sanatan as a composition of eternal old and eternal new | Robbar
Robbar
  • ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চির-পুরাতনের চির-নতুন

ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তী প্ল্যানেটারি আর গ্লোবাল– এই দুয়ের ভাগ করেন। প্ল্যানেটারি যা, তা গ্লোবালের চাইতে সময়ের নিরিখে বড়। এই গ্রহের প্রকৃতি আর প্রাণিজগৎ, মানব জগতের চাইতে প্রাচীন। মানুষ অবশ্য প্ল্যানেটারির অস্তিত্ব ভুলে গ্লোবালকেই বড় করে তুলতে চায়। নিজেকে রাখতে চায় গ্লোবের কেন্দ্রে। তার এই বাসনার জন্যই সনাতন প্রকৃতির চরিত্র যায় বদলে। নানা বিপর্যয়ের আশঙ্কা করেন বিজ্ঞানীমহল।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ১৭:০৬   
Facebook WhatsApp Messenger

১৫.

‘সনাতন পাঠক’ ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম। সুনীল ধর্মবাদী ছিলেন না, পুজো-অর্চনা ইত্যাদিতে তাঁর খুব একটা কিছু যেত-আসত না। তা অকপটেই লিখেছিলেন। লেখার জন্য কোনও কোনও পাঠকের কাছে ভর্ৎসিত হয়েছিলেন। উপন্যাসে মা কালীর পরিচয় দিতে গিয়ে যে শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন, তা নিয়ে বেশ হট্টগোল হয়েছিল। তবে কথাটি রামকৃষ্ণকথামৃতেই আছে। বোঝা গিয়েছিল, যাঁরা ধর্মকে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতায় ব্যবহার করতে চান, তাঁরা মন দিয়ে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ পড়েন না। আবার কোথাও কোথাও উপন্যাস লেখক সুনীল খানিক স্বাধীনতাও নিয়েছেন। স্বামী বিবেকানন্দ প্রয়াণের আগে নিবেদিতাকে নিজে রান্না করে খাইয়েছিলেন, তাঁর হাত মুছিয়ে দিয়েছিলেন। ‘উদ্বোধন’ পত্রিকায় সেই বিবরণ খুবই অকপটে প্রকাশ করা হয়েছিল। কারণ, সেই সুন্দর ঘটনার মধ্যে কোনও মালিন্য ছিল না। উনিশ শতকের কোনও কোনও মহন্ত এলোকেশীর সঙ্গে যা করেন তা অন্যায়, তামসিক আচরণ। রামকৃষ্ণদেব তাঁর শিষ্যদের বামাচার সাধনা করতে নিষেধ করেছিলেন। নিজে তন্ত্র-সাধনা করলেও সে-পথে যেতে শিক্ষিত-শিষ্যদের মানা, আর তন্ত্র-সাধক হিসেবে ঠাকুর যে কত পরিণত ছিলেন ভৈরবী ব্রাহ্মণী তা টের পেয়েছিলেন। নিবেদিতা-বিবেকানন্দ সম্পর্ক যে উচ্চস্তরীয় ও মানসিক মর্যাদাবোধের নিদর্শনবাহী তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিকটজনদের সাক্ষ্য থেকে তা জানা যায়। সুনীল তাঁর উপন্যাসে হাত-মোছানোর বিবরণ লিখতে গিয়ে কবিসুলভ চাপল্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। বিবেকানন্দ নাকি নিবেদিতার চাঁপার কলির মতো আঙুল একটি একটি করে মুছিয়ে দিয়েছিলেন। এই অঙ্গুলিস্পর্শী রোম্যান্টিকতা বিবেকানন্দ-নিবেদিতা সম্পর্কের নিজত্বকে খাটো করেছে।

zoom
বিবেকানন্দ ও নিবেদিতা

সেকথা থাক। সনাতনের প্রসঙ্গে আসি। সনাতন ধর্মে বিশ্বাস না থাকলেও সনাতন পাঠক হিসেবে আত্মপরিচয় দিতে তাঁর আটকায়নি। এতে নামও হল, আবার বাচ্যাতিরিক্ত আরও কিছু বোঝানোও সম্ভব হল। পাঠক তো বাঙালির পদবি। আর সনাতন নাম এককালে গ্রামদেশে খুবই চালু ছিল। আজকাল আর শোনা যায় না। বাস্তব নাম হতে আপত্তি নেই, তবে ‘সনাতন পাঠক’ এই নাম আরেকটু কিছু বোঝায়। পাঠের বা পড়ার যে চিরকালীন আনন্দ সুনীল তা আত্মস্থ করতে চান। তিনি বেশ পড়ুয়া। যেমন লিখতেন দু’হাতে তেমনই পড়তেনও বেশ। ধর্মের সঙ্গে যোগ না রেখেও ‘সনাতন’-এর মতো চমৎকার শব্দ যে আত্মস্থ করা যায় এ তার প্রমাণ।

কোনও নদীর নাম চাইলে কেউ ‘সনাতন’ দিতে পারেন। সেই চির-পুরাতন জলধারা চির-নতুন হয়ে নদীটির মধ্য দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। এই যে গঙ্গা-যমুনা এ তো কতকালের নদী। সনাতন নদী। মানুষের লোভের পা এই সনাতন প্রকৃতির উপরে পড়েছে। ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তী প্ল্যানেটারি আর গ্লোবাল– এই দুয়ের ভাগ করেন। প্ল্যানেটারি যা, তা গ্লোবালের চাইতে সময়ের নিরিখে বড়। এই গ্রহের প্রকৃতি আর প্রাণিজগৎ, মানব জগতের চাইতে প্রাচীন। মানুষ অবশ্য প্ল্যানেটারির অস্তিত্ব ভুলে গ্লোবালকেই বড় করে তুলতে চায়। নিজেকে রাখতে চায় গ্লোবের কেন্দ্রে। তার এই বাসনার জন্যই সনাতন প্রকৃতির চরিত্র যায় বদলে। নানা বিপর্যয়ের আশঙ্কা করেন বিজ্ঞানীমহল।

যাঁরা অবশ্য এখন সনাতনপন্থী, তাঁরা সনাতনকে খাটো অর্থে ব্যবহার করতে চান। হিন্দু ধর্মকে তাঁরা সনাতন বলেন। হরপ্পা সভ্যতার কথা মনে রাখলে তাকে তো বৈদিকদের চাইতে প্রাচীন বলে মানতে হবে। সেই হরপ্পা সভ্যতার কত খবর যে নতুন করে আসছে আমাদের কাছে। বৈদিক সভ্যতারও নানা রূপ। বেদ, হিন্দুত্ব এই সবকে ঘিরে যে সনাতনের দাপট– তাকে চমৎকার প্রশ্ন করেছিলেন গৌরী ধর্মপাল। তিনি বেদের কবিতার বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। তাঁর বেদের কবিতা বড় ভালো বই। সেই বেদের কবিতার পরবর্তীকালে আরেকটি চেহারা গড়ে উঠেছিল। তার নাম ‘পুরোনতুন বেদের কবিতা’। গৌরী ধর্মপাল তাঁর বেদের কবিতার ভূমিকায় বুঝিয়েছিলেন, বেদ কী অর্থে একইসঙ্গে পৌরুষেয় ও অপৌরুষেয়। এ তো কেবল বেদের ঋষির কথা নয়, এ চিরকালীন কবির কথা। সনাতনকে যাঁরা নিত্য করে তুলতে পারেন অর্থাৎ চিরপুরাতনকে নিজের জীবনে চিরনতুন করে তুলতে পারেন– তাঁরা এক; আর সনাতন বলতে যাঁরা স্থবির একটা কিছুকে বোঝেন তাঁরা আর এক। একালে যাঁরা ‘সনাতন সনাতন’ বলে হিক্কা তুলছেন, তাঁরা অধিকাংশই সনাতন বলতে স্থবির একটা কিছুকে বোঝাচ্ছেন। বেঁচে থাকা আর টিকে থাকার পার্থক্য তাঁদের কাছে স্পষ্ট নয়। সেই যে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকে ছিল হাজার বছরের এক টিকে থাকা ব্যাঙের কথা, স্থবির সনাতনও তেমনই। আর যে সনাতন বেঁচে আছে তা চিরপুরাতন হয়ে চিরনতুন। তা একইসঙ্গে অপৌরুষেয় ও পৌরুষেয়। গৌরী ধর্মপাল বেদের কবিতার সূত্রে সেই কথাটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন। বাল্মীকি যখন প্রথম শ্লোক উচ্চারণ করলেন, তখন তিনি ভাবলেন, ‘এ আমি কী বললাম!’, আবার এ-ও ভাবলেন ‘এ কি আমিই বললাম?’: এই যে দ্বিধা ‘এ কি আমিই বললাম?’, এর মধ্যেই পৌরুষেয় ও অপৌরুষেয়র সমাধান। এ আমার মধ্যে যেন আর কারও বাণী তাই এ অপৌরুষেয়, আর এ তো আমারই মুখ দিয়ে আবার উচ্চারিত তাই এ পৌরুষেয়।

zoom
বাল্মীকির চোখে ব্যাধ ও মৈথুনরত ক্রৌঞ্চহত্যা, পুরাতন চিত্র

গৌরী ধর্মপাল বেদের থেকে প্রাসঙ্গিক শ্লোক উদ্ধার করে দেখিয়েছেন– আকাশ থেকে দৈববাণী হচ্ছে আর ঋষিরা তা শুনে লিখে নিচ্ছেন, অপৌরুষেয় বলতে কিন্তু তা বোঝায় না। একালের ‘সনাতন পন্থী’-রা তাই বোঝেন। আবার একথাও মনে রাখতে হবে যে, হিন্দুধর্ম বলতে একই আচারকে বোঝায় না। শাক্ত, বৌদ্ধ, বৈষ্ণব, জৈন কত কী! সময়ের ক্রম ভেঙে যদি এই নানাত্বের দিকে তাকানো যায়, তাহলে সনাতন বলতে একমাত্রিক একটা পুরনো চরিত্রকে নির্দিষ্ট করা যাবে না। সনাতন একইসঙ্গে পুরনো ও নতুন। যে যেভাবে সনাতনকে পায়, সে সেভাবেই তাকে প্রকাশ করে। সনাতন ধর্মের থেকেও ‘সনাতন’ সনাতন প্রকৃতি। কেউ যদি একা সেই অনন্ত বরফের বুকে দাঁড়িয়ে গ্লোবালের অহমিকা ভুলে প্ল্যানেটারিকে প্রণাম করে, তাহলে সেই সু-প্রাকৃতিক মানবতা মানববিশ্বকে এই মহাবিশ্বের মধ্যে সম্প্রসারিত করবে। রবীন্দ্রনাথের গানে ছিল আকাশ ভরা সূর্য তারার কথা, বিশ্বভরা প্রাণের কথা। তা প্ল্যানেটারিকেই বড় করেছে। অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড, বিশ্ব ভরা প্রাণ যেখানে, সেখানে ক্ষুদ্র ধর্মীয় সনাতনকে বড় তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে।

…………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন সিরিয়াসলি নেবেন না-এর অন্যান্য পর্ব

…………………….

Gouri Dharmapal hymns of veda Rabindranath Tagore Sanatan Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sister Nivedita Swami Vivekananda Veda

Share this article on