


ঘনাদার মজার গল্পে প্রেমেন্দ্র মিত্র দুটো বিপরীতমুখী গতিকে সামনাসামনি লড়িয়ে দিয়েছেন। জ্ঞান বলতে আজ আমরা যা বুঝি, সত্য বলতে জ্ঞানের যে গঠনকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া হল, সেই বৈজ্ঞানিক তথ্যনির্ভর কাঠামোটিতে লেখক সযত্নে ঢুকিয়ে দিয়েছেন এক হাঘরে মানুষকে। যার জ্ঞানে কোনও কমতি নেই তবু সত্য উৎপাদন তার সাধ্য নয়। প্রভুর কথার স্রোত যদি দাসের মুখে বসে, তাহলে সেই একই কথা হাস্যকর হয়ে যেতে পারে। সব কথা তাকে মানায় না।
ঘোড়া দেখলেই সবার পায়ে বেমালুম বাত। কোনও কিছু লিখতে গেলে এই তেজি প্রাণীর চলাফেরা মনে আসে। সোজা গট গট করে কিছু যে বলে যাব, এমন কনফিডেন্স কস্মিনকালেও ছিল না। আড়ে আড়ে কোনাকুনি চলতে গিয়েও লজ্জায় মাথা কাটা যায়। তাই আড়াই চালে ভাবি। বাধা টপকে আদার ব্যাপারীও মোক্ষম ঘরটিতে গিয়ে বসতে পারে চোখের পলকে। কাটাকুটি– সে পরের কথা। তবে নিওলিথ স্তব্ধতায় না হোক মহীনের পোষা জীবটির আপন মনে ঘাস খাওয়ার দৃশ্য নিউটাউনেও দেখা যায়, সূর্যাস্তে, সন্ধ্যায়। স্যুররিয়াল। বিষাদ মন্থর। দিনশেষের লালচে আলোয় পিঠের ভাবনা-ক্ষতগুলো চিক চিক করে। কারও হাসি পায়, কারও চোখে জল আসে।
…………………………………………..
১৯.
১.
তিলকে তাল করে তোলা– কে জানে কেন বাঙালির স্বভাবধর্ম। চিন্তার ধরন-ধারণেই কোথাও ভূত ঢুকে বসে আছে বোধহয়। আর এই স্বভাবটাকেই যাঁরা নিজেদের ক্ষমতাগুণে কথাশিল্পে পরিণত করেন, সেই অসীম শক্তিধর মানুষগুলোকে ঘিরে একদিন তৈরি হয়ে উঠেছিল বাঙালির প্রায় পেটেন্ট নেওয়া কুটিরশিল্প ‘গুল’। বিশেষ পরিবেশে এরই একটু বড়ভাই– গাঁজাখুরি। ইংরাজি ‘Tall Story’-র থেকে জাতেগোত্রে আলাদা এই গুল-গল্পের মাঝখানে থাকেন এক আড়াধারী মহাপুরুষ– সৈয়দ মুজতবা আলির ঢঙে বললে– ফরাসি দেশে এঁদের বলে ‘দ্য গুল্’, বিলেতে ‘গুলিস্ট’, রাশিয়ায় ‘গুলাকভ’, আমরা আট্টু বাড়িয়ে নেদারল্যান্ডসে ‘গুলিট’ আর আমাদের পোড়ার দেশে, ‘গুলজারিলাল’ এবং বর্তমান অবস্থায় যে কোনও সর্বোচ্চ স্তরের দেশপিতার নাম ভাবতেই পারি। তবে কোন আর্থসামাজিক মহাসন্ধিক্ষণে, ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায়, গণ-মানসিক প্রবণতায় বাঙালি তার গুলমোহরে ছাপ রাখল– তা খতিয়ে দেখতে পারেন কেউ। এই আলোচনায় তার সুযোগ নেই। আমরা বরং চোখ রাখব এই সাম্রাজ্যের এক মুকুটহীন সম্রাটের দিকে।
‘গুল’ মানে মিথ্যে। সত্যি-র মতো মিথ্যেরও হরেকরকম চেহারা আছে। নানা আশ্রয় তার, নির্ভর নানাখানে। হতে পারে তা ত্রৈলোক্যনাথের ডমরুচরিত। গাঁজাখুরি গল্পের গরু যেখানে পাকা বাস্তবের তোয়াক্কা না করে গাছে তো চড়েই, এমনকী মরা কুমিরের পেটেও জলজ্যান্ত মাছের বাজার সাজিয়ে বসে। গাঁজাখুরির মূল ভিত্তি নেশায়। নেশার ধরনে, কথনের শিল্পে, যুক্তিবুদ্ধির সেখানে থোড়াই কেয়ার। কিন্তু কেউ যদি, সত্যি বলতে আমরা যা বুঝি, সেই যুক্তিনিষ্ঠ জ্ঞানভাণ্ডারের উপর বসেই মিথ্যের কারবার শুরু করে?
টনটনে বাস্তবজ্ঞান আর নির্ভুল তথ্যে-সত্যে মিলিয়ে নির্বিকার মিথ্যে কি বলা যায় কখনও? হো হো করে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার পরেও তখন সে মিথ্যের বেশ খানিকটা বাকি থেকে যায়। এই বিপজ্জনক মিথ্যে উদ্বৃত্ত– তখন সত্যি নিয়ে, মিথ্যে নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনাগুলোকেই প্রশ্ন করে বসে।

২.
‘আলপনা’ পুজো সংখ্যায় ১৯৪৫ সালে একটি ছোটগল্প ছাপা হল, নাম– ‘মশা’, আবির্ভাবই বলা ভালো একে। এক মোক্ষম হুল বিঁধল বাঙালির মনে।
নানা কারণে এই বছরটা ভোলার জো নেই। দু’-দুটো অ্যাটমিক বিস্ফোরণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সাঙ্গ করে শক্তিক্ষেত্রে চূড়ামণি হয়ে আবির্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ঠান্ডা-গরম নানা যুদ্ধে গোটা পৃথিবীটাকেই আজ পর্যন্ত খুঁচিয়ে রাখতে যে রাষ্ট্রের কোনও ত্রুটি থাকবে না। ধ্রুপদী ঔপনিবেশিক শোষণের যুগ আবছা হয়ে ততদিনে বাজারে হাজির হয়েছে নয়া উপনিবেশবাদের শৈশবমূর্তি। প্রযুক্তিবাদী আধুনিকতার তুঙ্গ মুহূর্ত তখন। একই সঙ্গে দু’-দুটো বিশ্বযুদ্ধে গোটা পশ্চিম দুনিয়ার মানবিক কল্যাণকারী ভণিতা নস্যাৎ হয়ে পৃথিবীজোড়া তৈরি হতে শুরু করেছে ‘দুনিয়ার হাঘরে’দের ‘দেশে ফেরার খাতা’। লেখা হচ্ছে মার খেতে খেতে উজার না হওয়া মানুষের নানা ধরনের প্রতিরোধ।
ছোট্ট একটা ‘মশা’, তারাই যে পালে পালে মারণ হুল ফোটাতে পারে সভ্যতায়– এক কামড়েই দেখ না দেখ সাবাড় করে দিতে পারে মহাপালোয়ানদের– এ কি ভাবতে পারে কেউ? আর এ-ও কি ভাবা যায়, এই মারণাস্ত্র বিজ্ঞানপ্রযুক্তির আজকের ভাষায় Bio-Technology-র বাই-প্রোডাক্ট! জাপানি বিজ্ঞানী নিশিমারা (নামটা দেখুন) মশার মুখের লালায় রাসায়নিক বদল ঘটিয়ে তৈরি করেছেন এক খুনে মশা। আর সেটিকে এক চড়ে খতম না করলে (বিজ্ঞানী-সহ) কোথায় যেত এই সভ্য জগৎ! সেই চড় মারলেন আর কেউ নয়, চড়চাপড়ে মশা মারতে যাঁরা নিঃসংশয়ে দক্ষ– সেই বঙ্গসন্তানদের কুলতিলক ঘনশ্যাম দাস।
ঘনাদার পরিচয় দিতে গিয়ে কথক স্বয়ংই হিমশিম খেয়ে যায়, আমাদের আর সাধ্য কী! তিনি এক সত্যিকারের গেছো দাদা। না আছে তার ভূত-ভবিষ্যতের ঠিকানা, না কোনও সুনিশ্চিত বর্তমান। কাঠবেকার বলেই মনে হয় তাকে। থাকেন ৭২ নম্বর বনমালী নস্কর লেনে, অথচ মুখে মুখে গোটা পৃথিবীটারই বাসিন্দা। তিন কুলে কেউ আছে কি না জানে না কেউ। অসম্ভব অভিমানী অথচ খাদ্য, নেশা ও সুবিধের লোভ মারাত্মক। আগাগোড়া রহস্যময় তার পরিচয় এবং গতায়াত। থাকার মধ্যে একটা গোপন টিনের বাক্স আর গল্প বলার ক্ষমতা।

বিজ্ঞানের হালফিল আবিষ্কার থেকে শুরু করে ইতিহাসের বা ভাষাতত্ত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুরে বেড়ায় তার জ্ঞানের জাহাজ– জানেন না হেন বিষয় নেই। গোটা পৃথিবীর ভৌগোলিক আর সাংস্কৃতিক পরিচয় নখের ডগায় নিয়ে তিনি, এক স্থানাঙ্কে বসে সর্বচরাচরে বিরাজমান। এক কথায় মহাজ্ঞানী বাকশিল্পী। যাঁর বাক্যস্রোত থামানো অসাধ্য।
পোষমাস খতরনাক সিস্টোসার্কা গ্রিগেরিয়ার ঝাঁকে জীবাণু ঢুকিয়ে দিলেন ঘনাদা, নইলে বিজ্ঞানী রথস্টাইনের প্রতিশোধস্পৃহায় সেই পঙ্গপালের দল পলকে পৃথিবীর খেতখামারগুলোকে শ্মশান করে ছাড়ত। মাগুরমাছের ছটফটানি দেখে ভূমিকম্পের আন্দাজ পাওয়া বা সামান্য এক নুড়ি তুলে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ ডুবিয়ে দেওয়া তো নস্য– এভারেস্টের মাথায় তেনজিং বা এডমন্ড হিলারির আগে মাথার টুপিটা রেখে এসেছিলেন স্বয়ং ঘনাদা। কখনও ফ্লাইং সসার, কখনও কম্পিউটারের দানবিক আদিমতা, শত্রুপক্ষের অ্যাটমিক শয়তানি, ইউরেনিয়াম বা রেডিয়াম রাহাজানি, ছায়াপথ থেকে ধেয়ে আসা বিপদ– সবকিছু থেকে অকুতোভয়ে এই পৃথিবীকে বারবার বাঁচিয়ে দেন তিনি। প্রযুক্তির মৃত্যুমুখী আগ্রাসী রূপটাকে জীবনের দিকে বারবার ঘুরিয়ে দেওয়াই ওঁর খেলা। যে বাধা দেবে ঘনাদাকে, তার মতো বদনসিব বেচারা এ দুনিয়ায় দুটো নেই।

এই গল্পের স্রোতে দাঁড়ালে ভেসে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। হো হো করে যে পথিমধ্যে হেসে উঠবে কেউ তাও সম্ভব নয়– আগাগোড়া তথ্যের বহর, অজানা খবর শ্রোতাকে কাত করে দেবেই। কম চেষ্টা করেছে তার আদত শ্রোতার দল, মেসের ছেলেছোকরারা, তাকে জব্দ করার? তিব্বতি ভাষার চোখা শব্দ তুলে আনা থেকে শুরু করে সাজানো আরবি পুথিপড়া মৌলবি অবধি বাদ রাখেনি কিছুই। দশরকম আদিম ভাষা থেকে এক-একটি অক্ষর পাশাপাশি রেখে ‘Ghanashyam Das hoaxed…’ পর্যন্ত লিখে রাখা হল– ঘনাদা হোঁচট তো খেলেনই না, উল্টে লিপিমালার অর্থ বলে নিজস্ব কায়দায় সিগারেটে টান দিতে দিতে উঠে গেলেন চিলেকোঠায়। এ এক এমন গল্প, যেখানে মিথ্যেরই গুণোত্তর প্রগতি শুধু নেই। সত্যি-মিথ্যে, তথ্য-গল্প টানটান বাঁধা আছে গল্প বলার কৌশলে। প্রযুক্তিও বলতে পারেন কেউ একে।
৩.
সত্যি কাকে বলে? এর কি কোনও উত্তর হয়? তবু জ্ঞানের গঠনে সত্যের একটা দাবি আছে। সারা পৃথিবীর নানাবিধ দর্শন শাখায়, লৌকিক বোধবুদ্ধিতে কতরকমের পথ তৈরি হয়ে চলেছে ‘সত্যি’কে জানার। আমরা সেসব জটিলতায় যাব না। এনলাইটেনমেন্ট-পরবর্তী আধুনিক ইউরোপে সত্যের এক সর্বমান্য চেহারা তৈরি করে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি। জ্ঞানের সরবরাহকারী তথ্যভিত্তি তৈরি হয় এনসাইক্লোপিডিয়ার মাধ্যমে (দিদেরো)। সময়টা একইসঙ্গে বণিক পুঁজি থেকে বদলে যাওয়া শিল্পপুঁজির কাল এবং আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদেরও ছড়িয়ে পড়ার কাল।
প্রমাণ, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা, অনুসন্ধিৎসা, পুনরাবৃত্ত ফল-এর নিরিখে তৈরি নিঃসন্ধিগ্ধ বৈজ্ঞানিক প্রত্যয়কেই বলা হতে থাকে সার্বজনিক সত্য। অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিলব্ধ জ্ঞান দেশকালপাত্র-নিরপেক্ষভাবে সত্যি। অনিশ্চয়তা-পূর্ববর্তী আধুনিক বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির ইতিহাস, বিজ্ঞানকে সামনে রেখে তৈরি করে তোলে জ্ঞানের এক বিজ্ঞানবাদী চেহারা। বিজ্ঞান আর বিজ্ঞানবাদকে এখানে দুটো আলাদা পরিসর হিসেবে ধরে নেওয়া ভালো।
বিজ্ঞানবাদী বয়ানে যে কোনও জ্ঞানেরই সত্যতা অর্জনের একটাই উপায়– তাকে বিজ্ঞানের পদ্ধতি নিতে হবে। এই ঝোঁক ইতিহাসচর্চা, ভাষাবিজ্ঞানচর্চা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানচর্চা এমনকী মানবিক বিদ্যার সব ক্ষেত্রের মতো সাহিত্যচর্চারও মূল নির্ভর হয়ে উঠল। প্রমাণবাদী এই জ্ঞান ছাড়াও আরও কতরকম জানার কৌশল ছিল বা আছে– সবই হয়ে উঠল প্রান্তিক। হারিয়েও গেল অনেক চর্চা।

কথাটা পরিষ্কার করতে এখানে তুলে নিতে পারি আমাদের বহুপরিচিত এক দেওয়াল লিখন– ‘মার্কসবাদ সত্য কেননা ইহা বিজ্ঞান’, যে কোনও ‘বাদ’-এর মতোই জ্ঞানচর্চার এই বিজ্ঞানবাদী কাঠামোও এক বদ্ধ বয়ান। আর এই ধ্যানধারণা ঔপনিবেশিক শিক্ষার মাধ্যমে উপনিবেশের মানুষের মনেও এক নতুন ঘূর্ণি তুলে দেয়। সত্যের একটাই পরিচয়– তা বিজ্ঞানলব্ধ, এ এক অমোঘ নিয়ম।
এই ইউরোপীয় বিজ্ঞানবাদ আর বিজ্ঞানবাদী যুক্তিকাঠামো সম্পূর্ণত ব্যবহৃত হয়েছিল পৃথিবীব্যাপী ঔপনিবেশিক শোষণের হাতিয়ার হিসেবে। অর্থনীতির অ্যাডাম স্মিথ কথিত সাধারণ নিয়ম, ডারউইনের যোগ্যতমের উদ্বর্তনবাদ, ফ্লেনোলজি আর অ্যানথ্রোপোলজির পর্যবেক্ষণ একইসঙ্গে ইতিহাসের সুনিশ্চিত অতীত নির্মাণ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন উপনিবেশবাদকে এক প্রাকৃতিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। আর উপনিবেশগুলোতে শিক্ষাদানে, বুলেটে বেয়নেটে সাঁড়াশি আক্রমণ হয়ে উঠেছিল এক মস্ত প্রবঞ্চনা।

আধুনিক ইউরোপে আলোকপ্রাপ্তি-পরবর্তী এই জ্ঞানবিস্তার, অগ্রগতি, আবিষ্কার আর অনুসন্ধানের ইতিহাসটা মায়াবী। ‘টেম্পেস্ট’ নাটকে, প্রসনেরোর ম্যাজিকের মতো, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির প্রয়োগে একটি মধ্যস্থতাকারী বিশেষ শ্রেণির সার্বিক উন্নতি, উপনিবেশের মানুষের কাছে চিরকালের অবনতির কারণ। তাই পৃথিবীর একদিকে যেটা কল্যাণ অপরদিকে সেটা অকল্যাণ। একদিকে যেটা অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, অন্যদিকে তাকেই বলা যায় মারাত্মক ক্ষয়।
এই বিপরীতের টানই আমার কাছে ঘনাদার গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার। প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছেন জানার বিস্ময় আর তার সঙ্গে একটু কৌতুক করার জন্যই ঘনাদার প্রবর্তনা। সাধারণভাবে কোনও ফাঁক পাওয়া মুশকিল ঘনাদার গল্পে। বিজ্ঞানলব্ধ নতুন সব জ্ঞান, প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা-নিরীক্ষার হাঁড়ির খবর, ডেমোগ্রাফি বা ভূগোল, ইতিহাস বা ভাষাতত্ত্বের পুঙ্খানুপুঙ্খ ছড়িয়ে আছে ঘনাদার গল্পে। ভ্যল্পেস ইয়াগোপ্স আর মসটেলা আরমেনিকা যে যথাক্রমে মেরুশেয়াল আর রুশ খটাশ– ঘনাদা না পড়লে আমি জানতে পারতাম না। ল্যাটাক্স লুট্রিস যে সমুদ্র ভোঁদর আর তার চামড়ার দামও মারাত্মক– একথা কি আমার জানার কথা। সুতো দিয়ে তৈরি ইনকাদের সাংকেতিক ভাষা কিছু কি আমরা পড়তে পারি? পালোলা উৎসবের মহিমাই বা জানতাম কী করে ঘনাদা না থাকলে!

তবে মশকরা করার ঢঙে গল্প বলেন না কখনও তিনি। মাঝখানে হাসিচাপা কাশি বা বেয়াড়া মন্তব্যে বেজায় চটে যান, আলগোছে তুলে নেন একটা কোনও তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিস। হতে পারে তা ‘নুড়ি’, ‘ছড়ি’, ‘তেল’, ‘ইঁট’ বা ‘পোকা’। আমরা সবিস্ময়ে দেখি আস্তে আস্তে ঘিরে ধরে তথ্যভিত্তি, নানা বিদ্যার যুগপৎ প্রয়োগ, বেড়ে ওঠে বিজ্ঞানপ্রযুক্তি-ঘেঁষা জ্ঞান, টান লাগে মনে– ‘লাট্টু’ হয়ে যায় ফ্লাইং সসার, ‘সুতো’ হয়ে যায় কিসু, ‘ফুটো’ পরিণত হয় ব্ল্যাক হোলে। কোথাও এতটুকু তথ্যের ফাঁক নেই।
কল্পবিজ্ঞানের গল্পগুলোর কথা যদি মনে করি, তার সঙ্গে এর মস্ত ফারাক উপস্থাপনে। কল্পবিজ্ঞানে অসম্ভবের গতি আসন্ন সম্ভাব্যতার দিকে। তা বিস্ময়ের হতে পারে, বিষাদের হতে পারে। আর ঘনাদার গল্পগুলোর গতি সমস্ত সম্ভাব্য তথ্য আয়োজন নিয়ে অসম্ভবের দিকে। তাই শেষমেশ হাসি পায় আমাদের। এতসব জ্ঞানঘূর্ণির পরে, ঐতিহাসিক প্রমাণের পরেও, জানি আমরা, এ হতেই পারে না, এ অসম্ভব– নেহাৎ বাকতাল্লা ছাড়া কিছু নয়!
৪.
জ্ঞানের এই তথ্যপ্রমাণ-নির্ভর বৈজ্ঞানিক গঠনে দাঁড়িয়ে এভাবে হাসি পাওয়ানোর মানে কী? কেনই বা পায় হাসি? সত্যি কথায় এহেন আয়োজন মিথ্যেই বা হয়ে যায় কী করে? আবার আমরা ফিরে আসি সেই পুরনো প্রশ্নে, কে এই ঘনাদা? তৃতীয় বিশ্বের এক অখ্যাত গলির বর্ষাকালে আধডোবা মেসবাড়ির চিলেকোঠার প্রায়-বেকার এক বাসিন্দা। অর্থাৎ সে অর্থে বিশ্বের দরবারে ‘মুখেন মারিতং জগৎ’ এক বেফালতু মানুষ।
জ্ঞান তো সবার। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা লব্ধ সত্য সার্বজনিক, কিন্তু যখনই মানবিক মধ্যস্থতাকারীর (human agency) প্রশ্ন এসে যায় তাঁর প্রায়োগিক মুহূর্তে– তখনই সত্যিগুলো মিথ্যে হয়ে যেতে পারে চোখের পলকে। বিদ্যায় অধিকারী সবাই, বাক্যে অধিকার সবার, কিন্তু প্রয়োগে কি সবার অধিকার আছে? ঔপনিবেশিক শিক্ষা-প্রণালীর এইটেই তো ছিল মূল কারসাজি। সায়েন্স কলেজ প্রতিষ্ঠা বা আমাদের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন-উত্তর জাতীয় শিল্প পরিষদ প্রতিষ্ঠার স্বতন্ত্র দেশীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণার ইতিহাস যদি কেউ খতিয়ে দেখেন, এই উলটপুরাণ তাঁর চোখ এড়াতে পারে না। প্রেমেন্দ্র মিত্র যে সময় ঘনাদার বিবরণ পেশ করা শুরু করলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে ততদিনে এই দ্বিচারিতা ফাঁস হয়ে গিয়েছে। প্রায় ৩৫ বছর ধরে এরপরেও ঘনাদার গল্প লিখবেন তিনি। কিন্তু গল্পের ভেতরকার মানুষগুলোর বয়স বা চরিত্র বদলাবে না।

সময় এক স্তরে থেমে থাকবে তাঁর লেখার ভেতরে। আর এগিয়ে যাওয়া সময়ের ভেতর থেকেও ছিটকে আসবে বাইরের দিক থেকে সমসাময়িক জ্ঞানবিদ্যা। একটা কোনও বিশেষ সময়কে এভাবে থামিয়ে রাখার একটা অর্থ হতে পারে– ১৯৪৫ সালই ছিল প্রযুক্তিবাদী উন্নয়নশীল মানবিক পশ্চিমি শক্তির আণবিক মুখ দেখতে পাওয়ার বছর।
মনের গতি থামার নয়, সে তার দূরাকাঙ্ক্ষা নিয়ে দুর্বার বেগে ছুটে চলে, সত্যের দিকে, জ্ঞানের দিকে– কিন্তু পায়ের শেকল তাকে ছাড়ে না। বৃথা ভ্রমণ শেষ হয় মাটিতে আছড়ে পড়ে। সাধ্য আর সাধনা, ইচ্ছে আর সংগতির মধ্যে যাদের বিস্তর ফারাক তাদের আবার অত ক্রিয়া কীসের!

গল্পটা আসলে করুণ, তবু হাসি পায়। হাসি তো দুঃখেরই কয়েক ধাপ আগের জিনিস।
৫.
এই লেখাটাকে একরকম প্রস্তাব বলাই ভালো। বাস্তব সহজ, ঘনাদার মজার গল্পে প্রেমেন্দ্র মিত্র দুটো বিপরীতমুখী গতিকে সামনাসামনি লড়িয়ে দিয়েছেন। জ্ঞান বলতে আজ আমরা যা বুঝি, সত্য বলতে জ্ঞানের যে গঠনকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া হল, সেই বৈজ্ঞানিক তথ্যনির্ভর কাঠামোটিতে লেখক সযত্নে ঢুকিয়ে দিয়েছেন এক হাঘরে মানুষকে। যার জ্ঞানে কোনও কমতি নেই তবু সত্য উৎপাদন তার সাধ্য নয়। প্রভুর কথার স্রোত যদি দাসের মুখে বসে, তাহলে সেই একই কথা হাস্যকর হয়ে যেতে পারে (‘আয় বাঁদী তুই বেগম হবি খোয়াব দেখেছি, আমি বাদশা বনেছি’– আবদাল্লার গানটা মনে পড়বে আমাদের)। সব কথা তাকে মানায় না। সে যা করে তা দাসের কাজ, সে যা বলে তা প্রভুর জবান। তাই মিথ্যে ছাড়া আর কোনও উপার্জন নেই তার। এভাবেই হাসির মধ্যে দিয়ে একটা চোরা অন্তর্ঘাতও হাজির হয় প্রভুর বয়ানে। তিনি যাকে নিয়ম বলেন আমি ধরিয়ে দিই– সে নিয়ম সবার নয়।

মনে হতে পারে এই সবই বাড়িয়ে ভাবা। মজার গল্পে আবার অত কী? কিন্তু স্বয়ং লেখকই ক্রমাগত খুঁচিয়ে দেন পাঠককে বারবার। ঘনাদার সবচেয়ে বড় গল্পের নাম– ‘সূর্য কাঁদলে সোনা’। সে উপন্যাস পিসারোর লাতিন আমেরিকা অভিযানের ছায়ায় লেখা। পৃথিবীর ইতিহাসে যত যা রক্তাক্ত ঔপনিবেশিক অভিযান সে সবের মধ্যেও এটি ঘৃণ্যতম। ঘনাদার পূর্বপুরুষ ঘনরাম এই উপন্যাসে প্রতিরোধকারী এক চরিত্র। ‘গানাদো’– যার অর্থ ‘গরু ভেড়া’– এই ছিল ঘনাদার আর এক পূর্বপুরুষের নাম, যে ক্রীতদাস হয়েও আবিষ্কার করেছিল পৃথিবীর প্রথম চলমান ট্যাঙ্ক।
ঘনাদার বেশিরভাগ গল্পই প্রযুক্তির খুনে প্রয়োগ থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোর গল্প, সত্যিকারের টেকনোলজি ফর ম্যানকাইন্ড।
ঘনশ্যাম দাসের বাক্যবাণ আদতে তাই এক উপনিবেশিত সত্তার অন্তর্ঘাতী বয়ান, যা দেখিয়ে দেয় প্রভুর সত্যি: স্থানকালপাত্রভেদে মিথ্যের বেসাতি! তাঁকে বিশ্বাস করার, মান্য করার অত কিছু নেই।

ঘনাদার নামটুকু খেয়াল করলে সন্দেহের আর কোনও অবকাশ থাকে না। ঘনশ্যাম দাস, কথাটিকে অন্তত সকলের জানা একটি প্রভু জবানে: অনুবাদ করে নিন– এক Dark Black Slave এসে হাজির হবে তার গল্পের ঝুলি নিয়ে।
সত্যমিথ্যের গোলকধাঁধায় যারা বারবার বাঘের খাঁচার সামনে এসে দাঁড়ায়– তাদেরই রঙচঙে এক প্রতিনিধি ঘনাদা। সত্যি দিয়ে তার গল্প শুরু হয়, শেষে লেখা ‘মিথ্যেরই জয়’।
… এক, দুই, আড়াই-এর অন্যান্য পর্ব …
১৮. অপ্রকাশিত মানিক: নিজেকে লেখার বেনিয়ম
১৫. ঋতুপর্ণ, অন্তরমহল আর রবীন্দ্রনাথ
১৪. জয় এখন শেষজীবনের বুদ্ধদেব বসুর মতোই প্রশ্নাতুর
১৩. নকশাল পর্বের হত্যা-প্রতিহত্যার পরিবেশে কলকাতায় এসেছিল মারি ফারার
১২. এমনও হাসি আছে বেদনা মনে হয়
১১. গুরুদত্ত চেয়েছিলেন, বিজয়ের চলে যাওয়া দিয়ে শেষ হবে ‘পিয়াসা’
১০. কবির বিশ্রাম
৯. গত ২০ বছরে নস্টালজিয়ার এত বাড়বাড়ন্ত কেন?
৮. কলকাতার মূর্তি-আবর্জনা কি বাড়ছে?
৭. ভাবা প্র্যাকটিস করা, কঠিন এখন
৬. লেখার অত্যাচার, লেখার বাঁচা-মরা
৫. বিশ্বকর্মা পুজোর সন্ধেবেলাটার মতো বিষাদ আর হয় না
৪. কথা শেষ হতে পারে, ‘শেষ কথা’ বলে কিছু হয় না
৩. দেখা হলে বলে দিও, আজও বেঁচে আছি
২. ফুলের রং শেষ পর্যন্ত মিশে যায় নন্দিনীর বুকের রক্তের ইমেজে
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved