Literary Legacy of Manipuri Poet Nilakanta Singh। Robbar
Robbar
  • ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬

নীলকান্তের অমৃতসন্ধান

১৯২৭ সালে জন্ম হয় মণিপুরি কবি এলামবম নীলকান্ত সিংহের। তাঁর জন্মের শতবর্ষ চলছে এখন। বিবিধ বিষয় তাঁর কবিতার উপজীব্য় হয়েছে। ২২ বছর বয়সে নীলকান্ত সিংহ রথযাত্রা নিয়ে যে কবিতা লিখলেন, সেখানে ধরা দিল স্বাধীনতা-পরবর্তী বিদ্ধস্ত মণিপুরের ছবি। তাঁর লেখার বেশিটাই যেন বাঁচার মন্ত্রের সন্ধান। প্রতিবেশী রাজ্য়ের এই কবিকে শ্রদ্ধার্ঘ্য় জানাতেই মুখুজ্জ্য়ের লিটফেস্টের এই পর্ব।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ২০:৩৮   
Facebook WhatsApp Messenger

১২.

ই. নীলকান্ত সিংহ মণিপুরি ভাষার বিশিষ্ট কবি। পুরো নাম: এলামবম নীলকান্ত সিংহ। ১৯৮৫ সালে ‘তীর্থযাত্রা’ কবিতা সংকলনটির জন‍্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁকে প্রথম দেখি আটের দশকের শেষের দিকে। আমি তখন সাহিত্য অকাদেমিতে। মাঝে মাঝে অকাদেমির কলকাতা দফতরে আসতেন। মেদহীন ঋজু মানুষ। অধিকাংশ মণিপুরির মতো বেশ ফরসা রং। ধুতি ও পাঞ্জাবি পরতেন। সে পোশাকের রংও বেশ সাদা। মণিপুরের তাঁতের কাপড় খুবই মোলায়েম। মনে হয় তুলোর কারণে আর বোনার গুণে।

নীলকান্ত সিংহ সাহিত্য অকাদেমির মণিপুরি ভাষার আহ্বায়ক ছিলেন। ফলে মণিপুরি ভাষার নানা কাজকর্মে আসতেন। সেই সঙ্গে ইস্টার্ন রিজিওনাল বোর্ডেরও সদস‍্য ছিলেন। আসতেন সেই কাজেও ।

zoom
এলামবম নীলকান্ত সিংহ

রিজিওনাল বোর্ডের বিষয়টি একটু স্পষ্ট করে বলা দরকার। সে-সময়ে সাহিত্য অকাদেমি ভারতের চারদিকে চারটি আঞ্চলিক সমিতি তৈরি করে। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই ও চেন্নাইয়ে (পরে বেঙ্গালুরুতে)। এক-একটি সমিতির মধ্যে সেই অঞ্চলের সাহিত্য অকাদেমি স্বীকৃত ভাষাগুলিকে যুক্ত করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, ওইসব ভাষায় লেখা সাহিত্যের পারস্পরিক সম্পর্ক খোঁজা। পরিকল্পনাটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ প্রতিবেশী সাহিত্যের সঙ্গে লতায়-পাতায় নানা কিছু জুড়ে আছে। সেসব ভুলে হঠাৎ করে নিজের ভাষা থেকে ভারতীয় সাহিত্যে পৌঁছে যাওয়া যায় না। গেলেও বিমানযাত্রীর মতো উড়ে যাওয়া যায়, ট্রেনযাত্রীর মতো ছুঁয়ে যাওয়া যায় না।

পূর্বাঞ্চলীয় আঞ্চলিক সমিতির পত্রিকা ‘প্রাচী’ প্রকাশিত হত কলকাতা থেকে। পূর্ব ভারতের আটটি ভাষার কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হত সেখানে। ওড়িয়া, অসমিয়া, নেপালি, বাংলা, বোড়ো, মণিপুরি, মৈথিলি ও সাঁওতালিতে। সাহিত্য অকাদেমি স্বীকৃত বাকি ১৮টি ভাষার আটটি দেখত দিল্লি দফতর, চারটি মুম্বই দফতর আর চারটি চেন্নাই দফতর। নানা আলোচনাসভাও অনুষ্ঠিত হত। কোনওটি পূর্ব ভারতের মৌখিক সাহিত‍্যের পরম্পরা বিষয়ে। তেমন একটিতে, মণিপুরি ও মৈথিলিতে গানের মাধ্যমে গল্প বলতে শুনেছি। দু’টিই প্রাচীন ও জনপ্রিয় কথনরীতি। আলোচনাসভা হয়েছে সীতাকে কেন্দ্র করে। বৈষ্ণব ধর্মও আলোচনার বিষয় হয়েছে, কারণ তার বেশ প্রভাব পড়েছিল আমাদের পূর্ব ভারতের সাহিত‍্যে।

zoom

যে কোনও সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার প্রতিষ্ঠানে এমন কিছু মানুষের দরকার হয়, যাঁরা ব‍্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার বাইরে ভাবতে ও কাজ করতে পারেন। নীলকান্ত সিংহ তেমনই একজন। ‘সাহিত্যসাধক’ বলতে যা বোঝায়, ঠিক তাই। দেখলেই ভিন্ন ভাবের মানুষ বলে মনে হত। নিচু গলায় কথা বলতেন, কিন্তু যা সত‍্য, তাই বলতেন বেশ স্পষ্টভাবে। জন্মেছিলেন ইম্ফল শহরে। মণিপুরি সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে বড় হয়েছিলেন। শুনেছিলেন মণিপুরের খম্ব ও থোইবীর অপূর্ব প্রেমগাথা। মণিপুরের নিজস্ব তারবাদ‍্য বাজিয়ে সে কাহিনির অসামান্য উপস্থাপনাও দেখেছিলেন। ১৯৭৬ সালে সেই প্রচলিত গীতিকাব‍্যকে প্রায় ৫০০ পাতা জুড়ে এন. টোম্বি সিং ইংরেজি ভাষায় কথাসাহিত‍্যের রূপ দিলেন। লেখক বইটির ভূমিকা লেখার জন‍্য অনুরোধ জানালেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে। তিনি খুশি হয়ে রাজি হলেন আর সেখানে লিখলেন যে, শুধু ভারতের নয়, থম্ব-থোইবীর প্রেমগাথা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রেমগাথা। তিনি এ-ও উল্লেখ করলেন যে, বইটিতে মণিপুরি বা মেইতেই জীবন ও সমাজের এক অনবদ্য ছবি আছে। সে-সঙ্গে কবিতা, রোমান্স এবং গভীর ও সুন্দর সংস্কৃতির প্রকাশ রয়েছে, যা পাঠককে প্রথম পাঠেই অভিভূত করে।

অন্যদিকে, টোম্বি সিং বইয়ের গোড়ার কথায় নীলকান্ত সিংহের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন, কারণ পাণ্ডুলিপিটি তৈরির পর্যায়ে তাঁকে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছেন। এর থেকে বোঝা যায় নীলকান্ত সিংহ নিজের শিকড়ে কতখানি প্রোথিত ছিলেন আর চিরায়ত মণিপুরি সংস্কৃতিকে কতখানি চিনতেন।

নীলকান্ত সিংহের পড়াশোনার সূচনা মণিপুরের চূড়াচাঁদপুর স্কুলে। পরে জনস্টোন হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম‍্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আই.এ. পর্যায়ের পড়াশোনা শ্রীহট্টের মুরারীচাঁদ কলেজে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা যথাক্রমে গুয়াহাটির কটন কলেজ ও গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় ছিল দর্শন। তাঁর জ্ঞানচর্চার বিষয়টিই পরবর্তীকালে তাঁর জীবনচর্যার অংশ হয়ে ওঠে। বুদ্ধদেবের দর্শন, অরবিন্দের ধর্মতত্ত্ব এবং গান্ধীজির অহিংসার ভাবনা তাঁকে আকৃষ্ট করে। তাঁর বক্তৃতা ও লেখার মধ্যে তা প্রকাশ পেত। ১৯৫২ সালে তিনি ইম্ফল কলেজে অধ‍্যাপনায় যোগ দেন। এক বছর পরে সেখান থেকে ডি.এম. কলেজে চলে গেলেন। প্রায় দু’-দশক সেখানে অধ্যাপনা করেন। বিভাগীয় প্রধান‌ও হন।

১৯৭২ সালে মণিপুর স্বতন্ত্র রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেল। মণিপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। কিন্তু রাজনীতি আর সমাজের পরিসর আলাদা। একবার ভোট দিয়ে সরকার তৈরি করে ফেললে জনগণের আর বিশেষ কিছু করার থাকে না। তখন ক্ষমতাসীন দল তাদের রাজত্ব চালিয়ে যায়। কিন্তু সাহিত্য ও সংস্কৃতি মণিপুরের প্রাণ। বাঙালির মতোই বারো মাসে তেরো পার্বণে বাঁচা। ১৯৭২ সালে তৈরি হল মণিপুর রাজ্য কলা অকাদেমি। তাঁরা এমন একজন মানুষ চাইলেন, যাঁর পাণ্ডিত্য, সৃষ্টিশীলতা এবং ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে জ্ঞান আছে। সব দিক দিয়েই নীলকান্ত সিংহ সচিব পদের যোগ্য ছিলেন। ততদিনে তিনি অধ্যাপক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত, কবি হিসেবেও সুনাম অর্জন করেছেন। বেশ কয়েকটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধ ও সমালোচনার ব‌ইও। মণিপুরি ভাষার পাশাপাশি সংস্কৃত, বাংলা, অসমিয়া ও ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়েছেন। নীলকান্ত সচিব পদে ছ’বছর কাজ করলেন আর প্রতিষ্ঠানটিকে সুসংহত রূপ দিলেন।

সাতের দশকের শেষদিকে মণিপুর শিল্পকলা ও সংস্কৃতি বিভাগ তৈরি হল। নীলকান্ত সিংহকে সেই প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হল। এ নিতান্তই গুরুদায়িত্ব, কারণ মণিপুরি সংস্কৃতি একমাত্রিক নয়, সেখানে নানা ধারার মিলন ঘটেছে। একদিকে তার প্রাচীন কিরাত ঐতিহ্য, অন্যদিকে তাতে বৈষ্ণব সংস্কৃতির মিশ্রণ। একই সঙ্গে ৩৩টি জনজাতির বাস– তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি আছে।

একবার ওইসব ভাষার কবিদের নিয়ে একটি সম্মেলন করা হয়েছিল। দেখেছিলাম কয়েকটি ভাষার ক্ষেত্রে লিখিত সাহিত্যের কোনও ঐতিহ্য নেই। কিন্তু কবিতার মধ্যে নাড়া দেওয়ার মতো ভাব ও ভাবনা আছে। নির্মাণের মুনশিয়ানাও আছে। নীলকান্ত সিংহ সাহিত্য, শিল্পকলা ও সংগীতের নানা ধারাকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করছিলেন। সেসঙ্গে মণিপুরি সমাজের যে মাতৃতান্ত্রিক কাঠামো, তা-ও সযত্নে মেনে চলেছিলেন।

এর পাশাপাশি ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক প্রতিষ্ঠিত জওহরলাল নেহরু মণিপুর ডান্স অকাদেমির সহ-সভাপতি, চলচ্চিত্র উন্নয়ন পর্ষদের সচিব, মণিপুরি সাহিত্য পরিষদের সভাপতি, কালচারাল ফোরামের সভাপতি, নাহারোল সাহিত্যপ্রেমী সমিতির সভাপতি ইত্যাদি পদেও ছিলেন। ২০০০ সালে পেয়েছিলেন মণিপুরি সাহিত্য পরিষদের দেওয়া সাহিত্য-রত্ন পুরস্কার। সে বছরে সম্মানিত হয়েছিলেন পদ্মশ্রী পুরস্কারেও।

zoom

আধুনিক মণিপুরি কবিতার সূচনা বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে। সেই পর্বের বিশিষ্ট কবিদের মধ্যে ছিলেন অঙাংহল সিংহ, চাউবা সিংহ এবং কমল সিংহ। অঙাংহল সিংহের কথা আগে উল্লেখ করেছি। প্রেমিক থম্বা ও প্রেমিকা রাজকুমারী থৌইবীকে কেন্দ্র করে ৩৪ হাজার পঙ্‌ক্তি রচনা করেন ‘খম্ব-থোইবী শেরেং’ বা ‘খম্ব-থোইবীর কাব‍্য’। এটিকে কাব‍্য না-বলে ‘মহাকাব্য’ বলাই ভালো। কমল সিংহ প্রকাশ করলেন– ‘লেই পারেং’ বা ‘ফুলের মালা’ নামে কবিতার সংকলন। ওই পর্বের কবিতা ছিল রোমান্টিক ঘরানার। মণিপুরের প্রাচীন ঐতিহ্য, লোকগাথা, প্রেম ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ছিল কবিতার অন্যতম বিষয়। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী যে কবিতা, তা বিষয় ও উপস্থাপনায় বদলে যেতে থাকল। এর বড় কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচ মণিপুরের ওপর বেশ ভালোভাবেই লেগেছিল। জিনিসপত্রের চড়া দাম, খাবারের অভাব, নিরাপত্তার নানা সমস‍্যা দিন দিন বাড়ছিল। স্বাধীনতার পরে বাংলা, ইংরেজি ও অসমিয়ার পরিবর্তে মাতৃভাষায় পড়াশোনার আগ্রহ বাড়ছিল। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কবিতার মন ও মেজাজ বদলে যাচ্ছিল। এই পর্বে যে দু’জনের কবিতায় নতুন স্বর শোনা গেল, তাঁরা হলেন নীলকান্ত সিংহ এবং এল. সমরেন্দ্র সিংহ। নীলকান্ত সিংহ ১৯৪৯ সালে ২২ বছর বয়সে লিখলেন–

রথযাত্রার এই বিকেলে
চারপাশে মানুষের গলায় শুধুই জয়ধ্বনি
‘জয় জগন্নাথ জয় জগন্নাথ’
কিন্তু আকাশের গায়ে কালোর ছোপ,
ঘৃণা আর সীমাহীন অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের

গত শতকের পাঁচের দশক থেকে নীলকান্ত সিংহ ধারাবাহিকভাবে কবিতার বই প্রকাশ করেছেন। তার মধ্যে ছিল ‘অচাইবা লৈ’, ‘চৎলসিনে কদাইদনো ইবানি’, ‘তীর্থযাত্রা’, ‘পুক্লিং লৈকোলগী অথুপ্পদা’ ইত্যাদি। লিখেছেন মণিপুরি ছন্দ, মণিপুরি নৃত্য, ভারতীয় সংস্কৃতি, ধর্ম ইত্যাদির ওপর আলাদা আলাদা বই। রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করেও নানা প্রবন্ধ লিখেছেন এবং বই হিসেবে প্রকাশ করেছেন।

২০০০ সালে নীলকান্ত সিংহ প্রয়াত হন। তাঁকে নিয়ে একটি স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলাম। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে পরিবারের উৎসাহে এবং মণিপুরি সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে তাঁর নামে একটি স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা হয়েছিল। এ বছরের বক্তা ছিলাম আমি। ২৫ অক্টোবর সেই অনুষ্ঠান হয়ে গেল। বিষয় বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা ছিল বক্তার। একই বৈষ্ণব ধর্ম কীভাবে তিন রূপ পেল মণিপুর, অসম ও বঙ্গদেশে, সে নিয়েই বলেছি আমি। স্থান, কাল ও পাত্রভেদে এই পরিবর্তন স্বাভাবিক। এটাই ভারতীয় ধর্মসাধনাকে বৈচিত্র‍ দিয়েছে এবং বর্ণময় করে তুলেছে।

ধর্ম ও দর্শন ছিল নীলকান্ত সিংহের অন্যতম প্রিয় বিষয়। তাই বৈষ্ণব ধর্ম ও সংস্কৃতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ক্ষেত্র অসম, বঙ্গদেশ ও মণিপুরকে আমার আলোচনার কেন্দ্রে রাখা।

zoom
অঙাংহল সিংহ

নীলকান্ত সিংহের প্রধান পরিচয় তিনি কবি। রোমান্টিকতার বিপরীতে তিনি ভিন্নধারার কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতায় জীবনের লক্ষ্য খুঁজেছেন, বাঁচার মন্ত্রের সন্ধান করেছেন আর প্রচলিত চিত্রকল্পের বিপরীতে নতুন চিত্রকল্প তৈরি করেছেন। তাঁর একটি কবিতার প্রথম স্তবকটি বাংলা অনুবাদে নিচে দিলাম:

আমি যাদের কবি হতে চাই

প্রিয় মাতৃকা মণিপুর
তোমার মনকাড়া কৃষ্টির বাগানে
আমি কবি হতে চাই
দলছুট, পতিত, নির্যাতিত ও হেরে যাওয়া মানুষের।
সনরেই, সিঙ্গরেই, কেতকী ও চম্পা ফুলের
মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে
ন’টি পাহাড় রয়েছে
মাকে ঘিরে,
দেখি পোড়া মন থেকে জল ঝরে পড়ছে দু’চোখ বেয়ে।
আমার সামনে দিয়ে এক অপরূপ সুন্দরী হেঁটে চলেছে
মিষ্টি হেসে সামনে ও পিছনে তাকাচ্ছে
যেন আগুন পতঙ্গকে ডাকছে,
তাকে পাওয়ার জন্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা
শুধু এক মুহূর্ত, একটি মাত্র মুহূর্তের জন্য,
কিন্তু সুন্দরীর হাসির কোনও লেশ নেই মায়ের মুখে
চোখ থেকে ঝরে পড়ছে জল।
সামনে দিয়ে ফনেক*, ধুতি ও প‍্যান্ট পরে
চলে যায় দলে দলে লোক
সাইকেল, জিপ, রিকশা, গাড়ি, শহরের বাস চড়ে–
তারা জানে না কোথা থেকে এসেছে কোথায়-বা যাচ্ছে,
তবু যেতে থাকে
বেঁচে থাকার জন্য,
তবু তারা যাতায়াত করে শহরের রাস্তায়, বাজারে, সিনেমা হলের সামনে।
আমি তাকিয়ে দেখি খিদেয় কাতর আর কুঁকড়ে যাওয়া মানুষের দল
আর দেখি মণিপুর মায়ের চোখের জল।
হে আমার মণিপুর জননী
আমাকে পতিত, ব‍্যভিচারী, পদদলিত আর হারিয়ে যাওয়া মানুষের
কবি হতে দাও।
(*ফনেক হল মণিপুরি মেয়েদের কোমর থেকে গোড়ালি পর্যন্ত পরার লম্বা কাপড়)

এখন এলামবম নীলকান্ত সিংহের জন্মের শতবর্ষ চলছে। শতবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি এটাই আমার সামান্য শ্রদ্ধা নিবেদন।

…………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন মুখুজ্জের লিটফেস্ট-এর অন্যান্য পর্ব

…………………..

Elangbam Nilakanta Singh Literature Manipur Manipuri literature Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Suniti Kumar Chatterji

Share this article on