up with it. I ordered another rum St. James and I watched the girl whenever I looked up , or when I sharpened the pencil with a pencil sharpener with the shavings curling into the saucer under my drink.

পানাহারে মজে হেমিংওয়ে

এইবার ওই তরুণীর প্রতি হেমিংওয়ের এক অসামান্য স্বগতোক্তি!

I have seen you , beauty, and you belong to me now, whoever you are waiting for and if I never see you again, I thought. You belong to me and all Paris belongs to me and I belong to this notebook and this pencil.

কিন্তু প্যারিস তো অনেক পুরনো এক শহর। আর আমরা ঝলমলে নতুন। আর কোনও কিছুই সহজ নয়। দারিদ্র, তাও সহজ নয় এখানে। যেমন সহজ নয় আকস্মিক অর্থ। চাঁদের আলোও সহজ নয়। কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল, সহজ নয় বোঝা। কেউ চাঁদের আলোয় তোমার পাশে শুয়ে শ্বাস নিচ্ছে, তা-ও সহজ ব্যাপার নয়।
But Paris was a very old city and we were young, and nothing was simple there, nor even poverty, not sudden money, nor the moonlight, nor right or wrong, nor the breathing of someone who lay beside you in the moonlight.

থাকবেন? তারপর তার জন্য দু’-তিনটে খুন করে লিবারেট করবেন প্যারিসকে? ভয়মুক্ত করবেন শরীরটাকে? কিন্তু যে মানুষ প্যারিসের জোছনায় পাশে ঘুমিয়ে আছে, তারও সঙ্গে সম্পর্কটা কি এককথায় বোঝার মতো সহজ? কারণ, শহরটার নাম প্যারিস। ‘নাথিং ইজ সিম্পল দেয়ার’! কিন্তু সিলভিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে প্রবল আবেগে তাঁকে প্যারিসের রাস্তায় বনবন করে ঘোরাবেন হেমিংওয়ে, তারপর তাকে চুমু খাবেন আর রাস্তার লোকেরা আনন্দে হাততালি দেবে!

হেমিংওয়ের প্যারিস, ইতিহাসের পাতা থেকে

গল্পটা বরং সিলভিয়ার মুখে সরাসরি শোনা যাক:
একদিন সারিবদ্ধ জিপগাড়ি, মার্কিন সৈনিকে ভর্তি, এসে দাঁড়াল আমার বাড়ির সামনে। শুনতে পেলাম সেই পুরনো ডাক, সিলভিয়া! সিলভিয়া! কণ্ঠে সেই গভীর পৌরুষ! এ তো হেমিংওয়ে! আমি পাগলের মতো ছুটে রাস্তায় লাফিয়ে পড়লাম। আর লাগল ধাক্কা হেমিংওয়ের সঙ্গে। ব্যস, আমি চুরমার হয়ে পড়ে গেলাম রাস্তায়। আর হেমিংওয়ে আমকে অবলীলায় কোলে তুলে ঘোরাতে লাগল আর চুমু খেতে লাগল:
I flew downstairs; we met with a crash; he picked me up and swang me around and kissed me while people on the street and in the windows cheered. Hemingway was in battle dress, grimy and bloody. He wanted to know if there was anything he could do for us. We asked him if he could do something about the Nazi snipers on the roof tops in our street. He got his company out of the jeeps and took them up to the roof. We heard firing for the last time. Hemingway and his men came down again and rode off in their jeeps.

এর পরে আমাদের রাস্তায় আর কোনওদিন বন্দুকের আওয়াজ শুনিনি। হেমিংওয়ে প্যারিসকে ‘মুক্ত শহর’ করে মিলিয়ে গেল।

কাছে, তবু দূরে: হেমিংওয়ের সঙ্গে সিলভিয়া বিচ

এবার আমি, সিলভিয়া, একটা বেদনার কথা বলি।

হেমিংওয়ে হয়তো আমার প্রেমে পড়েছিল। যদিও সে তখন বিবাহিত। কিন্তু তারপর আমাদের সামনেই ওর বিয়েতে ভাঙন ধরল। চারবার বিয়ে করল। প্রেমিকার সংখ্যা হাতে গুনে শেষ করা শক্ত। দুর্ধর্ষ লেখক। ক্রমশ সারা পৃথিবী তোলপাড় করা জিনিয়াস। মেয়েদের সঙ্গে সবসময় খুব ভালো ব্যবহার করত না। কিন্তু আমার সঙ্গে সব সময় মধুর। আমি কিন্তু ওকে গভীর আঘাত দিয়েছি। ওর প্রেম জীবন যে ছিন্নভিন্ন হয়েছে, খানিকটা হয়তো আমার কারণে।

হেমিংওয়ে যখন জানল আমি লেসবিয়ান, আমার পক্ষে কোনও পুরুষকে ভালোবাসা সম্ভব নয়, চুপ করে সেই শক সহ্য করেছিল। কিন্তু কোনও মেয়েকেই ভালোবাসতে পারেনি। আমার জীবনে একমাত্র পার্টনার অ্যাড্রিয়েন। আমার বইয়ের দোকানের কাছেই তারও বইয়ের দোকান। কিন্তু একদিন অ্যাড্রিয়েন আমাকে বলল, আমাকে একটু একা থাকতে দাও। দিলাম। পরের দিন সকালে ওর ঘরে গিয়ে দেখি, প্রাণহীন শরীরটা শুয়ে আছে। স্লিপিং পিলের ওভারডোজ! হেমিংওয়ে ঠিক লিখেছে, ‘নাথিং ইজ সিম্পল ইন প্যারিস’!

আমাকে ডি. এইচ. লরেন্স এসে বলেছিল, আমাকে বাঁচাও। আমার লেডি চ্যাটারলি’স লাভার তুমি প্রকাশ করো। আমার শরীর এবং অর্থ, দুয়ের অবস্থাই তখন খুব খারাপ। অলডাস হাক্সলি পর্যন্ত এসে আমাকে অনুরোধ করে, লরেন্সকে বাঁচাতে। আমি বাঁচাইনি। আমি বলেছিলাম, জেমস জয়েস ছাড়া আর কারওর বই আমি প্রকাশ করব না। আমি ওয়ান অথর পাবলিশার। এটা কিন্তু সত্যি, নাথিং ইজ সিম্পল ইন প্যারিস। কিছুদিনের মধ্যেই লরেন্স মারা গেল। হয়তো বাঁচাতে পারতাম।

ভালোবাসার মুহূর্ত: হেমিংওয়ের সঙ্গে মেরি ওয়েলশ

হেমিংওয়ে যাপন করেছেন এই তাড়িত জীবন। সংসার পেতেছেন সংসার ভাঙতে। একটি প্রেম শেষ হতে না হতে শুরু হয়েছে আর এক প্রেম। পর্দার আড়ালে সারাক্ষণ অপেক্ষা করেছে পরের প্রেমিকা। তবে তাঁর প্রথম প্রেম অ্যাগনেস ভন কুরোস্কি। তখন ১৯-২০ বছর বয়স হেমিংওয়ের। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল তাঁর হাঁটু। মিলানের হাসপাতালে ছ’মাস চিকিৎসার পরে ভালো হলেন। যে নার্সের সেবায় ভালো হয়ে উঠলেন সেই অ্যাগনেস তাঁর প্রথম প্রেম। বিয়ের প্রস্তাব দিলেন হেমিংওয়ে। রাজি অ্যাগনেস। দিনের পর দিন যায়। বাড়িতে অপেক্ষা করেন নিঃসঙ্গ হেমিংওয়ে। তারপর একদিন চিঠি লিখে জানায় নার্স অ্যাগনেস, সে অন্য একজনের প্রেমে পড়েছে!

যৌবনকালে হেমিংওয়ে

কালবিলম্ব না-করে হ্যাডলি রিচার্ডসনের প্রেমে পড়েন হেমিংওয়ে। হ্যাডলিকে বিয়ে করে আমেরিকা ছেড়ে প্যারিসে চলে আসেন হেমিংওয়ে। প্যারিসে বাউন্ডুলে জীবনযাপন না করে কী করে সাহিত্যিক হবেন? ১৯২১ থেকে ১৯২৭, হ্যাডলির সঙ্গে সংসার। কিন্তু ইতিমধ্যে লুকনো প্রেম শুরু হয়েছে পলিন ফাইফারের সঙ্গে। ফাইফার ‘ভোগ’ ফ্যাশন পত্রিকার সাংবাদিক। হেমিংওয়ের মনে হয়, তার লেখার টেবিল ক্রমাগত তাঁকে বলছে, এক একটা বিয়েকে জীবনের এক একটা স্টেশন মনে করবে। লেখাটাই একমাত্র সিরিয়াস কাজ। বিয়েটা খেলা! তোমাকে জীবন এবং সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করবে।

পলিন ফাইফারের সঙ্গে হেমিংওয়ে

আরেকটা জিনিস, নারীর মতোই, হেমিংওয়েকে টানে মদ। পানশালার টেবিলে বসেই হেমিংওয়ে সমস্ত জগৎ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারেন। তিনি সম্পূর্ণ মগ্ন হতে পারেন লেখায়। এবং প্রবিষ্ট হতে পারেন ভাষার শরীরে। ১৯২৭ থেকে ১৯৪০, হেমিংওয়ের দ্বিতীয় বিয়ে ভাঙে। ১৯৪০ এই তৃতীয় বউ, নতুন সংসার, মার্থা গেলহর্নের সঙ্গে। স্প্যানিশ সিভিল ওয়ার এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বউকে নিয়ে এই তাণ্ডবের মধ্যে ঢুকে পড়েন হেমিংওয়ে। লেখক পরিচিতি তাঁর এখন বিশ্বব্যাপী। ১৯৪৬-এ মেরি ওয়েলশের সঙ্গে হেমিংওয়ের চতুর্থ বিয়ে। ১৯৬১-তে আত্মহত্যা পর্যন্ত আর বউ বদলাননি হেমিংওয়ে।

তবে বউয়ের সঙ্গে যে খুব বেশি দেখা হত, সেটা নয়। কারণ তিনি বেছে নিয়েছিলেন ভাবনার একাকিত্ব। বেছে নিয়েছিলেন মদের সর্বগ্রাসী আগুন। তাঁর লিভারটা দেখা যেত শার্টের তলা থেকে। ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’র মতো উপন্যাস যিনি লিখতে পারেন, তাঁর কি আর কিছু লেখার দরকার আছে? এমন মাস্টারপিস পৃথিবীতে ক’টা লেখা হয়েছে? ১৯৫৪ সালে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিনি। তাঁর গদ্য ইংরেজি ভাষাকে নতুন পথ দেখিয়েছে।


১৯৬১ সাল। পানশালার টেবিলে বসে এক অলীক কণ্ঠ শুনতে পেলেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে: আর বেশি বাঁচলে হাসপাতালে ইলেকট্রিক শক ট্রিটমেন্টে আরও বেশি কষ্ট পাবে। তার চেয়ে নিজের ইচ্ছেমতো বেঁচেছ, নিজের ইচ্ছেমতো মরো। সবটাই হোক তোমার সিদ্ধান্তে। পানশালার টেবিলটার ওপর শেষবার স্নেহের হাত বোলালেন হেমিংওয়ে।

নিশানায় বুঝি জীবন, লক্ষ্যে স্থির হেমিংওয়ে

মৃত্যু কী সহজ এবং কাছের! শুধু একটিবার ট্রিগার টানার অপেক্ষা। তাঁর ‘আ মুভেবল ফিস্ট’ প্রকাশিত হবে মৃত্যুর পরে। সব ব্যবস্থা কমপ্লিট। তিনি নিশ্চিন্ত। এই একটি বই, এতবার লিখেও, শেষ হল না! কারণ, বিষয়টার যে-কোনও শেষ নেই।

বইটার শেষ প্যারার প্রথম লাইনটা মনে পড়ে গেল হেমিংওয়ের: ‘There is never any ending to Paris.’

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য লেখা

………………….