Robbar

অপ্রকাশিত মানিক: নিজেকে লেখার বেনিয়ম

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 13, 2026 9:22 pm
  • Updated:June 13, 2026 9:27 pm  

খুব পরিচিত দুটো ফোটোগ্রাফ আছে মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের। এক, প্রত‌্যয়ী মুখে স্মিত হাসি, তাকিয়ে আছেন একপাশে, উজ্জ্বল হয়ে আছে মুখটা, কোনও অদেখা আলোয়। অন‌্য ছবিতে সরাসরি দর্শকের মাথার সামান‌্য ওপর দিয়ে দেখছেন, উৎকণ্ঠ মানিক। চাপা অস্থিরতায় সমস্ত ছবিটাই থমথম করছে। একটা অমঙ্গল যেন আমাদের ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে। দুটো ছবিই সুনীল জানার তোলা। আমাদের মানিক পাঠেরও সাধারণ দুটো মূর্তি এইরকমই। একটা স্থানু-ভঙ্গি মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়কে ফ্রয়েড বনাম মার্কস, অথবা ফ্রয়েড এবং মার্কস, কিংবা ফ্রয়েড থেকে মার্কস– এইসব অভিজ্ঞান দিয়ে বুঝতে চাইছি আমরা। একটা কোনও অভিজ্ঞান পেলে চিনতে সুবিধা হয় কাউকে।

সুমন্ত মুখোপাধ্যায়

১৮.

খুব ভোর ভোর উঠে পড়ে লোকটা। এক-একদিন উনুন ধরায়। কখনও দুধ জ্বাল দেয় মেয়ের সঙ্গে। সারাদিন তারপর অনেক কাজ করে– অনেক অনেক কাজ। পড়ার কাজ, লেখার কাজ, দোকান-বাজার, ডাক্তার-হাসপাতালে ছোটাছুটি– কী নয়! যখন যেমন দরকার। একটা গোটা দিন– ২৪ ঘণ্টা সময় যথেষ্ট নয় যেন। মনটা সারাদিনই ছুটে বেড়ায়। আক্ষরিকই টালা থেকে টালিগঞ্জ। ময়দানে, কলেজ স্ট্রিটে চলে যায়, একটু উত্তেজনা অথবা সংসারের খোরাকির সন্ধানে। সময়টা গোলমেলে, সেই গোলমাল থেকেই জড়িয়ে গিয়েছে রাজনীতিরও কাজে।

মিছিলে, মিটিংয়ে, নতুন সব তর্কে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। আর লোক দেখে। কতরকম যে লোক। শহুরে লোক। গ্রামের লোক। মুখ থুবড়ে পড়া লোক, বুক ফুলিয়ে, লাথ মেরে যাওয়া লোক। বাসে-ট্রামে চড়া লোক। বাস-ট্রাম জ্বালানো লোক। রাস্তায় ছেতরে পড়ে থাকা ১২ বছরের ছেলে। বিনা বিচারে জেলে যাওয়া কত লোক। 

আড়চোখে সবাই যে এখন দেখছে সবাইকে– সে-ও বোঝে কথাটা। কলেজবাড়ির ছাদে স্বাধীন দেশে কেন বসে আছে মিলিটারি– মাথায় ঢোকে না তার। অথচ চারপাশটা পালটাতে চাইছে দ্রুত। আর সেই বদলকে কোনও অমোঘ নিয়মে স্বাভাবিক হয়ে যেতে হচ্ছে। বিস্ফোরণের সামনে থেকে কেনই-বা বারবার শান্ত হয়ে ঝিমিয়ে ঘরে ফিরে যায় দেশ– এইসব কথা বুঝতে চায়। ইতিহাস আর মানুষ, মানুষের ছোট-বড় প্রতিদিনের ইতিহাস কীভাবে, কোনটা উঠে পড়ে কার ঘাড়ে– এইটে ভাবতে ভাবতেই সে ঢুকে পড়ে এর-ওর-তার মনে। সেইসব মন তখন একইসঙ্গে ছুটতে থাকে হাজার দিকে। একটা কোনও নির্দিষ্ট দিকেই তো আর নয়, হাজার দিকেরও আবার হাজার হাজার দিক। ছুটতে ছুটতেই টের পায়, নিজেকে ডাকার মতো কোনও ‘আমি’ কোথাও সে এখন আর ধরতে পারছে না।

নিজের জন‌্য সযত্নে বাঁচিয়ে রাখা একটা সর্বনাম– মিশে যাচ্ছে লোকজনের ভেতর, পশুপাখি, নদী-মাঠ-প্রান্তরের ভেতর। একটা গোটা দেশের ভেতর, আর সারাদিনই চলতে থাকে লেখা– মাথায়, কাগজে– লিখতে লিখতে কোনও ঊর্ধ্বশ্বাস গতি তাকেও যেন বলে যায় ‘তুমি কোনও চশমা নও’, ‘জানলা নও’, ‘স্বর্গের নরকের নাগরিক নও’। অনেক রাতে, ঘুমিয়ে পড়ার আগে তার বোঝা হয়ে যায় ‘আমি’ কথাটার অর্থ ‘বাংলাভাষা শুধু’’; ‘আমি’ মানে বাংলা ভাষা ছাড়া আর কিছুই নয়। 

২.

লাল রঙের তিনটে সমান্তরাল লাইন। এই সরলরেখা ত্রয়ীর ঘেরাটোপে, লাল রঙেই লেখা ‘অপ্রকাশিত মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়’। ভূমিকা, নির্দেশপঞ্জি– যুগান্তর চক্রবর্তী, আর গোটা ঘটনাটাই ঘটছে ওপর দিক করে। একটা সাদা-কালো ফোটোগ্রাফিক প্রেক্ষাপটে। ছবিটা একটা কোনও ডায়েরি-বইয়ের হঠাৎ-খোলা পাতার। অচেনা হাতের লেখা। শব্দের আন্দাজ অচেনা। এমনকী, এইসব লেখায়, একটু আস্তে-ধীরে পড়লে যেসব কথার আঁচ পাওয়া যাচ্ছে– কেউ ভাবতেই পারে না তার লেখক স্বয়ং মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়!
একটা কোনও নাটকের সামনে যেন দাঁড় করানো হল পাঠককে। প্রকাশ আর অপ্রকাশের নাটক। যেন একটা প্রকাশিত রূপ আছে মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের– যেটা লাল রঙে ওই উপরিভাগে বিপন্ন হয়ে উঠলে অপ্রকাশিতের আবির্ভাবে।

এই ছিল আজ থেকে ৫০ বছর আগে বেরনো মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের ডায়েরি আর চিঠিপত্রের প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ। ভেবেছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। ১৯৪৯ সালের ১৭-১৮ জুন, এই পাতাটি খোলা। অথচ লেখক লিখছেন– ৮.৮.১৯৫১! রবীন্দ্রপ্রয়াণের ১০ বছর পার হল সেদিন। রবীন্দ্রনাথ, সভা, শরীর, দারিদ্র, লেখার খবর, ছাপার দুনিয়া, সাহিত‌্যের রাজনীতি, আপনজনের আচরণ, আত্মসমালোচনা, উদ্বেগ কত রকমের মনের গতি, সব পড়ে নেওয়া যায়, দুটো মাত্র পাতা থেকে, আলাদা আলাদা করে। ওই প্রচ্ছদেই ধরা থাকল সম্পাদকের হাতে বাদ যাওয়া অতি ব্যক্তিগত খানিকটা অংশ। অর্থাৎ, মলাট থেকেই টের পাওয়া যায় অপ্রকাশিতেরও অপ্রকাশিত কোনও চেহারা আছে। তেমনই প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গে অবলীলায় ছুটে চলা এক মনেরও মুখোমুখি হলাম আমরা। সেই আচম্বিত সাক্ষাৎ, তার নানারকম সম্ভাবনা আজ বদলে গিয়েছে। পরবর্তী সংস্করণের প্রচ্ছদে সেই নাটকটাই গায়েব হয়ে গেল। খয়েরি রঙের জমিতে সাদা-কালোর মোটা দাগের টান, যার ভেতর দায়সারাভাবে ধরা আছে আলাদা আলাদা তিনটে শব্দ। ‘অপ্রকাশিত’, ‘মানিক’ আর ‘বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়’। নির্দেশপঞ্জির তীক্ষ্ণ অভিমুখ বদলে গিয়েছে নিয়মমানা টীকা-ভাষ‌্যে। দ্বিতীয় সংস্করণের এই প্রচ্ছদও এঁকেছিলেন– পূর্ণেন্দু পত্রী।

‘ভালো মলাট, বইয়ের ললাট’ … মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের ডায়েরির ভাগ‌্যেও এইরকম বদল ঘটেছে। প্রকাশের অর্ধশত বছর পরে আজ আবার তাকে ঘিরে খানিক জিজ্ঞাসা জমছে মনে।

১৯৪৫ সাল থেকে ১২ বছরের ডায়েরি। আরও অনেক বেশি বছরের সাংসারিক হিসেব। কেননা অনেক পুরনো প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি আর প্রাপ্তব‌্যের সারসংক্ষেপ রয়েছে সেখানে। সারি সারি গল্পের প্লট। উপন‌্যাসের পরিকল্পনা, সতীনাথ ভাদুড়ির ডায়েরির মতো নয়– শুধু সম্পর্ক বিন‌্যাসের ছক। রয়েছে বক্তৃতা বা প্রবন্ধের চুম্বক। অসুখের বিস্তারিত নোট, ঘোড়দৌড়-সংক্রান্ত বিজাতীয় সাংকেতিক লিপি, চিঠিপত্র পাওয়া আর লেখার তালিকা। আর রয়েছে লিখে রাখা কথা– নিজেকে লেখা, নিজের জন‌্য। এলোমেলোভাবে, নিজেকেই খাতায় বসানো।

কতদূর এলোমেলো– তার পরিচয় দিয়েছেন সম্পাদক। যখন তখন যেখানে খুশি ক্রমের কোনও বালাই না-রেখে যে কোনও ডায়েরির যে কোনও পাতায়– নিজেকে লিখে রাখছেন মানিক! যেন কোনও অনিবার্য দাঁড়ির দিকে ক্রমশ গড়িয়ে চলা ঢালু পরিসর এইসব ডায়েরি বইয়ের পাতা। লেখকের নিজের সময় সেই পরিসরে যখন যেমন খুশি হাজির হয়ে, ভেঙে দিতে চাইছে ঘেরাটোপের নির্দেশ।

পড়তে পড়তে বোঝা যায়, ডায়েরি লেখার ধাত নেই তাঁর। বিখ‌্যাত সব ডায়েরি-লেখকরা– কাফকা, টলস্টয় অথবা ব্রেশট; বিভূতিভূষণ কিংবা সতীনাথ একটা নির্দিষ্ট নিয়মে হাজির হন ডায়েরির পাতায়। একটা বাচনপদ্ধতি তৈরি হয়ে যায়। নির্মলকুমার বসুর ‘সাতচল্লিশের ডায়েরি’ খুলে, দেখতেই পাই কী সুনিপুণ অধ‌্যবসায়ে কথা বলেন এঁরা। মানিক তেমন নন। বারবার লিখতে বসে কত রকমের ভাষাভঙ্গি, কত রকম কায়দায় লেখেন তিনি। লিখতে লিখতে দিন শেষ হয়ে যায়, কিছুতেই একটা কোনও নিয়ম আর খুঁজে বের করা হয়ে ওঠে না তাঁর।

হয়তো সময়ই নেই সারাদিনে ডায়েরি খুলে বসার, অথবা যেমন বলেন ১৯৪৯-এর শুরুতে:

‘এবারও কি শুরুতেই শেষ হবে? দেখা যাক। ডায়েরি রাখতে পারি না কেন? বোধহয় এই ধারণা থেকে গেছে বলে যে ডায়েরি মানেই নিছক ব‌্যক্তিগত কথা! কয়েকদিন লেখার পর আর উৎসাহ পাই না।’

তিন বছর পর ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি, লিখছেন:

‘প্রতি নতুন বছরে নতুন ডায়েরি হাতে পেয়ে ডায়েরি লেখার সাধ। দেখা যাক এবার হয় কিনা। … জীবনটা গুছিয়ে নেওয়ার জরুরি চিন্তাতেই দিনটা কাটল।’

বছর চলে যায়, তবু দুটো কথার বদল ঘটে না এতটুকু। বোঝা যায়, ‘নিছক ব‌্যক্তিগত কথা’ লেখার একটা কোনও ‘ধারণা’ থেকেই চলে যায় ‘উৎসাহ’। তৈরি হয়ে ওঠে লেখার ‘নিছক-ব‌্যক্তিগত’ আর ‘নিছক-ব‌্যক্তিকে ছাড়িয়ে ওঠা’ চেহারার ধারণা। কিন্তু একটা উদ‌্যমও চোখে পড়ে– ‘ডায়েরি লেখার সাধ’ ও ‘দেখা যাক এবার হয় কিনা’-র উদ্বেগ আস্তে আস্তে বুঝিয়ে দেয় ওই ‘ধারণা’র প্রবল অস্তিত্ব। শেষ পর্যন্ত, লেখার প্রবল আগ্রহ আর না-লেখার একইরকম জোরালো ধারণার মধ‌্যেই, মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের ডায়েরিগুলো লেখা হতে থাকে।

এতসব উজান ঠেলে এই ১২ বছরে কেন ফিরে আসেন তিনি বারবার ডায়েরির পাতায়? কেন লেখে লোকে ডায়েরি? কী-ই বা ঘটে এই লিখনে?

৩.

What is good and evil is essentially the I, not the world.
The I, the I is what is deeply Mysterious!

–Wittgenstein [Note books 1914-1, Blackwall, P. 80]

মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায় ডায়েরি লিখেছেন জীবনের শেষ ১২ বছর। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫৬। চারের দশকের নানামুখী রাজনৈতিক সম্ভাবনা ততদিনে রাষ্ট্রীয় দমনে আর ভাবাদর্শের টানে, অনেক নির্দিষ্ট নিয়মিত পথে বইতে শুরু করেছে। মানিকের লেখায় এই সম্ভাবনা আর বিলয় নিয়ে জিজ্ঞাসার, পরীক্ষার শেষ নেই। ‘বর খুঁজে ফেরে সত্তা’– এক অর্থে তাঁরও অনেক উপন‌্যাস আর ছোটগল্পের ভেতরকার প্রস্তাব।

ডায়েরির পাতা থেকে এই সময়ের কিছু ভাবনা অংশ তুলে নেওয়া যায়:

১. যুদ্ধের সময় ছাত্রদের তরুণদের নৈতিক অধোগতি কেন হয়েছিল? স্বদেশ সেবার আদর্শ লুপ্ত হয়েছিল? স্বদেশপ্রেম ও তাদের হুজুগ প্রিয়তা ও ব্রিটিশ বিদ্বেষ: সভাসমিতি আন্দোলনে বিদ্বেষ রূপ নিতে পারলো না হুজুগ প্রিয়তা মিটল না: জীবন উদ্দেশ‌্যহীন– ভবিষ‌্যৎ অনির্দিষ্ট…
–১৯৪৬

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

২. ছাত্রদলন পর্ব আরও প্রচণ্ডভাবে। ছাত্ররা দৃঢ়-খালি হাতে গুলির বিরুদ্ধে লড়ছে।…
আজ পুলিশের সাহায‌্যে মিলিটারী আমদানী।…
কলেজের ছাতে বন্দুক তাক করে সৈন‌্য।
১৯/২০ জানুয়ারি ১৯৪৯

৩. আজ সম্মেলন ঘিরে আরও বেশি লোক। একটি অল্পবয়সী চাষী বৌ মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে এমন চমৎকার বক্তৃতা করলেন। কি রেটে সব বদলে যাচ্ছে তিনি যেন তার জীবন্ত প্রতীক।
২৫/১১/১৯৪৯

৪. ফ্ল‌্যাগ কিছু কিছু উড়ছে– কিন্তু চারদিক ঝিমানো। প্রথম বছর এমনকি দ্বিতীয় বছরের– সঙ্গে তুলনায় স্বাধীনতার মৃত‌্যু দিবস। কোথাও কোনও উৎসাহ উদ্দীপনার চিহ্ন নেই।
১৫/৪/১৯৫০

তবু এই ১০-১২ বছরের ডায়েরির সামনে বসে ডায়েরির পাঠক বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন। কোনও আদল, আত্মবর্ণনার কোনও নিয়ম বা কোনও পাঠক্রম বানিয়ে নিতে পারার মতো সংহতি এখানে পাওয়া অসম্ভব।

১৯৫৪-এর ডায়েরি প্লটে ঠাসা। ১৯৪৬ সালে ডায়েরি লিখেছেন মাত্র ন’দিন। চারদিন, টালিগঞ্জের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা, ’৪৬-এর কলকাতা দাঙ্গায়। দু’দিন বড় মেয়ের অপারেশন– আর গাড়ির ব‌্যবস্থা। ১৯৪৭ সাল– একটি লাইনও নয়! ১৯৪৮-এর জানুয়ারি মাসে সাতদিন আর এপ্রিল-মে মাসে দু’দিন। বাঙালি লেখকদের ডায়েরির তুলনায় এই উপস্থিতিকে সাময়িক খেয়াল বা মুহূর্তের ঝোঁক ছাড়া কিছু বলার উপায় থাকে না।

ডায়েরি লেখার যে-তাগিদের কথা বলতে চেয়েছি ১৯৪৯-এর আগে, মানিকের কাছে তা বিক্ষিপ্তভাবে আসে। উপহার পাওয়া ডায়েরিগুলো ভরে যায় এপিলেপসি সংক্রান্ত নোটে, উপন‌্যাস বা গল্পের প্লটে, দৈনিক সংসার খরচের টুকিটাকি হিসেবপত্রে।

১৯৪৯ থেকে ১৯৫৩– পেশাদার লেখক হিসেবে ১৩টা উপন‌্যাস আর বেশ কিছু ছোটগল্প লিখছেন তিনি। আর ডায়েরির পাতাও ভরে যাচ্ছে নানা আঙ্গিকের দিনলিপিতে। কখনও সবিস্তার, কখনও প্রতিদিনের টানা টুকরো টুকরো উল্লেখ মাত্র। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সালের পাতায় পাতায় এই উপস্থিতির একটা গুণগত পরিবর্তন দেখা যাবে।

ডায়েরির সম্পাদক এই পরিবর্তনটাকে– সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক আর পেশাগত দুশ্চিন্তার সঙ্গে সমানুপাতে দেখতে চেয়েছেন। সঙ্গে আছে ‘অসুখ আর আসক্তি’। ব‌্যক্তিগত কথা লেখার দরকার হয়ে পড়েছে তখনই, যখন নানা ক্ষেত্রে ওই ব‌্যক্তি-অংশটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই তিন পর্যায় সামনে রেখে, এর বাইরে কিছু কথা ভাবা চলে।

সারাজীবনই, নিজের লেখা নিয়ে নানা পরীক্ষা চালিয়েছেন মানিক। অনেক সময় উপন‌্যাসের ভাবনাসূত্র জুড়ে দিয়েছেন মূল পাঠ‌্যের সঙ্গেই। আর এইসব পরীক্ষার মূল নির্ভর হয়ে দাঁড়ায় ‘বিষয়ী’ বা ‘সাবজেক্ট’– যাকে আমরা ক্রিয়ার কর্তা অথবা বাক‌্যের অর্থনিষ্পত্তির মূল নিয়ন্তা হিসেবে চিনি। এই চেনাশোনা ‘বিষয়ী’কে ক্রমাগত সমস‌্যায় ফেলে দিয়ে মানিক বুঝতে চান কোনও এক নিয়মকে, যা সমস্ত সামাজিক সম্পর্ক বিনিময়কে তার অন্তঃস্থল থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। যাকে আলথুসার পড়তে চাইবেন ‘ইডিওলজি’ বলে। আর সব ভাবাদর্শেরই গন্তব‌্য হল ‘সাবজেক্ট’ বা ‘বিষয়ী’। আপাতভাবে সমস্ত ক্রিয়ার কেন্দ্রে বসে থাকা এই লোকটা, সমস্ত ভাষাজালের মানে তৈরি করা এই বিষয়ীর যে কোনও উদ‌্যমকেই নানাদিক থেকে বুঝতে চেষ্টা করেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এই সমীক্ষণেই ‘আত্মতা’র নানারকম জটিল ধারণা তৈরি হয় তাঁর লেখায়।
বিষয়ীর একটা কোনও জমাট-নিটোল আকার বারবারই অসম্ভব হয়ে ওঠে। ব‌্যক্তির সত্তা লোপ পায় প্রায়শ। যদিও গোপন, তবু ‘আত্মতা’-সংক্রান্ত অন‌্য আরেকরকম পরীক্ষার সুযোগ আসে ডায়েরি লিখনে। ‘আমি’ এই উত্তমপুরুষ একবচনের উচ্চারণ মাত্র আত্মতার সম্পূর্ণ নতুন এক প্রকল্প শুরু হয়ে যায়। এমিল বেনভেনিস্ত খুব সুন্দর করে বলছেন, ভাষাই হল সেই বস্তু যা বিষয়ীত্বের সম্ভাবনা তৈরি করে। কারণ ভাষাই বক্তাকে সেই সুযোগ দেয়– নিজেকে ‘আমি’ হিসেবে, বাক‌্যের কর্তা হিসেবে হাজির করার।
এই ‘আমি’ হিসেবে উপস্থিত হওয়ার দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ধরন খুঁজে পাওয়া যায় মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের ডায়েরিতে। ‘আমি’ উচ্চারণ মাত্রেই যেহেতু ভাষার ভেতর কেউ নিজেকে বিষয়ী হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পায়, তাই তফাত করার একটা প্রক্রিয়াও এখানে সক্রিয়।

‘আমি’কে ধারণ করা বা অর্থময় করে তোলা অসম্ভব– কোনও ‘না-আমি’ অথবা ‘তুমি’র ধারণা ছাড়া। মানিকের ডায়েরিতে ‘আমি’ ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে দু’ভাবে: এক, যখন ডায়েরিতে ‘আমি’ প্রবেশ করছে বহির্জগতে– যেখানে অন‌্য বা অপরের দিকে সে ধাবমান। সমস্ত অভিজ্ঞতার অভিমুখ বাইরের দিকে। অভিজ্ঞতাটা হচ্ছে ‘আমার’, কিন্তু আমি এসে পৌঁছয় সেখানে। রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক বা যে কোনও সম্পর্ক বিনিময়ের কেন্দ্রে হাজির হয়ে নথিবদ্ধ করে নিজেকে। এই লিখনের গতি বহির্মুখী। উদাহরণ হিসেবে টেনে আনা যায় ১৯৪৬-এর দাঙ্গা বিষয়ক লেখা। অথবা বাবার সঙ্গে তাঁর একেবারে পারিবারিক সংলগ্নতা।

‘অহিংসা’ (১৯৪১) উপন‌্যাসে, ‘লেখকের মন্তব‌্যে’ মানিক জানিয়েছিলেন, ‘ব‌্যক্তিত্ব আসলে পরাশ্রয়ী’, তার প্রচ্ছন্ন ও ‘প্রকাশ‌্য’ উপাদানগুলোর বিশ্লেষণ প্রায় অসম্ভব। ‘পর’ অভিমুখী ‘আমি’র একটা সহযোগ, এই ধরনের লেখায় ফুটে উঠতে থাকে।

আর দ্বিতীয় পরিস্থিতিতে ‘আমি’ অনেকটা নিষ্ক্রিয়, কোনও ধারক যন্ত্রের মতো। বাইরের ‘না-আমি’, বলা ভালো সমস্ত external-টাই তখন ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়তে চায় আমার ভেতর। অভিজ্ঞতার এই লিখন প্রাণপণে বাঁচাতে চায় ওই ‘আমি’ অংশটাকে। বাঁচাতে না-পারলেও, স্পর্শ করতে চায়। ১৯৪৮-এর দিনলিপি থেকে এইরকম একটা উদাহরণ ধরে নিচ্ছি:

‘দুর্দ্দিন। গান্ধিজী গুলির আঘাতে নিহত।
বেলা সাড়ে বারোটা। বাথরুমে স্নান করতে ঢুকেছি। টুবলু বারান্দায় লাফাচ্ছিল। রান্নাঘরে ডলি ফুটন্ত ডাল উনান থেকে নামিয়েছে। সেই সময়… টুবলুর বাঁ পা হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত পুড়ে গেল।…
এই যন্ত্রণা কাতর শিশুসন্তানকে নিয়ে আছি। জ্বর এসে গেছে, সন্ধ‌্যার পর সংবাদ এলো: দিল্লিতে প্রার্থনাসভায় পিস্তলের গুলিতে গান্ধিজী নিহত। সমস্ত মনপ্রাণ যেন হায় সর্বনাশ বলে আর্তনাদ করে আঘাতে মুহ‌্যমান হয়ে গেল।’

এপিলেপ্‌সি বা ফিট সংক্রান্ত বিবরণে, গৃহহীনতায়, দারিদ্রে অথবা ১৯৫৫ সালে হাসপাতালের লেখায় এরই একটা চূড়ান্ত রূপ দেখা দেবে। শুধুমাত্র নিজের ছায়ায় নিজেকে দেখার একটা কাল্পনিক আশ্রয় এখানে গড়ে উঠতে চায়। নিজেরই এক বিচ্ছিন্ন ছায়ার সঙ্গে কথা বলে এক ধরনের স্বাস্থ‌্য এবং স্বস্তি ফিরে পাওয়ার উপায় হয়ে ওঠে ডায়েরি লেখা। এখানে ওই পরাশ্রয় প্রায় লুপ্ত হতে থাকে। শরীর বা মনের বৈকল‌্য আর নিয়ন্ত্রণহীনতার সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে এই এক ‘আমি’ যা একটা স্পর্শযোগ‌্য কেন্দ্র হয়ে আসে।

১৯১৪ সালে আত্মরতি সংক্রান্ত প্রস্তাবে প্রশ্ন তুলেছিলেন ফ্রয়েড। ‘অহং’ই যদি আত্মরতির আসন হয়, আর তা যদি জন্ম থেকেই না থাকে, তাহলে কী জন‌্য আত্মবীক্ষণের এই ঘোর জন্মায় মনে? প্রায় ৩০ বছর পর উত্তর খুঁজে পেয়েছিলেন জাক লাঁকা। দৈহিক আর স্নায়বিক অসম্পূর্ণতা, নিয়ন্ত্রণের অভাবই শিশুকে নিয়ে যায় আয়নার সামনে। নিজেকে কোনও একটা ঐক‌্যে বুঝতে।

এই দ্বিতীয় পরিস্থিতিতেই, নিষ্ক্রিয়তার মুহূর্তে, সাবজেক্ট বা বিষয়ী পরম কোনও সাবজেক্টের কবলে পড়তে পারে। ‘বিষয়ী’ হয়ে ওঠা, একই সঙ্গে তার সমর্পণ বা বিলয়েরও নির্দেশক হয়ে যায়। সে নিজেকে শেষ পর্যন্ত বিলিয়ে দেয়, অজ্ঞাতে একটা কোনও পরম আশ্রয় বা নিয়মের হাতে।

শেষ পর্বের ডায়েরি লিখনে মানিকের ‘আমি’ এই বিলয়বোধ থেকে খুঁজে আনে এক ‘মা’কে। যার সাপেক্ষে সমস্ত কাজ আর কথা অর্থময় হয়ে ওঠে:

‘সবই নিয়মে চলে– মা-র জগতে অনিয়ম নেই। আগুনে যেমন হাত পোড়ায় তেমনি আগুনে হাত না দেবার বুদ্ধিও দিয়েছেন মাথায়।
২৮/৪/৫৪’

মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের ডায়েরি নিয়ে যে সমস্ত আলাপ-আলোচনা চলে, যেভাবে আমরা সাক্ষ‌্য হিসেবে এদের দাখিল করি, সেখানে একটা পরিণতির বোধ কাজ করে। যেন একরকম থেকে আর-এক রকমে পৌঁছল একটা মন!

সত্যজিৎ রায়ের আঁকা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

যে দুটো শক্তির কথা এখানে বলতে চেয়েছি, অবশ‌্যই তাদের ‘বিপরীতমুখী’ বলে চিনে নেওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবিক, কোনও পরিস্থিতিতে তারা একসঙ্গেও যে কাজ করে যেতে পারে– এই কথাটা হারিয়ে যায়। মানিকের ডায়েরিতে এইখান থেকে শুরু হয় একটা নতুন শক্তি বা সম্ভাবনাময় জগৎ। ‘অসুখ, আসক্তি, আর দারিদ্র’ কারও মতে রাজনৈতিক দলীয়তার নিয়ম যখন আছড়ে পড়ে– একইসঙ্গে ‘আমি’ চলে যেতে পারে কাল্পনিক আশ্রয় বা নিরাপত্তা ভেঙে সম্পূর্ণ অন‌্য স্থানাঙ্কে। প্রথম উদারণ হিসেবে আমি তুলে নিতে চাইব সেই মর্মান্তিক দিন, যখন সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে রিকশায় তুলে রাতের অন্ধকারে চলেছেন মানিক। রাস্তায় রক্ত ঝরে পড়ছে স্ত্রীর গর্ভাশ্রয় থেকে– বিধ্বস্ত স্বামীর স্থানাঙ্ক হঠাৎই, মুহূর্তে বদলে যায়।

‘এত রক্ত? রক্ত মনে পড়িয়ে দেয় রাজপথে মেয়েরা বুলেটের ছেঁদা পথে যে রক্ত ঝরিয়েছে।’

পরক্ষণেই ‘আমি’র জায়গা বদলে যায় পিতৃত্বে:

‘ছেলেমেয়েরা জেগে আছে, উত্তেজিত, উৎসুক। ঠান্ডা করে ঘুম পাড়ালাম।’

দারিদ্রের নিয়ম যখন অমোঘ হয়ে আছড়ে পড়ে, মৃত সন্তান প্রসব করা স্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে:

‘বাচ্ছা মরে যাওয়ায় ডলি অখুশী নয়। অনেক হাঙ্গামা থেকে বেঁচেছে। বলল যে বাঁচা গেছে বাবা, আমি হিসেব করছি বাড়ি ফিরে মাসখানেক বিশ্রাম করে রাঁধুনি বিদায় দেব! অনেক খরচ বাঁচবে।’

বিলয় যখন সুনিশ্চিত ধরে নেওয়া যায়, তখনই ‘আমি’ বলে ওঠে: ‘মানুষ সন্তানকে ভয় করছে? … অভিশপ্ত সমাজ এমনি অস্বাভাবিক করেছে জীবন।’

উল্টোরথ কার্যালয়ে, মৃত্যুর চারদিন আগের ছবি, আলোকচিত্র: হেমেন মিত্র

আর দারিদ্রের অমোঘ নিয়ম ফেঁসে গিয়ে দেখা দেয় ‘সাম্রাজ‌্যবাদী রাক্ষস’-এর মুখ। “মা’র জগৎ”, ‘মূল নিয়ম কখনও বুঝবো না’, ‘দয়া চেয়েছি, দয়া পেয়েছি’– এইসব প্রসঙ্গের সঙ্গেই উঠে আসে ১৯৫৫ সালে অন্ধপ্রদেশে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির লজ্জাজনক পরাজয়ের বিশ্লেষণ। হাসপাতালের ঘরে বন্দি এক রুগীর স্থানাঙ্ক বদলে যায় হাসপাতাল ব‌্যবস্থার পর্যবেক্ষকে। গৃহসন্ধানী দুশ্চিন্তা, হাহাকার বদলে যায় উল্লাসে– ‘চিনে চিয়াং যায় যায়।’

ডায়েরি লেখায় এই সম্ভাবনার দুটো দিকের কথা এখানে তুলতে চাই। ‘আমি’ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে যে অনঢ় বিষয়ীত্বের ধারণা গড়ে ওঠে, সেটা ভেঙে যায় যখন নিজেকে একটা পরিবর্তনশীল বিষয়ী স্থানাঙ্কে উপস্থিত হতে দেখি। প্রতি মুহূর্তের এই স্থানান্তর, এই সঞ্চালন ‘আমি’-র একটা স্বতশ্চল চেহারা গড়ে তোলে। যাকে কোথাও কখনও আটকে রেখে দেখা সম্ভব হচ্ছে না আর।

ডায়েরিতে যে টুকরো-টুকরো খণ্ডে এসে হাজির হচ্ছেন মানিক, তাতে ভেঙে পড়ে আমাদের বানিয়ে তোলা প্রাথমিক যে কোনও মূর্তি। আর ডায়েরির লেখকের কাছেও প্রতীত হয় ‘আমি’ আদতে এক ছায়া। ক্রমাগত কোনও এক অবস্থানে স্থির থেকে সেই ছায়ার সাপেক্ষে ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠা হয় না আর। স্বামী থেকে পিতা, পিতা থেকে সন্তান, সন্তান থেকে পেশাদার লেখক বা দায়িত্বশীল বিশ্লেষণপ্রবণ রাজনৈতিক কর্মীর অবস্থানে যখন বদলে যেতে পারে ওই উত্তম পুরুষ একবচন– বদলের নানা ফাঁকফোঁকর দিয়ে তখন বেরিয়ে আসতে পারে নানা বৈপ্লবিক সম্ভাবনা।

১৯৫৪ সালে, এক ঘোরতর আত্মসমীক্ষার দিনে, ডায়েরিতে পড়ি:

‘পিচ্ছিল এগিয়ে এসে যদি মনকে পিছলে দেয় সে দায়িত্ব আমার নয় সে দায়িত্ব নেবার সাহস আমার নেই।’

বারবার পিছলে যাওয়া সম্ভাবনা ছাড়া মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের ডায়েরির ‘আমি’কে বর্ণনা করা অসম্ভব। দিনলিপি লিখনের মধ‌্য দিয়ে এই সম্ভাবনার জগৎটাকেও ভাষার ভেতর ছুঁয়ে দেখতে চাইছিলেন মানিক। এইটেই তাঁর তাগিদ, তাঁর ডায়েরি লেখার সাধ।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বরানগরের ভাড়াবাড়ি

৪.

খুব পরিচিত দুটো ফোটোগ্রাফ আছে মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের।

এক, প্রত‌্যয়ী মুখে স্মিত হাসি, তাকিয়ে আছেন একপাশে, উজ্জ্বল হয়ে আছে মুখটা, কোনও অদেখা আলোয়। অন‌্য ছবিতে সরাসরি দর্শকের মাথার সামান‌্য ওপর দিয়ে দেখছেন, উৎকণ্ঠ মানিক। চাপা অস্থিরতায় সমস্ত ছবিটাই থমথম করছে। একটা অমঙ্গল যেন আমাদের ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে। দুটো ছবিই সুনীল জানার তোলা।

আমাদের মানিক পাঠেরও সাধারণ দুটো মূর্তি এইরকমই। একটা স্থানু-ভঙ্গি মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়কে ফ্রয়েড বনাম মার্কস, অথবা ফ্রয়েড এবং মার্কস, কিংবা ফ্রয়েড থেকে মার্কস– এইসব অভিজ্ঞান দিয়ে বুঝতে চাইছি আমরা। একটা কোনও অভিজ্ঞান পেলে চিনতে সুবিধা হয় কাউকে।

ডায়েরির অপ্রকাশিত মানিক এই প্রচেষ্টাগুলোর দিকে একটা উপহাস ছুড়ে দেয়। প্রতি মুহূর্তের বিক্ষেপ থেকে আমরা টের পাই, একটা প্রবল শক্তি আছে বিক্ষেপ গতির। তা কোনও বিলম্বিত বা সমর্পণের দিকে যেমন টান দিতে পারে, (যেমন দেয়, আমাদের কর্মনির্ভর সাধনাকে) তেমনই টেনে নিতে পারে বৈপ্লবিক কোনও চূড়ান্তেও, যাকে আমরা একমুখী করে বা নির্দিষ্ট অভিমুখে ঠেলে দিয়ে সম্ভাবনাময় করে তুলি। প্রশ্নগুলি সরিয়ে রাখি টেবিল থেকে। যে-প্রশ্নগুলোর ভেতর দিয়ে মানিক আমাদের নিয়ে যেতে চাইছিলেন একদিন।

সত্যজিৎ রায়ের করা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্কেচ

পয়লা জানুয়ারি, ১৯৫৬। রবিবার। যখন ভেঙে পড়তে চাইছে শরীর, সমস্ত মন, মদ, দারিদ্র, অলৌকিকের কাছে সমর্পণ যখন প্রায় সম্পূর্ণ হয়েছে– ‘মদ’ বলে একটা কোনও লেখা শুরু করেছিলেন মানিক:

“রাস্তা দিয়ে মাতাল গান গেয়ে চলেছিল– ‘মদ খানে আমি, সুধাপান করি কালী বলে…’। সুন্দর সুর। চমৎকার ঝংকার। গভীর মর্মস্পর্শী আবেগ। ধন্বন্তরী রাস্তায় নেমে যায়।”

মদ, কালী, রামপ্রসাদী ভক্তি, আবেগটান– সব কিছুর ঘোর ভেঙে দেখি ‘ধন্বন্তরী’ নামক লোকটি রাস্তায় নেমে গেল। কেন গেল? কোথায় গেল? কী-ই বা করবে লোকটা এখন? এই সমস্ত সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়ে বাংলা ভাষায় মিশে গেলেন মানিক। সমর্পণ থেকে সম্ভাবনায় দিকে আমাদের এগিয়ে দিয়ে গেলেন।

এক, দুই, আড়াই-এর অন্যান্য পর্ব …

১৭. কবি বনাম আবৃত্তিকার

১৬. অগ্রন্থিত শক্তির শক্তি

১৫. ঋতুপর্ণ, অন্তরমহল আর রবীন্দ্রনাথ

১৪. জয় এখন শেষজীবনের বুদ্ধদেব বসুর মতোই প্রশ্নাতুর

১৩. নকশাল পর্বের হত্যা-প্রতিহত্যার পরিবেশে কলকাতায় এসেছিল মারি ফারার

১২. এমনও হাসি আছে বেদনা মনে হয়

১১. গুরুদত্ত চেয়েছিলেন, বিজয়ের চলে যাওয়া দিয়ে শেষ হবে ‘পিয়াসা’

১০. কবির বিশ্রাম

৯. গত ২০ বছরে নস্টালজিয়ার এত বাড়বাড়ন্ত কেন?

৮. কলকাতার মূর্তি-আবর্জনা কি বাড়ছে?

৭. ভাবা প্র্যাকটিস করা, কঠিন এখন

৬. লেখার অত্যাচার, লেখার বাঁচা-মরা

৫. বিশ্বকর্মা পুজোর সন্ধেবেলাটার মতো বিষাদ আর হয় না

৪. কথা শেষ হতে পারে, ‘শেষ কথা’ বলে কিছু হয় না

৩. দেখা হলে বলে দিও, আজও বেঁচে আছি

২. ফুলের রং শেষ পর্যন্ত মিশে যায় নন্দিনীর বুকের রক্তের ইমেজে

১. আমাদের বিস্মৃতিশক্তির কথা বলে গিয়েছেন ভাস্কর চক্রবর্তী