Role of Donkeys in Human Life। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তৃতীয় সুর, ষষ্ঠ সুর

শীতলা ছাড়াও কালরাত্রি দেবীর বাহন রূপেও গাধা দেখা যায়। এই কালরাত্রি চণ্ডীর আরেক ভয়ানক রূপ। গাধা নীরবে ঠাকুরের ভার বহন করে। সে নিরামিষভোজী, স্তন্যপায়ী ও নির্বিকার চারপেয়ে। রাগী গাধা বড় একটা দেখা যায় না। হয়তো এই জন্যই ‘গাধা’ শব্দটা বাংলায় অপভাষা বা গালাগালির সমার্থক হয়ে উঠেছে। ‘গাধা’ শব্দে অভিহিত ব্যক্তি একটি নীরব, খাটিয়ে, অপদার্থ এবং বোকা প্রাণী বলেই প্রতিষ্ঠিত। গুরুভার বহনকারী গড়ুর একটি কল্পিত রূপ কিন্তু পৃথিবীতে গাধা সত্যিকারের এক মুটে জাতীয় প্রাণী, যার সঙ্গে শুধুই শ্রমের সম্পর্ক আছে।

শেষ আপডেট: মে ৭, ২০২৬, ১৯:৩৯   
Facebook WhatsApp Messenger

৪.

গাধা খুবই সহনশীল জন্তু। ‘নিরীহ’ এবং ‘ভারবহনকারী’ বলে মানবসমাজে কদর আছে। শীতলা রোগ হরণকারিণী দেবী। চৈত্র-বৈশাখ মাসে জুড়ে যখন বসন্তরোগের প্রকোপ বাড়ে তখনই মা শীতলার পুজো হয় মাস-জুড়ে। মনে করা হয়, তিনি বসন্ত রোগ হরণ করেন। তাঁর হাতে ঝাঁটা আর পাখা, কাঁখে কলসি, মাথায় কুলো আর বাহন গাধা। এসবই পরিষ্কার করার জিনিস। গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে রোগহারিণী রূপেই তিনি পূজিত হন।

শীতলা ছাড়াও কালরাত্রি দেবীর বাহন রূপেও গাধা দেখা যায়। এই কালরাত্রি চণ্ডীর আরেক ভয়ানক রূপ। গাধা নীরবে ঠাকুরের ভার বহন করে। সে নিরামিষভোজী, স্তন্যপায়ী ও নির্বিকার চারপেয়ে। রাগী গাধা বড় একটা দেখা যায় না। হয়তো এই জন্যই ‘গাধা’ শব্দটা বাংলায় অপভাষা বা গালাগালির সমার্থক হয়ে উঠেছে। ‘গাধা’ শব্দে অভিহিত ব্যক্তি একটি নীরব, খাটিয়ে, অপদার্থ এবং বোকা প্রাণী বলেই প্রতিষ্ঠিত। গুরুভার বহনকারী গড়ুর একটি কল্পিত রূপ, কিন্তু পৃথিবীতে গাধা সত্যিকারের এক মুটে জাতীয় প্রাণী, যার সঙ্গে শুধুই শ্রমের সম্পর্ক আছে।

গাধা ইটভাটায় শ্রম দেয়, চাষির ফসল, ধোপার কাপড় বয়ে দেয়, শীতলা থেকে শুরু করে ডন কিহোতের সঙ্গী শাঙ্কো পাঞ্জার বাহন হয়েও প্রতিষ্ঠা পায়।

আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘ডাঙ্কি’ শব্দটা খুবই পরিচিত। এই নামে একটা ছবি আঁকার ফার্নিচার আছে। গাধায় চড়ার মতো করে দু’পাশে পা দিয়ে বসে একটা লম্বা গলার স্ট্যান্ডে ড্রয়িং বোর্ড ঠেস দিয়ে ছবি আঁকা হয়।

এর আবিষ্কর্তা এক নিপুণ নকশাকার ছিলেন বটে! আজও এই ‘ডাঙ্কি বেঞ্চ’-এর কদর একই রকম আছে। যাকে বলে ‘কালোত্তীর্ণ’ হওয়া। কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজ ১৮৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আর্ট স্কুল নামে। সেই কবে থেকে গাধার বেঞ্চগুলো কতশত শিল্পীর রেওয়াজ সঙ্গী হয়ে আছে, তার ইয়ত্তা নেই। গাধার বেঞ্চে বসে গাধার খাটুনি খাটলে শিল্পী হওয়া ঠেকায় কে?

মা শীতলার গাধার পিঠে বসার ভঙ্গিটা অন্যরকম। বাইকের ওপরে শাড়ি পরা সওয়ার যেমন একদিকে দু’পা ঝুলিয়ে বসেন, তেমন। এতে করে একটা অধিষ্ঠানের ভঙ্গি থাকে চালিকার ভঙ্গির চেয়েও। কিন্তু কখনওই মনে হয় না তিনি পড়ে যাবেন। তা কিন্তু ওই নির্বিরোধী গাধার জন্য। ওর জায়গায় ‘বুসেফেলাস’ হলে হয়েছিল আর কী! গাধা মানেই তৃতীয় সুর আর ষষ্ঠ সুরের যুগলমিলন। যার পিঠে বসে গুপী গ্রাম ছাড়া হয়।

গাধা শ্লেষ আর উষ্মা প্রকাশের চরম চারপেয়ে হাতিয়ার। সে নীরবে গুপীকে গ্রাম পার করলেও তার সম্মতিক্রমেই আবার স্বস্থান আমলকী গ্রামে ফিরে আসে।

‘অচলপত্র’ বাংলাভাষার এক সম্পদ। বিদ্রুপ আর কৌতুকের অসামান্য সমাজকথা। সেখানে ‘চিঠিপত্র’ নামে একটা বিভাগ ছিল। শোনা যায়, সম্পাদক দীপ্তেন্দ্রকুমার সান্যাল নাকি নিজেই প্রশ্ন-উত্তর– দুই-ই লিখতেন। জনৈক পত্রপ্রেরক একবার প্রশ্ন করেছিলেন যে, ‘আপনি কি গাধার খাটুনি (প্রশংসার্থে) খেটে লেখা অভ্যাস করেছিলেন?’ তার উত্তরে সম্পাদক মশাই লেখেন যে ‘গাধার খাটুনি কথাটা ঠিকই প্রায় আঁচ করেছেন;তবে ঠিক গাধার খাটুনি নয়,গাধাদের জন্যই আমার যা কিছু খাটুনি। তারা কিছুতেই নিম্নশ্রেণির স্থূল রসিকতা ছাড়া অচলপত্রে আর কিছুই দেখতে চায় না। অচলপত্রের এই গাধাদের কবে পিটিয়ে-পুটিয়ে ঘোড়া করতে পারব তাই ভাবছি।’

ঘোড়ার কাছাকাছি দেখতে হলেও ঘোড়ার মতো গ্ল্যামারাস না হওয়ায় বুঝি এই খাটুনি-পিটুনি।


ঈশ্বর-কূলে শীতলাও কিছুটা ডিগ্লামারাস। তাঁর নামে দিব্যি কাটা যায়। মানবসমাজকে ঝাড়ুবাতাস দিয়ে অমৃতবারি সিঞ্চনে শীতল রাখেন তিনি। আজকের ‘স্বচ্ছ ভারত’ অভিযানের আদি প্রতীক। পুজো মিটলেও তাঁকে চোখে হারাতে চাই না আমরা। তাই পুকুর-নদী-ঘাটের গাছতলায় ঠাঁই হয় ঠাকুরের। রোদবৃষ্টির ছোঁয়ায় অর্ধগলিত প্রতিমার শব ওই গাধাই পিঠে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বসন্ত বিদায় নেয়।

…………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন পার্থ দাশগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা

…………………….

Donkey Bench goopy gyne bagha byne Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar অচলপত্র গাধা শীতলাপুজো

Share this article on