


‘প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’-এর মতো একটি আসর জমানো গান (হালফিলের ভাষায়– ‘ডান্স আইটেম’) উত্তরকালে প্রায় সবাই গেয়েছেন কাটা কাটা ভঙ্গিতে, বিলিতি স্টাকাটো ব্যবহার করে, পঙ্কজকুমার গাইছেন বাণীর অর্থ-জাগানিয়া উচ্চারে। অন্যদিকে, দেবব্রত বিশ্বাসের রেকর্ডের যন্ত্রানুষঙ্গ বিশ্বভারতী সংগীত সমিতির কানে রবীন্দ্রসংগীতের সুখকর মনে হয়নি, তাঁরা রেকর্ড কোম্পানিকে চিঠিতে যন্ত্র ব্যবহার সম্পর্কে যে আদেশনামাটি পাঠিয়েছিলেন, তার সার কথাটি ছিল প্রথাগত কয়েকটি যন্ত্রের সীমায় সংগীতকে অবরুদ্ধ করে রাখা। অপমানিত দেবব্রত নিজেকে রবীন্দ্র-রেকর্ডের দুনিয়া থেকে নির্বাসিত করে নেওয়ার চার বছর পর তিমিরবরণ রচনা করেন ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অবলম্বনে এক বহুমাত্রিক অর্কেস্ট্রা। সেটি ১৯৭৭ সাল।
১২.
যে বছর বই হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’, সেই ১৯১০ সালেই কলকাতা শহরে ইন্দুমাধব মল্লিক আবিষ্কার করছেন ‘ইকমিক কুকার’। সেই ইকমিক কুকারে, একই আধারে অন্ন ও ব্যঞ্জন রান্না করছেন তিমিরবরণ ভট্টাচার্য, মাইহারে বসে ১৯২৫-এ, বাবা আলাউদ্দিনের কাছে তালিম নিতে নিতে আর ইকমিক কুকারে রান্না করতে করতে তাঁর ভিতরে জন্ম নিচ্ছে ভারতীয় অর্কেস্ট্রার প্রথম রসায়ন।

তার ঠিক ১০ বছর পরে নিউ থিয়েটার্সের ‘দেবদাস’ ছবিতে ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে প্রথম অর্কেস্ট্রা প্রয়োগ করলেন তিমিরবরণ, সঙ্গী ছিলেন রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। এই বছরই পাহাড়ী সান্যাল রেকর্ড করলেন– ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’ গানটি, সেই রেকর্ডে প্রথমেই বেজে ওঠে কয়েক সেকেন্ডের একটি অর্কেস্ট্রেশন, ঠিক যেমন এই গড়নের অর্কেস্ট্রা বাজবে কয়েকদিন পর কানন দেবীর রেকর্ডে ‘প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’ গানের লম্বা প্রিলিউডে। বেহালা আর মাউথ অর্গানের অভিনব সিম্ফনি রচনা করে পণ্ডিত ভূষণের হিন্দি অনুবাদে এই গান গেয়ে (‘প্রাণ চাহে’) পঙ্কজকুমার সারা দেশে সাড়া ফেলে দিলেন ১৯৪০ সালে। মূল বাংলা ও হিন্দি তরজমা-সহ পঙ্কজ মল্লিক রেডিওতে গাইলেন এই গান, সেই গানে প্রথম পঙ্ক্তির পরই বেজে উঠল বিলিতি ঘরানায় এক আশ্চর্য ভায়োলিন, সঙ্গে হারমোনিয়াম। ১৯৪০-এ ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-কে হারমোনিয়াম ব্যবহারে আপত্তি জানিয়ে রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক চিঠিটি এসে পৌঁছনোর আগেই গাওয়া সেই গান রয়েছে ইউটিউবে।

পঙ্কজ মল্লিক তো তাঁর কেরিয়ার শুরুই করেছিলেন রেডিও-তে, ১৯২৭ সাল থেকে, তখন ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ নামটি আসেনি, ছিল ‘ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন’। সেখানে সঙ্গী হলেন রাইচাঁদ বড়াল, যিনি ‘ছায়াছবি’তে রবীন্দ্রগানে বিশদ জ্যোৎস্নার মতো নিয়ে আসবেন সিম্ফনি আর কর্ড প্রোগ্রেশন। খুবই অবাক লাগে এই কথা ভেবে যে, ইউরোপীয় ঘরানার এই অর্কেস্ট্রেশন প্ৰয়োগ করে, একদিকে যেমন এঁরা এসরাজ খোল মন্দিরার শান্তিনিকেতনী অনুষঙ্গ থেকে একটি গণমাধ্যমে নির্মাণ করছেন রবীন্দ্রসংগীতের এক অন্যতর পরিবেশন-প্ৰতিমা, তাঁরা কিন্তু গানটি গাইছেন রবীন্দ্রনাথের মতো কথা বলার দিশি চালে। ‘প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’-এর মতো একটি আসর জমানো গান (হালফিলের ভাষায়– ‘ডান্স আইটেম’) উত্তরকালে প্রায় সবাই গেয়েছেন কাটা কাটা ভঙ্গিতে, বিলিতি স্টাকাটো ব্যবহার করে, পঙ্কজকুমার গাইছেন বাণীর অর্থ-জাগানিয়া উচ্চারে।
একই সময়কালে কানন দেবীও এই গানের স্বরক্ষেপণে জুড়ে দিচ্ছেন অভিনয়। এই সংলাপধর্মী গায়ন একান্ত চলচ্চিত্রের দান বললে ভুল হবে, কথকতা, কীর্তন, শায়ের বলার দেশে ‘গান বলার’ যে ধারা, সেই ধারায় স্নান করে প্রস্তুত হয়েছে এই কণ্ঠ, প্রসাধন হিসেবে তুলে নিচ্ছে সংগীত আয়োজনের এক নব্য রসায়ন, উত্তরকালে যার মুখ্য প্রতিনিধি হয়ে উঠবেন দেবব্রত বিশ্বাস। দেবব্রতর রেকর্ডের যন্ত্রানুষঙ্গ বিশ্বভারতী সংগীত সমিতির কানে রবীন্দ্রসংগীতের সুখকর মনে হয়নি, তাঁরা রেকর্ড কোম্পানিকে চিঠিতে যন্ত্র ব্যবহার সম্পর্কে যে আদেশনামাটি পাঠিয়েছিলেন, তার সারকথাটি ছিল প্রথাগত কয়েকটি যন্ত্রের সীমায় সংগীতকে অবরুদ্ধ করে রাখা। অপমানিত দেবব্রত নিজেকে রবীন্দ্র-রেকর্ডের দুনিয়া থেকে নির্বাসিত করে নেওয়ার চার বছর পর তিমিরবরণ রচনা করলেন ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অবলম্বন করে এক বহুমাত্রিক অর্কেস্ট্রা। সেটি ১৯৭৭ সাল।

তার ১৬ বছর আগে রবীন্দ্রশতবর্ষে আরেকটি ঘটনা ঘটে। জওহরলাল নেহরু ফোন করলেন উদয়শঙ্করকে। রবীন্দ্রশতবর্ষ উপলক্ষে একটি ব্যালে চাই, এই অনুরোধ নিয়ে। ‘মা রান্নাঘরে নিম-বেগুন ভাজছিলেন’, বলছেন মমতাশঙ্কর, “বাবা বললেন, ‘অমলা কী করা যায় বল তো…’ খুন্তি হাতে মা বলে উঠলেন, ‘বহে মাঘ মাসে শীতের বাতাস স্বচ্ছসলিলা বরুণা…’ ব্যস, বাবা শুরু করলেন, ‘সামান্য ক্ষতি’ নিয়ে কাজ। কোনও টেক্সট নেই। পুরোটাই মিউজিক্যাল। পরদিন সকালে চলে এলেন কাকা (পণ্ডিত রবিশঙ্কর), আলিমামা (আলি আকবর খান) আরও সব মিউজিশিয়ানরা। তৈরি হল এমন একটা মিউজিক, যাতে রবীন্দ্রনাথের গানের ভিতরের নাটকটা ধরা আছে পুরো…।”
একটা কথা মনে হল লিখি। কি-বোর্ড আসার পর আসরে আর রেকর্ডে সেটি প্রায় সর্বজনীন হয়ে গিয়েছে। এমনকী, শান্তিনিকেতন উপাসনাগৃহ আলো করেও সেটি ইদানীং বাজছে গানের সঙ্গে উপাসনার অব্রাত্য উপাচার হয়ে। বেশ কিছু বছর ধরে রবীন্দ্রসদন থেকে স্টুডিও রেকর্ডিংয়ে, মন্দির থেকে মাচায়, কি-বোর্ড একটি কাজ খুব দক্ষতার সঙ্গে করে দিচ্ছে। সেটি হল ফিলার বাজানো। ধরা যাক, গাইয়ে গান ধরেছেন– ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা।’ তিনি গাইলেন, ‘ভ-অ-অ-রা’। পরের পাঁচ মাত্রায় ওঁর কণ্ঠ ‘সা’-তে দাঁড়াক না দাঁড়াক, যন্ত্রী অব্যর্থ হাতে বাজিয়ে দেবেন টিং টুং করে পাঁচ রকমের স্বরের একটি ফিলার। ‘ভরা’ শব্দটির জন্য ছয়টি মাত্রা পূর্ণ করে ‘সা’ পেতে রেখেছেন স্রষ্টা। সেই পূর্ণতার নিটোল অবয়বটিকে আহত করে ‘ফিলার’ নামে ওই বাড়তি অস্ত্র, মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথের সেই উক্তি, ‘আমার গানে আমি তো কোনো ফাঁক রাখি নি…’।

এই লেখা শুরু হয়েছিল তিমিরবরণের সংগীত আয়োজনের আখ্যান দিয়ে। ১৯৩৫ সালে দীর্ঘ প্রিলিউড ইন্টারলিউড সম্বলিত ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’ গানটি গেয়েছিলেন যে পাহাড়ী স্যান্যাল, তাঁকে দিয়েই ঠিক চার বছর বাদে ১৯৩৯ সালে একই গান গাইয়ে নিলেন ‘অধিকার’ ছবিতে। সেই ছবির সংগীত পরিচালক হিসেবে তিমিরবরণ গানটিতে কোনও ইন্টারলিউড প্রিলিউড ব্যবহার করলেন না। ‘বাতাস বহে’ আর ‘ভেসে আসে’– এই দু’টি জায়গায় যেখানে স্থির স্বর ছয় মাত্রা জুড়ে, সেখানে ব্যবহার করলেন সেই স্বরকে নিয়েই অর্গানে একটি পশ্চিমি ভ্যাম্প, বাড়তি কোনও স্বরের আমদানি না-ঘটিয়ে বাতাসের বহে যাওয়া আর সুগন্ধের ভেসে আসার জন্য রবীন্দ্রনাথ যে স্পেস রেখেছেন, সেই স্পেসটিকে আলোকিত করে তুললেন, ওই ভ্যাম্পের ছন্দে রইল সেই বাতাসের সুমন্দ চলা, সুগন্ধ ভেসে আসবে বলে আমাদের প্রতীক্ষার হৃদস্পন্দন, আর ঠিক যেমন করে দিগঙ্গনার বুকের আঁচলে কাঁপন লাগে, বাঁশিতে তেমন একটি অদীর্ঘ কিন্তু ক্ষিপ্র তান অন্তরা আর আভোগের পুনরাবৃত্তির মাঝখানটিতে। তিমিরবরণের ধ্রুপদী ঘরানার সতীর্থ বাহাদুর খান এমনিই অলৌকিক আলো বিছিয়ে রাখেন রবীন্দ্রগানের ভূমিতে, ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’ আর ‘সুবর্ণরেখা’ ছবির গানগুলিতে।

রেডিও-তে পঙ্কজ মল্লিকের গানে বিলিতি ভায়োলিন বেজে ওঠার অনেক পরে এসরাজ তবলা সেতার বাঁশির একটি নিয়মিত সাহচর্য শুরু হয় রবীন্দ্রসংগীতের ব্রডকাস্টিং-এ। সুপূর্ণা ঠাকুর (চৌধুরী) একবার কলকাতা রেডিও স্টেশনে গান গাইতে গিয়েছেন। ফ্লোরে ঢুকে দেখেন সেদিনের তবলার দায়িত্বে উস্তাদ কেরামতউল্লা খান বসে আছেন। সেকালে ওইরকমই ছিল, যাঁর যে তারিখে বাজার কাজ, তিনিই থাকবেন ফ্লোরে। ‘আমার তো ওঁকে দেখে হাত পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে’ বলছেন এই লেখককে কোমলস্বভাব সুপূর্ণা চৌধুরী, নয়ের দশকে জলপাইগুড়ির এক সংগীত কর্মশালায় এসে, ইউরোপিয়ান ক্লাবের কাঠের বারান্দায় বসে, “উনি সস্নেহে ডাকলেন, ‘কোঈ বাত নেহি বেটি, আপ গাইয়ে…’ আমার প্রথম গান ছিল– ‘ডাকো মোরে আজি এ নিশীথে’। আমি গাইতে শুরু করলাম। গানের কী রূপ যে ফুটিয়েছিলেন উনি!”

রেডিও-র মানুষ জগন্নাথ বসুর মুখে শোনা আরেকটি গল্প। সত্যজিৎ রায়কে একদিন সসম্ভ্রমে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনি জন-অরণ্য ছবিতে ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’ গানটি ব্যবহার করেছেন। ছবিতে গানটির সোর্স কি রেডিও?” ভুরু কুঁচকে ব্যারিটোনে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ’। কিন্তু, মানিকদা, গানটি খালি গলায়। রেডিওতে তো রাষ্ট্রীয় শোকের সময় ছাড়া খালি গলায় গান হয় না। ঈষৎ থমকে গম্ভীর গলায় সপাটে জবাব দিলেন সত্যজিৎ রায়, ‘হওয়া উচিত’।” বলে গটগট করে বেরিয়ে গেলেন।
‘জনঅরণ্য’ ছবিতে এক গভীর অস্তিত্বসংকটের মুহূর্তে গানটি ভেসে আসে। স্বপ্ন দেখা একটি সম্ভাবনাময় যুবক কর্পোরেট দুনিয়ার সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করছে। ছায়া ঘনিয়ে আসছে শর্মিলা রায়ের গাঢ় স্বরে। ওই সংশয়ে, সংকটে গানের মিলিয়ে যাওয়া বাণীতে শুনছি যেন অন্তরাত্মার কণ্ঠস্বর– ‘যে মধু হৃদয়ে ছিল মাখা, কাঁটাতে কী ভয়ে দিলি ঢাকা!’ সেই স্বরে গাঁথা থাকে যন্ত্রহীন নৈঃশব্দের তর্জনী।
…………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন ঠাকুরঘরানা-র অন্যান্য লেখা
…………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved