


হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য তিনি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, কিন্তু সে হিন্দুধর্ম কোন হিন্দুধর্ম? ‘হিন্দু ধর্ম্মের মুখ্য উপদেশ এই যে, যাহার যে ধর্ম্ম সে ব্যক্তি সেই ধর্ম্ম সর্ব্ব প্রকারে পালন করিলেই উদ্ধার হইবে।’ অর্থাৎ, অপরের ধর্ম-অধিকারে হিন্দু, ধর্মের দোহাই দিয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। রাজনারায়ণ নিজেকে কেন ‘হিন্দু-ব্রাহ্ম’ বলতেন এই রচনায় তার উত্তর ছিল। ‘হিন্দু ধর্ম্ম ক্রমে ক্রমে উন্নত হইয়া ব্রাহ্মধর্ম্মে পরিণত হইয়াছে।’ আসলে প্রসন্ন হাস্যময় রাজনারায়ণের হিন্দুধর্ম ছিল সুসংস্কৃত ও উদার। ধর্মের মতো খাদ্য ও বস্ত্র বিষয়ে হেতুহীন শুচিবায়ুগ্রস্ততা তাঁর কখনও ছিল না।
১৭.
রবীন্দ্রনাথ রাজনারায়ণ বসুকে বেশ পছন্দ করতেন। করবেন না-ই বা কেন? রাজনারায়ণের বন্ধু মধুসূদনের মেঘনাদবধের প্রতি রবীন্দ্রনাথ কম বয়সে বেশ খড়্গহস্ত, পত্রিকার পাতায় দীর্ঘ সমালোচনায় তার প্রমাণ আছে। সদাহাস্যময় প্রসন্ন রাজনারায়ণের স্বাদেশিক ছেলেমানুষি রবি কিন্তু বেশ উপভোগ করতেন।
রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিপ্রসঙ্গের উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘রাজনারায়ণবাবু তখনকার সেই প্রবল ভাঙাগড়ার যুগে সকল কার্যের মধ্যে থাকিয়াও আমার মতো বালকের সহিত মেলামেলা কর্তব্য মনে করিতেন। শিশুদের প্রতি তাঁহার শ্রদ্ধা ছিল। ইহা যে তিনি কেবল কর্তব্যবুদ্ধিতে করিতেন তাহা নহে, ওই কর্তব্যবুদ্ধির পশ্চাতে তাঁহার একটা পরিপূর্ণ জীবন রহিয়াছে। কর্তব্যবুদ্ধি অনেক সময়ে সংকীর্ণভাবে কার্য করিয়া থাকে। রাজনারায়ণবাবুর কর্তব্যবুদ্ধি তেমন সংকীর্ণ নহে। তিনি আমার পিতার সকল কার্যের সঙ্গী ছিলেন; আমার অগ্রজ দ্বিজেন্দ্রনাথ আমার অপেক্ষা বয়সে অনেক বড়ো, তিনি তাঁহার সুহৃদ ছিলেন; আবার আমার মতো শিশুরও তিনি বয়স্য ছিলেন। সকলের সহিত মিশিবার জন্য যেমন সরসতা দরকার তাহা তাঁহার ছিল।’

দেবেন্দ্রনাথের সহযোগী রাজনারায়ণের স্বাদেশিক ছেলেমানুষির নজির মিলবে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’র পাতায়। রাজনারায়ণ কেমন করে গান গাইতেন? রবীন্দ্রনাথ উবাচ: ‘রাজনারায়ণবাবুর কণ্ঠে সাতটা সুর যে বেশ বিশুদ্ধভাবে খেলিত তাহা নহে কিন্তু তিনিও গলা ছাড়িয়া দিলেন, এবং সূত্রের চেয়ে ভাষ্য যেমন অনেক বেশি হয় তেমনি তাহাঁর উৎসাহের তুমুল হাতনাড়া তাঁহার ক্ষীণকণ্ঠকে বহুদূরে ছাড়াইয়া গেল; তালের ঝোঁকে মাথা নাড়িতে লাগিলেন এবং তাঁহার পাকা দাড়ির মধ্যে ঝড়ের হাওয়া মাতামাতি করিতে লাগিল।’
এই ছেলেমানুষ অগ্রজ রাজনারায়ণ নিজেকে ‘হিন্দু-ব্রাহ্ম’ বলে পরিচয় দিতেন। হাসি যেমন যে-কোনও দেওয়াল ভেদ করে মানুষের মন দখল করে নেয়, তেমনই রাজনারায়ণও তাঁর প্রসন্ন-হাস্যময়তায় নিজের আত্মপরিচয়কে বিমিশ্র-বিস্তার দিতে পারতেন। আহা! উনিশ শতকের সেই রাজনারায়ণপন্থা যদি একালের সংকীর্ণ-বাঙালি গ্রহণ করতেন!
রাজনারায়ণের বন্ধু মাইকেল মধুসূদন। রাজের প্রতি মধুর প্রেমের অবধি ছিল না। দেখা হলে বন্ধু রাজকে আলিঙ্গন করে মাইকেল চকাস-চকাস করে চুমু খেতেন। সেই চুমু খাওয়ার সরস বিবরণ বসুমশাই তাঁর আত্মচরিতে প্রকাশ করেছিলেন। ‘মধু প্রচুর মদ্যপান করিলেন। বিদায় লইবার সময় তিনি আমাকে জড়াইয়া ধরিয়া কষে ক্রমাগত মুখচুম্বন করিতে লাগিলেন। মধুর আর যাহা দোষ থাকুক না কেন কিন্তু হৃদয় একেবারে প্রেমে ও স্নেহে পরিপূর্ণ ছিল।’

একবার শিওরাজপুর গ্রামের ডেপুটি কলেক্টর লালা বিহারীলালের বাসায় রাজনারায়ণ অতিথি হয়েছিলেন। সঙ্গে ভূদেব মুখোপাধ্যায়। লালা রাজনারায়ণের ওপর চটে গিয়েছিলেন। কারণ, রাজনারায়ণ পুতুল-পুজোয় বিশ্বাসী ছিলেন না। লালা রাজনারায়ণকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাঁরা কি মাটির পুতুলের বাইরের রূপকে পুজো করেন? না কি ভেতরের দেবতাকে মূর্তির মাধ্যমে পুজো করেন? ‘হামলোগ ক্যয়া মাট্টিকাবুৎকো পূজা করতে হে না উসকা ভিতর দেওতাকো পূজ্তে?’ ভূদেবকে লালাজি এই বিতর্কে উকিল দাঁড় করিয়েছিলেন। ভূদেব বললেন, ‘সব আচ্ছা হ্যায়, সব আচ্ছা হ্যায়।’ গোলমাল মিটে গেল। এই হিন্দু-ব্রাহ্ম প্রসন্নতা রাজনারায়ণ তাঁর খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রেও বজায় রেখেছিলেন। হেয়ার সাহেবের ইশকুল শেষ করে তিনি হিন্দু কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁদের আমলে হিন্দু কলেজের ছাত্রদের বিস্তর মদ খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। রাজনারায়ণও বেশ মদ খেতেন। সেই মদ্যপানে পরিমিতি ছিল না, রাজনারায়ণের পিতা বুঝলেন– ছেলেকে সামলাতে হবে। কীভাবে সামলাবেন? সে উপায় পাওয়া গেল। রাজনারায়ণ তাঁর ‘আত্মস্মৃতি’-তে কবুল করেছেন সে-কথা। মুনশি আমির আলি ছিলেন রাজনারায়ণের পিতৃবন্ধু। মুনশি সাহেব ছিলেন রাজনারায়ণের পিতা ঠাকুরের ‘রাজদার দোস্ত’। দোস্তকে গোপন কথা বলা চলে। ছেলের অপরিমিত মদ্যপানের কথা জানালেন। মুনশি আমির আলির বাড়ি থেকে টিনের বাক্স আসতে লাগল। একদিন সন্ধের পর পিতাঠাকুর রাজনারায়ণকে ডাকলেন। ডেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। প্রকাণ্ড টিনের বাক্স খোলা হল। ভেতরে পোলাও, কালিয়া, কোফতা। দেরাজ থেকে বাইরে এল একটি কর্কস্ক্রু ও সেরির বোতল, ওয়াইন গ্লাস। পিতা বললেন, ‘তুমি প্রত্যহ সন্ধ্যার পর আমার সঙ্গে এই সকল উত্তম দ্রব্য আহার করিবে, কিন্তু মদ (সেরি) দুই গ্লাসের অধিক পাইবে না; যখনই শুনিব অন্যত্র মদ খাও, সেই দিন অবধি এই খাওয়া বন্ধ করিয়া দিব।’ পিতার কাছ থেকে প্রসন্ন মতি রাজনারায়ণ ত্যাগের মাধ্যমে ভোগ করা শিখেছিলেন। আহারের বিষয়ে পরবর্তী কালে তিনি পরিমিতি বোধের পরিচয় দিয়েছিলেন, মদ একেবারেই ত্যাগ করেছিলেন, আমিষ আহারে সংযম প্রদর্শনেও দ্বিধা করেননি। তবে আহার্য ও বস্ত্র বিষয়ে হেতুহীন শুচিবায়ুগ্রস্ততা তাঁর কখনও ছিল না।

হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য তিনি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, কিন্তু সে হিন্দুধর্ম কোন হিন্দুধর্ম? ব্রাহ্মের হিন্দুধর্ম। তাঁর সেই বক্তৃতার পর বিভিন্ন সংকীর্ণ হিন্দুরা তাঁকে দলে টানার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। পারার কথা নয়। শিমলার সাকারবাদী হিন্দুরা বললেন, রাজনারায়ণ তাঁদের দলে। রাজনারায়ণ ‘হিন্দুকুলচূড়ামণি’। রাজনারায়ণ তাঁদের প্রত্যাখ্যান করলেন! অসমের পদ্মহাস গোস্বামী তাঁকে ‘কলির ব্যাসদেব’ বলে ডাকতে শুরু করলেন। রাজনারায়ণ বসু জানিয়েছেন, এই সব হিন্দু-কাণ্ড দেখে তিনি ‘হাস্য সম্বরণ’ করতে পারলেন না। তিনি কোন হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের কথা লিখেছিলেন? ‘হিন্দু ধর্ম্মের মুখ্য উপদেশ এই যে, যাহার যে ধর্ম্ম সে ব্যক্তি সেই ধর্ম্ম সর্ব্ব প্রকারে পালন করিলেই উদ্ধার হইবে।’ অর্থাৎ, অপরের ধর্ম-অধিকারে হিন্দু, ধর্মের দোহাই দিয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। রাজনারায়ণ নিজেকে কেন ‘হিন্দু-ব্রাহ্ম’ বলতেন এই রচনায় তার উত্তর ছিল। ‘হিন্দু ধর্ম্ম ক্রমে ক্রমে উন্নত হইয়া ব্রাহ্মধর্ম্মে পরিণত হইয়াছে।’ প্রসন্ন হাস্যময় রাজনারায়ণের হিন্দুধর্ম সুসংস্কৃত ও উদার।

তিনি ফারসি বেশ জানতেন। মিস এলিজাবেথ শার্পের সঙ্গে রাজনারায়ণের বন্ধুত্ব ছিল। এই প্রিয়বাদিনী ব্রহ্মবাদিনীকে তিনি সংস্কৃত শাস্ত্র ও পারস্য কবির গ্রন্থ থেকে ‘উত্তম উত্তম বচন’ উদ্ধার করে পাঠাতেন। সাদির কবিতা রাজনারায়ণ ইংরেজিতে অংশ-বিশেষ উদ্ধার করেছিলেন। সাদির কবিতা রামমোহন রায়েরও খুব প্রিয় ছিল। ‘হে ভোরের পাখি। তুমি অগ্নিমুখী পতঙ্গকে ভালোবাসার কথা জিজ্ঞাসা করো। নিজেকে পোড়ায় নিরুচ্চারে।’ এই ভালোবাসার কাঙালেরা পরমেশ্বরের খবর তাদের খোঁজের সময় পায় না। যখন খবর আসে তখন তো আর খবর গ্রহণের জন্য কেউ নেই। এই সদাপ্রসন্ন মরমিয়া ছেলেমানুষ স্বাদেশিক প্রাজ্ঞ রাজনারায়ণের লেখা পড়তে পড়তে আর আজকের হিন্দুর নাম নেওয়া গর্জমান রাজনৈতিক জনসমূহকে দেখতে দেখতে মনে হয়, ভদ্রলোক হিন্দু বাঙালিবাবুরা কী ছিলেন আর কী হইয়াছেন!
কী হইবেন সে-কথা আর ভাবতে ইচ্ছে করে না।

…………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন সিরিয়াসলি নেবেন না-র অন্যান্য পর্ব
…………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved