


ঠাকুরের দলে বাবু-উবুর ভেদ নেই। কারণ তাঁর কালী-সাধনা ঠিক ভদ্রলোকের ধর্ম নয়। কেশব-শিবনাথ এঁরা অবশ্য নিয়মিত ঠাকুরের কাছে আসতেন। তাঁদের বাবুধর্ম বিষয়ে ঠাকুরের নানা প্রশ্ন। পরমহংসের কৌতুকবোধের অবধি ছিল না। রামচন্দ্র দত্তের বাড়িতে ঠাকুর এসেছেন। মহেন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘পরমহংস মশাই তখন হাঁটু দুটি উঁচু করিয়া আসনখানির উপর বসিয়া… আহার করিতেছিলেন।’ এ বাবু ভঙ্গি নয়, উবু ভঙ্গি।
৩.
আপনি বাবু না উবু? বাবু কলকাতায় তিনি ছিলেন উবু মানুষ। নরেন্দ্রনাথ দত্ত তখনও ‘বিবেকানন্দ’ হননি। দক্ষিণেশ্বর থেকে মানুষটি মাঝেমাঝে সিমলে পাড়ায় আসতেন। আসতে সময় লাগত। ট্রাম, বাস, ট্যাক্সি, মেট্রোরেল– এসবের কলকাতা তো নয়। টাইম মেশিনে করে নয়, মনের চোখে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে ভর করে চলুন টুক করে একটু ঘুরে আসা যাক।
১৮৮২-’৮৩। রামচন্দ্র দত্তের বাড়িতে রামকৃষ্ণ পরমহংস মাঝেমাঝে আসতেন। সেই আসার বিবরণ পাওয়া যাবে মহেন্দ্রনাথ দত্তর লেখায়। আপনারা আবার ছাতাবাবু মহেন্দ্রনাথের কথা ভাববেন না। ইনি স্বামী বিবেকানন্দের ভাই। নরেন্দ্রনাথ, মহেন্দ্রনাথ, ভূপেন্দ্রনাথ– এই তিন ছেলের পিতা-মাতা বিশ্বনাথ আর ভুবনেশ্বরী। তিনজনেই প্রতিভাবান। নরেন্দ্রর খ্যাতি সবচেয়ে বেশি। মহেন্দ্রনাথ চমৎকার গপ্পে-ভঙ্গিতে স্মৃতিকথা লিখতেন আর ভূপেন্দ্রনাথ সশস্ত্র বিপ্লবী থেকে মার্ক্সবাদী।

মহেন্দ্রনাথের বিবরণে ঠাকুরের রূপটি বড় খোলতাই! ঠাকুরের কাছে তখন নরেন্দ্র যাতায়াত শুরু করেছে। সিমলে পাড়ার কেউ কেউ গিয়ে দেখে আসে ব্যাপারটা কী? দেখে এসে আবার ছ্যা-ছ্যা করে কেউ কেউ। কিছুকাল পরের কথা। ঠাকুর তখন কাশীপুর উদ্যানবাটীতে। লোকের মুখের ভাষায় কাশীপুর বাগান। কৈলাস ডাক্তার একদিন রামচন্দ্র দত্তকে বলেছিলেন, ‘আরে, প্রথমে গিয়ে দেখলুম যে, নরেনটা বি,এ, পাশ করে একেবারে বখে গেছে, নীচেকার হলঘরে কতকগুলো ছোঁড়া নিয়ে এলোমেলো ভাবে বসে আছে, আর… সেই চাকর ছোঁড়া, লাটু সেটাও বসে আছে, আরে ছ্যা!’ রামকৃষ্ণদেব বাবুপাড়া আর উবুপাড়া দুই দলকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। নরেন্দ্র বাবু, লাটু উবু।
এই লাটু অবাঙালি, বিহারের ছেলে। ঠাকুরের দলে বাবু-উবুর ভেদ নেই। কারণ তাঁর কালী-সাধনা ঠিক ভদ্রলোকের ধর্ম নয়। কেশব-শিবনাথ এঁরা অবশ্য নিয়মিত ঠাকুরের কাছে আসতেন। তাঁদের বাবুধর্ম বিষয়ে ঠাকুরের নানা প্রশ্ন। পরমহংসের কৌতুকবোধের অবধি ছিল না। রামচন্দ্র দত্তের বাড়িতে ঠাকুর এসেছেন। মহেন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘পরমহংস মশাই তখন হাঁটু দুটি উঁচু করিয়া আসনখানির উপর বসিয়া… আহার করিতেছিলেন।’ এ বাবু ভঙ্গি নয়, উবু ভঙ্গি।

ঠাকুরের কথাবার্তার ভঙ্গিও বাবুদের থেকে আলাদা। “কথাবার্তার ভাষা কলিকাতার শিক্ষিত সমাজের ভাষার মতো নয়, অতি গ্রাম্য ভাষা, এমনকি কলকাতা শহরের রুচি বিগর্হিত। কথাগুলি একটু তোতলার মতো। রাঢ়দেশীয় লোকের মতো উচ্চারণ; ন-এর জায়গায় ল উচ্চারণ করিতেছে, যেমন, ‘লরেনকে বললুম’ ইত্যাদি।”
রামকৃষ্ণদেবকে বাবু কলকাতা অবজ্ঞা করতে পারল না। চেষ্টার অবধি ছিল না। দক্ষিণেশ্বরের ব্রাহ্মণরা তাঁর কাছে আসতেন না। কারণ, তিনি ছিলেন নিচুজাতের কালীঠাকুরের পূজারী। মাহিষ্যদের বাবু-ব্রাহ্মণরা ‘মাড়ে’ বলতেন। তাছাড়া ঠাকুরের গলায় পইতে থাকত না। সিমলা পাড়াতেও মহেন্দ্র গোঁসাই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। বৈষ্ণব এলেও পাড়ার কোনও ভট্টাচার্য বামুন আসতেন না। ক্রমশ অবশ্য ঠাকুরের প্রভাবে, তাঁর উবু-ধর্মের প্রভাবে, জাতের আর নারী-পুরুষ ভেদের ভাবনা মুছে গেল।

রামচন্দ্র দত্তের ছাদে আহারের আয়োজন। সবাই লুচি খাচ্ছেন। জাতের বিচার মুছে যাচ্ছে। একই ছাদে নানা জাতের মানুষ। ঠাকুর খাচ্ছেন। নানা বয়সের মহিলা এসেছেন। পরিবেশন করছেন। মহেন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘কী আশ্চর্য ভাব! কাহারো মনে দ্বিধা বা সংকোচ নাই, লজ্জা বা কোনো প্রকার দৈহিক ভাব একেবারেই নাই। সকলেই পরমহংস মশাই-এর মুখের দিকে চাহিয়া আছেন, দেহজ্ঞান একেবারেই নাই। কেবা স্ত্রী কেবা পুরুষ– এসব চিন্তা কাহারো নাই, যেন অন্য এক রাজ্যে সকলে গিয়াছেন।’
বাবু দেহের মধ্যে যে অহমিকা, তা এই উবু মানুষটি অতিক্রম করেছেন। আবার উবু শরীরের মধ্যেও কি আটকে পড়া অহমিকার ঘূর্ণি থাকে না? থাকে। ঠাকুরের কাছে এক বৈষ্ণবী আসতেন, ভাবটি অন্য। এমনিতে ঠাকুরের কীর্তন শরীরটি অন্তর্মুখী। বহির্মুখী উদ্দাম কীর্তন তিনি করতেন না। একজায়গায় দাঁড়িয়ে শরীরটি ধীরে ধীরে আন্দোলিত করতেন। পায়ের গতি নির্দিষ্ট বৃত্তের বাইরে যেত না। সেই বৈষ্ণবীকে দেখে পায়ের চাপে সশব্দে নারকেল মালা ভেঙে দিলেন। ‘পেম পেম’ বলে তীক্ষ্ণব্যঙ্গে তাকে বিদ্ধ করলেন। বাবুদেশে যেমন, উবুদেশেও তেমন কত রকম ‘লুম্পেনপনা’, তাদের চেহারা চরিত্র আলাদা, প্রকাশভঙ্গি আলাদা। উদ্দেশ্য একই শরীর, আচার আর রীতিনীতির কোটরে মানুষকে আটকে রাখা। বাবুধর্মে যান্ত্রিক তত্ত্বকথা, বইমুখী মানসিক ব্যায়াম, তাদের বাইরে যারা, তাদের মানুষ বলে গণ্য না-করা।

সিমলা পাড়ার বাবুরা প্রথম প্রথম পরমহংসের প্রতি যথেষ্ট বিদ্বিষ্ট। বিদ্যার অহমিকায় বিরক্ত। মহেন্দ্রনাথ লিখেছেন, দাদা নরেন্দ্রনাথ পরমহংস সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘…একটা আকাট মুক্খু, কালীর পূজারী, কৈবর্তদের বামুন– সেইটার কাছে শিখতে শিখতে যাব? সেটা জানে কি?’ এই হল বাবুধর্মের লুম্পেনপনা। আমি ও আমরা সব জানি, বাকিরা আকাট। অন্যদিকে উবু ধর্মের লম্পটপনা, লুম্পেনপনা। মহেন্দ্রনাথ লিখেছেন– সেকালের কলকাতায় পাড়ায় পাড়ায় চক্র। সেই চক্রে দেহসাধনার নামে অবাধ যৌনাচার, নেশা। ভদ্র যুবকেরা লাঠি হাতে গিয়ে সেই সব ভেঙে দেয়। পরমহংস সিমলে পাড়ায় এসে গান ধরেছেন: ‘আর কী সাজাবি আমায়/ জগৎ-চন্দ্র-হার আমি পরেছি গলায়।’

এই গান বঙ্গদেশের লোকায়ত প্রাগাধুনিক পরম্পরার গান। সে-গানে শিকড়ের ডানা হয়, ডানার শিকড়। বাবু ধর্মের আর উবু ধর্মের অহমিকা থাকে না। পরমহংসের প্রয়াণ হল। ১৯৩৬। তাঁর জন্ম-শতবর্ষ। বঙ্গদেশের রাজনীতিতে সে-এক অস্থির সময়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পারিবারিক ব্রাহ্মধর্মের আগার থেকে অনেক দিন হল বাইরে এসেছেন। ‘মানুষের ধর্ম’ তাঁর অনুসন্ধানের বিষয়। ঠাকুরের জন্মশতবর্ষে লিখলেন, ‘বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা/ ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা।’
ধ্যান নয় ধেয়ান। যুক্তাক্ষরের অহমিকা ভেঙে যাচ্ছে। মনটি ধেয়ানে গেল। ধেয়ানে যে মন যায়, তার উবু ধর্মের সীমা খুলে যায়, বাবু ধর্মের সীমা থাকে না। এই ধর্মসাধন যেমন বাবু নরেন্দ্রকে আর উবু লাটুকে মিলিয়ে দেয়, তেমনই রবীন্দ্র-মানসেও কি সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে কোনও ব্যবস্থাপনার আদর্শ উঁকি দিচ্ছিল, যা পাশ্চাত্যের বর্বর সীমাবদ্ধ রাষ্ট্রতন্ত্রকে ভেঙে ফেলবে? মানবতার ধ্যানের আদর্শকে অনুসরণ করার মতো কোনও ব্যবস্থাপনা কি তৈরি করা অসম্ভব!

আপনি বাবু না উবু? মহেন্দ্রনাথ লিখেছেন, উপু? রাষ্ট্রীয় দেহজ্ঞানে ফিরে আসা, আবার চলে যাওয়া। ঠাকুর মাঝে মাঝে দেহে ফিরতেন, আবার দেহজ্ঞান লোপ পেত।
এই সব আবোল-তাবোল সিরিয়াসলি নেবেন না। ঠাকুর বসে। নরেন গাইছে, ‘মন চল নিজ নিকেতনে’। ঠাকুর নরেনকে বলেন ‘লরেন’। ‘ন’, ‘ল’-এ লয় পায়, আবার ‘ন’, ‘ন’-এ ফেরেও।
… পড়ুন সিরিয়ালসি নেবেন না-র অন্যান্য লেখা …
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved